ঢাকা ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
কেঁচো: মাটির নীরব শ্রমিক, কৃষির অদৃশ্য নায়ক চট্টগ্রামে যুবককে গুলি করে হত্যা রোটারি ইন্টারন্যাশনালের বর্ষবরণ উপলক্ষ্যে কুমিল্লায় বর্ণাঢ্য র‍্যালি ফাইন্যান্স এশিয়ার তিন পুরস্কার পেল আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস বালুর নিচে মিলল বিদেশি মদের মজুত, আটক বাড়ির মালিক Golden Touch বিষয়ক Story Writing নিয়ে আলোচনা, ৬ষ্ঠ পর্ব, এইচএসসির ইংরেজি ১ম পত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের আহ্বান চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতির নোয়াখালীতে মডেল মসজিদের খতিবের মরদেহ উদ্ধার জন্মদিনে ভালোবাসা আর শুভেচ্ছায় সিক্ত জয়া আহসান ধামরাইয়ে মালচিং পদ্ধতিতে চাষাবাদে ভাগ্য বদল কৃষকের প্রয়াত নাট্যজগতের কিংবদন্তি বিজয়া মেহতা পুশইনের পর শূন্যরেখা থেকেই নিখোঁজ তিন যুবক পরিচ্ছন্নতাকর্মী থেকে সিইও হওয়ার গল্প শোনালেন শরণ রাস্তার সংস্কার চাই শোবার ঘর হোক শান্ত ও আরামদায়ক প্রাণীর বিভিন্নতা ও শ্রেণিবিন্যাস অধ্যায়ের ১৭টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, এইচএসসির জীববিজ্ঞান ২য় পত্র দরজায় কাফনের কাপড়, চিরকুটে হুমকির বার্তা! রাবি ক্যাম্পাসে স্বাস্থ্যকর খাবারের স্বল্পতা এল নিনো: জলবায়ুর অস্থিরতা ও বাংলাদেশের ঝুঁকি মাস্টারকার্ড, এমটিবি ও জিপের যৌথ উদ্যোগে কো-ব্র্যান্ডেড প্রিপেইড কার্ড চালু এমআইএসটিতে দেশের প্রথম ফর্মুলা স্টুডেন্ট অ্যান্ড অটোমোটিভ ইঞ্জিনিয়ারিং সামিট ঐতিহাসিক সোনাহাট সেতুতে ফাটল, থেমে গেল ভারী যান চলাচল হাসপাতালে ভর্তি নজরুল ইসলাম খান চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের কাছে ইজারা না দেওয়ার জন্য মানববন্ধন ও সমাবেশ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ ডিসকাউন্ট ফেস্ট সন্ত্রাসবাদকে কখনোই যৌক্তিক বলা যেতে পারে না: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের তাৎপর্য সেনেগাল ম্যাচের আগে সতর্ক বেলজিয়াম চমেক হাসপাতালে হামে আক্রান্ত রোগীরা পেল হাইজিন কিট ও আর্থিক অনুদান সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকনোলজি ট্রান্সফার অফিসের যাত্রা শুরু

এল নিনো: জলবায়ুর অস্থিরতা ও বাংলাদেশের ঝুঁকি

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম
এল নিনো: জলবায়ুর অস্থিরতা ও বাংলাদেশের ঝুঁকি
আলম শাইন

প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। তা না পারলে জলবায়ু ঘটনাগুলো আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় দিক থেকেই সেই চাপ হবে তীব্র। জলবায়ুর এ পরিবর্তনকে সামনে রেখে এখন থেকেই কার্যকর অভিযোজন, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি গ্রহণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এর মূল্য আরও বেশি দিতে হবে।...

প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বৈশ্বিক জলবায়ুব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। এ পরিবর্তনকেই ‘এল নিনো’ বলা হয়। এটি কোনো একক অঞ্চলের নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর আবহাওয়াব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পর পর এ পরিস্থিতি দেখা দেয়। তবে এর তীব্রতা সব সময় একরকম থাকে না। কখনো তা স্বাভাবিক মাত্রায় সীমিত থাকে, আবার কখনো তা ‘সুপার এল নিনো’-তে রূপ নেয়। তখন বৈশ্বিক জলবায়ুকে মারাত্মক সংকটে ফেলে দেয়।

পৃথিবীর জলবায়ুব্যবস্থায় দুটি প্রাকৃতিক চক্র রয়েছে; একটি এল নিনো, অন্যটি এর বিপরীত অবস্থা লা নিনা। এই দুটি চক্র দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের কাছে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই দুটি চক্র বহুলভাবে আলোচিত হচ্ছে। কারণ এই চক্রের আচরণ এখন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে, বাতাসের প্রবাহ পরিবর্তিত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বৃষ্টিপাত, খরা, ঝড় ও তাপপ্রবাহের ওপর। ফলে এল নিনো এখন আর শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জটিলভাবে যুক্ত একটি সংকেত।

এল নিনোর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নভাবে দেখা যায়। যেমন, দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশে অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দেয়। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তীব্র খরা নেমে আসে। আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে খাদ্য উৎপাদন কমে যায়। এতে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়। উত্তর আমেরিকায় শীত ও ঝড়ের ধরনেও পরিবর্তন আসে। এই বৈশ্বিক অস্থিরতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয় যে, পৃথিবীর এক প্রান্তে সমুদ্রের উষ্ণতা বাড়লে তার ঢেউ অন্য প্রান্তেও গিয়ে আঘাত করে।

বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক জলবায়ু চক্রের বাইরে নয়। ভৌগোলিক অবস্থান ও নদীনির্ভর অর্থনীতির কারণে এর প্রভাব এখানে আরও সংবেদনশীল। এল নিনোর সময় বাংলাদেশে বর্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে। কোথাও বৃষ্টি কমে গিয়ে খরার পরিস্থিতি তৈরি হয়। আবার কোথাও অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হয়। এতে স্থানীয়ভাবে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই অনিশ্চিত আবহাওয়া কৃষি পরিকল্পনাকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।

ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। এর উৎপাদনের একটি বড় অংশ সময়মতো বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টি সময়মতো না হলে বীজতলা নষ্ট হয়, রোপণ পিছিয়ে যায়, ফলনও কমে আসে। শুধু ধান নয়, পাট, ভুট্টা ও ডালসহ প্রায় সব ফসলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষকের জীবনযাত্রা সরাসরি এর সঙ্গে জড়িত থাকায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর ব্যাপক চাপ পড়ে। বিশেষ করে উৎপাদন খরচ বাড়ে, কিন্তু আয় কমে যায়। ফলে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে।

এল নিনোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো তাপমাত্রা বৃদ্ধি। এটি বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি ডেকে আনে। গ্রীষ্মকাল আরও দীর্ঘ ও তীব্র হয়ে ওঠে। হিটওয়েভের সময়কাল বেড়ে যায়। জনস্বাস্থ্য গুরুতর হুমকির মুখে পড়ে। অত্যধিক গরমে শ্রমজীবী মানুষের কাজের সক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে কৃষক, নির্মাণশ্রমিক এবং রিকশা-ভ্যানচালকদের আয়-রোজগার সরাসরি প্রভাবিত হয়।

পানিসংকটও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। নদী-খাল শুকিয়ে যায়। অনেক এলাকায় খাবার পানির অভাব দেখা দেয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জেলায় এ সমস্যা আরও প্রকট হয়। একই সঙ্গে লবণাক্ততার বিস্তারও বাড়ে। এতে কৃষি ও পানীয় জলের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্বাস্থ্য খাতে এর প্রভাবও কম নয়। গরমজনিত অসুস্থতা বেড়ে যায়। ডিহাইড্রেশন ও হিটস্ট্রোকের ঘটনা বাড়ে। পানিবাহিত রোগও ছড়িয়ে পড়ে। তাতে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে এটি অর্থনৈতিক দিক থেকে রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনো ছিল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ঘটনা। সেই সময় বিশ্বের বহু দেশে আবহাওয়ার চরম পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। কোথাও অতিবৃষ্টি হয়েছিল। কোথাও তীব্র খরা নেমেছিল। আবার কোথাও অস্বাভাবিক ঝড় আঘাত করেছিল। সেই ধাক্কা শুধু প্রকৃতিতে নয়, অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কৃষি উৎপাদন কমে গিয়েছিল। খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছিল। বিভিন্ন দেশে মানবিকসংকট তৈরি হয়েছিল। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গিয়েছিল।

পরবর্তীতে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোও ছিল ভয়ংকর। সেই সময় বৈশ্বিক তাপমাত্রা রেকর্ড ছুঁয়েছিল। অনেক দেশে দাবানলের ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। কৃষি উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। বাংলাদেশেও সে সময় আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। বিশেষ করে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ওঠানামায় তা স্পষ্ট ছিল।

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এল নিনোর সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে এল নিনো কখন শুরু হবে তা বলা কঠিন হয়ে পড়ছে। কতটা শক্তিশালী হবে তাও অনিশ্চিত। কতদিন স্থায়ী হবে সে বিষয়েও নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব বহুমাত্রিক। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে। গ্রামীণ আয় কমে গেলে শহরমুখী অভিবাসন বাড়ে। এতে নগর ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। বস্তি সম্প্রসারণ হয়। কর্মসংস্থানের সংকট দেখা দেয়। সামাজিক বৈষম্যও বাড়তে থাকে।

শ্রম উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়াও একটি বড় সমস্যা। প্রচণ্ড গরমে মানুষের কাজের গতি কমে যায়। কাজের সময় কমে আসে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং পরিবহন খাতেও এর প্রচণ্ড প্রভাব পড়ে।

এ বাস্তবতায় এল নিনোকে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি এখন উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত একটি ঝুঁকির কারণ। তাই কৃষিব্যবস্থায় জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি। পানি সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। সেচব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে। আগাম আবহাওয়া পূর্বাভাসকে আরও কার্যকর করতে হবে।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সহযোগিতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশ একা এই ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারে না। সমুদ্রের উষ্ণতা, বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন এবং কার্বন নিঃসরণ–সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই বৈশ্বিক সমন্বয় ছাড়া এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলা করা কঠিন।

বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিযোজন। প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। তা না পারলে জলবায়ু ঘটনাগুলো আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় দিক থেকেই সেই চাপ হবে তীব্র। জলবায়ুর এ পরিবর্তনকে সামনে রেখে এখন থেকেই কার্যকর অভিযোজন, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি গ্রহণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এর মূল্য আরও বেশি দিতে হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও 
জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের তাৎপর্য

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৫:১১ পিএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের তাৎপর্য
গাজীউল হাসান খান

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, লালমনিরহাট বিমানবন্দরের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, মোংলাবন্দর উন্নয়ন কিংবা অন্যান্য কাজে চীন সরকার অত্যন্ত তৎপর হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারেরও কর্মতৎপরতার পরিধি অনেক বেড়ে যাবে। উন্নয়ন ও উৎপাদনের পালে হাওয়া লাগবে বাংলাদেশে। নতুন প্রযুক্তি ও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করবে তারেক রহমানের সরকার। এই মুহূর্তে তারেক রহমানের দেশপ্রেমের রাজনীতি ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি নিয়ে কারও মনে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই।...

বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক এবং বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী ঘরানার মানুষের মধ্যে এখন সর্বত্রই একটি উৎসাহ ও উদ্দীপনার ভাব পরিলক্ষিত হতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে তরুণ রাজনীতিবিদ ও নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্যসমাপ্ত চীন সফরের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি যেন আবার এক কাঙ্ক্ষিত ছন্দে ফিরছে। আশা-নিরাশার দোলাচল কিংবা রাজনৈতিক ধোঁয়াশা কেটে যেন এক রক্তিম সূর্যোদয়ের প্রত্যাশিত ক্ষণ শুরু হয়েছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, ভবিতব্য বাংলাদেশ এবং তার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এখন যেন ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও ঐতিহাসিকভাবে এক নতুন সঙ্গমস্থলের দিকে ঠেলে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের আগ পর্যন্ত দেশের জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক শক্তি অত্যন্ত সংশয়ের মধ্যে ছিল–শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবেন তারেক রহমান? বাংলাদেশ কী তার ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারবে? মুক্ত হতে পারবে আধিপত্যবাদের নিগড় থেকে? বাংলাদেশের আকাশ, জলসীমা ও ভূখণ্ড কী মুক্ত হতে পারবে ষড়যন্ত্রকারীদের আগ্রাসন এবং আধিপত্যের হাত থেকে? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় থেকেই দিগন্তে জমে ওঠা অবিশ্বাসের কালো মেঘ ক্রমে ক্রমে অপসারিত হতে শুরু করেছে। এখন তিস্তাসহ বাংলাদেশের অভিন্ন নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার এক অপর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের আদিগন্ত নীলাকাশ ও জলরাশি আর অরক্ষিত থাকবে না। এ দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি কিংবা সমৃদ্ধির জন্য রচিত হবে এক নতুন সম্ভাবনাময় মহাসড়ক। সে পথ ধরে একদিন সমাধান হতে পারে প্রতিবেশী মায়ানমারের সঙ্গে প্রায় সাড়ে চার দশক স্থায়ী বিতাড়িত রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের নিজ বাসভূমিতে ফিরে যাওয়া কিংবা স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সমস্যা। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ও উন্নয়নের কৌশলগত মিত্র চীন এবং তার প্রবীণ ও বিচক্ষণ নেতা শি জিনপিং এবং বাংলাদেশের অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতা তারেক রহমানের মধ্যে যে বৃহত্তর সমঝোতা ও মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে তা একদিন এ অঞ্চলের ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও সমৃদ্ধির গতিপথ বদলে দেবে বলে ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে।

চীনের বহুমুখী সাহায্য-সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনশীল খাতে রপ্তানি উন্নয়ন এলাকার অগ্রগতি দ্রুত এগোবে বলে ইতোমধ্যে একটি স্বচ্ছ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের পর পরই চীনের ১২টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে প্রায় সাড়ে নয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। মোংলা বন্দরকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। দীর্ঘদিন কোনো অপশক্তির কারণে ঝুলে থাকা তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের অন্যান্য নদী ব্যবস্থাপনার আশ্বাসও দিয়েছেন চীনের নেতারা। এসব ব্যাপারে বাইরের দেশের হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না বলে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে চীন সরকার। তাতে বাংলাদেশের সমস্যাসংকুল সেচব্যবস্থা, বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও নাব্য বৃদ্ধি এবং নদীভাঙন রোধ করার কাজ দ্রুত অগ্রসর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি স্বস্তির ভাব সৃষ্টি হয়েছে। আবার আলো ফুটেছে বাংলাদেশের অরক্ষিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। চীনের ২৪টি প্রস্তাবিত জে টেন সিই-মাল্টিরোল কমব্যাট জঙ্গিবিমান বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার শুভ সূচনা করবে। এর পাশাপাশি চীনের দ্রুততম ও বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি এবং কারখানা নির্মাণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে বলে জনগণের মধ্যে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য আস্থার ভাব সৃষ্টি করেছে। অরক্ষিত না হলেও তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রতিরক্ষার দেশ বাংলাদেশে এখন তুরস্কের বিভিন্ন ড্রোনপ্রযুক্তি ও অস্ত্র নির্মাণের কর্মসূচি নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা যেতে পারে। শেখ হাসিনার বিগত দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যে চরম হতাশা সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখন দ্রুত কেটে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে এখন আর কোনো বহিঃশক্তির আধিপত্য চলবে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া, তাঁবেদারির রাজনীতি ও নতজানু কোনো নীতির অস্তিত্ব এই গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর ‘নতুন বাংলাদেশে’ খুঁজে পাওয়া এখন কঠিন হবে বলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তির বিশ্বাস।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এখন বহু কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে, যা তার সফরের আগ পর্যন্ত ধারণা করা যায়নি। তারেক রহমানের চীন সফর এক নতুন রাজনৈতিক দিগন্তের সূচনা করেছে। চীন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রস্তাবে এত দ্রুত এগিয়ে আসবে তা আগে অনুধাবন করা যায়নি। তা ছাড়া তারেক রহমান সাহেবের অন্তরে লালিত ধ্যান-ধারণা, কর্মপরিকল্পনা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা নিয়েও বিশেষ কারও কোনো স্বচ্ছ বা বদ্ধমূল ধারণা ছিল না। বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, ক্ষমতায় দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার জন্য তারেক রহমান যে কারও দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন। কিন্তু তার চীন সফরের পর সে ধারণা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক শক্তি আবার দ্রুত পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠছে। তারা তারেক রহমানের ভেতর শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়া ও পরলোকগত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছেন। সে কারণে তারা বিভিন্ন দ্বিধাদ্বন্দ্ব, দুর্নীতি, সংশয় ও মতবিরোধ কাটিয়ে দ্রুত শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাসনামলের মতো একটি অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছেন। এটি একটি অত্যন্ত শুভ লক্ষণ বলে বিবেচিত হচ্ছে এখন। ক্ষমতাসীন বিএনপি এ স্প্রিরিটটি ধরে রাখতে পারলে দেশ শাসনে তাদের কোনো সংশয় বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকা উচিত হবে না। বিএনপির উচিত ক্রমবর্ধমান উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের অগ্রাধিকারমূলক আর্থ-রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া। সাধারণ মানুষের মধ্যে ঝিমিয়ে পড়া দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা জাগিয়ে তোলা। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়ে যারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাদের হারাবার কিছু নেই। কারণ তাদের কাছে এখন একটি স্বাধীন বাংলাদেশ আছে। এ দেশকে সর্বতোভাবে রক্ষা করতে হবে। প্রাগঐতিহাসিক কাল থেকেই এ বাংলা কখনো কারও কোনো পরাভব মানেনি। বারবার স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পতাকা উড়িয়েছে এবং সবসময় তাকে উড্ডীন রাখার সংগ্রামে নিঃসংকোচে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে গেছে।

ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রদারণের দিকে দৃষ্টি রেখে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশের মধ্যে যে অভিন্ন বাণিজ্য করিডর স্থাপনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন তা নিয়ে এখন সর্বত্রই খোলামেলাভাবে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ করিডরের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সম্ভাবনা ও সমস্যা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। কথাবার্তা হচ্ছে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ১২ লক্ষাধিক সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষের বাংলাদেশের বিতাড়ন নিয়ে। প্রস্তাবিত চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ বাণিজ্য করিডর বাস্তবায়ন যেমন বিভিন্ন বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মায়ানমারের সামরিক জান্তা, আরাকানের মুক্তিসংগ্রামীদের রাখাইন রাজ্য দখল ও সেখান থেকে বিভিন্ন সময়ে বিতাড়িত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের বিষয়গুলো সমাধান করাও অত্যন্ত আবশ্যক। মায়ানমারের সামরিক জান্তার স্বার্থ রক্ষায় রাশিয়া, আমেরিকা ও ভারত সরকার অনেক কাজ করে থাকে। চীন সরকারও মায়ানমারের সামরিক জান্তা এবং সংগ্রামরত আরাকান আর্মির মধ্যে অনেক কাজ করেছে। কিন্তু জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ভারত মায়ানমারের বিরাজমান বিশাল সমস্যার আজও কোনো সমাধান দিতে পারেনি। একথা ঠিক যে, মায়ানমারের ওপর প্রতিবেশী চীনের প্রভাব অপরিসীম কিন্তু তারা এ ক্ষেত্রে কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছে তা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিতাড়নের বিষয়টি প্রায় সাড়ে চার দশক যাবৎ থেমে থেমে চলছে। কিন্তু আরাকান আর্মির (রাখাইন রাজ্য) বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও তা তাদের অর্থনীতিসহ বিভিন্ন সংকটের কারণে সামনে এগোতে পারছে না। এখন চীনের ওপর এ বিশাল সমস্যা সমাধানের বিষয়টি অনেকখানি নির্ভর করছে। নতুবা চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিন থেকে মায়ানমারের মান্দালয় এবং এমনকি ইয়াংগুন হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর কিংবা রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত প্রস্তাবিত বাণিজ্য করিডর স্থাপন কতটুটু সম্ভব হবে? মায়ানমারের সামরিক জান্তা কিংবা আরাকান আর্মির সঙ্গে কথাবার্তা না বলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিশ্চয়ই বাণিজ্য করিডর স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে এতদূর এগোননি। কারণ বিবাদমান জান্তা ও মুক্তিগামী আরাকান আর্মিকে এ প্রস্তাবিত করিডরে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ তার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে যা করণীয় আছে তা সার্বিক ও আন্তরিকভাবে করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

চীনকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা কিংবা মিরসরাই রপ্তানি উন্নয়ন এলাকায় উৎপাদন কার্যক্রমের জন্য যে এলাকা বা জমি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে উন্নয়নের কাজ খুব শিগগিরই শুরু হচ্ছে। তাতে আশা করা যায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, লালমনিরহাট বিমানবন্দরের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, মোংলাবন্দর উন্নয়ন কিংবা অন্যান্য কাজে চীন সরকার অত্যন্ত তৎপর হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারেরও কর্মতৎপরতার পরিধি অনেক বেড়ে যাবে। উন্নয়ন ও উৎপাদনের পালে হাওয়া লাগবে বাংলাদেশে। নতুন প্রযুক্তি ও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করবে তারেক রহমানের সরকার। এই মুহূর্তে তারেক রহমানের দেশপ্রেমের রাজনীতি ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি নিয়ে কারও মনে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। তার নেতৃত্বের প্রতি বর্তমানে যে আস্থা ও বিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে তাতে তারেক রহমানের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে আর কোনো বাধা রইল না। তার প্রতি জনগণের রাজনৈতিক সমর্থন আরও শক্তিশালী হলো।

লেখক: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। 
একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা 
[email protected]

রাজস্ব আদায়ের বাস্তবভিত্তিক টার্গেট নির্ধারণ জরুরি

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম
আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
রাজস্ব আদায়ের বাস্তবভিত্তিক টার্গেট নির্ধারণ জরুরি
মো. হেলাল উদ্দিন

সমুদয় রাজস্ব আয় চলে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়ে। উন্নয়ন যতটুকু হচ্ছে তা দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্নভাবে ধারকর্জ করে। এ কারণে প্রতি বছর রাজস্বের একটা বিরাট অংশ চলে যায় ঋণের সুদ গুনতে। এ বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে বিরাট আকারের কথিত টার্গেট কমিয়ে আনতে পারে।...

দেশ পরিচালনা এবং জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে কর আদায় আবশ্যক। এই কর সাধারণত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আহরণ করে থাকে। এবারের বাজেটে কর আদায়ের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আদায় করবে ৬ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অবশিষ্ট টাকা আসবে নন-এনবিআর আর নন-ট্যাক্স রেভিনিউ থেকে।

বিগত অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা। কিন্তু এ পর্যন্ত ৪ লাখ কোটি টাকাও আদায় করা সম্ভব হয়নি। এ বছরের রাজস্ব আদায়ের জন্য যে টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে তার পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। অথচ কীভাবে, অর্থাৎ কোন জাদুবলে এ টার্গেট অর্জন করা হবে, তা বোধ্যগম্য নয়।

গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলাম একজন ব্যবসায়ী ও ব্যবসাবান্ধব অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার জন্য। এর আগেও একজন ব্যবসায়ীকে অর্থমন্ত্রী করা হয়েছিল। কিন্তু জাতির অত্যন্ত দুর্ভাগ্য তিনি কোনো প্রকার ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন করতে পারেননি। এবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠনের সময় একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীকে অর্থমন্ত্রী করায় দেশের ব্যবসায়ী সমাজ আশ্বস্ত হয়। ধারণা করা হয়েছিল, একজন ব্যবসাবান্ধব অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সুখ-দুঃখের কথা বুঝবেন অর্থাৎ প্রকৃত ব্যবসাবান্ধব করনীতি গ্রহণ করবেন। এতে করে একদিকে যেমন সরকারের কর আদায়ের বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও হয়রানিমুক্ত পরিবেশে কর প্রদানের মাধ্যমে তাদের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাচ্ছন্দ্যে পরিচালনা করতে পারবেন।

এই মুহূর্তে জাতীয় অর্থনীতিতে একটা মন্দাবস্থা বিরাজ করছে। ইরান যুদ্ধের কারণে সরকার জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব শিল্প-বাণিজ্যের ওপর পড়ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং ব্যবসা তথা এসএমই খাত তাদের ব্যবসার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বভাবতই বেসরকারি শিল্প ব্যবসার কর্মচারীরাও অতিরিক্ত বেতন-ভাতা দাবি করবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের পক্ষে এই অর্থের জোগান দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এর মাধ্যমে শিল্পব্যবসার অঙ্গনে একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি উদ্ভবের আশঙ্কা রয়েছে।

সাধারণত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তিনটি খাত থেকে রাজস্ব আদায় করে থাকে। এগুলো হলো–আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর। এগুলো নিয়মিত পরিসরে আদায়ের পাশাপাশি বিভিন্নভাবে জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে রাজস্ব আয় করে থাকে।

দেখা গেছে, বিগত বছরগুলোতে আমদানি শুল্ক আদায়ের পরিমাণ স্থির অবস্থায় রয়েছে। এজন্য সরকার অবশিষ্ট দুটি খাত অর্থাৎ ভ্যাট ও আয়কর আদায়ের পরিমাণ বাড়াতে চাচ্ছে। এ লক্ষ্যে গত ২৪ জুন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী জানান–মুদি, প্রসাধনী দোকানসহ ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাট ও করের আওতায় আনা হবে। উল্লেখ্য, ভ্যাটের মূলনীতি হলো ভ্যাট প্রদান করবে ভোক্তা। ব্যবসায়ীরা কালেক্টরের ভূমিকায় থাকবে। আমাদের প্রশ্ন অর্থ মন্ত্রী ক্ষুদ্র এবং অতিক্ষুদ্র ব্যবাসায়ীরা কীভাবে ভোক্তার কাছ থেকে ভ্যাট এবং কর আদায় করবে তা আমাদের বোধগম্য নয়। আর এখানে কতইবা রাজস্ব আদায় হবে তার সঠিক পরিসংখ্যান কি রাজস্ব বোর্ডের কাছে আছে? ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সময় ভ্যাট প্রবর্তন করা হয়। তখন বলা ছিল হাটবাজারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হবে না। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটি ভ্যাট আদায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এবারের বাজেটে আয়কর এবং ভ্যাটের পরিধি বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান এনবিআরের যে জনবল এবং দক্ষতার অভাব রয়েছে তাতে কোনো ক্রমেই ট্যাক্স ও ভ্যাটের আওতা বিস্তৃত করা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি না। এ ধরনের প্রসঙ্গ এলেই এনবিআর প্রথম অভিযোগ করে–১. তাদের জনবল স্বল্পতা, ২. যথাসময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ ছাড় না দেওয়া, ৩. দক্ষ জনবল না থাকায় অটোমেশন চালু করা যাচ্ছে না। এগুলো তাদের পুরোনো অভিযোগ। জনবলসংকট দূর করার জন্য বাংলাদেশে অনেক স্বনামধন্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অনার্সে অধ্যায়নরত ইন্টার্নশিপ করছে, এমন ছাত্রদের দিয়ে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যন্ত আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করা যায়। দক্ষ জনবলের অভাবে অটোমেশন চালু করা যাচ্ছে না।  আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় সুপরিয়র সার্ভিসের জন্য বিসিএস বাধ্যতামূলক। প্রশ্ন থাকে যে, সারা পৃথিবি এখন ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ক্যাশলেস লেনদেন শুরু করেছে। এর জন্য আইন সংশোধন করে স্বনামধন্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যেমন–বুয়েট, ব্র্যাক, নর্থসাউথ, ইস্টওয়েস্টসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আইটিতে পারদর্শী ছাত্রছাত্রীদের বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে সরাসরি সুপিরিয়র সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সেই সঙ্গে আইটি-সংক্রান্ত পদে পদায়ন করা যেতে পারে। এই বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আহরণ করার জন্য যে দক্ষতা, সততা, মানবিকতা দরকার তা যদি না থাকে তাহলে এ অর্থসংগ্রহ করা যাবে কি না তার অনিশ্চয়তা ও সংশয় থেকেই যাবে।

ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, এখন থেকে অর্থবছরের আয়কর ও ভ্যাট রিটার্নের অর্থবছরের ৬ মাসের মধ্যে অর্থাৎ ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করবেন। পরবর্তী ৬ মাসে যাচাইবাছাই করে এনবিআরের বা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কর্মকর্তার কোনো দাবি থাকলে ওই ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। ভ্যাট ও আয়করদাতাকে বছরান্তে সার্টিফিকেট দিতে হবে। যেমনভাবে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের ক্ষেত্রে বছরান্তে দেয় বিল পরিশোধের সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। এতে অতীতের কোনো ভূতুড়ে কথিত বকেয়া কর এসএমই খাতের ব্যবসায়ীদের কাছে দাবি করতে পারে না। তেমনিভাবে পরবর্তীতে কোনো কারণেই অডিট অথবা অর্থ ডকসের নামে ভ্যাট ও করদাতার কাছে অর্থাৎ নতুন করদাতা ও এসএমই খাতের ব্যবসায়ীদের কাছে পূর্ববর্তী অর্থ দাবি না করে করব্যবস্থাকে মানবিক করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

আমাদের দেশে ভ্যাট প্রথা চালুর সময় এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, বিদ্যমান আবগারি শুল্ক ও বিক্রয় কর উঠিয়ে দিয়ে আধুনিক করব্যবস্থা হিসেবে ভ্যাটের প্রচলন করা হলো। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে যে ভ্যাট আদায় করা হয়, তা স্রেফ বিক্রয় কর। বিগত সরকারগুলো তাদের দেওয়া অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হয়ে এ ভ্যাট চালু করেছিল। ব্যবসায়ীরাও সরকারের রাজস্ব আদায়ে সহযোগিতা করতে তা মেনে নিয়েছিল। প্রথমে প্যাকেজ ভ্যাট অর্থাৎ দোকান পর্যায়ে বাৎসারিক একটি নির্দিষ্ট হারে এবং পরে বেচাকেনার হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ করে এ ভ্যাট আদায়ের প্রস্তাব করা হলে ব্যবসায়ীরা তা মেনে নেয়। সরকার এ সময় বলেছিল, এসএমই খাতের ব্যবসাগুলোকে এর আওতামুক্ত রাখা হবে। বছরে ৩ কোটি টাকা বিক্রি পর্যন্ত দোকান ব্যবসায়ীদের থেকে ভ্যাট আদায় করা হবে না। প্রথমে সেই অঙ্গীকার মেনে চললেও বর্তমানে তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এখন দৈনিক ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা বিক্রি হলেও সেসব দোকান ব্যবসা থেকে ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে।

দেশে মোট ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন হয়েছে ৮ লাখ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা আদায় হয়েছে ভ্যাট থেকে। এর মধ্যে এলটিইউ-ভুক্ত ১০৯টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৬০ শতাংশ ভ্যাট প্রদান করে। বড় ৫ হাজার প্রতিষ্ঠান প্রদান করে ৯৮ শতাংশ। এখানে ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ বিস্তর। এটা বন্ধ করা গেলে রাজস্ব আদায়ের জন্য সারা দেশের ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করজালে প্রবেশ করানোর প্রয়োজন হয় না। এতে বিশাল সংখ্যক ব্যবসায়ী যে হয়রানির শিকার হবে তাতে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে পারে। যেহেতু গত দুই বছর এফবিসিসিআই প্রশাসক কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে, সেহেতু এবার বাজেটে ব্যবসায়ীদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে।

সরকার কর আদায় করে মূলত দেশের উন্নয়নের স্বার্থে। সাধারণ কথায় বলা হয়, কর আদায়ের মাধ্যমে সরকারের আয়ের একটা অংশ পরিচালন খাতে ব্যয় করার পর অবশিষ্ট টাকা উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। অথচ সমুদয় রাজস্ব আয় চলে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়ে। উন্নয়ন যতটুকু হচ্ছে তা দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্নভাবে ধারকর্জ করে। এ কারণে প্রতি বছর রাজস্বের একটা বিরাট অংশ চলে যায় ঋণের সুদ গুনতে। এ বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে বিরাট আকারের কথিত টার্গেট কমিয়ে আনতে পারে।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি ও সাবেক সহসভাপতি, এফবিসিসিআই

বাজেটে ঘাটতি ঘাটতির বাজেট

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
বাজেটে ঘাটতি ঘাটতির বাজেট
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

কর ব্যবস্থাপনা দারিদ্র্য দূরীকরণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কর ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে, যাতে কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ে। কর ব্যবস্থাপনা অবশ্যই নীতিমালার নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করবে, পক্ষপাতিত্ব বা ক্ষমতাবানদের সুবিধা দেওয়া যাবে না। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বর্তমান প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারকে বিদ্যমান আইনগুলো পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা সমীচিন হবে।...

আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সের সবজান্তা শরিক চ্যাট জিপিটির কাছে জানতে না চেয়েও বলা যায়, ২০২৬-২৭-এর বাজেটকে ঘিরে কথার ফুলঝুরি এবার ‘বাজেটঘাটতি’ নিয়েই ঝরেছে বেশি। তীব্র টানাটানির অর্থনীতির সংসারে সবাইকে স্বস্তি দিতে, এক চিলতে হাসি ও প্রত্যাশা প্রাপ্তির পদাবলি শুনতে ও শোনাতে সময় গড়িয়ে ৩০ জুনে যে লাউ সেই কদু বিশাল ঘাটতির বাজেট পাসে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হবেই। মহামান্য রাষ্ট্রপতি অর্থ বিল ও অর্থ আইনে সানুগ্রহ স্বাক্ষর দান করলে বাজেট কার্যকর হয়ে যাবে। তবে এবারের বাজেট বাস্তবায়ন পারঙ্গমতার ওপর নির্ভর করবে এর উদ্দেশ্য বিধেয় পূরণ। নতুন নির্বাচিত সরকার। খাদের কিনারা থেকে নিমজ্জমান অর্থনীতিকে টেনে তুলতে হবে, হাতে সময় কম। ঘরে-বাইরে সমস্যারা সর্বত্র। জনগণের প্রত্যশা পাহাড়সমান। সাধ ও সাধ্যের মধ্যে যেন যোজন যোজন দূরত্ব। তার পরও বড় বাজেট, ব্যয়ের তো বটেই। ব্যয় করতে গেলে আয় লাগবে। বাড়ন্ত ব্যয় নিজের আয় না থাকলে ধারকর্জ করে বাস্তবায়ন করা যাবে, তবে সেই ধারকর্জের টাকা শোধ করতে গেলে আবার আয়ের বাজেটেই বাড়বে টান। সে কারণে মিডিয়ায় সবাই বলছে আয় তো হবে না, তা জেনেও কেন আয়ের বাজেট বাড়ানো হচ্ছে? তা দেখিয়ে কি বেশি ব্যয় করার চেষ্টা, যা করা হয়েছে বিগত দেড় দশকে। এবারের ব্যয় আগের মতো লুটপাটের ইচ্ছে নিয়ে নয়, থাকবে নেগেটিভ অথবা পজিটিভলি প্রত্যাশা পূরণের প্রয়াস।

সোজাসাপ্টা ভাষায় বলা যায়, ব্যয়ের বাজেট বাস্তবায়নে আয়ের জোগান বা সংস্থানে যতটুকু কম পড়ে সেটাই ঘাটতি বাজেট। আর বাজেট বাস্তবায়নে ব্যয়ের যে বরাদ্দ দেওয়া আছে তা পূরণে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা যতটুকু অপূরণীয় থাকে সেটাকে বাজেটের ঘাটতি বলা যায়।

প্রকৃতপক্ষে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয় রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি হিসেবে, এটি করা হয় জনগণের অর্থনীতিকে চাঙ্গা, গতিশীল, কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সহনশীল করার জন্য। ভাবখানা এই–আমি যদি ব্যয় না করি তাহলে অর্থনীতিতে সম্পদ ও সেবা সৃষ্টি হবে না, উৎপাদন ও সরবরাহের চাহিদা, গণ-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবে না। সরকারের এ প্রত্যয় ও পরিকল্পনায় এটাও কাজ করে যে অর্থনীতি সচল হলে রাজস্ব আয় বাড়বে এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর দ্বারা অর্থনীতিতে আয়বৈষম্য কমানো সহজতর হবে। সব সরকারের লক্ষ্য থাকে অর্থনীতিতে আয়-ব্যয়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা এবং পরস্পর পরিপূরক ভূমিকা পালন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রাক্কলনের সময় তিনটি বিষয় সামনে দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে এসেছে–১. ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হবে। কেননা, অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়লে বেকারত্ব বাড়বে, দ্রব্যমূল্য সবার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠবে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রকারান্তরে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে খরা দেখা দেবে, ব্যয় করার সক্ষমতা কমে যাবে। এটি একটি ঘূর্ণায়মান প্রক্রিয়া। ২. দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির প্রধান পুঁজি সরবরাহ খাত ব্যাংক ও পুঁজিবাজার যথা ভূমিকার স্থানে নেই, পুঁজি পাচার হয়ে গেছে, যা ফিরিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় ব্যাংক ও বিনিয়োগ খাতকে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিয়ে হলেও এর চলতশক্তি বজায় রাখা বা বাড়ানো। ৩. কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে ভবিষ্যতের জন্য টেকসই ও খাদ্য নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি করা। মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটানো, গণমুখী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে জনস্বাস্থ্যসেবাকে গণস্বাস্থ্য অভিমুখীকরণের দ্বারা স্বাস্থ্য খাতের উপযোগিতায় যে ক্ষরণ তা রোধ করা। অর্থনীতির সব খাতকে মূল ভরকেন্দ্রে শামিল করতে খাতভিত্তিক সৃজনশীল উদ্যোগ নেওয়া। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ খাতগুলোকে ক্ষেত্রবিশেষে সুশাসন, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীল করে তোলা।

এই তিন লক্ষ্যমাত্রা পরিপালনে সরকারকে বড় ব্যয়ের বাজেট বানাতে হয়েছে আর সিম্পল বা গাণিতিক সূত্রে রাজস্ব আয়ের বাজেট বড় হতেই হয়েছে। বিস্তর সমালোচনা হতেই পারে আয় ব্যয়ের এই যোজন যোজন ফারাক কমানো হবে কীভাবে, যা না হলে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে না, আয়ের পালে বাতাস বইবে না। তাই সরকারকে আয় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে দৃঢ়চিত্ত ও প্রতিশ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বাধীনতার ৫৩ বছরের মাথায় চব্বিশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের মর্মবাণী তিনটি–

১. পাবলিক মানি আয়-ব্যয়ে ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণ, চাকরিসহ সব নাগরিক সুবিধা সৃষ্টিতে বৈষম্য কমাতে হবে, ২. সর্বত্র সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়াবে, ৩. দেশ অর্থনীতি ও জাতিকে স্বনির্ভর, স্বাবলম্বী হতে হবে। কেননা, বহিরাগত পক্ষ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে জাতীয় অর্থনীতিকে দুর্বল বলয়ে দেখতে বা রাখতে চাচ্ছে। স্বাধীনতার জন্য রক্ত দেওয়া জাতির দেশ বাংলাদেশ কারও ট্রাপে না পড়ে বরং কীভাবে এর থেকে উত্তরণ ঘটানো যায় সেটা দেখতে হবে। একটাই বিকল্প–নিজেকে স্বাবলম্বী করে তোলা, টেকসই করে তোলা, লাগসই প্রযুক্তি পানির আধার তৈরিতে খাল কাটায় কর্মসংস্থান, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দিয়ে সবার পারচেজিং পাওয়ার বাড়ানো। মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে দেশের ও বাইরের চাকরিতে ঢোকার পথ তৈরিতে দৃঢ়চিত্ত পদক্ষেপ সৃষ্টি প্রয়োজন হবে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকারের দ্বারা রক্তক্ষরণ সৃষ্টিকারী পথ-পন্থাগুলোকে ক্রমশ উধাও করা।

দারিদ্র্য হ্রাস এবং সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্য কমানো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ, পারত পক্ষে নিরসনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সম্পদের পুনর্বণ্টন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা মূলত করব্যবস্থা ও কল্যাণমূলক নীতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কর ও ব্যয়ের প্রভাবকে সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে।

দারিদ্র্য মানুষের শত্রু, এটি মানুষকে অপমানিত ও অমানবিক করে তোলে। দারিদ্র্য সরকারগুলোর জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব হলো জীবনের মৌলিক চাহিদার অভাব। বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রচেষ্টা মূলত শিক্ষাকে কেন্দ্র করে হয়েছে, যা অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হয়েছে। দারিদ্র্যের কারণ হিসেবে দেখা যায় দুর্নীতি, দুর্বল শাসন, ঋণের বোঝা, বেকারত্ব, কম উৎপাদনশীলতা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বিশ্বায়ন, অকার্যকর সরকারি নীতি এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণের অভাব।

করব্যবস্থা দারিদ্র্য দূরীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: ব্যক্তিগত ও সরকারি খাতের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে এর ভূমিকা অপরিসীম। দারিদ্র্য এমন একটি বিষয় যা প্রতিটি রাষ্ট্রের সরকারের বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। এজন্য সরকারের নীতি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে টেকসই জীবিকা অর্জনে সহায়তা করার দিকে মনোযোগী হওয়া। এ দৃষ্টিভঙ্গি হলো সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করা একটি সুসংগঠিত ও সমন্বিত দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে।

নীতিনির্ধারকরা যদি সত্যিই দারিদ্র্য দূর করতে এবং দরিদ্র জনগণের জীবনমান উন্নত করতে চান, তবে তাদের কর ও স্থানান্তর ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে দরিদ্ররা বিশেষত অতিদরিদ্ররা অতিরিক্ত করভার বহন না করে এবং যথাযথ সুবিধা পায়।

সরকারকে কর ও স্থানান্তর ব্যবস্থা এমনভাবে নকশা করতে হবে যাতে দরিদ্রদের আয় বা ভোগ কর-পরবর্তী সময়ে আগের চেয়ে কম না হয়। সংক্ষেপে, রাজস্বনীতি দরিদ্রদের কল্যাণ উন্নত করবে, তাদের দারিদ্র্যে ঠেলে দেবে না বা বঞ্চনা বাড়াবে না। এখনো একটি কঠিন বাস্তবতা হলো, জনসেবা (যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য) নিশ্চিত করতে দরিদ্র দেশগুলোকে আরও বেশি কর সংগ্রহ করতে হবে এবং তা প্রগতিশীল ও ন্যায়সঙ্গত উপায়ে করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর করনীতি অনেক সময় অভিজাতদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে ভ্যাটের মতো পশ্চাদগামী করের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। তাই কর ব্যবস্থাপনা দারিদ্র্য দূরীকরণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কর ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে, যাতে কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ে। কর ব্যবস্থাপনা অবশ্যই নীতিমালার নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করবে, পক্ষপাতিত্ব বা ক্ষমতাবানদের সুবিধা দেওয়া যাবে না। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বর্তমান প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারকে বিদ্যমান আইনগুলো পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা সমীচিন হবে।

লেখক: ঘাটতি বাজেট বিশ্লেষক

শিল্প ও টেলিভিশনের এক অনন্য কারিগর মুস্তাফা মনোয়ার

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৯:১০ এএম
আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬, ০৯:১১ এএম
শিল্প ও টেলিভিশনের এক অনন্য কারিগর মুস্তাফা মনোয়ার
মুস্তাফা মনোয়ার। ছবি: খবরের কাগজ

চলে গেলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি প্রকৃতির গন্ধ ও পরিবেশের আবহকে অত্যন্ত সচেতনভাবে তার শিল্পচর্চায় ধারণ করেছিলেন। মানুষের খুব কাছাকাছি এসে তিনি জীবনকে নানা দিক থেকে ভালো বেসেছেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল চিত্রকলায়। কিন্তু তিনি শুধু একজন প্রথাগত চিত্রশিল্পী হয়ে থাকেননি। তার মূল লক্ষ্য ছিল কীভাবে শিল্প-সংস্কৃতির মাধ্যমে আমাদের সামাজিক জগৎ ও মানববিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ ও সংরক্ষণ করা যায়।

মুস্তাফা মনোয়ারকে অসংকোচে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব বলা যায়। তার এই যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫৪ সালে, যখন বাংলাদেশে (তৎকালীন পাকিস্তান আমলে) পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়। কলিম শরাফী, জামান আলী খান ও জামিল চৌধুরীর মতো পরিচালকদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি টেলিভিশনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি টেলিভিশনের খুঁটিনাটি এমনভাবে আয়ত্ত করেছিলেন যে, তা দেখে খোদ টেলিভিশনের সংশ্লিষ্টরাও অবাক হয়েছিলেন। তার মধ্যে যেন এক ধরনের ‘ম্যাজিক’ ছিল। তিনি নাটক, সমসাময়িক অনুষ্ঠান ও বিশেষ করে ছোটদের ছবি আঁকার অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। এই ছবি আঁকার ক্লাসেই তিনি আমাকে যুক্ত করেছিলেন, কারণ আমার সঙ্গে তার আগে থেকেই ঘনিষ্ঠতা ছিল।

টেলিভিশনের শুরুর দিকে তিনি নাট্য পরিচালনায় যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন, তা অতুলনীয়। অনেক পরিচালক যেখানে কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খেতেন, সেখানে মুস্তাফা মনোয়ার অনায়াসেই অনুষ্ঠান পরিচালনা করে দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছিলেন। নাটকের কলাকুশলীরা তাকে এতটাই আপন করে নিয়েছিলেন যে, অনেকেই তাকে ভালোবেসে ‘মন্টু মামা’ বলে ডাকতেন। তৎকালীন পাকিস্তান আমলে নাসিমার সহায়তায় তার পরিচালিত নাটকগুলো ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। বলা যায়, মুস্তাফা মনোয়ার ছাড়া টেলিভিশনের সব বড় অনুষ্ঠান সগৌরবে সম্পন্ন হওয়া কঠিন ছিল।
টেলিভিশনের চাকরির পাশাপাশি তিনি শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক এবং জাতীয় চারুশিল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যানের পদেও তার বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ ছিল। তিনি যেখানেই কাজ করেছেন, সেখানে একটি ইতিবাচক ও গভীর ছাপ রেখে গেছেন।

আমাদের ঐতিহ্যবাহী গ্রাম্য পুতুল নাচকে আধুনিক ও শিল্পসম্মত রূপে উপস্থাপনে তার অবদান অসাধারণ। তিনি নিজেই পুতুল তৈরি করতেন এবং নাটক রচনা করতেন। এই পুতুল নাচ নিয়ে তিনি বিশ্বের অনেক দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের ব্যাংক নোটের নকশা ও শিল্প-চিন্তার বিকাশেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের যোগ্য সহযোগী।

শিল্পাচার্য যেমনটি চেয়েছিলেন, অর্থাৎ এমন একটি শিল্পকলার জগত তৈরি করা যেখানে মানুষ শুধু শিল্পী হবে না, বরং সংস্কৃতির ধারক হবে। মুস্তাফা মনোয়ার সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই কাজ করে গেছেন। এ দেশের শিল্প আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক জগতকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করতে তিনি এক অনন্য যন্ত্র হিসেবে কাজ করেছেন। শিল্পের জগতে তার অবদান এবং এই সংগ্রাম ছিল নিরবচ্ছিন্ন।

লেখক: চিত্রশিল্পী, ইমেরিটাস অধ্যাপক, চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

শিক্ষা খাতে বাজেট: বিনিয়োগ নাকি দুর্নীতির নতুন সুযোগ?

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
শিক্ষা খাতে বাজেট: বিনিয়োগ নাকি দুর্নীতির নতুন সুযোগ?
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট নিঃসন্দেহে একটি সাহসী এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাজেটের অঙ্ক উন্নয়ন নিশ্চিত করে না; উন্নয়ন নিশ্চিত করে এর সঠিক ব্যবহার। আজকের বাংলাদেশে প্রশ্নটি তাই বাজেটের আকার নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা কি শিক্ষাকে সত্যিই জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে প্রস্তুত?...

বাংলাদেশের নতুন বাজেট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ভিড়ে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। অর্থমন্ত্রী শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ তৈরি করে। কারণ শিক্ষা এমন একটি খাত, যেখানে ব্যয় আসলে ব্যয় নয়; এটি এক ধরনের বিনিয়োগ। সড়ক, সেতু কিংবা ভবন নির্মাণ একটি দেশের অবকাঠামো গড়ে তোলে। কিন্তু শিক্ষা গড়ে তোলে মানুষের সক্ষমতা। আর মানুষের সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করে একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন।

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় একটি প্রশ্ন সামনে এসে যায়। সেটি হলো শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট কি সত্যিই শিক্ষার সর্বোচ্চ উন্নয়ন নিশ্চিত করবে? নাকি অতীতের মতো এবারও বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ দুর্বল প্রশাসন, অদক্ষতা, অনিয়ম এবং দুর্নীতির জালে আটকে যাবে?

এ কথা সত্য যে দীর্ঘদিন পর শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকার একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার উন্নয়ন, নতুন শিক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ, ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রায় সব বিশ্লেষণেই একটি সতর্কবার্তা রয়েছে। বরাবরই আমরা লক্ষ করেছি যে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট অর্থ নয়; বরং যথাযথ ব্যবস্থাপনা কিংবা সুশাসনের অভাব।

বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা দেখে আসছি। একদিকে শিক্ষার হার বেড়েছে, বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, বাজেটও বেড়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতি বছর ডিগ্রি অর্জন করছে। কিন্তু চাকরির বাজার বলছে, যোগ্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু দক্ষ মানুষের সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এই বৈপরীত্যের পেছনে অন্যতম কারণ শিক্ষা প্রশাসনের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি স্তরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, জেলা শিক্ষা প্রশাসন, অধিদপ্তর–সবকিছু এমন একটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়, যেখানে অনেক সময় শিক্ষার চেয়ে প্রশাসন বড় হয়ে ওঠে। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের চেয়ে নানা ধরনের রিপোর্ট, ফরম, ডাটা অ্যান্ট্রি এবং প্রশাসনিক কাজ নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করে প্রশাসনিক অনুমোদনের ওপর, যা অকারণ বিলম্ব এবং অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করে।

দুর্নীতির বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। শিক্ষক নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, বিদ্যালয় নির্মাণ, শিক্ষা উপকরণ ক্রয়, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, প্রকল্প বাস্তবায়ন–বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ প্রকৃত উন্নয়নের পরিবর্তে অপচয় কিংবা অনিয়মের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে শিক্ষা খাতে শুধু অর্থ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না।

আসলে বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শিক্ষা খাতে অর্থের পাশাপাশি সুশাসনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার হাতে যত বেশি অর্থ দেওয়া হবে, অপচয়ের ঝুঁকিও তত বেশি বাড়বে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় সমস্যা হলো, এটি এখনো মূলত সনদ উৎপাদনমুখী। একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়, কিন্তু পুরো ব্যবস্থাটি তাকে চাকরির বাজারের জন্য কতটা প্রস্তুত করছে, সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ব্যবসায় শিক্ষা, সমাজবিজ্ঞান কিংবা মানবিক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করছে। কিন্তু প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, আধুনিক কৃষি, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি কিংবা শিল্প ব্যবস্থাপনার মতো খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প খাত দক্ষ কর্মীর অভাবে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করছে।

এ বাস্তবতায় শিক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা উচিত। প্রাথমিক শিক্ষায় মৌলিক সাক্ষরতা, গণিত এবং বিশ্লেষণী দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ডিজিটাল দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা, ভাষা শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষায় গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্প-সংযুক্ত শিক্ষার ওপর জোর বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশে এখনো কারিগরি শিক্ষাকে অনেক পরিবার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা মনে করে। এ মানসিকতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান, প্রোগ্রামার, ইলেকট্রিশিয়ান, মেকানিক বা কৃষি উদ্যোক্তার সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো না গেলে কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

এবারের বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবসম্পদ উন্নয়নকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া। এটি ইতিবাচক। কারণ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রতিযোগিতা আর শুধু অবকাঠামো দিয়ে হবে না; হবে দক্ষতা দিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির যুগে যে দেশ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারবে, সেই দেশই এগিয়ে যাবে।

আবারও একই প্রশ্ন সামনে আসে–এ অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহি কে নিশ্চিত করবে? বাংলাদেশে শিক্ষা খাতের প্রকৃত সংস্কার শুরু হওয়া উচিত শিক্ষা প্রশাসন থেকে। উপজেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন চালু করতে হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক আর্থিক নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে। শিক্ষাপ্রকল্পগুলোর তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। কোন বিদ্যালয় কত টাকা পেল, কীভাবে ব্যয় করল এবং কী ফল অর্জিত হলো–সেসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।

শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট নিঃসন্দেহে একটি সাহসী এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাজেটের অঙ্ক উন্নয়ন নিশ্চিত করে না; উন্নয়ন নিশ্চিত করে এর সঠিক ব্যবহার। আজকের বাংলাদেশে প্রশ্নটি তাই বাজেটের আকার নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা কি শিক্ষাকে সত্যিই জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে প্রস্তুত? আমরা কি শিক্ষাপ্রশাসনের দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত? আমরা কি ডিগ্রি-নির্ভর শিক্ষা থেকে দক্ষতানির্ভর শিক্ষায় যেতে প্রস্তুত?

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে এবারের শিক্ষা বাজেট ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। আর যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিক্ষা বাজেটও হয়তো কেবল আরেকটি বাজেট হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]