বিমানের হ্যাঙ্গারের মতো বিশাল ভেন্যুর বাইরে জড়ো হয়েছেন অসংখ্য জেন জি তরুণ-তরুণী। যাদের কেউ এসেছেন অফিস থেকে, কেউবা কলেজ থেকে। প্রবেশের আগে কর্মীরা কিউআর কোড স্ক্যান করছেন, হাতে পরিয়ে দিচ্ছেন রিস্টব্যান্ড। বন্ধুরা সেলফি তুলছেন, অপেক্ষা করছেন দরজা খোলার। সন্ধ্যা নামতেই প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ ভেতরে প্রবেশ করেন। তবে ঢুকেই তারা জুতা খুলে মেঝেতে পা গুটিয়ে বসে পড়েন। আলো নিভে আসে। সামনের সারিতে এক তরুণী মা কাঁধে শিশুকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন সংগীত শুরু হওয়ার।
কিন্তু স্পিকারে ইলেকট্রনিক ডান্স মিউজিকের পরিবর্তে শুরু হয় শতাব্দীপ্রাচীন হিন্দু ভক্তিগীতি–ভজন, যা সাধারণত মন্দির বা ধর্মীয় শোভাযাত্রায় শোনা যায়। সুরের তালে তালে দর্শকদের অনেকেই উঠে দাঁড়ায়। হাততালি, ভজন গান আর নাচের তালে পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে উচ্ছ্বাসময়। কোথাও মাদকের ছিটেফোঁটাও নেই। আয়োজকরাই অনুষ্ঠানস্থলে মদ ও মাদক নিষিদ্ধ করেছেন।
ভারতে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই নতুন ধারার নাম ‘ভজন ক্লাবিং’। এটি এমন এক আয়োজন, যেখানে তরুণরা সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত পরিবেশে ভক্তিগীতির মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করেন। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে জেন জি প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ‘সোবার কিউরিয়াস’ বা ‘কফি রেভ’-এর মতো প্রবণতারই ভারতীয় সংস্করণ হিসেবে দেখা হচ্ছে একে।
দুই ঘণ্টা ধরে গান, কীর্তন ও সমবেত ভজন শেষে দর্শকরা হাসিমুখে দল বেঁধে বেরিয়ে যান। ২৫ বছর বয়সী জিল ভিরার জন্য এটি ছিল প্রথম ‘ভজন ক্লাবিং’ অনুষ্ঠান। তিনি বলেন, ‘এমন কনসার্ট মানুষকে ঈশ্বরের আরও কাছে নিয়ে যায়। এটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা ছিল।’
তিনি বলেন, ‘অন্য কনসার্টে ধূমপান বা মদ্যপান খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এখানে মাখনের ঘোল পান করাটাই যেন আমার কাছে মদের বিকল্প ছিল।’
ভজন নতুন কিছু নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতজুড়ে মন্দির, ধর্মীয় শোভাযাত্রা ও সামাজিক আয়োজনে বিনামূল্যে ভজন পরিবেশিত হয়ে আসছে। নতুনত্ব হলো এর উপস্থাপনা। এখন বড় বড় ভেন্যুতে টিকিট কেটে এসব অনুষ্ঠান দেখতে হয়। সেখানে থাকে ধোঁয়ার বিশেষ প্রভাব, বিশাল এলইডি স্ক্রিন ও আধুনিক কনসার্টের মতো আয়োজন।
এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছেন সংগীতশিল্পী জুটি ব্যাকস্টেজ সিবলিংস। ছোটবেলা থেকেই তারা ভজন গেয়ে আসছেন। এখন ভারতের বিভিন্ন শহরে তারা আধুনিক উপস্থাপনায় প্রাচীন ভজন পরিবেশন করছেন। এই জুটির সদস্য রাঘব আগারওয়াল বলেন, ‘মদ্যপান আর ক্লাবিং এক জিনিস নয়। মদ্যপান মানে নেশাগ্রস্ত হওয়া, আর ক্লাবিং মানে আনন্দ উপভোগ করা।’ তার বোন ও সহশিল্পী প্রাচি আগারওয়াল বলেন, ‘এখানে দাদা-দাদি, বাবা-মা, বন্ধু বা সঙ্গী–সবাইকে নিয়ে আসা যায়।’
এই প্রবণতা এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, ভারতের অন্যতম প্রাচীন সংগীত প্রতিষ্ঠান সারেগামাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব অনুষ্ঠানের ভিডিও লাখ লাখ বার দেখা হয়েছে।
সমর্থকদের মতে, এসব আয়োজন কঠোর ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বা মন্দিরকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই মানুষের কাছে ভক্তিকে সহজ ও গ্রহণযোগ্য করে তুলছে। সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ, এতে আধ্যাত্মিকতা ধীরে ধীরে প্রদর্শনী ও বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হচ্ছে।
ভারতের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অর্থনীতির আকার ২০২৫ সালে প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলার ছিল, যা আগামী দশকে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতারা, এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ভজনের মর্যাদা ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ন রেখে জেন জি যেভাবে এটিকে নিজেদের জীবনযাত্রার অংশ করে তুলেছে, তা সত্যিই আনন্দের।
আয়োজক নিকুঞ্জ গুপ্ত জানান, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগই কলেজপড়ুয়া, সদ্য স্নাতক বা কর্মজীবনের শুরুতে থাকা তরুণ। তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন প্রচণ্ড মানসিক চাপ ও উদ্বেগে ভুগছে। এখানে এসে তারা স্বস্তি অনুভব করে।’ সূত্র: সিএনএন