ঢাকা ২১ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
কোথায় সমস্যা হচ্ছে আর্জেন্টিনার? দিনাজপুরে ১১ দলীয় ঐক্যের মিছিল বায়ু দূষণের শীর্ষে নয়া দিল্লি, ঢাকার বাতাস আজ সহনীয় সাম্বার ছন্দ নাকি ভাইকিং ঝড়? হবিগঞ্জ ও সিলেটে ‘দুরন্ত স্পোর্টস গ্যালারি’ এর নতুন শোরুম চালু বিশ্বকাপে ১৫০ গোল স্পর্শ করল ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি নস্যাৎ করতে দেওয়া যাবে না: এরদোয়ানের হুঁশিয়ারি পররাষ্ট্রনীতি থেকে দূরে থাকার সুযোগ নেই: কিয়ার স্টারমার জাবিতে র‍্যাগিংয়ের ঘটনায় ১২ শিক্ষার্থী সাময়িক বহিষ্কার ঢাকাসহ দেশের ৯ অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রে ‘কমিউনিস্ট হুমকির’ সমালোচনা ট্রাম্পের বরিশালে তরুণদের ঘিরে মাদকের বিস্তার ২৫ আলোকবর্ষ দূরে পৃথিবীর মতো গ্রহ ইউক্রেনের কোস্তিয়ান্তিনিভকা দখলের দাবি রাশিয়ার, জেলেনস্কির নাকচ সারজিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলেন জুলাই শহিদের মা সর্বাধিক গোল দিয়ে মেসির সমকক্ষ হলেন এমবাপ্পে রবিবার রাজধানীর যেসব মার্কেট বন্ধ উত্তরা মোটর্স নিয়ে এলো নতুন ইসুজু লাক্সারি এনকিউআর বাস উচ্চতার চ্যালেঞ্জে ইংল্যান্ড, দুর্দান্ত ছন্দে মেক্সিকো ভারতে জনপ্রিয় হচ্ছে নতুন আধ্যাত্মিক ট্রেন্ড ‘ভজন ক্লাবিং’ সুশাসন চর্চা থেকে অবিচল আস্থা: ব্র্যাক ব্যাংক কয়লার ময়লায় টিকে থাকার সংগ্রাম বেনাপোল বন্দরে রাজস্বে বড় ধাক্কা, ঘাটতি ৪৭৩১ কোটি টাকা সেতুর বদলে মেলে শুধু আশ্বাস কুষ্টিয়ায় পানির অভাবে বিপাকে পাটচাষিরা ‘ওপেন সিক্রেট’ মাদক ৫ জুলাই: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ৫ জুলাই: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল ৭৯৭৫ কোটির প্রকল্পে ২৮৪ কোটি টাকা অনিয়ম কেপ ভার্দেকে স্যালুট

‘ওপেন সিক্রেট’ মাদক

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৩ এএম
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
‘ওপেন সিক্রেট’ মাদক
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

হাত বাড়ালেই যেন মিলছে মরণনেশা ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে গেছে। চিহ্নিত মাদক স্পটের গণ্ডি পেরিয়ে এখন রাজধানীর অলিগলি, মহল্লা ও আবাসিক এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদকের কারবার। 

সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মায়ানমারভিত্তিক ইয়াবা ট্যাবলেট মারাত্মক হারে ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামে। এ ছাড়া হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), সিসা, এলএসডিসহ আরও একাধিক কৃত্রিম মাদকেরও ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে বিভিন্ন এলাকায়।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চিহ্নিত মাদকের স্পটে কেনাবেচা ছাড়াও অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজ বা গ্রুপ খুলে মাদক বেচাকেনা চলছে। এমনই একটি চক্রের তিন সদস্যকে প্রায় ৬৬ কেজি সিসা, বিভিন্ন সরঞ্জামসহ গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে দুজনই ইরানি বংশোদ্ভূত সহোদর, যারা পারিবারিক ব্যবসার সূত্রে ঢাকায় বসবাস করে আসছিলেন। একই দিন টেকনাফ সীমান্ত এলাকা থেকে দুই কেজি ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ও একটি রাইফেল জব্দ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তার আগের দিন বুধবার টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় বিজিবির পৃথক দুটি অভিযানে ২ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুজনকে আটক করা হয়। এ ছাড়া গতকাল শুক্রবার পাকস্থলীর ভেতরে করে পাচারকালে ১ হাজার ৩২০ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির ‘সিটিটিসি’ ইউনিট।
 
ম কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দোকানের আড়ালে বা ভ্রাম্যমাণ ক্ষুদ্র দোকান, এমনকি হাঁটাচলার মাঝেই লেনদেন হচ্ছে ইয়াবা-গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। অনেকে পাকস্থলীর ভেতর, বিভিন্ন পণ্যের ভেতর, যানবাহনে কৌশলে লুকিয়ে বা মোবাইল ফোনের ব্যাটারির চেম্বারে করেও ইয়াবা বহন করছে। এমনকি ঢাকার কিছু এলাকায় ইয়াবা ও গাঁজা সেবন এখন অনেকটাই ‘ওপেন সিক্রেট’। 

চিহ্নিত মাদক স্পট ও কারবারিদের তৎপরতা

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে সুনির্দিষ্টসংখ্যক কোনো মাদক স্পট নেই। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারিদের তৎপরতা অনুসারে মাদকের স্পটের বিভিন্ন সংখ্যা অনেকেই বলে থাকেন। সে হিসাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আটটি ক্রাইম জোনে বর্তমানে মাদক বেচাকেনার জন্য স্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ২৪৭টি স্থান। এ ছাড়া এসব মাদক কারবারের নেপথ্যে অন্তত ২৩১ জন ডিলার পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী এবং ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি মাদক কারবারি সক্রিয় রয়েছেন। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) হালনাগাদ পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার চারপাশের অন্তত ১০৫টি রুট দিয়ে প্রতিদিন ইয়াবা, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), হেরোইন ও ফেনসিডিলের মতো ভয়াবহ মাদক প্রবেশ করছে।এর মধ্যে সম্প্রতি মেরুল বাড্ডার কাঁচাবাজার এলাকায় মাদকের নতুন স্পট চোখে পড়েছে সাধারণ বাসিন্দাদের। বাড্ডা থানা ভবন থেকে মাত্র কয়েক শ মিটার দূরত্বে এই কাঁচাবাজার রোডে এখন অনেকটা প্রকাশ্যেই ইয়াবা বেচাকেনা চলছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী। স্থানীয় ওই ব্যক্তির দাবি, স্থানীয় পুলিশও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। 

অন্যদিকে সায়েদাবাদ জনপদের মোড় থেকে দয়াগঞ্জ সড়কের একটি রিকশা গ্যারেজ ঘিরে আরেকটি নতুন মাদক স্পটের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, জনপদের মোড় থেকে দয়াগঞ্জ সড়কের দিকে কিছুটা এগোলেই ডান পাশে সেই রিকশা গ্যারেজ। রিকশার গ্যারেজ হলেও এটি মূলত মাদকের আস্তানা। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, রিকশা গ্যারেজের আড়ালে এখানে ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজা কেনাবেচা চলে। এমনকি যাদের রিকশার চালক হিসেবে এখানে দেখা যায়, তাদের বেশির ভাগই মাদকের কারবার ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। তাদের সংশ্লিষ্ট থানার এলাকাভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মদদ দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। থানায় ফোন করে অভিযোগ জানানোর পরও এই মাদক স্পটটি বন্ধ হয়নি বলে জানান স্থানীয়রা। 

এলাকাভিত্তিক স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে নাখালপাড়া রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশ মাদকের অন্যতম প্রধান ও উন্মুক্ত হটস্পট। অন্যদিকে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প ও টাউন হল এলাকা এখন মাদকের বড় স্পট হিসেবে পরিচিত। মিরপুর ও পল্লবীর বিভিন্ন বিহারি ক্যাম্প, আগারগাঁওয়ের বস্তি এলাকা মাদকের পুরোনো ও অন্যতম বড় স্পট। এ ছাড়া বাড্ডা, মহাখালী, তেজগাঁও, তুরাগ, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, ডেমরা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, গাবতলী-বাগবাড়ী, ফকিরাপুল কালভার্ট বস্তি, গোলাপবাগ, সিটি কলোনি এবং গোপীবাগ মেথরপট্টি রেললাইন এলাকাও মাদকের হটস্পট হিসেবে পরিচিত। 

রাজধানীর সবচেয়ে কুখ্যাত তিন ‘মাদকের হাট’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকার অন্তত তিনটি মাদক স্পটকে অনেকটা মাদকের হাট হিসেবে ধরা হয়। ২৪ ঘণ্টাই খোলাবাজারের মতো বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা হয় এসব স্পটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝেমধ্যে অভিযানও চালায়, কিন্তু তার পরও চলছে মাদক কেনাবেচা। এই তিনটি হটস্পটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে–আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের বসবাস কেন্দ্র মোহাম্মদপুরের ‘জেনেভা ক্যাম্প’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি, এটি রাজধানীর সবচেয়ে ভয়াবহ মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট। ক্যাম্পের মুরগিপট্টি, বাবর রোড এবং হুমায়ুন রোড এলাকায় নারী ও শিশুদের ব্যবহার করে ইয়াবা-হেরোইন বিক্রি করা হয়। এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি মাদক-ছিনতাইকারী চক্র ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া পুলিশের ওপরও হামলা চালায়।

এদিকে কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে নাখালপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইন এলাকা আরেকটি ‘মাদকের বাজার’ হিসেবে পরিচিত। ভাসমান খুচরা বিক্রেতারা এখানে ব্যাপকভাবে সক্রিয়। পাশাপাশি রেললাইনের আশপাশে এখানে মাদকসেবীদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলাও বসে।

এ ছাড়া মিরপুর বিহারি ক্যাম্প আরেকটি অন্যতম প্রধান মাদক স্পট হিসেবে পরিচিত। এই ক্যাম্পগুলোতে রাতে হাঁকডাক ছেড়ে মাদক বিক্রি হয়। ঘনবসতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা খুব সহজেই পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপন করে।

যা বলছেন অপরাধ বিশেজ্ঞরা

মাদকের নেটওয়ার্ক অনেক শক্তিশালী ও উচ্চপর্যায়ের বলে মনে করেন অপরাধ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের এই অধ্যাপক গত শুক্রবার খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘মাদকের নেটওয়ার্ক অনেক উচ্চপর্যায়ের। মাদক চোরাচালান বন্ধ হয়ে গেলে সরকারিভাবে দায়িত্বশীল অনেকেরই নিয়মিত আয়ের উৎস কমে যাবে। অন্যদিকে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে একশ্রেণির প্রভাবশালী রাজনীতিক-ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাও মাদক কারবারে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। ফলে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মুখে মাদকবিরোধীর বড় কথা বললেও তাদের অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদক বিস্তারে কাজ করছে। মাদক চোরাচালান বন্ধ না হওয়ার পেছনে এগুলো বড় কারণ।’

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, মাদক চোরাচালানের রুট এবং কেনাবেচার চিহ্নিত কিছু স্পটের খবর বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেলেও সুনির্দিষ্টভাবে সেটি নির্ধারণ করা কঠিন। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের মাদকের এতটাই বিস্তার ঘটেছে যে, রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর প্রায় সব এলাকায় বা পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মাদকবিরোধী সামাজিক অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বাড়ানো খুব জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকিতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের যুক্ত করে সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ার মাধ্যমে মাদকবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় দেশের বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম অন্ধকারে ডুবে যাবে।’

মাদক থেকেই অধিকাংশ অপরাধের সূত্রপাত ঘটে বলে মনে করেন সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক। গতকাল তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাদক দেশের যুবসমাজকে ধ্বংসের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কারণ অধিকাংশ অপরাধের সূত্রপাত হয় মাদক থেকে। পাশাপাশি মাদক যেমন কর্মস্পৃহা কমিয়ে দিচ্ছে, তেমনি তরুণ সমাজের মেধা ধ্বংস করে দিচ্ছে, যা বৈজ্ঞানিকভাবেও স্বীকৃত। ফলে মাদকের ছোবলে আমাদের সম্ভাবনার একটি জাতি (জেনারেশন) পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। মুখে আমরা অনেকেই মাদকবিরোধী নানা রকম কথা বলে থাকি, কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর কোনো পদক্ষেপ এবং সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না।’
 
ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আগে একসময়ে পাড়া-মহল্লাগুলোতে বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং ব্যাপক কার্যকর ছিল। পুলিশের নিয়মিত টহল বা আনাগোনা দেখা যেত। এখন এগুলো খুব একটা চোখে পড়ে না। যদিও পুলিশকে আরও নানা কাজে যুক্ত থাকতে হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মাদক কারবারিসহ পেশাদার অপরাধীদের ভয়ভীতিও কমে গেছে। অনেকে প্রকাশ্যই মাদক কেনাবেচা বা সেবন করে যাচ্ছে। ফলে মাদকবিরোধী কঠোর অবস্থান আরও দৃশ্যমান করতে হবে। মাদকবিরোধী সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে নজরদারি বৃদ্ধি ও সাঁড়াশি অভিযান চালানো জরুরি।’ 

যা বলছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযান ডিএমপির নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে চলমান রয়েছে। আমাদের বিভিন্ন গোয়েন্দা দল থেকে যখনই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তখনই অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু তার পরও মাদকের বিস্তার কমছে না, বরং মারাত্মক হারে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এ জন্য সবার আগে সীমান্ত ‘সিল’ (বন্ধ) করার ব্যবস্থা করতে হবে। সীমান্তে টহল বৃদ্ধিসহ কঠোরভাবে যদি মাদক প্রবেশ বন্ধ করা যায়, তাহলে রাজধানী ঢাকাসহ অন্য সবখানেই মাদক কমে যাবে। এর বাইরেও মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাও জরুরি। মসজিদ, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবখানে মাদকের কুফল তুলে ধরতে হবে। সমাজে যাদের কথা সবাই মান্য করে, তাদের এ বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান ডিএমপির এই অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা।

‘ওপেন সিক্রেট’ মাদক

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৩ এএম
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
‘ওপেন সিক্রেট’ মাদক
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

হাত বাড়ালেই যেন মিলছে মরণনেশা ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে গেছে। চিহ্নিত মাদক স্পটের গণ্ডি পেরিয়ে এখন রাজধানীর অলিগলি, মহল্লা ও আবাসিক এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদকের কারবার। 

সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মায়ানমারভিত্তিক ইয়াবা ট্যাবলেট মারাত্মক হারে ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামে। এ ছাড়া হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), সিসা, এলএসডিসহ আরও একাধিক কৃত্রিম মাদকেরও ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে বিভিন্ন এলাকায়।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চিহ্নিত মাদকের স্পটে কেনাবেচা ছাড়াও অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজ বা গ্রুপ খুলে মাদক বেচাকেনা চলছে। এমনই একটি চক্রের তিন সদস্যকে প্রায় ৬৬ কেজি সিসা, বিভিন্ন সরঞ্জামসহ গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে দুজনই ইরানি বংশোদ্ভূত সহোদর, যারা পারিবারিক ব্যবসার সূত্রে ঢাকায় বসবাস করে আসছিলেন। একই দিন টেকনাফ সীমান্ত এলাকা থেকে দুই কেজি ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ও একটি রাইফেল জব্দ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তার আগের দিন বুধবার টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় বিজিবির পৃথক দুটি অভিযানে ২ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুজনকে আটক করা হয়। এ ছাড়া গতকাল শুক্রবার পাকস্থলীর ভেতরে করে পাচারকালে ১ হাজার ৩২০ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির ‘সিটিটিসি’ ইউনিট।
 
ম কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দোকানের আড়ালে বা ভ্রাম্যমাণ ক্ষুদ্র দোকান, এমনকি হাঁটাচলার মাঝেই লেনদেন হচ্ছে ইয়াবা-গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। অনেকে পাকস্থলীর ভেতর, বিভিন্ন পণ্যের ভেতর, যানবাহনে কৌশলে লুকিয়ে বা মোবাইল ফোনের ব্যাটারির চেম্বারে করেও ইয়াবা বহন করছে। এমনকি ঢাকার কিছু এলাকায় ইয়াবা ও গাঁজা সেবন এখন অনেকটাই ‘ওপেন সিক্রেট’। 

চিহ্নিত মাদক স্পট ও কারবারিদের তৎপরতা

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে সুনির্দিষ্টসংখ্যক কোনো মাদক স্পট নেই। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারিদের তৎপরতা অনুসারে মাদকের স্পটের বিভিন্ন সংখ্যা অনেকেই বলে থাকেন। সে হিসাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আটটি ক্রাইম জোনে বর্তমানে মাদক বেচাকেনার জন্য স্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ২৪৭টি স্থান। এ ছাড়া এসব মাদক কারবারের নেপথ্যে অন্তত ২৩১ জন ডিলার পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী এবং ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি মাদক কারবারি সক্রিয় রয়েছেন। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) হালনাগাদ পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার চারপাশের অন্তত ১০৫টি রুট দিয়ে প্রতিদিন ইয়াবা, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), হেরোইন ও ফেনসিডিলের মতো ভয়াবহ মাদক প্রবেশ করছে।এর মধ্যে সম্প্রতি মেরুল বাড্ডার কাঁচাবাজার এলাকায় মাদকের নতুন স্পট চোখে পড়েছে সাধারণ বাসিন্দাদের। বাড্ডা থানা ভবন থেকে মাত্র কয়েক শ মিটার দূরত্বে এই কাঁচাবাজার রোডে এখন অনেকটা প্রকাশ্যেই ইয়াবা বেচাকেনা চলছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী। স্থানীয় ওই ব্যক্তির দাবি, স্থানীয় পুলিশও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। 

অন্যদিকে সায়েদাবাদ জনপদের মোড় থেকে দয়াগঞ্জ সড়কের একটি রিকশা গ্যারেজ ঘিরে আরেকটি নতুন মাদক স্পটের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, জনপদের মোড় থেকে দয়াগঞ্জ সড়কের দিকে কিছুটা এগোলেই ডান পাশে সেই রিকশা গ্যারেজ। রিকশার গ্যারেজ হলেও এটি মূলত মাদকের আস্তানা। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, রিকশা গ্যারেজের আড়ালে এখানে ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজা কেনাবেচা চলে। এমনকি যাদের রিকশার চালক হিসেবে এখানে দেখা যায়, তাদের বেশির ভাগই মাদকের কারবার ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। তাদের সংশ্লিষ্ট থানার এলাকাভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মদদ দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। থানায় ফোন করে অভিযোগ জানানোর পরও এই মাদক স্পটটি বন্ধ হয়নি বলে জানান স্থানীয়রা। 

এলাকাভিত্তিক স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে নাখালপাড়া রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশ মাদকের অন্যতম প্রধান ও উন্মুক্ত হটস্পট। অন্যদিকে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প ও টাউন হল এলাকা এখন মাদকের বড় স্পট হিসেবে পরিচিত। মিরপুর ও পল্লবীর বিভিন্ন বিহারি ক্যাম্প, আগারগাঁওয়ের বস্তি এলাকা মাদকের পুরোনো ও অন্যতম বড় স্পট। এ ছাড়া বাড্ডা, মহাখালী, তেজগাঁও, তুরাগ, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, ডেমরা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, গাবতলী-বাগবাড়ী, ফকিরাপুল কালভার্ট বস্তি, গোলাপবাগ, সিটি কলোনি এবং গোপীবাগ মেথরপট্টি রেললাইন এলাকাও মাদকের হটস্পট হিসেবে পরিচিত। 

রাজধানীর সবচেয়ে কুখ্যাত তিন ‘মাদকের হাট’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকার অন্তত তিনটি মাদক স্পটকে অনেকটা মাদকের হাট হিসেবে ধরা হয়। ২৪ ঘণ্টাই খোলাবাজারের মতো বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা হয় এসব স্পটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝেমধ্যে অভিযানও চালায়, কিন্তু তার পরও চলছে মাদক কেনাবেচা। এই তিনটি হটস্পটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে–আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের বসবাস কেন্দ্র মোহাম্মদপুরের ‘জেনেভা ক্যাম্প’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি, এটি রাজধানীর সবচেয়ে ভয়াবহ মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট। ক্যাম্পের মুরগিপট্টি, বাবর রোড এবং হুমায়ুন রোড এলাকায় নারী ও শিশুদের ব্যবহার করে ইয়াবা-হেরোইন বিক্রি করা হয়। এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি মাদক-ছিনতাইকারী চক্র ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া পুলিশের ওপরও হামলা চালায়।

এদিকে কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে নাখালপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইন এলাকা আরেকটি ‘মাদকের বাজার’ হিসেবে পরিচিত। ভাসমান খুচরা বিক্রেতারা এখানে ব্যাপকভাবে সক্রিয়। পাশাপাশি রেললাইনের আশপাশে এখানে মাদকসেবীদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলাও বসে।

এ ছাড়া মিরপুর বিহারি ক্যাম্প আরেকটি অন্যতম প্রধান মাদক স্পট হিসেবে পরিচিত। এই ক্যাম্পগুলোতে রাতে হাঁকডাক ছেড়ে মাদক বিক্রি হয়। ঘনবসতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা খুব সহজেই পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপন করে।

যা বলছেন অপরাধ বিশেজ্ঞরা

মাদকের নেটওয়ার্ক অনেক শক্তিশালী ও উচ্চপর্যায়ের বলে মনে করেন অপরাধ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের এই অধ্যাপক গত শুক্রবার খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘মাদকের নেটওয়ার্ক অনেক উচ্চপর্যায়ের। মাদক চোরাচালান বন্ধ হয়ে গেলে সরকারিভাবে দায়িত্বশীল অনেকেরই নিয়মিত আয়ের উৎস কমে যাবে। অন্যদিকে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে একশ্রেণির প্রভাবশালী রাজনীতিক-ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাও মাদক কারবারে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। ফলে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মুখে মাদকবিরোধীর বড় কথা বললেও তাদের অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদক বিস্তারে কাজ করছে। মাদক চোরাচালান বন্ধ না হওয়ার পেছনে এগুলো বড় কারণ।’

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, মাদক চোরাচালানের রুট এবং কেনাবেচার চিহ্নিত কিছু স্পটের খবর বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেলেও সুনির্দিষ্টভাবে সেটি নির্ধারণ করা কঠিন। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের মাদকের এতটাই বিস্তার ঘটেছে যে, রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর প্রায় সব এলাকায় বা পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মাদকবিরোধী সামাজিক অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বাড়ানো খুব জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকিতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের যুক্ত করে সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ার মাধ্যমে মাদকবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় দেশের বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম অন্ধকারে ডুবে যাবে।’

মাদক থেকেই অধিকাংশ অপরাধের সূত্রপাত ঘটে বলে মনে করেন সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক। গতকাল তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাদক দেশের যুবসমাজকে ধ্বংসের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কারণ অধিকাংশ অপরাধের সূত্রপাত হয় মাদক থেকে। পাশাপাশি মাদক যেমন কর্মস্পৃহা কমিয়ে দিচ্ছে, তেমনি তরুণ সমাজের মেধা ধ্বংস করে দিচ্ছে, যা বৈজ্ঞানিকভাবেও স্বীকৃত। ফলে মাদকের ছোবলে আমাদের সম্ভাবনার একটি জাতি (জেনারেশন) পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। মুখে আমরা অনেকেই মাদকবিরোধী নানা রকম কথা বলে থাকি, কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর কোনো পদক্ষেপ এবং সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না।’
 
ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আগে একসময়ে পাড়া-মহল্লাগুলোতে বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং ব্যাপক কার্যকর ছিল। পুলিশের নিয়মিত টহল বা আনাগোনা দেখা যেত। এখন এগুলো খুব একটা চোখে পড়ে না। যদিও পুলিশকে আরও নানা কাজে যুক্ত থাকতে হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মাদক কারবারিসহ পেশাদার অপরাধীদের ভয়ভীতিও কমে গেছে। অনেকে প্রকাশ্যই মাদক কেনাবেচা বা সেবন করে যাচ্ছে। ফলে মাদকবিরোধী কঠোর অবস্থান আরও দৃশ্যমান করতে হবে। মাদকবিরোধী সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে নজরদারি বৃদ্ধি ও সাঁড়াশি অভিযান চালানো জরুরি।’ 

যা বলছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযান ডিএমপির নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে চলমান রয়েছে। আমাদের বিভিন্ন গোয়েন্দা দল থেকে যখনই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তখনই অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু তার পরও মাদকের বিস্তার কমছে না, বরং মারাত্মক হারে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এ জন্য সবার আগে সীমান্ত ‘সিল’ (বন্ধ) করার ব্যবস্থা করতে হবে। সীমান্তে টহল বৃদ্ধিসহ কঠোরভাবে যদি মাদক প্রবেশ বন্ধ করা যায়, তাহলে রাজধানী ঢাকাসহ অন্য সবখানেই মাদক কমে যাবে। এর বাইরেও মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাও জরুরি। মসজিদ, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবখানে মাদকের কুফল তুলে ধরতে হবে। সমাজে যাদের কথা সবাই মান্য করে, তাদের এ বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান ডিএমপির এই অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা।

৭৯৭৫ কোটির প্রকল্পে ২৮৪ কোটি টাকা অনিয়ম

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৮ এএম
৭৯৭৫ কোটির প্রকল্পে ২৮৪ কোটি টাকা অনিয়ম
ছবি: সংগৃহীত

‘সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডর সড়ক উন্নয়ন’ শিরোনামে গৃহীত মেগা প্রকল্পের মেয়াদ আট বছরে বেড়েছে পাঁচ বার, উন্নয়ন ব্যয় (ডিপিপি) ব্যয় বেড়েছে ৫১ শতাংশ। ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা ডিপিপি ব্যয় অনুমোদনের পর ২০২২ সালে ডিপিপি সংশোধন করা হয়। সেই ডিপিপি প্রস্তাব অপরিবর্তিত রেখে প্রকল্পের উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে ৭ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। সম্প্রতি বাংলাদেশের মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের এক নিরীক্ষায় দেখা গেছে, গত চার অর্থবছরে এই প্রকল্পে ২৮৪ কোটি ৯৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪১৪ টাকার অনিয়ম হয়েছে। 

অনিয়ম আর অনিয়ম, কর্মকর্তারা চুপ

অডিট প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে, সাসেকের এই প্রকল্পে ২০২১-২২ অর্থবছরে আউটসোর্সিংয়ের মোট বিল থেকে আয়কর কর্তন না করায় ৪২ হাজার ১১৩ টাকা সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। 

২০২২-২৩ অর্থবছরে ঠিকাদারকে চুক্তির অতিরিক্ত মূল্য প্রদান, সর্বনিম্ন দরদাতাকে উপেক্ষা করে দ্বিতীয় দরদাতার সঙ্গে চুক্তি, ঠিকাদারদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক এবং আয়কর কম কর্তনসহ নানা অনিয়ম হয়েছে। এ অনিয়মে ২৪৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮৬ হাজার ৭৩ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে চুক্তির সাধারণ শর্ত লঙ্ঘন করে বিশেষ শর্তাবলি প্রণয়ন করা হয়েছে। পরে সে অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় করে ঠিকাদারদের বিল দেওয়ায় ২৫ লাখ ৮ হাজার ৮০৬ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ওই অর্থবছরে প্রকল্পে নিয়োজিত প্রকৌশলীদের জন্য অর্ধ-স্থায়ী আবাসন নির্মাণের কোনো কাজ সম্পাদন না করেই ঠিকাদার উধাও হয়ে গিয়েছিল। এ কাণ্ডে ৩ কোটি ৮০ লাখ ১৭ হাজার ৫৫৬ টাকার অনিয়ম হয়েছে। 

২০২৩-২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষায় দেখা গেছে, ঠিকাদারদের বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩৮ টাকা আদায় করা হয়নি। সেই অর্থবছরে সঞ্চিত ব্যাংক সুদ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি, যার পরিমাণ ৫ লাখ ১৫ হাজার ৭৭৮ টাকা। ভেরিয়েশন অনুমোদন ছাড়া প্রকল্পের খরচের জন্য নির্ধারিত অর্থ থেকে অতিরিক্ত ৪৫ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯২ টাকা ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে বিমা কাভারেজ করা হয়নি; এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১৬ হাজার ৫০০ টাকা।

প্রকৃত ব্যয়ের পরিবর্তে পরামর্শক, ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তির হারে আন্তর্জাতিক বিমান ভাড়ার বিল পরিশোধ করা হয়েছিল সেই বছর। এতে ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬১ হাজার ৯৬৭ টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঠিকাদারের বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর আদায় করা হয়নি ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩৮ টাকা। সঞ্চিত ব্যাংক সুদ থেকে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি ৫ লাখ ১৫ হাজার ৭৭৮ টাকা। 

নির্মাণকাজের জন্য নির্ধারিত বিল থেকে ভেরিয়েশন অনুমোদন ছাড়াই ঠিকাদারকে ৪৫ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯২ টাকা অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করা হয়েছে। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে বিমা কাভারেজ করা হয়নি ১৬ হাজার ৫০০ টাকার। ঠিকাদার ও পরামর্শকদের বিমানযাত্রার বিলে ১১ কোটি ৬৬ লাখ ২০ হাজার ৪৮৩ টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত চার বছরে সাসেক প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মোট ১৯টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সময়মতো ব্রডশিট জবাব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বড় অঙ্কের আর্থিক আপত্তিগুলো দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত অবস্থায় ঝুলে আছে।

এ বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক এ কে রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে খবরের কাগজ। তিনি ফোন ধরেননি। রাজধানীর সড়ক ভবনে তার কার্যালয় ও প্রকল্প কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। প্রকল্পের অন্য কর্মকর্তারা অডিট আপত্তির বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ল ২০২৭ পর্যন্ত

সাসেক ঢাকা (কাঁচপুর)-সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ এবং উভয় পাশে পৃথক সার্ভিস লেন নির্মাণ করতে ‘সাপোর্ট’ প্রকল্পটির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্তের আলোকে এখন প্রকল্পের কাজ ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে।

২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন পায়। সে সময় ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই প্রকল্পের সামগ্রিক মেয়াদ দাঁড়িয়েছে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ মূল মেয়াদের তুলনায় প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধির হার এখন ৩০০ শতাংশ।

ভৌত অগ্রগতি এখনো ৫০ শতাংশের নিচেই

এই প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চার বছর পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। প্রকল্পের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সামগ্রিক ভৌত অগ্রগতি এখনো ৫০ শতাংশের নিচেই রয়ে গেছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, হবিগঞ্জ, সিলেট ও নরসিংদীর মতো জেলাগুলোতে ভূমি অধিগ্রহণের ধীরগতি মূল প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণকাজকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। প্রকল্পের সবচেয়ে ধীরগতি পরিলক্ষিত হয়েছে নরসিংদী জেলায়। সেখানে ১৫৮ দশমিক শূন্য ৩ একর ভূমির মধ্যে মাত্র ৩৮ দশমিক ৩৫ একর জমি হস্তান্তর হওয়ায় ভৌত অগ্রগতির হার মাত্র ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশে আটকে আছে।
মাঠপর্যায়ের তথ্য ও সরকারের বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জেলা প্রশাসন ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগের দীর্ঘসূত্রতা এবং মাঠপর্যায়ে যৌথ জরিপ পরিচালনায় অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ হয়েছে। খতিয়ান ও জমির মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতা, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দেওয়ানি মামলা এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি বিরোধও জমি অধিগ্রহণে জটিলতার সৃষ্টি করেছে। এসব কারণে দফায় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে।

নতুন ‘সেফটি ইন্টারভেনশন’ পরিকল্পনা

ব্যয় সীমাবদ্ধ রাখতে প্রস্তাবিত নকশা থেকে ২২টি ওভারপাস ও ৭টি আন্ডারপাসসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কাঠামো বাদ দিয়েছিল প্রকল্প অফিস। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে মহাসড়কটির ভবিষ্যৎ ট্রাফিক গতি এবং সার্বিক সড়ক নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ‘রোড সেফটি অডিট’ প্রতিবেদনে বর্তমান নকশায় বেশ কিছু গুরুতর ‘ব্ল্যাক স্পট’ ও নিরাপত্তাঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। চিহ্নিত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে–রাস্তা বা মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে কোনো উড়াল সড়ক বা আন্ডারপাস না রাখা; সার্ভিস লেনের ধীরগতির যানবাহন মূল সড়কের দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে মিশে যাওয়া; মূল রাস্তা থেকে কোনো লেনে ঢোকা বা বেরিয়ে যাওয়ার সময় গতি কমাতে আলাদা লেন না থাকা; ত্রুটিপূর্ণ ফুটওভারব্রিজ।

এখন মহাসড়কের স্থায়িত্ব ও ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন করে ‘সেফটি ইন্টারভেনশন’ বা নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সড়ক অবকাঠামো প্রকল্পের নকশায় বিদ্যমান দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এই সংশোধনী আনা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি

আইএমইডির নিরীক্ষা প্রতিবেদন বলছে, অনুমোদিত নকশা সাইটে পৌঁছানোর আগে চেইনেজে (সাইটে) কাজ স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন ঠিকাদার। দাপ্তরিক অনুমোদনের এই বর্ধিত ‘রেসপন্স টাইম’ প্রকল্পের সামগ্রিক মেয়াদ ও ব্যয় উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করছে।

সাত বছর আগে করা প্রাথমিক সমীক্ষায় ভূগর্ভস্থ মাটির বৈশিষ্ট্য সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয়নি। এর ফলে বাস্তবে সড়ক অ্যালাইনমেন্টে ক্ষতিকর মাটি ও নরম কাদার উপস্থিতি ধরা পড়েছে। তাই মাঝপথেই নকশা সংশোধন করতে হচ্ছে।

২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ঠিকাদারদের অভ্যন্তরীণ আর্থিক তারল্যসংকট এবং নগদ অর্থের প্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়ায় নির্মাণকাজের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ঋণচুক্তি অনুযায়ী, দরপত্র প্রক্রিয়ার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে, বিশেষ করে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এডিবির পূর্ব অনুমোদন বা ‘নো অবজেকশন’ গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই অনুমোদনের জন্য এডিবির দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া প্রকল্পের সময়সীমাকে প্রলম্বিত করেছে। এ ছাড়া এডিবির ক্রয় বিভাগ বারবার বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার ফলে সময়ক্ষেপণ হয়েছে। উচ্চমূল্যের ক্রয়ের ক্ষেত্রে এডিবির সদর দপ্তর সময়ক্ষেপণ করেছে বলে ব্যাখ্যা দিয়েছে আইএমইডি।

ক্রয় প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে ঠিকাদারদের জমা দেওয়া দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ বারবার বাড়াতে হয়েছে। এডিবি গাইডলাইনের স্বাভাবিক নিয়ম ভঙ্গ করে এই মেয়াদ ১২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩৯৫ দিন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

এইচএসসিতে ঝরে পড়া বাড়ার দায় কার?

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ১০:১৯ এএম
আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০১:০৯ পিএম
এইচএসসিতে ঝরে পড়া বাড়ার দায় কার?
ছবি: সংগৃহীত

গত বছর উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (এইচএসসি ও সমমান) নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা না দেওয়ার হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি। এবার এটি বেড়ে হয়েছে ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে। পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার হার এভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে কিছু বিষয়কে সামনে আনছেন সংশ্লিষ্টরা। 

এর মধ্যে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর অনেক শিক্ষার্থীকে ক্লাসে-পড়ার টেবিলে ফেরাতে না পারাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। এ ছাড়া শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব বেড়ে যাওয়াকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন তারা। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহের কারণে মেয়ে শিক্ষার্থীরা এবং শ্রমবাজারে ঢুকে পড়ায় ছেলে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ার কারণকেও সামনে আনছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসব বিষয়ে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাইকোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন, লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দল্টা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিতের সঙ্গে দৈনিক খবরের কাগজের কথা হয়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, বিশেষ করে করোনা-পরবর্তী সময়কে ধরে একটা গবেষণা হওয়া দরকার। গবেষণাটি হতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা। গবেষণা হতে হবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে নয়। এই গবেষণার জন্য যথেষ্ট বাজেটও থাকা উচিত।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, প্রস্তুতির সংকটের কারণে অনেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি। প্রস্তুতির সংকটের কারণ হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা অসাধারণ কাজ করেছে, তারা গণ-অভ্যুত্থান সফল করেছে। কিন্তু অভুত্থান শেষে তাদের সবাইকে ক্লাসে-পড়ার টেবিলে পাঠানো দরকার ছিল। কিন্তু সবাইকে পাঠানো গেছে, তা নয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের মনস্তাত্ত্বিক গ্যাপ বেড়ে গিয়েছিল, সেটা পূরণ হয়নি। রাস্তার ট্রাফিক ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ঠিক করা সরকারের দায়িত্ব, শিক্ষার্থীদের না। আন্দোলনের পর তাদের দিয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করানোর চেয়ে তাদের ক্লাসে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল তখন, কিন্তু তখন এটা করা হয়নি।

শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অশোভন আচরণ করার খবর আসছিল তখন। কিন্তু এর জন্য শিক্ষার্থীদের এককভাবে দায়ী করা উচিত হবে না, তারা ভিকটিম। শিক্ষকদেরও মনে রাখা উচিত, শিক্ষকতা স্রেফ একটা চাকরি নয়, ব্রত। তবে নির্বাচনের পর এখন অবস্থার উন্নতি হচ্ছে, আশা করি এই সমস্যা কেটে যাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের সীমাহীন ক্ষতি হয়ে গেছে, এই ক্ষতিপূরণে সীমাহীন অঙ্গীকার দরকার।

ঢাবির সাইকোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, পরীক্ষা তো গায়ের জোরে হয় না। পরীক্ষা দিতে হয় পড়াশোনা করে। পরীক্ষার একটা প্রস্তুতি আছে, প্রস্তুতি নিতে হয়। আন্দোলনের পর শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের অশোভন আচরণের খবর আসছিল। তাই বলে শিক্ষকরা পড়াননি, ক্লাসে যাননি, তা তো না। শিক্ষকরা পড়িয়েছেন, ক্লাস নিয়েছেন; কিন্তু অনেক ছাত্র ঠিকমতো ক্লাসে যায়নি, পড়েনি। তাই প্রস্তুতি নিতে পারেনি, পরীক্ষায়ও বসতে পারেনি। কেবল আন্দোলনের পর না, করোনার পর থেকেই যেনতেনভাবে পড়ে পাস করার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, সেটিও এই অবস্থার জন্য একটা কারণ।

তবে ঝরে পড়ার কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক কারণকে প্রধান করে দেখতে রাজি নন লক্ষ্মীপুর জেলার দল্টা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, অভিভাবকদের মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাবোধ বেড়ে গেছে। এখন সম্পন্ন ঘরের মেয়েদেরও বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে চাইছেন অভিভাবকরা। ছেলে অসৎ সঙ্গে পড়ে অসামাজিক বা বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে কি না, এই টেনশনে অবস্থাসম্পন্ন অভিভাবকরাও সন্তানকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত বলেন, ‘আন্দোলনের পর ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে আমিও ছিলাম। কিন্তু সেটা সপ্তাহ থেকে ১০ দিন করেছি। কিন্তু এর বেশি সময় ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসের বাইরে রাখা ঠিক হয়নি। তখন একটা গ্রুপ এটি করিয়েছে। তারা পরে নতুন দল গঠন করেছে।’

প্রসঙ্গত, গতকাল শুরু হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দুই বছর আগে (২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। যাদের মধ্যে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না।

সাম্প্রতিক সময়ে পাবলিক পরীক্ষায় ফরম পূরণ করার পরও পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থী বাড়ছে। যেমন গত বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিনে মোট ১৯ হাজার ৭৫৯ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। এর আগের বছর প্রথম দিনে অনুপস্থিত ছিল ১৫ হাজার ২০৩ পরীক্ষার্থী।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। এ বছর এই বোর্ডে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের বেশি পরীক্ষার জন্য ফরমই পূরণ করেনি।

মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে কেন এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে গেল বা পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না, তার সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে পারেনি শিক্ষা বিভাগ।

অবশ্য গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের করা একটি বিশ্লেষণে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। ওই বছর ঢাকা বোর্ডের অধীনে ৬ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৩৫০ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় ৪১ শতাংশের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ বাল্যবিবাহই ছিল অনুপস্থিতির প্রধান কারণ। এ ছাড়া পরীক্ষার প্রস্তুতির অভাব ও দারিদ্র্যও উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে উঠে আসে।

এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাতেও দেখা গেছে, দুই বছর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেও তাদের মধ্যে ২৩ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে পাবলিক পরীক্ষায় ফরম পূরণ করার পরও পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থী বাড়ছে। যেমন ২০২৫ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিনে মোট ১৯ হাজার ৭৫৯ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। এর আগের বছর প্রথম দিনে অনুপস্থিত ছিল ১৫ হাজার ২০৩ পরীক্ষার্থী।

৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে। বাকি ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন ফরম পূরণ করেনি। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৩৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। এক বছরে হারটি প্রায় ৬ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম প্রথম বর্ষে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে নিবন্ধন করেছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ৭৮ হাজার ২৬৯ জন পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে। ৬১ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি, যা মোট নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর ৪৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় একাদশ শ্রেণিতে (ভোকেশনাল) নিবন্ধন করেছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে মাত্র ৭৫ হাজার ১৯৭ জন পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে। অপরদিকে ৯০ হাজার ৩৪৫ জন ফরম পূরণ করেনি। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশই এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ।

নির্ধারিত ৬০ পণ্যে বাজেটের সুবিধা পাচ্ছেন না ক্রেতারা

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৬ এএম
আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম
নির্ধারিত ৬০ পণ্যে বাজেটের সুবিধা পাচ্ছেন না ক্রেতারা
ছবি: সংগৃহীত

মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে চলতি অর্থবছরের (২০২৬-২৭) জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেল, বীজসহ ৬০টি পণ্যের দাম কমার ঘোষণা দেন। খেজুর, জিরা, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, গোলমরিচের দাম কমাতেও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কমান। ৩০ জুন সংসদে বাজেট পাস হয়েছে। তবে বাজারে এসব পণ্যের দাম কমেনি। ক্রেতাদের ভাগ্যে জোটেনি দাম কমার সুফল। গতকাল বিভিন্ন বাজার ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, খেজুর, জিরা, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, গোলমরিচ, ধনিয়ার দাম কমাতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (রেগুলেটরি ডিউটি বা আরডি) ৫ শতাংশ থেকে শূন্য করা হয়। গতকাল পাইকারি বাজার থেকে শুরু করে খুচরা বাজারের বিক্রেতারা জানান, এক টাকাও কমেনি এসব মসলার দাম। বরং কাজুবাদামের দাম কেজিতে ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে।

চোরাকারবারির মাধ্যমেই দেশে বিভিন্ন মসলায় ভরে গেছে। আমদানি হচ্ছে না। তাহলে দাম কমবে কীভাবে? এ ব্যাপারে ঢাকার মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাফেজ হাজি মো. এনায়েত উল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘দুই বছর ধরে দেশে কোনো জিরা আমদানি হচ্ছে না। তাহলে সরকার শুল্ক পাবে কীভাবে? জিরায় সরকার শুল্ক নির্ধারণ করেছে ২৫০ টাকা, এলাচের কেজিতে ১ হাজার ৪০০ টাকা। অন্য মসলার জন্যও উচ্চ শুল্ক দিতে হয়। প্রয়োজনের তুলনায় এই শুল্ক অনেক বেশি। এ কারণেই চোরালানির মাধ্যমে দেশে এসব পণ্য আসছে। চাহিদার অর্ধেকও আমদানি হচ্ছে না। সিলেটসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে দেশে মসলা ঢুকছে। এ জন্য মসলার দাম কমছে না। কমবেও না। শুধু চোখ দেখানো আরডি কমালে হবে না। বাজেটে ভাঁওতাবাজি করা হয়েছে। সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ করতে হবে। বাজারে অভিযান চালাতে হবে। অন্যথায় এ অবস্থার অবসান হবে না।’ 

তার কথার সত্যতা জানতে বিভিন্ন বাজারে গেলে খুচরা বিক্রেতারা জানান, পাইকারিতে না কমলে খুচরা বাজারেও কমবে না দাম। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের লিটন বনাজী স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. মৃদুল খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোনো পণ্যের দাম কমেনি। তাহলে কম দামে বিক্রি করব কীভাবে? সব মসলাই আমদানি করা। তাই এসব মসলা আমদানি করার পর দেশে এলে দাম কমতে পারে। তখন আমরা কম দামে বিক্রি করতে পারব। আগের মতোই লবঙ্গের কেজি দেড় হাজার টাকা, দারুচিনি ৫২০, জিরা ৬০০, কিশমিশ ৮০০ থেকে ৯০০, গোলমরিচ ১ হাজার ৩০০ ও এলাচ সাড়ে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাজেটের পর এসব জিনিসের দাম না কমলেও কাজুবাদামের দাম কেজিতে বেড়েছে ১০০ টাকা পর্যন্ত। তাই দেড় হাজার টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।’ 

চোখে পড়বে না শুল্ক কমার সুফল

খেজুরে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) ৫ শতাংশ থেকে শূন্য করা হলেও দাম কমেনি এক টাকাও। আমদানিকারক থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতারা এ কথা জানান। বাংলাদেশ ফল আমদানিকারক সমিতির সদস্য মো. নাজিম উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘খেজুরে পাঁচ স্তরের শুল্ক আরোপ করে সরকার। এটা খুবই বেশি। পাঁচ কেজির মেডজুল খেজুরে সব মিলিয়ে শুল্ক দিতে হয় ২ হাজার টাকার বেশি। চলতি অর্থবছরে শুধু আরডি শূন্য করা হয়েছে। এটা ইতিবাচক। সরকার ভোক্তাদের বলবে শুল্ক কমানো হয়েছে। কিন্তু এর প্রভাব তেমন পড়বে না। কারণ আমদানি পর্যায়ে কেজিতে ১০ থেকে ১২ টাকা কমবে। ভোক্তা পর্যায়ে এটা চোখে পড়বে না। বিভিন্ন বাজারের খুচরা খেজুর বিক্রেতারাও জানান, দাম কমেনি। আগের দামেই বিক্রি করা হচ্ছে।’

এদিকে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, কৃষিপণ্যে করছাড়েরও ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী যেন দেশের প্রত্যেক ব্যক্তি ও পরিবারের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। 

গতকাল পর্যন্ত এসব পণ্যের দাম কমেনি। আগের মতোই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। গতকালও মিনিকেট চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি, আটাশ ৬০ থেকে ৬৫ ও মোটা চাল ৫০ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হয়। দেশি মসুর ডাল ১৬০ টাকা, আমদানি করা ডাল ১২০, ছোলা ৯০ থেকে ১০০, দুই কেজির প্যাকেট আটা ১২০ থেকে ১৩০, চিনি ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। আদার দাম ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি, পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৪৫, আলু ৩০, দেশি রসুন ১০০, চায়না রসুন ১৪০ টাকায় বিক্রি হয়। 

টাউন হল বাজারের মনির স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. আনোয়ার হোসেনসহ অন্য মুদি বিক্রেতারা খবরের কাগজকে বলেন, ‘বোরো ধানের মৌসুম গেল। বাজেট গেল। কোনো কিছুতেই কোনো পণ্যের দাম কমছে না। তাই আগের মতোই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এ সময় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার বাজেটে কিছু পণ্যের দাম কমার কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবে তো দেখলাম না কিছুর দাম কমল। বরং কাজুবাদামসহ অনেক কিছুর দাম বেড়েছে। বাজারে অভিযান চালাতে হবে। তা ছাড়া কমবে না কোনো কিছুর দাম।’ কারওয়ান বাজারের মায়ের দোয়া স্টোরের স্বত্বাধিকারী শাহ আলম খানও একই তথ্য জানান। 

বেড়েছে ব্রয়লার মুরগির দাম

গতকালও তেলাপিয়া মাছ আকারভেদে ২২০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি, পাঙাশ ২০০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। রুই, কাতল মাছও আগের মতো ৩৬০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি, চিংড়ি, কাজলি, ট্যাংরাসহ নদীর অন্য মাছ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে চাষের এসব মাছ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়। আগের মতো গতকালও সোনালি মুরগির কেজি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা হয়েছে। দেশি মুরগি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা, গরু মাংস ৮০০ ও খাসির মাংস ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা ও ডিম ১১০ থেকে ১২০ টাকা ডজন বিক্রি হয়।

পদ্মার চরে রক্তাক্ত আধিপত্যের লড়াই: আট মাসে ৮ খুন, আতঙ্কে চরবাসী

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ১০:৫২ এএম
আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৭ এএম
পদ্মার চরে রক্তাক্ত আধিপত্যের লড়াই: আট মাসে ৮ খুন, আতঙ্কে চরবাসী
ছবি: খবরের কাগজ

দেশের উত্তর-পশ্চিমে পদ্মার চরাঞ্চলে রক্তাক্ত আধিপত্যের লড়াই কোনো ভাবেই থামছেই না। বহু আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ অভিযান চালিয়ে এসব চরাঞ্চলকে সন্ত্রাসমুক্ত ঘোষণা করে। তবে বর্তমান চিত্র ভিন্ন। গত আট মাসে রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার সীমান্তঘেঁষা বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের মূলে রয়েছে বালুমহাল, চরের জমি, ফসল কাটা ও নদীপথে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর লড়াই। সহিংসতা না থামায় প্রতিনিয়ত চরম নিরাপত্তাহীনতা আর আতঙ্কে দিন কাটছে চরবাসীর।

গত শুক্রবার পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ও ভাঁড়ারা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী জোতকাকুরিয়া কলাবাগান চরে অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন মঞ্জু শেখ। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বালু উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ চলছিল। শুক্রবার দুপুরে উভয় পক্ষ নদীতে অবস্থান নিলে সংঘর্ষ বাধে। একপর্যায়ে গোলাগুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন মঞ্জু শেখ।

এর আগে ১৬ জুন নাটোরের লালপুর উপজেলার রাইটার চরের কাছে যাত্রীবাহী নৌকায় সশস্ত্র হামলায় সাহাবুল ইসলাম নিহত হন। আহত হন আরও একজন। ৯ জুন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চর জজিরায় বালুমহালের ব্যবস্থাপক আজিজুল হাকিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৮ মে বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের কালিদাসখালী চরে সশস্ত্র হামলায় নিহত হন স্বপন ব্যাপারী। হামলাকারীরা তার মরদেহও ট্রলারে তুলে নিয়ে যায়।

এরও আগে ৩ জানুয়ারি বাঘার পলাশী-ফতেপুর করালি নওশারার চরে নিজ বাড়িতে ঢুকে সোহেল রানাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত বছরের ২৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তের চৌদ্দহাজার চরে খড় কাটাকে কেন্দ্র করে গোলাগুলিতে নিহত হন আমান মণ্ডল ও নাজমুল হোসেন। পরদিন একই ঘটনার জেরে হবিরচর থেকে লিটন হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আধিপত্যের সংঘাতের ধারাবাহিকতা।

রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মো. শাহজাহান বলেন, পদ্মার চরাঞ্চলের সহিংসতার প্রধান কারণ বালু উত্তোলন, চরের জমির নিয়ন্ত্রণ ও নদীপথে চাঁদাবাজি। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে লিজ নেওয়া বালুমহালের নির্ধারিত সীমানা মানা হয় না। আবার প্রশাসন সীমানা নির্ধারণ করে দিলেও প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ তা মেনে নিতে চায় না। এসব বিরোধই শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ নেয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অপরাধ চক্রগুলো পদ্মার দুই পাড়েই সক্রিয়। একদিকে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা; অন্যদিকে কুষ্টিয়াকে কেন্দ্র করে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করে।

চরের কয়েকটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এলাকায় পুলিশি নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ায় নতুন নতুন সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রামবাসীর অভিযোগ, এখন দিনের বেলাতেই অস্ত্রধারীরা স্পিডবোটে নদীপথে টহল দেয়। সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ঘর থেকে বের হতে ভয় পান। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি চরের বাসিন্দা বলেন, ‘প্রায়ই গুলির শব্দ শুনি। কারও বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস নেই।’

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত বছরের ২৮ নভেম্বর নাটোর ও পাবনায় ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ নামে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই অভিযানে অন্তত ৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এরপরও অপরাধ কমেনি। সম্প্রতি পাবনার ঈশ্বরদীর লক্ষীকুণ্ডা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ওসিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য চরে অভিযান চালাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন বলে জানান ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান।

তিনি বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই চরে অবস্থান করেন না। তারা দূরের শহরে বসেই স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। তা ছাড়া বহু জেলার সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত দুর্গম চরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানও অপরাধীদের বড় সুবিধা দিচ্ছে। পুলিশ পৌঁছানোর আগেই তারা অন্য জেলায় পালিয়ে যায়।’

ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাঘা উপজেলার চরাঞ্চলে একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই আরেকটি সমন্বিত যৌথ অভিযানও পরিচালনা করা হবে।