একটি ছোট্ট ঘরে সন্ধ্যা নামে। চুলায় ভাতের ঘ্রাণ, শিশুর হাসি আর কাজ থেকে ফিরে আসা একজন মানুষের ক্লান্ত মুখে স্বস্তির ছাপ–এই দৃশ্যটাই হয়তো একটি পরিবারের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা। কিন্তু এই সাধারণ দৃশ্যের পেছনে আছে একটি গভীর দায়িত্ব, যাকে ইসলাম শুধু সামাজিক কর্তব্য নয়, বরং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয় বলে ঘোষণা করেছে। আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, ভরণপোষণের প্রশ্ন এলে অবহেলার চাদরে ঢাকা থাকে। কেউ বলেন, আমি তো রোজগার করছি, এটাই তো যথেষ্ট। কেউ আবার সংসারের খরচ নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে প্রতিদিন তর্ক করেন, যেন স্ত্রী-সন্তানের খাবার-পোশাক কোনো অনুগ্রহ, অধিকার নয়। ইসলাম এই ভুল ধারণাটি ভেঙে দেয় খুব স্পষ্টভাবে।
আল্লাহতায়ালা সুরা বাকারায় বলেন, সন্তানের বাবার ওপর মায়েদের খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করা ন্যায়সংগতভাবে আবশ্যক। কোনো ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপানো হয় না। (সুরা বাকারা, ২৩৩)। এই একটি আয়াতেই ইসলাম পরিবারের অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল নীতি বলে দিয়েছে। প্রথমত, স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ পুরুষের ওপর ফরজ, এটি কোনো ঐচ্ছিক উদারতা নয়। দ্বিতীয়ত, এই দায়িত্ব হবে সামর্থ্য অনুযায়ী কাউকে তার সক্ষমতার বাইরে চাপ দেওয়া হবে না। সুরা তালাকে আরও বলা হয়েছে, তোমরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে থাকো, সেখানেই তাদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করো... সচ্ছল ব্যক্তি তার সচ্ছলতা অনুযায়ী ব্যয় করবে, আর যার রিজিক সীমিত, সে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকেই ব্যয় করবে। (সুরা তালাক, ৬-৭)
কী অসাধারণ ভারসাম্য! আল্লাহ এখানে কোনো নির্দিষ্ট টাকার অঙ্ক বলে দেননি। বরং একটি নীতি দিয়েছেন–যার যেমন সামর্থ্য, সে তেমন দেবে। ধনী ব্যক্তি কৃপণতা করতে পারবে না, আর দরিদ্র ব্যক্তিকে অসম্ভব বোঝা বহন করতে হবে না।
একদিন এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, স্ত্রীর ওপর স্বামীর কী অধিকার? তিনি উত্তরে বললেন, তুমি নিজে যা খাও, তাকেও তাই খাওয়াবে; নিজে যা পরো, তাকেও তাই পরাবে। মুখে আঘাত করবে না এবং কুৎসিত কথা বলবে না। (আবু দাউদ, ২১৪২)। এই হাদিস থেকেই বোঝা যায়, ভরণপোষণ মানে শুধু খাবার-পোশাক দেওয়া নয়, এটি মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে দেওয়া। কেউ যদি স্ত্রীকে খাবার দেয় কিন্তু প্রতিটি লোকমার সঙ্গে অপমান জুড়ে দেয়, তাহলে সে নাফাকাহর প্রকৃত চেতনা পূরণ করল না। আরেকটি অসাধারণ ঘটনা আমাদের শেখায় কতটা গুরুত্বের সঙ্গে ইসলাম এ বিষয়টি দেখে। হিন্দ বিনতে উতবা (রা.) নবিজির কাছে অভিযোগ করলেন, তার স্বামী আবু সুফিয়ান কৃপণ, পর্যাপ্ত খরচ দেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার ও তোমার সন্তানদের জন্য যা ন্যায়সংগতভাবে যথেষ্ট, তা গ্রহণ করো। (বুখারি, ৫৩৬৪)।
এই একটি ঘটনা থেকেই স্পষ্ট ভরণপোষণ না দেওয়া এত গুরুতর বিষয় যে, নবিজি স্ত্রীকে স্বামীর অগোচরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। এটি কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়। পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনকে নবিজি (সা.) নিজের চরিত্রের মাপকাঠি বানিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সে উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম এবং আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। (তিরমিজি, ৩৮৯৫; ইবনে মাজাহ, ১৯৭৭)। এখানে একটা গভীর বার্তা আছে। আমরা প্রায়ই বাইরের মানুষের কাছে ভালো হওয়ার চেষ্টা করি, অথচ ঘরের মানুষের প্রতি অবহেলা করি। নবিজি (সা.) শিখিয়েছেন, সবচেয়ে বড় চরিত্র পরীক্ষা হয় ঘরের ভেতরে, যেখানে কেউ দেখছে না, যেখানে প্রশংসার আশা নেই।
আমাদের অনেকেই মনে করেন, সংসারের খরচ চালানো একটা বোঝা, একটা দায়। ইসলাম এই দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তুমি যা ব্যয় করো তোমার পরিবারের ওপর, তা-ও সদকাহ (দান) হিসেবে গণ্য হবে। (বুখারি, ৫৫)। ভাবুন একবার, সকালে অফিসে যাওয়ার আগে স্ত্রীর হাতে বাজারের টাকা দেওয়া, সন্তানের স্কুলের বেতন পরিশোধ করা এই সাধারণ কাজগুলোই আল্লাহর কাছে সদকার সমান সওয়াব নিয়ে আসে! এর চেয়ে বড় প্রেরণা একজন উপার্জনকারীর জন্য আর কী হতে পারে?
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, একজন ব্যক্তির ব্যয় করা দিনারের মধ্যে সর্বোত্তম দিনার হলো সেটি, যা সে তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে (মুসলিম, ৯৯৪)। অর্থাৎ মসজিদে দান করা, গরিবকে সাহায্য করা–এসবের পাশাপাশি নিজের সন্তানের দুধের টাকা দেওয়াটাও সমান মর্যাদার আমল। কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন কেন এই দায়িত্বটি বিশেষভাবে পুরুষের ওপর? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইসলামের সামগ্রিক ন্যায়বিচারের কাঠামোয়। ইসলাম নারীকে দিয়েছে সন্তান জন্মদান ও স্তন্যদানের শারীরিক ও মানসিক দায়িত্ব এমন একটি দায়িত্ব, যা কোনো পুরুষ বহন করতে পারে না। গর্ভধারণ, প্রসব, সন্তান পালনের প্রথম বছরগুলোর শারীরিক ক্ষয় এসব নারীর জীবনে এমন একটি সময় তৈরি করে, যখন তার অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
ইসলাম এই বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়েছে এবং বিনিময়ে পুরুষের ওপর অর্থনৈতিক দায়িত্ব দিয়ে একটি ভারসাম্য তৈরি করেছে। এর সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসলামে স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ, উপার্জন বা উত্তরাধিকার সম্পূর্ণভাবে তার একান্ত মালিকানায় থাকে। স্বামী তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না, এমনকি স্ত্রী যদি স্বামীর চেয়েও ধনী হন, তবু স্বামীর ভরণপোষণের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেই। এটি প্রকৃতপক্ষে নারীর জন্য একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা তার নিজের সঞ্চয় তার নিজের থাকে, সংসারের খরচ চালানোর দায়িত্ব নয়।
বাংলাদেশের সমাজে আমরা প্রায়ই দুটি বিপরীত চিত্র দেখি। একদিকে এমন পুরুষ আছেন, যারা সামান্য রোজগার থেকেও পরিবারের জন্য সর্বোচ্চটা দিয়ে দেন, নিজে কষ্ট করেন তবু সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চান। অন্যদিকে এমন পুরুষও আছেন, যারা যথেষ্ট রোজগার করেও স্ত্রী-সন্তানকে অবহেলা করেন, নিজের শখ-আহ্লাদে খরচ করেন অথচ সংসারের প্রয়োজনে কৃপণতা দেখান। এই দ্বিতীয় চিত্রটি ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন যে এই অবহেলাকে তিনি গুনাহের মাপকাঠি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পরিবারের ভরণপোষণে কৃপণতা করে, সে নিজের আমানতের খেয়ানত করছে।
লেখক: প্রধান শিক্ষক, তাহফিজুল কুরআন মাদরাসা, ঢাকা