প্রকৃতি যেন আর আগের মতো নেই। ঋতুর স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে একের পর এক তাপপ্রবাহে পুড়ছে ইউরোপ। জুলাই মাসের শুরুতেই রেকর্ডভাঙা দুটি তাপপ্রবাহ নতুন করে জানিয়ে দিল, জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়—এটি এখন বর্তমানের নির্মম বাস্তবতা। মে মাসের অস্বাভাবিক গরমের পর জুনেও একের পর এক তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে। জাতিসংঘের আবহাওয়া সংস্থা একে ইউরোপজুড়ে ‘অসাধারণ’ আবহাওয়াগত পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অধিদপ্তর মেট অফিসের প্রধান বিজ্ঞানী অধ্যাপক স্টিফেন বেলচার বলেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের তাপপ্রবাহ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ঘন ঘন এবং তীব্র হয়ে উঠছে।
মে ও জুন মাসজুড়ে যুক্তরাজ্যের গড় তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। দক্ষিণ ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ ওয়েলসে তাপপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হলেও দেশের প্রায় কোনো এলাকাই এর বাইরে ছিল না।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নরফোকের লিংউডে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর মাধ্যমে ১৯৫৭ সালে স্থাপিত এবং ১৯৭৬ সালে সমতা পাওয়া জুন মাসের আগের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে যায়।
রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিজ্ঞানী অধ্যাপক এড হকিন্স বলেন, সাধারণত তাপমাত্রার রেকর্ড খুব সামান্য ব্যবধানে ভাঙে। কিন্তু এবার কয়েক ডিগ্রির ব্যবধানে রেকর্ড ভেঙে যাওয়াটা সত্যিই ব্যতিক্রমী। এর আগেও মে মাসে একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল।
দিনের দাবদাহ থেকে বাঁচার আশায় মানুষ যখন রাতের অপেক্ষায় থাকে, তখনও মিলছে না স্বস্তি। বরং রাতের গরম আর ভ্যাপসা আবহাওয়া হয়ে উঠছে আরও ক্লান্তিকর। উচ্চ আর্দ্রতার কারণে ঘামের মাধ্যমে শরীর স্বাভাবিকভাবে তাপ বের করে দিতে পারছে না, ফলে তাপপ্রবাহের প্রভাব আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে ঘুমহীন রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন লাখো মানুষ। কার্ডিফে ২৪ জুন রাত থেকে ২৫ জুন ভোর পর্যন্ত তাপমাত্রা ২৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি—যা যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে জুন মাসের সবচেয়ে উষ্ণ রাত হিসেবে রেকর্ড হয়েছে।
এদিকে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের অধিকাংশ এলাকাই অন্তত একটি ‘ট্রপিক্যাল নাইট’ বা এমন রাতের অভিজ্ঞতা পেয়েছে, যখন সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামে না। অতীতে যুক্তরাজ্যে এমন ঘটনা ছিল অত্যন্ত বিরল।
এড হকিন্সের ভাষায়, “বিশ্বের গড় তাপমাত্রা যত বাড়বে, ট্রপিক্যাল নাইটও তত বাড়বে।”
যুক্তরাজ্যে তীব্র গরমের জন্য দায়ী একই ‘হিট ডোম’ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ সৃষ্টি করেছে।
জার্মানির আবহাওয়া সংস্থা এই তাপপ্রবাহকে “ইতিহাসে স্থান পাওয়ার মতো ঘটনা” বলে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্সের আবহাওয়া সংস্থা একে “ব্যতিক্রমী” ও “ঐতিহাসিক” হিসেবে বর্ণনা করেছে।
পশ্চিম, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের এক ডজনের বেশি দেশে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড গড়েছে। অনেক স্থানে আগের রেকর্ড ছাড়িয়েছে দুই থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস। কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রিও অতিক্রম করেছে। ফ্রান্স ও স্পেন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ জুন মাস পার করেছে।
জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের স্পষ্ট প্রভাব। তাদের মতে, ইউরোপ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আরও দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। তুষার ও বরফ দ্রুত গলে যাওয়া, বায়ুদূষণকারী সূক্ষ্ম কণা কমে যাওয়া এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠে বেশি তাপ আটকে থাকার কারণেই এ অঞ্চলে উষ্ণায়নের গতি বেড়েছে।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ুমণ্ডলের প্রবাহে পরিবর্তন ঘটছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে, যা তাপপ্রবাহ সৃষ্টিকারী উচ্চচাপ বলয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
এ গ্রীষ্মে ইউরোপের সমুদ্রগুলোর পানিও অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যের উপকূলবর্তী এলাকায় সামুদ্রিক তাপপ্রবাহও আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি বাতাসের তুলনায় ধীরে ঠান্ডা হয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্র উষ্ণ থাকলে স্থলভাগে শীতল সমুদ্রবাতাসের প্রভাব কমে যায় এবং ভবিষ্যতের তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় জুন মাসের তাপপ্রবাহ আগের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয়ে উঠছে। তাদের আশঙ্কা, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে গরম আরও বাড়বে। কয়েক দশক আগেও যুক্তরাজ্যে জুন মাসে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা খুবই বিরল ছিল। এখন সেটিই প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে। যদিও প্রতি বছর আগের বছরের চেয়ে বেশি গরম হবে—এমন নয়। তবে কার্বন নিঃসরণ কমানো না গেলে আগামী দিনে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের গ্রীষ্ম আরও উষ্ণ হবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
বিবিসি/এসএন