সব কিছুতেই যেন ২০০২ বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তি! দুই যুগ আগে কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ে ২-১ গোলে জয় পেয়েছিল ব্রাজিল। শেষ পর্যন্ত সেবার পঞ্চম বিশ্বকাপও জিতেছিল পেলের দেশ। এরপর টানা পাঁচ বিশ্বকাপে নকআউটে গোল হজমের পর আর ফিরে আসতে পারেনি সাম্বা ছন্দের দেশ। এবার শেষ বত্রিশ রাউন্ডে জাপানের বিপক্ষে সেটি করে দেখিয়েছে বিখ্যাত হলুদ জার্সিধারীরা। ২৪ বছর আগের এমন আরও অনেক স্মৃতিই এভাবে ঘুরেফিরে আসছে।
তবে এবার ব্রাজিলকে ‘হেক্সা’ জয়ের লক্ষ্যে আরেক ধাপ এগিয়ে যেতে হলে তাদের ঐতিহাসিক ‘অভিশাপ’ কাটাতে হবে! সেই অভিশাপের নাম ‘নরওয়ে’। এই দলটিকে যে কখনোই, কোনো মঞ্চেই হারাতে পারেনি সেলেসাওরা। এবার ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল অর্থাৎ শেষ ষোলোতে সেই নরওয়ের মুখোমুখি হচ্ছে রেকর্ড সর্বোচ্চ পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। নিউইয়র্কের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ম্যাচটি মাঠে গড়াবে আজ রাত ২টায়।
নকআউটের এই ম্যাচটি ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে বিপুল উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। যার মূল কারণ এই দুই পরাশক্তি দলের মুখোমুখি হওয়ার আকর্ষণীয় ইতিহাস এবং বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স। পরিসংখ্যান বলছে, নরওয়ে ব্রাজিলের জন্য এক সত্যিকারের ‘গোলকধাঁধা’। এখন পর্যন্ত এই দুই দল চারবার মুখোমুখি হয়েছে। যার মধ্যে নরওয়ে জিতেছে দুটি ম্যাচে এবং বাকি দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। বিশ্বকাপে দল দুটির সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও আলোচিত সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯৯৮ সালের গ্রুপ পর্বে। যেখানে নরওয়ে ২-১ গোলে হারিয়ে দিয়েছিল ব্রাজিলকে। ফলে কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যদের জন্য এটি শুধু পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার লড়াই নয় বরং নরওয়ের বিপক্ষে হারের প্রতিশোধ নেওয়ারও মিশন।
আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে শেষ ষোলোতে এসেই ইতিহাস গড়েছে। তাদের কাছে আর প্রত্যাশার চাপ নেই! তারা এখন বিদায় নিলেও সমালোচনা হবে না; কিন্তু জিতলে প্রশংসার স্রোতে ভাসবে। কিন্তু ব্রাজিলের জন্য বিষয়টা ঠিক উল্টো। এই দলটি ফাইনালে হেরে গেলেও সেটিকে ব্যর্থতা বলা হয়। তাইতো নরওয়ের বিপক্ষে জয়ের কোনো বিকল্প নেই ব্রাজিলের। আর ম্যাচে তারা স্পষ্ট ফেভারিটও। কিন্তু ইতিহাস চোখ রাঙাচ্ছে ভিনিসিয়ুস, কাসেমিরো, নেইমারদের। কাগজে-কলমে ব্রাজিল ফেভারিট হলেও ইতিহাস, বর্তমান ফর্ম আর নরওয়ের সাহসী ফুটবল বলছে এই ম্যাচ মোটেও একপেশে হবে না।
ব্রাজিল এবারের বিশ্বকাপে শুরু থেকেই নিজেদের শিরোপাপ্রত্যাশী হিসেবে প্রমাণ করেছে। গ্রুপ পর্বে ধীরে ধীরে ভালো পারফরম্যান্সের পর শেষ বত্রিশে জাপানের বিপক্ষে কঠিন লড়াইয়ে ২-১ গোলের জয় তুলে নেয় তারা। কিন্তু ব্রাজিলের সবকিছু এখনো নিখুঁত নয়। মাঝমাঠে সৃজনশীলতার ঘাটতি মাঝে মাঝে স্পষ্ট হয়েছে। ইনজুরি এবং স্কোয়াড রোটেশনও কোচ কার্লো আনচেলত্তির জন্য কিছুটা চিন্তার কারণ। তবুও আক্রমণে ভিনিসিয়ুস, নেইমার, রাফিনিয়া এবং মার্টিনেল্লির মতো তারকারা ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন যেকোনো মুহূর্তে।
অন্যদিকে নরওয়ে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে চমকপ্রদ দলগুলোর একটি। আর্লিং হালান্ডের ভয়ংকর রূপ ২৮ বছরের দীর্ঘ খরা কাটিয়ে ফিরে আসা নরওয়ে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ‘ডার্ক হর্স’। প্রায় তিন দশক পর বিশ্বকাপে ফিরে তারা শুধু অংশগ্রহণ করেই সন্তুষ্ট থাকেনি; নিজেদের সামর্থ্যের জানানও দিয়েছে। গ্রুপ পর্বে কঠিন লড়াই পেরিয়ে শেষ বত্রিশে আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে তারা। নরওয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সংগঠিত ডিফেন্স এবং দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক। সামনে আছেন বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর স্ট্রাইকার হালান্ড। তার সঙ্গে মিডফিল্ডে অধিনায়ক মার্টিন ওটেগার্ডের সৃজনশীলতা নরওয়েকে ভয়ংকর করে তুলেছে। তবে নরওয়ের বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্রাজিলের বল নিয়ন্ত্রণ ও ধারাবাহিক আক্রমণ সামলানো।
এই ম্যাচটি মূলত পরিণত হতে যাচ্ছে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং আর্লিং হালান্ডের ব্যক্তিগত দ্বৈরথে। কার্লো আনচেলত্তি দলের ভারসাম্য বজায় রাখতে কৌশলে পরিবর্তন আনছেন এবং তরুণ মার্টিনেলিকে ‘সুপার সাব’ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন। যা নরওয়ের রক্ষণভাগের জন্য বড় পরীক্ষা। অন্যদিকে নরওয়ে যদি ব্রাজিলের রক্ষণভাগের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে প্রথম গোল আদায় করে নিতে পারে, তবে এই ম্যাচে অঘটন ঘটা অসম্ভব কিছু নয়। টুর্নামেন্টের এই পর্যায়ে এসে প্রতিটি দলের কৌশল কতটা নিখুঁত হতে পারে তা দেখার মতো। এই রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে কোন দল শেষ আটে যাবে, তা দেখার জন্য দর্শকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
কৌশলগতভাবে ম্যাচটি হতে পারে দারুণ রোমাঞ্চকর। ব্রাজিল চাইবে শুরু থেকেই বলের দখল রেখে আক্রমণের চাপ তৈরি করতে। নরওয়ে অপেক্ষা করবে সুযোগের। একটি ভুল, একটি দ্রুত পাল্টা আক্রমণ। আর তাতেই হালান্ডের সামনে খুলে যেতে পারে গোলের দরজা! শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফল নির্ভর করতে পারে ছোট ছোট মুহূর্তে একটি ড্রিবল, একটি থ্রু পাস অথবা একটি ফিনিশিং। ব্রাজিলের তারকাসমৃদ্ধ আক্রমণ শক্তি তাদের এগিয়ে রাখছে। তবে নরওয়ের গোছানো ফুটবল এবং হালান্ড ফ্যাক্টর ম্যাচটিকে করে তুলেছে শেষ ষোলোর সবচেয়ে অনিশ্চিত লড়াইগুলোর একটি। এ যেন শুধু একটি ম্যাচ নয়; এটি সাম্বার শিল্প বনাম ভাইকিংদের শক্তির লড়াই।
এই ম্যাচের জন্য ব্রাজিলের সেরা তারকা নেইমার প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি। তিনি বলেন, ‘সে খেলতে চায়, সব সময়ই চেয়েছে। কিন্তু তার আচরণ অসাধারণ। সে কঠোর পরিশ্রম করছে, ভালোভাবে অনুশীলন করছে। দলের সবাই তাকে ভালোবাসে।’ জাপানের বিপক্ষে শেষ বত্রিশের ম্যাচে অবশ্য মাঠে নামা হয়নি নেইমারের। এতে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু কার্লো জানিয়েছেন, সেটা ম্যাচ কৌশলের একটি অংশ। ফুটবল ইতিহাসের সেরা দলের বিপক্ষে লড়াইয়ের আগে হালান্ড অবশ্য প্রতিপক্ষকে সমীহ করছেন, ‘ব্রাজিলকে হারিয়ে পরের পর্বে যাওয়ার সম্ভাবনা আমাদের খুবই ক্ষীণ। তাদের বিপক্ষে আমাদের খেলতে হবে এটাই বাস্তবতা। শেষ ষোলোর লড়াইটা মোটেও সহজ হবে না। আমরা শেষ পর্যন্ত পারব কি না, তা জানি না।’
হালান্ডের মতো নরওয়ে কোচ স্তল সুলবাকেনও ব্রাজিলকে সমীহ করছেন। ম্যাচের আগে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, ব্রাজিল তাদের পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পাচ্ছে। ভালো থেকে আরও ভালো হচ্ছে এবং সব পজিশনে তাদের শক্তিশালী খেলোয়াড় আছে। আমরা এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে উন্মুখ হয়ে আছি। অবশ্যই ব্রাজিল ফেভারিট এবং এই বিশ্বকাপ জয়ের বড় দাবিদার। কিন্তু আমাদের ভাগ্যে লেখা, আমরা তাদের মুখোমুখি হব। তাদের বিপক্ষে নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে খেলতে হবে আমাদের।’ আনচেলত্তির ব্রাজিলকে প্রশংসা, সমীহ করলেও নিজ দলের প্রতি আস্থার কমতি নেই সুলবাকেনের। বিশেষ করে, তার দলের আক্রমণভাগে আছে আর্লিং হালান্ড নামের এক গোলমেশিন। যার নৈপুণ্যে আইভরি কোস্টকে হারিয়ে নকআউট পর্বে প্রথম জয়ের স্বাদ পেয়েছে নরওয়ে। নিউইয়র্কে সেই স্বপ্ন যাত্রা টেনে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে দলটি।
নরওয়ে বিশ্বের একমাত্র দল, যারা একাধিকবার ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়ে অপরাজিত আছে।