বরিশালের তরুণদের মধ্যে মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মাদকের সহজলভ্যতা, বন্ধুমহলের প্রভাব, কৌতূহল, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক হতাশা এবং সহজে অর্থ উপার্জনের প্রবণতার কারণে অনেক কিশোর-তরুণ এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। এর প্রভাব ব্যক্তি ও পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল নগরীর অন্তত অর্ধশত স্থানে প্রকাশ্যে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি এবং সেবন করা হয়। বিশেষ করে কাউনিয়া, ভাটিখানা, ত্রিশ গোডাউন, বেলস পার্কের হেলিপ্যাড, কেডিসি, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, রসুলপুর, পলাশপুর, বেলতলা, লামছড়ি, রূপাতলী, সাগরদী, বাংলাবাজার, ভাটারখাল, স্টেডিয়াম কলোনি, ওয়াপদা কলোনি, কাশিপুর বাজার, চর কাউয়া ও কর্ণকাঠি চৌমাথাসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক বেচাকেনা ও সেবনের অভিযোগ রয়েছে।
বরিশাল মহানগর পুলিশের (বিএমপি) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত এক বছরে চার থানায় ৪৮৭টি মাদক মামলা হয়েছে।
অন্যদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ১ হাজার ৯০৭টি মাদক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১ হাজার ৭৬ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সাতটি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৬৪১ জন রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক তানভীর হোসেন খান বলেন, ‘মাদক কারবারিদের কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাদক পাচার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও ধর্মীয় নেতাদেরও সচেতনতা বৃদ্ধিতে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে হলে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’
বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশ সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের নজরদারি বাড়ানো জরুরি। অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি আরও মনোযোগী হতে হবে এবং তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে। তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও ইতিবাচক সামাজিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে পারলে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে তাদের অনেকাংশে দূরে রাখা সম্ভব।’
দ্য নিউ লাইফ মাদকাসক্তি ও মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক মর্তুজা জুয়েল জানান, প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চারজন নতুন মাদকাসক্ত চিকিৎসার জন্য তাদের কেন্দ্রে আসেন। বর্তমানে কেন্দ্রটিতে প্রায় ১০০ রোগী ভর্তি রয়েছেন, যাদের প্রায় ৯০ শতাংশই তরুণ।
তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক রোগীর আসক্ত হওয়ার পেছনে আলাদা গল্প রয়েছে। সেই কারণগুলো চিহ্নিত করে কাউন্সেলিং ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের সুস্থ করে পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। এতে আশানুরূপ ফলও মিলছে।’
সেভ দ্য লাইফ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন মিঠু জানান, তাদের কেন্দ্রে ভর্তি অধিকাংশ রোগীর বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তাদের বেশির ভাগই পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশের কারণে মাদকের দিকে ঝুঁকেছেন।
রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ও বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের সাবেক আবাসিক চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘মাদকাসক্তি কোনো অপরাধ নয়; এটি একটি মানসিক, সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যগত সমস্যা। তাই শাস্তির পরিবর্তে ভুক্তভোগীদের বিজ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে।’
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. তপন কুমার সাহা বলেন, ‘পারিবারিক, সামাজিকসহ নানা কারণে অনেক তরুণ মানসিক হতাশা, বিষণ্নতা, একাকিত্ব ও সঙ্গ দোষের প্রভাবে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাই কেবল আসক্তির চিকিৎসা নয়, একজন ব্যক্তি কেন মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছেন, সেই কারণও চিহ্নিত করতে হবে। সময়মতো কাউন্সেলিং, থেরাপি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং পরিবারের সহযোগিতা পেলে অধিকাংশ মাদকাসক্তকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আশিক সাঈদ বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। মাদক নির্মূলে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা নগরীকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি।’