পোলাওয়ের চালে অস্বাভাবিক দাম বাড়ায় ভোক্তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। সম্প্রতি খবরের কাগজের বাজারদর তদারকিতে পণ্যটির কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীরা এ পরিস্থিতির জন্য মিলমালিক, করপোরেট গ্রুপের সিন্ডিকেটকেই দায়ী করছেন। কিছু শিল্পগ্রুপ ও মিলমালিক মিলে শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করে পণ্যটির বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। তারা দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। এর প্রভাব এখন বাজারে পড়ছে। অন্যদিকে করপোরেট গ্রুপের মালিকরা সিন্ডিকেটের অভিযোগের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করছেন। তারা বলছেন, সরকার রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে। তাই সব চাল রপ্তানি হয়েছে। চিনিগুঁড়া চালের উৎপাদন তুলনামূলক কম হয়। তাই এই চাল রপ্তানিতে অনেক সময় সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকে। মাঝে মাঝে বছরে এক থেকে দুবার নির্ধারিত পরিমাণ চিনিগুঁড়া চাল রপ্তানির অনুমতি দেয়। বিদেশে এ চালের ভালো চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়ায় এই চালের চাহিদা বেশি। তারা বলছেন, করপোরেটদের হাতে চালের বাজার যায়নি। পুরো বাজারে ২ থেকে ৩ শতাংশ চাল করপোরেট প্রতিষ্ঠানের। বাংলাদেশের চালের বাজারে কিছু নিয়ন্ত্রণ আছে। লাইসেন্সিং, রিপোর্টিংয়ের ইস্যু আছে। খাদ্য অধিদপ্তরকে সবকিছুর হিসাব দিতে হয়।
অন্যদিকে খুচরা চাল বিক্রেতা ও রাইস মিলমালিকরাও চিনিগুঁড়া চালের এমন অস্বাভাবিক দাম বাড়ায় অবাক হয়েছেন। তাদের অভিযোগ করপোরেটরা প্যাকেটজাত করে ভালো মানের দোহাই দিয়ে ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে। বাজারে চরম নৈরাজ্য চলছে। খবরের কাগজের সরেজমিন প্রতিবেদনে এমনই তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত নিয়ন্ত্রণে কঠোর তদারকি চায় ক্যাব। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন ভোক্তা অধিকার রক্ষায় সোচ্চার এ সংগঠনটির নেতারা।
কোরবানির ঈদের পর থেকে চিনিগুঁড়া চালের দাম বাড়ছে। আকিজ, স্কয়ার, প্রাণসহ বিভিন্ন কোম্পানির এই প্যাকেটজাত চাল ১৯০ টাকা ও বস্তার চাল ১৭০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। দাম আরও বেড়ে ২১০ টাকা হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন কারওয়ান বাজার ও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু দিনাজপুর, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও, চাঁপাইনবাবগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে পোলাওয়ের ধান বাজারে কেনাবেচা হচ্ছে না। ধানের দাম বাড়েনি। কয়েক মাস আগে কেনাবেচা হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা মণ।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, যেভাবে চালের দাম বাড়ছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। করপোরেট প্যাকেটজাতের নামে কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেশি নিচ্ছে। এটা হতে পারে না। বেশি দাম নেওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন মামলা করেছে। সেটা মনে রাখতে হবে। বাজার কোনো নিয়ন্ত্রণে নেই। লুটপাট শুরু হয়েছে। ভোক্তাদের পকেট কাটা হচ্ছে। সরকারের দায়িত্বে যারা আছেন তারা কী করছেন?
পোলাওয়ের চালের দামে নৈরাজ্য ভাঙতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাজারে শক্তিশালী করপোরেট সিন্ডিকেটের বিষয়ে যে অভিযোগ এসেছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকার বাজার তদারকি না করলে সমস্যা আরও বাড়বে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। এ ছাড়া কৃষক পর্যায়ে ধানের উৎপাদন খরচ কমাতে তাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে; যাতে ভোক্তারা কম দামে চাল কিনতে পারেন। আশা করছি, সরকার চালের নৈরাজ্য ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেবে।