প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। তা না পারলে জলবায়ু ঘটনাগুলো আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় দিক থেকেই সেই চাপ হবে তীব্র। জলবায়ুর এ পরিবর্তনকে সামনে রেখে এখন থেকেই কার্যকর অভিযোজন, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি গ্রহণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এর মূল্য আরও বেশি দিতে হবে।...
প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বৈশ্বিক জলবায়ুব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। এ পরিবর্তনকেই ‘এল নিনো’ বলা হয়। এটি কোনো একক অঞ্চলের নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর আবহাওয়াব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পর পর এ পরিস্থিতি দেখা দেয়। তবে এর তীব্রতা সব সময় একরকম থাকে না। কখনো তা স্বাভাবিক মাত্রায় সীমিত থাকে, আবার কখনো তা ‘সুপার এল নিনো’-তে রূপ নেয়। তখন বৈশ্বিক জলবায়ুকে মারাত্মক সংকটে ফেলে দেয়।
পৃথিবীর জলবায়ুব্যবস্থায় দুটি প্রাকৃতিক চক্র রয়েছে; একটি এল নিনো, অন্যটি এর বিপরীত অবস্থা লা নিনা। এই দুটি চক্র দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের কাছে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই দুটি চক্র বহুলভাবে আলোচিত হচ্ছে। কারণ এই চক্রের আচরণ এখন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে, বাতাসের প্রবাহ পরিবর্তিত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বৃষ্টিপাত, খরা, ঝড় ও তাপপ্রবাহের ওপর। ফলে এল নিনো এখন আর শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জটিলভাবে যুক্ত একটি সংকেত।
এল নিনোর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নভাবে দেখা যায়। যেমন, দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশে অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দেয়। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তীব্র খরা নেমে আসে। আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে খাদ্য উৎপাদন কমে যায়। এতে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়। উত্তর আমেরিকায় শীত ও ঝড়ের ধরনেও পরিবর্তন আসে। এই বৈশ্বিক অস্থিরতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয় যে, পৃথিবীর এক প্রান্তে সমুদ্রের উষ্ণতা বাড়লে তার ঢেউ অন্য প্রান্তেও গিয়ে আঘাত করে।
বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক জলবায়ু চক্রের বাইরে নয়। ভৌগোলিক অবস্থান ও নদীনির্ভর অর্থনীতির কারণে এর প্রভাব এখানে আরও সংবেদনশীল। এল নিনোর সময় বাংলাদেশে বর্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে। কোথাও বৃষ্টি কমে গিয়ে খরার পরিস্থিতি তৈরি হয়। আবার কোথাও অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হয়। এতে স্থানীয়ভাবে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই অনিশ্চিত আবহাওয়া কৃষি পরিকল্পনাকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। এর উৎপাদনের একটি বড় অংশ সময়মতো বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টি সময়মতো না হলে বীজতলা নষ্ট হয়, রোপণ পিছিয়ে যায়, ফলনও কমে আসে। শুধু ধান নয়, পাট, ভুট্টা ও ডালসহ প্রায় সব ফসলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষকের জীবনযাত্রা সরাসরি এর সঙ্গে জড়িত থাকায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর ব্যাপক চাপ পড়ে। বিশেষ করে উৎপাদন খরচ বাড়ে, কিন্তু আয় কমে যায়। ফলে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে।
এল নিনোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো তাপমাত্রা বৃদ্ধি। এটি বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি ডেকে আনে। গ্রীষ্মকাল আরও দীর্ঘ ও তীব্র হয়ে ওঠে। হিটওয়েভের সময়কাল বেড়ে যায়। জনস্বাস্থ্য গুরুতর হুমকির মুখে পড়ে। অত্যধিক গরমে শ্রমজীবী মানুষের কাজের সক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে কৃষক, নির্মাণশ্রমিক এবং রিকশা-ভ্যানচালকদের আয়-রোজগার সরাসরি প্রভাবিত হয়।
পানিসংকটও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। নদী-খাল শুকিয়ে যায়। অনেক এলাকায় খাবার পানির অভাব দেখা দেয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জেলায় এ সমস্যা আরও প্রকট হয়। একই সঙ্গে লবণাক্ততার বিস্তারও বাড়ে। এতে কৃষি ও পানীয় জলের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্বাস্থ্য খাতে এর প্রভাবও কম নয়। গরমজনিত অসুস্থতা বেড়ে যায়। ডিহাইড্রেশন ও হিটস্ট্রোকের ঘটনা বাড়ে। পানিবাহিত রোগও ছড়িয়ে পড়ে। তাতে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে এটি অর্থনৈতিক দিক থেকে রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনো ছিল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ঘটনা। সেই সময় বিশ্বের বহু দেশে আবহাওয়ার চরম পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। কোথাও অতিবৃষ্টি হয়েছিল। কোথাও তীব্র খরা নেমেছিল। আবার কোথাও অস্বাভাবিক ঝড় আঘাত করেছিল। সেই ধাক্কা শুধু প্রকৃতিতে নয়, অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কৃষি উৎপাদন কমে গিয়েছিল। খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছিল। বিভিন্ন দেশে মানবিকসংকট তৈরি হয়েছিল। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গিয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোও ছিল ভয়ংকর। সেই সময় বৈশ্বিক তাপমাত্রা রেকর্ড ছুঁয়েছিল। অনেক দেশে দাবানলের ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। কৃষি উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। বাংলাদেশেও সে সময় আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। বিশেষ করে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ওঠানামায় তা স্পষ্ট ছিল।
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এল নিনোর সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে এল নিনো কখন শুরু হবে তা বলা কঠিন হয়ে পড়ছে। কতটা শক্তিশালী হবে তাও অনিশ্চিত। কতদিন স্থায়ী হবে সে বিষয়েও নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব বহুমাত্রিক। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে। গ্রামীণ আয় কমে গেলে শহরমুখী অভিবাসন বাড়ে। এতে নগর ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। বস্তি সম্প্রসারণ হয়। কর্মসংস্থানের সংকট দেখা দেয়। সামাজিক বৈষম্যও বাড়তে থাকে।
শ্রম উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়াও একটি বড় সমস্যা। প্রচণ্ড গরমে মানুষের কাজের গতি কমে যায়। কাজের সময় কমে আসে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং পরিবহন খাতেও এর প্রচণ্ড প্রভাব পড়ে।
এ বাস্তবতায় এল নিনোকে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি এখন উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত একটি ঝুঁকির কারণ। তাই কৃষিব্যবস্থায় জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি। পানি সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। সেচব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে। আগাম আবহাওয়া পূর্বাভাসকে আরও কার্যকর করতে হবে।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সহযোগিতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশ একা এই ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারে না। সমুদ্রের উষ্ণতা, বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন এবং কার্বন নিঃসরণ–সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই বৈশ্বিক সমন্বয় ছাড়া এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলা করা কঠিন।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিযোজন। প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। তা না পারলে জলবায়ু ঘটনাগুলো আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় দিক থেকেই সেই চাপ হবে তীব্র। জলবায়ুর এ পরিবর্তনকে সামনে রেখে এখন থেকেই কার্যকর অভিযোজন, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি গ্রহণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এর মূল্য আরও বেশি দিতে হবে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও
জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট


