হাত বাড়ালেই যেন মিলছে মরণনেশা ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে গেছে। চিহ্নিত মাদক স্পটের গণ্ডি পেরিয়ে এখন রাজধানীর অলিগলি, মহল্লা ও আবাসিক এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদকের কারবার।
সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মায়ানমারভিত্তিক ইয়াবা ট্যাবলেট মারাত্মক হারে ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামে। এ ছাড়া হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), সিসা, এলএসডিসহ আরও একাধিক কৃত্রিম মাদকেরও ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে বিভিন্ন এলাকায়।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চিহ্নিত মাদকের স্পটে কেনাবেচা ছাড়াও অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজ বা গ্রুপ খুলে মাদক বেচাকেনা চলছে। এমনই একটি চক্রের তিন সদস্যকে প্রায় ৬৬ কেজি সিসা, বিভিন্ন সরঞ্জামসহ গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে দুজনই ইরানি বংশোদ্ভূত সহোদর, যারা পারিবারিক ব্যবসার সূত্রে ঢাকায় বসবাস করে আসছিলেন। একই দিন টেকনাফ সীমান্ত এলাকা থেকে দুই কেজি ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ও একটি রাইফেল জব্দ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তার আগের দিন বুধবার টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় বিজিবির পৃথক দুটি অভিযানে ২ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুজনকে আটক করা হয়। এ ছাড়া গতকাল শুক্রবার পাকস্থলীর ভেতরে করে পাচারকালে ১ হাজার ৩২০ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির ‘সিটিটিসি’ ইউনিট।
ম কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দোকানের আড়ালে বা ভ্রাম্যমাণ ক্ষুদ্র দোকান, এমনকি হাঁটাচলার মাঝেই লেনদেন হচ্ছে ইয়াবা-গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। অনেকে পাকস্থলীর ভেতর, বিভিন্ন পণ্যের ভেতর, যানবাহনে কৌশলে লুকিয়ে বা মোবাইল ফোনের ব্যাটারির চেম্বারে করেও ইয়াবা বহন করছে। এমনকি ঢাকার কিছু এলাকায় ইয়াবা ও গাঁজা সেবন এখন অনেকটাই ‘ওপেন সিক্রেট’।
চিহ্নিত মাদক স্পট ও কারবারিদের তৎপরতা
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে সুনির্দিষ্টসংখ্যক কোনো মাদক স্পট নেই। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারিদের তৎপরতা অনুসারে মাদকের স্পটের বিভিন্ন সংখ্যা অনেকেই বলে থাকেন। সে হিসাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আটটি ক্রাইম জোনে বর্তমানে মাদক বেচাকেনার জন্য স্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ২৪৭টি স্থান। এ ছাড়া এসব মাদক কারবারের নেপথ্যে অন্তত ২৩১ জন ডিলার পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী এবং ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি মাদক কারবারি সক্রিয় রয়েছেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) হালনাগাদ পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার চারপাশের অন্তত ১০৫টি রুট দিয়ে প্রতিদিন ইয়াবা, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), হেরোইন ও ফেনসিডিলের মতো ভয়াবহ মাদক প্রবেশ করছে।এর মধ্যে সম্প্রতি মেরুল বাড্ডার কাঁচাবাজার এলাকায় মাদকের নতুন স্পট চোখে পড়েছে সাধারণ বাসিন্দাদের। বাড্ডা থানা ভবন থেকে মাত্র কয়েক শ মিটার দূরত্বে এই কাঁচাবাজার রোডে এখন অনেকটা প্রকাশ্যেই ইয়াবা বেচাকেনা চলছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী। স্থানীয় ওই ব্যক্তির দাবি, স্থানীয় পুলিশও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
অন্যদিকে সায়েদাবাদ জনপদের মোড় থেকে দয়াগঞ্জ সড়কের একটি রিকশা গ্যারেজ ঘিরে আরেকটি নতুন মাদক স্পটের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, জনপদের মোড় থেকে দয়াগঞ্জ সড়কের দিকে কিছুটা এগোলেই ডান পাশে সেই রিকশা গ্যারেজ। রিকশার গ্যারেজ হলেও এটি মূলত মাদকের আস্তানা। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, রিকশা গ্যারেজের আড়ালে এখানে ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজা কেনাবেচা চলে। এমনকি যাদের রিকশার চালক হিসেবে এখানে দেখা যায়, তাদের বেশির ভাগই মাদকের কারবার ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। তাদের সংশ্লিষ্ট থানার এলাকাভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মদদ দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। থানায় ফোন করে অভিযোগ জানানোর পরও এই মাদক স্পটটি বন্ধ হয়নি বলে জানান স্থানীয়রা।
এলাকাভিত্তিক স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে নাখালপাড়া রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশ মাদকের অন্যতম প্রধান ও উন্মুক্ত হটস্পট। অন্যদিকে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প ও টাউন হল এলাকা এখন মাদকের বড় স্পট হিসেবে পরিচিত। মিরপুর ও পল্লবীর বিভিন্ন বিহারি ক্যাম্প, আগারগাঁওয়ের বস্তি এলাকা মাদকের পুরোনো ও অন্যতম বড় স্পট। এ ছাড়া বাড্ডা, মহাখালী, তেজগাঁও, তুরাগ, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, ডেমরা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, গাবতলী-বাগবাড়ী, ফকিরাপুল কালভার্ট বস্তি, গোলাপবাগ, সিটি কলোনি এবং গোপীবাগ মেথরপট্টি রেললাইন এলাকাও মাদকের হটস্পট হিসেবে পরিচিত।
রাজধানীর সবচেয়ে কুখ্যাত তিন ‘মাদকের হাট’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকার অন্তত তিনটি মাদক স্পটকে অনেকটা মাদকের হাট হিসেবে ধরা হয়। ২৪ ঘণ্টাই খোলাবাজারের মতো বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা হয় এসব স্পটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝেমধ্যে অভিযানও চালায়, কিন্তু তার পরও চলছে মাদক কেনাবেচা। এই তিনটি হটস্পটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে–আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের বসবাস কেন্দ্র মোহাম্মদপুরের ‘জেনেভা ক্যাম্প’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি, এটি রাজধানীর সবচেয়ে ভয়াবহ মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট। ক্যাম্পের মুরগিপট্টি, বাবর রোড এবং হুমায়ুন রোড এলাকায় নারী ও শিশুদের ব্যবহার করে ইয়াবা-হেরোইন বিক্রি করা হয়। এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি মাদক-ছিনতাইকারী চক্র ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া পুলিশের ওপরও হামলা চালায়।
এদিকে কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে নাখালপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইন এলাকা আরেকটি ‘মাদকের বাজার’ হিসেবে পরিচিত। ভাসমান খুচরা বিক্রেতারা এখানে ব্যাপকভাবে সক্রিয়। পাশাপাশি রেললাইনের আশপাশে এখানে মাদকসেবীদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলাও বসে।
এ ছাড়া মিরপুর বিহারি ক্যাম্প আরেকটি অন্যতম প্রধান মাদক স্পট হিসেবে পরিচিত। এই ক্যাম্পগুলোতে রাতে হাঁকডাক ছেড়ে মাদক বিক্রি হয়। ঘনবসতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা খুব সহজেই পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপন করে।
যা বলছেন অপরাধ বিশেজ্ঞরা
মাদকের নেটওয়ার্ক অনেক শক্তিশালী ও উচ্চপর্যায়ের বলে মনে করেন অপরাধ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের এই অধ্যাপক গত শুক্রবার খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘মাদকের নেটওয়ার্ক অনেক উচ্চপর্যায়ের। মাদক চোরাচালান বন্ধ হয়ে গেলে সরকারিভাবে দায়িত্বশীল অনেকেরই নিয়মিত আয়ের উৎস কমে যাবে। অন্যদিকে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে একশ্রেণির প্রভাবশালী রাজনীতিক-ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাও মাদক কারবারে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। ফলে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মুখে মাদকবিরোধীর বড় কথা বললেও তাদের অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদক বিস্তারে কাজ করছে। মাদক চোরাচালান বন্ধ না হওয়ার পেছনে এগুলো বড় কারণ।’
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, মাদক চোরাচালানের রুট এবং কেনাবেচার চিহ্নিত কিছু স্পটের খবর বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেলেও সুনির্দিষ্টভাবে সেটি নির্ধারণ করা কঠিন। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের মাদকের এতটাই বিস্তার ঘটেছে যে, রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর প্রায় সব এলাকায় বা পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মাদকবিরোধী সামাজিক অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বাড়ানো খুব জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকিতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের যুক্ত করে সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ার মাধ্যমে মাদকবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় দেশের বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম অন্ধকারে ডুবে যাবে।’
মাদক থেকেই অধিকাংশ অপরাধের সূত্রপাত ঘটে বলে মনে করেন সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক। গতকাল তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাদক দেশের যুবসমাজকে ধ্বংসের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কারণ অধিকাংশ অপরাধের সূত্রপাত হয় মাদক থেকে। পাশাপাশি মাদক যেমন কর্মস্পৃহা কমিয়ে দিচ্ছে, তেমনি তরুণ সমাজের মেধা ধ্বংস করে দিচ্ছে, যা বৈজ্ঞানিকভাবেও স্বীকৃত। ফলে মাদকের ছোবলে আমাদের সম্ভাবনার একটি জাতি (জেনারেশন) পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। মুখে আমরা অনেকেই মাদকবিরোধী নানা রকম কথা বলে থাকি, কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর কোনো পদক্ষেপ এবং সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না।’
ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আগে একসময়ে পাড়া-মহল্লাগুলোতে বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং ব্যাপক কার্যকর ছিল। পুলিশের নিয়মিত টহল বা আনাগোনা দেখা যেত। এখন এগুলো খুব একটা চোখে পড়ে না। যদিও পুলিশকে আরও নানা কাজে যুক্ত থাকতে হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মাদক কারবারিসহ পেশাদার অপরাধীদের ভয়ভীতিও কমে গেছে। অনেকে প্রকাশ্যই মাদক কেনাবেচা বা সেবন করে যাচ্ছে। ফলে মাদকবিরোধী কঠোর অবস্থান আরও দৃশ্যমান করতে হবে। মাদকবিরোধী সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে নজরদারি বৃদ্ধি ও সাঁড়াশি অভিযান চালানো জরুরি।’
যা বলছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযান ডিএমপির নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে চলমান রয়েছে। আমাদের বিভিন্ন গোয়েন্দা দল থেকে যখনই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তখনই অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু তার পরও মাদকের বিস্তার কমছে না, বরং মারাত্মক হারে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এ জন্য সবার আগে সীমান্ত ‘সিল’ (বন্ধ) করার ব্যবস্থা করতে হবে। সীমান্তে টহল বৃদ্ধিসহ কঠোরভাবে যদি মাদক প্রবেশ বন্ধ করা যায়, তাহলে রাজধানী ঢাকাসহ অন্য সবখানেই মাদক কমে যাবে। এর বাইরেও মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাও জরুরি। মসজিদ, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবখানে মাদকের কুফল তুলে ধরতে হবে। সমাজে যাদের কথা সবাই মান্য করে, তাদের এ বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান ডিএমপির এই অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা।