এবারের বিশ্বকাপ সত্যিই দারুণভাবে উপভোগ করছি। বিশেষ করে যেসব দলকে ছোট হিসেবে ধরা হচ্ছিল, তারা হট ফেবারিটদের রীতিমতো কাঁপিয়ে দিচ্ছে। এটাই এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। আর এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ কেপ ভার্দে।
রাউন্ড অব বত্রিশে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তাদের যে লড়াই, তা অনেক দিন ফুটবলপ্রেমীদের মনে থাকবে। ফুটবল ইতিহাসে যেসব দলকে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হিসেবে ধরা হয়, যাদের ক্যাবিনেটে রয়েছে অসংখ্য শিরোপা—সেই দলগুলোকেই কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে কেপ ভার্দে। প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলেই নকআউট পর্বে ওঠা এবং বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে চোখে চোখ রেখে লড়ে যাওয়া সত্যিই প্রশংসনীয়।
শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হারলেও, কেপ ভার্দের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ফুটবলের প্রকৃত সৌন্দর্য ও লড়াকু মানসিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ফুটবলের প্রতি তাদের খেলোয়াড়দের নিবেদন, ফিটনেস এবং লক্ষ্যপানে অবিচল মানসিকতা মুগ্ধ করার মতো। দলটির সব খেলোয়াড়ই নিজেদের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিয়েছে। এই ফুটবলের জন্য আমি তাদের স্যালুট জানাই।
আফ্রিকার ছোট্ট একটি দেশ কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপের আগে যে দেশের নাম আমিসহ বিশ্বের অনেক মানুষই তেমনভাবে জানত না। সেই দেশই এখন ফুটবলের মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। এখন বিশ্বজুড়ে তাদের নাম উচ্চারিত হচ্ছে।
গ্রুপ পর্বে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য রুখে দিয়ে কেপ ভার্দে নিজেদের মিশন শুরু করেছিল। তখন এটিকে অনেকেই চমক হিসেবে দেখলেও, পরবর্তীতে আরেক চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে তারা প্রমাণ করে দেয়—এটি কোনো অঘটন নয়, বরং তাদের সামর্থ্যেরই প্রতিফলন। এরপর সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে রাউন্ড অব বত্রিশে জায়গা করে নেয় কেপ ভার্দে।
এই তিনটি ম্যাচেই তারা সবার হৃদয় জয় করে নেয়। নকআউট পর্বের প্রথম ধাপেই তাদের মুখোমুখি হতে হয় বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। লিওনেল মেসিদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে যে লড়াই তারা করেছে, তা সত্যিই রূপকথার মতো।
তারা যে এমন ফুটবল উপহার দেবে, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এটা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। আমার মনে হয়, অন্যদের ক্ষেত্রে বিষয়টা এমন। আসলে চেষ্টা করলে যে সবই সম্ভব, এবারের বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে সেটাই দেখাল। আমরা কিন্তু তাদের থেকে অনুপ্রেরণা নিতে পারি। মাত্র ৫ লাখ মানুষের একটি ছোট্ট দেশ হয়েও বিশ্বকাপে যে ফুটবল তারা খেলেছে, আমরা এত বড় দেশ, এত জনসংখ্যার দেশ হয়ে কেন পারব না? কেপ ভার্দের থেকে আমাদের অনেক কিছুই শেখার আছে। সেই শিক্ষাটা নিতে হবে আমাদের।
ফেবারিট দলের তকমা নিয়ে যারা বিশ্বকাপে এসেছিল, তাদের মধ্যে জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস ইতোমধ্যে ছিটকে গেছে। তবে ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন বেশ ভালোভাবে রেসে আছে। এদের সঙ্গে আমি পর্তুগালের নামটাও বলব। এরা অনেক নামিদামি খেলোয়াড় নিয়ে দল গড়েছে এবং এখন পর্যন্ত তারা নিজেদের নামের প্রতি সুবিচার করে যাচ্ছে।
নকআউটে এরই মধ্যে রাউন্ড অব বত্রিশ শেষ হয়ে রাউন্ড অব সিক্সটিন শুরু হয়ে গেছে। এই লেখা পাঠকের হাতে যেতে যেতেই যেমন শেষ ষোলোর দুটি ম্যাচ হয়ে যাওয়ার কথা। এখন ধীরে ধীরে দল কমে আসবে এবং ফাইনাল ঘনিয়ে আসবে। তাতে রোমাঞ্চও বাড়তে থাকবে। কার হাতে শিরোপা উঠে, সেটার জন্য অবশ্য আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে।
তবে এখন পর্যন্ত দলগুলোর পারফরম্যান্সে আমি ফ্রান্সকেই এগিয়ে রাখব। টোটাল ফুটবলের সমন্বয়ে গড়া এই দলটি আক্রমণ, পাসিং এবং ফিনিশিং—সব বিভাগেই দারুণ ভারসাম্য দেখাচ্ছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ফ্রান্সই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী দল।
কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলেরা গতরাতেই প্যারাগুয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে খেলেছে। এই লেখাটি অবশ্য সেই খেলার বেশ আগে লেখা। ফলে ফ্রান্সকে নিয়ে কিছু লেখার ক্ষেত্রে ঝুঁকি ছিল। সেই ঝুঁকি সত্ত্বেও লিখতে হলো। কারণ এই ফ্রান্সকে নিয়ে অল্প কিছু না বললে যে লেখাটা অপূর্ণ থেকে যায়।
লেখক: জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার