লিওনেল মেসির দেশের সমর্থকেরা প্রায়ই বলে থাকেন, ‘আর্জেন্টিনা কখনোই ম্যাচ সহজ করে জেতে না।’ গতকাল শনিবার ভোরে আরও একবার সেই কথার প্রতিফলন দেখা গেছে। গোল করে এগিয়ে গিয়েও গোল হজম করার প্রবণতা থেকে কিছুতেই বের হতে পারছে না আর্জেন্টিনা।
বিস্তারিতভাবে বললে, কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা চারটি ম্যাচে এগিয়ে গিয়েও গোল হজম করেছিল। প্রতিপক্ষ সমতা ফিরিয়েছিল।
শুরুটা হয়েছিল সৌদি আরবের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে। আর্জেন্টিনা এগিয়ে যাওয়ার পরও সৌদি আরব দুটি গোল করে ম্যাচ জিতে নেয়। কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েও ম্যাচ ২-২ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে জিততে হয় আর্জেন্টিনাকে। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালেও আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল। পরে ম্যাচ ২-২ হয় এবং টাইব্রেকারে জিতে ট্রফি হাতে তোলে তারা।
একই চিত্র দেখা গেছে কেপ ভার্দের বিপক্ষেও। কেপ ভার্দের রক্ষণ সংগঠিত এবং দুর্দান্ত গোল করার সামর্থ্যের জন্য দলটির সুনাম রয়েছে। তাদের বিপক্ষে গোল করে এগিয়ে যাওয়ার পর আর্জেন্টিনা যেন হঠাৎই ‘সুইচ অফ’ হয়ে গিয়েছিল এবং গোল হজম করে। দ্বিতীয় গোলের পরও একই ঘটনা ঘটে। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ না থাকলে কেপ ভার্দে অতিরিক্ত সময়ে এগিয়েও যেতে পারত।
ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেন, আজ আমরা অনেকগুলো আঘাত হজম করেছি। অনেকেই হয়তো ভেবেছিল খুব সহজে ম্যাচটা জিতে নেব। আমরা কিন্তু সেটা ভাবিনি।
খুব সহজে ম্যাচ জয়- স্কালোনি হয়তো ঠিক বলেননি। কিন্তু শক্তিমত্তায় অনেকটা পিছিয়ে থাকা দলের বিপক্ষেও আর্জেন্টিনাকে এত কষ্ট করে জিততে হবে কেন? অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, ক্লান্তি, কৌশলগত দুর্বলতা নাকি মানসিক চাপ- প্রশ্ন উঠতেই পারে।
এ দিনের ম্যাচ দেখে মনে হয়েছে, আর্জেন্টিনা দ্বিতীয় গিয়ারে খেলেই ম্যাচ জিততে চেয়েছিল। এমনিতেই এবারের বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব দলগুলোর জন্য শারীরিক ধকল সামলানোর পরীক্ষা।
প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে পাঁচটি নকআউট ম্যাচ খেলতে হচ্ছে। ফলে পরের রাউন্ডের জন্য শক্তি সঞ্চয় করতে দলগুলো চাইবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শক্তি বাঁচাতে গিয়ে খেলার গতি মন্থর হয়ে গেলে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট খেলতে হলে সেটি উল্টো সমস্যাই তৈরি করে। আর্জেন্টিনা ঠিক সেই ভুলটাই করেছে।
আর্জেন্টিনার বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তার কথা ম্যাচ শেষে উল্লেখ করেছেন স্কালোনি। মিশরের বিপক্ষে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালের আগে মাত্র তিন দিন সময় পাওয়ার কথাও বলেন তিনি। তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে, জর্ডানের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে যে আর্জেন্টিনা খেলেছিল, তার তুলনায় এ দিনের প্রথম একাদশে বেশ কিছু পরিবর্তন ছিল।
বিষয়টি শুধু শারীরিক ফিটনেসের নয়। ইউরোপীয় দলগুলোর তুলনায় আর্জেন্টিনার খেলার ধরন আলাদা। তারা একটানা আগ্রাসী ফুটবল খেলে না। সেটি মেনে নিয়েছেন মেসিও।
তিনি বলেন, আমরা ওদের চাপে রাখতে পারিনি। সব সময় বলের পেছনে ওদের একজন বাড়তি ফুটবলার ছিল। তার সঙ্গে আমরা তাল মেলাতে পারিনি। এই কারণেই ওদের পায়ে বল বেশি ছিল এবং আমাদের বেশি দৌড়াতে হয়েছে।
মেসির পক্ষে এ ধরনের কৌশলগত মন্তব্য বিরলই বলা যায়। আর্জেন্টিনার পরিকল্পনা সাধারণত আচমকা আক্রমণে প্রতিপক্ষকে ভেঙে দেওয়া। যেমন ২৯ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পাস থেকে মেসির গোলটি- যা আগে থেকে কেউ অনুমান করতে পারেনি। কিন্তু প্রতিপক্ষ যখন আগ্রাসী ফুটবল খেলা শুরু করে, তখনই আর্জেন্টিনা রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে।
নিজেদের বক্সে রক্ষণের ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা খুব খারাপ নয়। তবে এ দিন তারা বল ক্লিয়ার করতে বেশি সময় নিয়েছে। ফলে কেপ ভার্দে সহজেই আর্জেন্টিনার রক্ষণের ফাঁক খুঁজে পেয়েছে। প্রথমে দুয়ার্তে সমতা ফেরান, পরে সিডনি লোপেজ অসাধারণ শটে গোল করেন।
আর্জেন্টিনার হাতে সব ধরনের শক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা কেন প্রতি-আক্রমণনির্ভর ফুটবল খেলে না, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। প্রতিপক্ষ আগ্রাসী খেললে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠে পাল্টা গোল করার প্রবণতা আর্জেন্টিনার খেলায় খুব বেশি দেখা যায় না। মেসি গোল করা ও সুযোগ তৈরিতে অসামান্য। তবে তার বয়সের কথা বিবেচনায় রেখে বারবার প্রতি-আক্রমণ তার পা থেকে শুরু হবে- এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। ফলে আর্জেন্টিনাকে নির্ভর করতে হবে লাউতারো মার্তিনেজ বা জুলিয়ান আলভারেজের ওপর।
তবে এটাও মানতে হবে, এ দিন দুই বার গোল হজমের পর আর্জেন্টিনা দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কখনোই ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়নি। তারা বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং প্রতিপক্ষকে খুব বেশি সুযোগ তৈরি করতে দেয়নি। দুই সেন্টারব্যাক সেটপিস থেকে গোল করেছেন। ফলে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে পারে না- এ কথা পুরোপুরি সত্য নয়। প্রশ্ন হলো, তারা কতটা সময় এবং কতটা ধারাবাহিকভাবে চাপ ধরে রাখতে চায়।
স্কালোনিও এ দিন সেই প্রসঙ্গ তুলেছেন। তার ভাষায়, আমার মনে আছে, কাতারে যে ম্যাচগুলো অতিরিক্ত সময়ে গিয়েছিল, আজও ঠিক একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ছেলেরা আক্রমণ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এক-এক সময় মনে হচ্ছিল, সৌদি আরব ম্যাচের মতোই কোনো একটি ম্যাচ খেলছি। তবে সৌদি আরবের বিপক্ষে যেমন খেলেছিলাম, তার চেয়ে আজ ভালো খেলেছি। কারণ এই দলটি আগের চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ হয়েছে। সূত্র: আনন্দবাজার