১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ ঘটেছে অসংখ্য। মূল যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোকজন পার পেয়ে গেছে প্রথমেই। স্বাধীনতার পর ‘দালাল আইন’ করে দেশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়। একপর্যায়ে ১৯৭৩ সালে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বাদে বাকি সবার জন্য ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করা হয়। এর ফাঁক দিয়ে বড়-ছোট অনেক অপরাধীই পার পেয়ে যায়।...

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘরে ঘরে ধর্মচর্চা বেড়ে গিয়েছিল। অনিশ্চয়তার মুখে নিরাপত্তার প্রার্থনায় নামাজ, কোরআন খতম, জিকির, দোয়া-দরুদ সবই বেড়েছিল মুসলিম পরিবারগুলোতে, আমাদের পরিবারে তার অংশীদার ছিলাম আমিসহ সব ভাইবোনই। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যারা অংশ নিয়েছেন, যারা সহায়তা করেছেন, মুসলমান হলে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর রাজাকার, আলবদরদের নৃশংসতার মুখে, আল্লাহ ও রসুলের ওপর ভরসাই ছিল তাদের বড় অবলম্বন।
কিন্তু অন্যদিকে জামায়াতসহ প্রায় সব ইসলামপন্থি দল পাকিস্তান সামরিক জান্তার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। অধিকাংশ প্রভাবশালী পীরের ভূমিকাও ছিল একইরকম। তাদের কেউ কেউ সরাসরি পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যা, নারী নির্যাতনের পক্ষে সাফাইও গেয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো–যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পীর বা নেতা হিসেবে এদেরই মেনেছেন জীবনভর, তারা উল্টো মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়েছেন। ধর্মীয় নেতাদের অবস্থান তাদের প্রভাবিত করতে পারেনি। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের মানুষ এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও চর্চা থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তারা আলাদা করে রেখেছেন।
ইতিহাস আরও সাক্ষ্য দেয় যে, বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানায়নি, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার জন্য কোনো মিছিল করেনি, সংবিধানকে পরিবর্তন করার জন্য দাবি তোলেনি, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার পক্ষেও কোনো মত প্রকাশ করেনি কিন্তু তবুও বিভিন্ন সময়ে শাসকগোষ্ঠী এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের নিজেদের সুবিধার্থে, অন্য ব্যর্থতাকে আড়াল করতে কিংবা জনগণের ধর্মানুভূতিকে ব্যবহার করে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে। লক্ষ্যণীয় যে, বাংলাদেশে (এবং ’৭১ পূর্ব ও পরবর্তী পাকিস্তানে) সামরিক শাসনের কালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসার ঘটেছে সব চেয়ে বেশি। এর বাইরে বুর্জোয়া রাজনীতির সংকট এবং বাম রাজনীতির বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তি ধর্মপন্থি রাজনীতির পরিসর বাড়িয়েছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ ঘটেছে অসংখ্য। মূল যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোকজন পার পেয়ে গেছে প্রথমেই। স্বাধীনতার পর ‘দালাল আইন’ করে দেশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়। একপর্যায়ে ১৯৭৩ সালে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বাদে বাকি সবার জন্য ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করা হয়। এর ফাঁক দিয়ে বড়-ছোট অনেক অপরাধীই পার পেয়ে যায়।
এ সময়ে ইসলামি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা খাতে ব্যয়বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু কর্মসূচি নেন শেখ মুজিব। একই সঙ্গে তিনি ইসলামি শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেন। সম্ভবত, ‘ধর্মহীনতা’র মিথ্যা অভিযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্যই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী অর্থনীতির সংস্কারও শুরু হয় এ সময়েই। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় সরকারের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। ১৯৭৪-এ আসে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। এরপর জরুরি অবস্থা এবং একদলীয় শাসনে আপাতদৃষ্টিতে মহাপরাক্রমশালী সরকার প্রকৃতপক্ষে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হন সামরিক বাহিনীর একাংশ দ্বারা এবং শুরু হয় সামরিক শাসন।
সামরিক শাসনামলে পাকবাহিনীর সহযোগী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমে বৈধতা পায়। সেই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সক্রিয় ব্যক্তিরাও সমাজে রাজনীতিতে আবারও ফিরে আসতে থাকে। ১৯৭৮ সালে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে তার কার্যক্রম শুরু করলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে প্রথম আন্দোলন সূচিত হয়। সে সময় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ছিল ঐক্যবদ্ধ এবং দেশজুড়ে প্রভাবশালী। কর্নেল কাজী নূরুজ্জামানের নেতৃত্বে তারাই এই আন্দোলন সারা দেশে বিস্তৃত করে। জামান সাহেবের ভাষ্য অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮১ সালে জিয়া নিহত হন, একই সূত্রে আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসার নিহত হন। সে সময় সেনাপ্রধান হিসেবে এরশাদই ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রে।
১৯৮২ সালে নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে উচ্ছেদ করে এরশাদের নেতৃত্বে আবারও সামরিক শাসন শুরু হয় এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যু ধামাচাপা পড়ে যায়। পুরো ৮০ দশকজুড়ে এরশাদ তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখবার জন্য ধর্ম, ধর্মপন্থি দল, মাদ্রাসা, পীর, মাজার ইত্যাদির যথেচ্ছাচার ব্যবহার করেন। ক্ষমতার সুবিধার্থে দুর্বৃত্ত কিছু নেতাকে দুহাতে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। এই সময়েই ধর্মের বাণিজ্যিকীকরণ, পীর ও ধর্মপন্থি দলগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি সম্প্রসারণ ঘটে সব চেয়ে বেশি। শীর্ষপদ থেকে দুর্নীতির বিস্তার ঘটে তখনই।
এই দশকে এরশাদ স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৫ দল ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দল পরিচালিত আন্দোলনে সমঝোতার মধ্যদিয়েই যুগপৎ কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামী অংশীদার হয়ে যায়। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সংসদ নির্বাচন দিয়ে ক্রমবর্ধমান জনপ্রতিরোধ থেকে নিজের ক্ষমতা রক্ষা করতে চেষ্টা করেন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ ১৫ দলের কয়েকটি দলের সঙ্গে জামায়াতও অংশ নেয়। নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ও কয়েকটি বাম দল। ১৫ দল ভেঙে ৫ বাম দল আলাদা হয়ে যায়। একদিকে প্রশাসনের প্রশ্রয় অন্যদিকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশীদারের বৈধতা নিয়ে এই দশকেই জামায়াতে ইসলাম দেশব্যাপী নিজেদের দলের সব চেয়ে বেশি সম্প্রসারণ ঘটাতে সমর্থ হয়। এ ছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাদের দক্ষ কৌশলী নানা প্রতিষ্ঠান সংগঠিত হয় এসময়েই।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের দ্বন্দ্ব সংঘাত বাড়তে থাকে। বিশেষত আশির দশকের দ্বিতীয় ভাগে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিবিরের সন্ত্রাস, রগকাটা, হত্যার বহু খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। শিবিরের সঙ্গে প্রধানত সংঘাত হয় বাম সংগঠনগুলোর, কিন্তু ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সঙ্গেও অনেক রক্তাক্ত সংঘাত দেখা যায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের হাতে ছাত্রদল নেতা কবির নিহত হন ১৯৮৯ সালে। এরপরই বাকি সব ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
এই দশকেই বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি জোরদারভাবে বাস্তবায়ন হতে থাকে। সে অনুযায়ী শিক্ষা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক তৎপরতার সুযোগ উন্মুক্ত হয়। ক্রমে শিক্ষা, ব্যাংক, বিমা, কম্পিউটার, এনজিও সব ক্ষেত্রে জামায়াত দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। সরকারি প্রশাসন, বিনিয়োগ খাত, এনজিওসহ কয়েকটি দেশের দূতাবাস মিলে জামায়াতের একটি শক্ত নেটওয়ার্ক দাঁড়ায়। একদিকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ, অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি দুই পক্ষের জন্যই অনুকূল সময় ছিল এরশাদের স্বৈরশাসন।
১৯৮৭ সালের শেষ দিকে এরশাদ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন ব্যাপক আকার নেয়। ১০ নভেম্বর বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে সরকারবিরোধী মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন নূর হোসেন। পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হওয়ার পর গণপ্রতিরোধ দ্রুত গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নেয়। জরুরি অবস্থা দিয়ে এরশাদ কোনোভাবে সামাল দিতে সক্ষম হন। ক্ষমতার বৈধতা তৈরি করতে তিনি আবার সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। সে নির্বাচন বর্জন করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দল, পাঁচ বাম দল, জামায়াতসহ সবাই।
১৯৮৮ সালে কতিপয় ‘গৃহপালিত’ দল নিয়ে করা এই প্রহসনের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে মানুষজনই দেখা যায়নি। তবে ঘোষিত ফলাফলে বিপুল ভোটে এরশাদের দল বিজয়ী হয়। এরশাদ সরকার নিজের জনধিকৃত গদির বৈধতা আদায় করতে সেই চরম প্রহসনমূলক ভোটারবিহীন নির্বাচনে গঠিত সংসদে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ করে সংবিধান সংশোধন করে। তবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ ওপরের সব দলই এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়।
লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

