‘সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডর সড়ক উন্নয়ন’ শিরোনামে গৃহীত মেগা প্রকল্পের মেয়াদ আট বছরে বেড়েছে পাঁচ বার, উন্নয়ন ব্যয় (ডিপিপি) ব্যয় বেড়েছে ৫১ শতাংশ। ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা ডিপিপি ব্যয় অনুমোদনের পর ২০২২ সালে ডিপিপি সংশোধন করা হয়। সেই ডিপিপি প্রস্তাব অপরিবর্তিত রেখে প্রকল্পের উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে ৭ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। সম্প্রতি বাংলাদেশের মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের এক নিরীক্ষায় দেখা গেছে, গত চার অর্থবছরে এই প্রকল্পে ২৮৪ কোটি ৯৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪১৪ টাকার অনিয়ম হয়েছে।
অনিয়ম আর অনিয়ম, কর্মকর্তারা চুপ
অডিট প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে, সাসেকের এই প্রকল্পে ২০২১-২২ অর্থবছরে আউটসোর্সিংয়ের মোট বিল থেকে আয়কর কর্তন না করায় ৪২ হাজার ১১৩ টাকা সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ঠিকাদারকে চুক্তির অতিরিক্ত মূল্য প্রদান, সর্বনিম্ন দরদাতাকে উপেক্ষা করে দ্বিতীয় দরদাতার সঙ্গে চুক্তি, ঠিকাদারদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক এবং আয়কর কম কর্তনসহ নানা অনিয়ম হয়েছে। এ অনিয়মে ২৪৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮৬ হাজার ৭৩ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে চুক্তির সাধারণ শর্ত লঙ্ঘন করে বিশেষ শর্তাবলি প্রণয়ন করা হয়েছে। পরে সে অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় করে ঠিকাদারদের বিল দেওয়ায় ২৫ লাখ ৮ হাজার ৮০৬ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ওই অর্থবছরে প্রকল্পে নিয়োজিত প্রকৌশলীদের জন্য অর্ধ-স্থায়ী আবাসন নির্মাণের কোনো কাজ সম্পাদন না করেই ঠিকাদার উধাও হয়ে গিয়েছিল। এ কাণ্ডে ৩ কোটি ৮০ লাখ ১৭ হাজার ৫৫৬ টাকার অনিয়ম হয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষায় দেখা গেছে, ঠিকাদারদের বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩৮ টাকা আদায় করা হয়নি। সেই অর্থবছরে সঞ্চিত ব্যাংক সুদ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি, যার পরিমাণ ৫ লাখ ১৫ হাজার ৭৭৮ টাকা। ভেরিয়েশন অনুমোদন ছাড়া প্রকল্পের খরচের জন্য নির্ধারিত অর্থ থেকে অতিরিক্ত ৪৫ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯২ টাকা ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে বিমা কাভারেজ করা হয়নি; এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১৬ হাজার ৫০০ টাকা।
প্রকৃত ব্যয়ের পরিবর্তে পরামর্শক, ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তির হারে আন্তর্জাতিক বিমান ভাড়ার বিল পরিশোধ করা হয়েছিল সেই বছর। এতে ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬১ হাজার ৯৬৭ টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঠিকাদারের বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর আদায় করা হয়নি ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩৮ টাকা। সঞ্চিত ব্যাংক সুদ থেকে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি ৫ লাখ ১৫ হাজার ৭৭৮ টাকা।
নির্মাণকাজের জন্য নির্ধারিত বিল থেকে ভেরিয়েশন অনুমোদন ছাড়াই ঠিকাদারকে ৪৫ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯২ টাকা অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করা হয়েছে। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে বিমা কাভারেজ করা হয়নি ১৬ হাজার ৫০০ টাকার। ঠিকাদার ও পরামর্শকদের বিমানযাত্রার বিলে ১১ কোটি ৬৬ লাখ ২০ হাজার ৪৮৩ টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত চার বছরে সাসেক প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মোট ১৯টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সময়মতো ব্রডশিট জবাব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বড় অঙ্কের আর্থিক আপত্তিগুলো দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত অবস্থায় ঝুলে আছে।
এ বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক এ কে রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে খবরের কাগজ। তিনি ফোন ধরেননি। রাজধানীর সড়ক ভবনে তার কার্যালয় ও প্রকল্প কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। প্রকল্পের অন্য কর্মকর্তারা অডিট আপত্তির বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ল ২০২৭ পর্যন্ত
সাসেক ঢাকা (কাঁচপুর)-সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ এবং উভয় পাশে পৃথক সার্ভিস লেন নির্মাণ করতে ‘সাপোর্ট’ প্রকল্পটির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্তের আলোকে এখন প্রকল্পের কাজ ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে।
২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন পায়। সে সময় ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই প্রকল্পের সামগ্রিক মেয়াদ দাঁড়িয়েছে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ মূল মেয়াদের তুলনায় প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধির হার এখন ৩০০ শতাংশ।
ভৌত অগ্রগতি এখনো ৫০ শতাংশের নিচেই
এই প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চার বছর পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। প্রকল্পের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সামগ্রিক ভৌত অগ্রগতি এখনো ৫০ শতাংশের নিচেই রয়ে গেছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, হবিগঞ্জ, সিলেট ও নরসিংদীর মতো জেলাগুলোতে ভূমি অধিগ্রহণের ধীরগতি মূল প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণকাজকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। প্রকল্পের সবচেয়ে ধীরগতি পরিলক্ষিত হয়েছে নরসিংদী জেলায়। সেখানে ১৫৮ দশমিক শূন্য ৩ একর ভূমির মধ্যে মাত্র ৩৮ দশমিক ৩৫ একর জমি হস্তান্তর হওয়ায় ভৌত অগ্রগতির হার মাত্র ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশে আটকে আছে।
মাঠপর্যায়ের তথ্য ও সরকারের বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জেলা প্রশাসন ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগের দীর্ঘসূত্রতা এবং মাঠপর্যায়ে যৌথ জরিপ পরিচালনায় অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ হয়েছে। খতিয়ান ও জমির মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতা, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দেওয়ানি মামলা এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি বিরোধও জমি অধিগ্রহণে জটিলতার সৃষ্টি করেছে। এসব কারণে দফায় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে।
নতুন ‘সেফটি ইন্টারভেনশন’ পরিকল্পনা
ব্যয় সীমাবদ্ধ রাখতে প্রস্তাবিত নকশা থেকে ২২টি ওভারপাস ও ৭টি আন্ডারপাসসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কাঠামো বাদ দিয়েছিল প্রকল্প অফিস। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে মহাসড়কটির ভবিষ্যৎ ট্রাফিক গতি এবং সার্বিক সড়ক নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ‘রোড সেফটি অডিট’ প্রতিবেদনে বর্তমান নকশায় বেশ কিছু গুরুতর ‘ব্ল্যাক স্পট’ ও নিরাপত্তাঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। চিহ্নিত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে–রাস্তা বা মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে কোনো উড়াল সড়ক বা আন্ডারপাস না রাখা; সার্ভিস লেনের ধীরগতির যানবাহন মূল সড়কের দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে মিশে যাওয়া; মূল রাস্তা থেকে কোনো লেনে ঢোকা বা বেরিয়ে যাওয়ার সময় গতি কমাতে আলাদা লেন না থাকা; ত্রুটিপূর্ণ ফুটওভারব্রিজ।
এখন মহাসড়কের স্থায়িত্ব ও ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন করে ‘সেফটি ইন্টারভেনশন’ বা নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সড়ক অবকাঠামো প্রকল্পের নকশায় বিদ্যমান দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এই সংশোধনী আনা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি
আইএমইডির নিরীক্ষা প্রতিবেদন বলছে, অনুমোদিত নকশা সাইটে পৌঁছানোর আগে চেইনেজে (সাইটে) কাজ স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন ঠিকাদার। দাপ্তরিক অনুমোদনের এই বর্ধিত ‘রেসপন্স টাইম’ প্রকল্পের সামগ্রিক মেয়াদ ও ব্যয় উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করছে।
সাত বছর আগে করা প্রাথমিক সমীক্ষায় ভূগর্ভস্থ মাটির বৈশিষ্ট্য সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয়নি। এর ফলে বাস্তবে সড়ক অ্যালাইনমেন্টে ক্ষতিকর মাটি ও নরম কাদার উপস্থিতি ধরা পড়েছে। তাই মাঝপথেই নকশা সংশোধন করতে হচ্ছে।
২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ঠিকাদারদের অভ্যন্তরীণ আর্থিক তারল্যসংকট এবং নগদ অর্থের প্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়ায় নির্মাণকাজের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ঋণচুক্তি অনুযায়ী, দরপত্র প্রক্রিয়ার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে, বিশেষ করে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এডিবির পূর্ব অনুমোদন বা ‘নো অবজেকশন’ গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই অনুমোদনের জন্য এডিবির দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া প্রকল্পের সময়সীমাকে প্রলম্বিত করেছে। এ ছাড়া এডিবির ক্রয় বিভাগ বারবার বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার ফলে সময়ক্ষেপণ হয়েছে। উচ্চমূল্যের ক্রয়ের ক্ষেত্রে এডিবির সদর দপ্তর সময়ক্ষেপণ করেছে বলে ব্যাখ্যা দিয়েছে আইএমইডি।
ক্রয় প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে ঠিকাদারদের জমা দেওয়া দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ বারবার বাড়াতে হয়েছে। এডিবি গাইডলাইনের স্বাভাবিক নিয়ম ভঙ্গ করে এই মেয়াদ ১২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩৯৫ দিন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।