রাজধানীতে সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। গত কয়েক দিন সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও অলি-গলিতে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। জলজটে কোথাও যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, আবার কোথাও হাঁটুসমান পানিতে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন নগরবাসী। এ পরিস্থিতির জন্য অপরিকল্পিত বর্জ্যব্যবস্থাপনাকে দায়ী হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রাপ্ত হিসাব মতে, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে সাত হাজার টন বর্জ উৎপন্ন হয়, এর প্রায় ১৫ শতাংশই প্লাস্টিকজাত। এসব প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্য বর্জ্যের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত গিয়ে জমা হয় ড্রেন, নালা ও খালে। ফলে পানি চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামান্য বৃষ্টিতে ড্রেন উপচে পানি রাস্তায় উঠে আসে। অনেক স্থানে ড্রেনের অস্তিত্ব থাকলেও পলি ও ময়লার স্তূপে সেগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য গত দেড় দশকে একের পর এক প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও সামান্য বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখনো পানির নিচে তলিয়ে যায়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থায়ী সমাধানের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু খাল খনন বা ড্রেন পরিষ্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ঢাকার পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার পুরো শৃঙ্খলই বিভিন্ন স্থানে বাধাগ্রস্ত। সড়কের ক্যাচপিট থেকে শুরু করে ড্রেন, খাল, স্লুইসগেট, পাম্প স্টেশন এবং নদীতে পানি প্রবাহের প্রতিটি ধাপেই রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। কোথাও অবৈধ দখল, কোথাও বর্জ্যের স্তূপ, আবার কোথাও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা পুরো ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলছে। ফলে একটি অংশ সংস্কার করা হলেও অন্য অংশের সমস্যার কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে নগরপরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার কারণ শুধু অবকাঠামোগত দুর্বলতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সমন্বয়হীন ব্যবস্থাপনা।
পরিকল্পনাবিদ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, ঢাকায় সম্প্রতি মাত্র ৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ বর্ষা মৌসুমে ৫০ থেকে ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত আমাদের দেশের জন্য স্বাভাবিক। সাধারণ বৃষ্টিতেই নগরজীবন অচল হয়ে পড়া প্রমাণ করে, দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো সমন্বিত ও কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। ওয়াসার প্রণীত মাস্টারপ্ল্যান সিটি করপোরেশনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের পর আর হালনাগাদ করা হয়নি। ফলে বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম সমন্বয়হীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রত্যাশিত ফল মিলছে না। টেকসই সমাধানের জন্য আধুনিক মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে খাল সংস্কার, ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। তাই এসব প্রকল্পের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে কারা দায়ী সেসব বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে জবাবদিহি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত। তা না হলে জনগণের অর্থের অপচয় চলতে থাকবে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।
প্রতিবছর বর্ষার মৌসুমে এ ধরনের জলাবদ্ধতা রাজধানীবাসীর জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। আশা করছি, সরকার একটি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে জলাবদ্ধতা দূরীকরণে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।