পঞ্চম শ্রেণি শেষ করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই বাংলা ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে নির্ধারিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ইংরেজির অবস্থা কী? শ্রেণিকক্ষে আনন্দদায়ক ও কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতির অভাব। শিক্ষার্থীরা দিন দিন মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে তাদের মধ্যে বিশ্লেষণমূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা গড়ে উঠছে না। প্রাথমিক স্তরের এই বড় ঘাটতি পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।...
শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নাকি নতুন সরকারের বাজেট তৈরি হয়েছে! প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, আনন্দময় ও বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে; যেখানে স্কাউট, গার্লস গাইড, বিএনসিসির মতো কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বিদেশি ভাষাও শেখার সুযোগ পাবেন। এমতাবস্তায় প্রশ্ন আসে–শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখা জরুরি কি না। এমন প্রশ্নে ৭২ শতাংশ মানুষ মনে করেন শিক্ষার্থীদের ভাষা শেখা জরুরি। দেশের শিক্ষাবিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পত্রিকা দৈনিক শিক্ষাডটকমের এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এদিকে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। পঞ্চম শ্রেণি শেষ করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই বাংলা ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে নির্ধারিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ১৪ জুন রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ শিক্ষা খাত বিশ্লেষণ (ইএসএ) ২০২৬’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের যাচাইকরণ কর্মশালায় বাংলাদেশ সরকার, ইউনিসেফ এবং গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন (জিপিই)-এর সহযোগিতায় আয়োজিত কর্মশালায় শিক্ষা খাতের বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পঞ্চম শ্রেণির প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলায় এবং ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে তাদের শ্রেণি উপযোগী ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ইংরেজির অবস্থা কী? সেটি নিয়ে কথা হয়নি। শ্রেণিকক্ষে আনন্দদায়ক ও কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতির অভাব এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের কারণে শিক্ষার্থীরা দিন দিন মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে তাদের মধ্যে বিশ্লেষণমূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা গড়ে উঠছে না। শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক স্তরের এই বড় ঘাটতি পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন ভর্তির দাবি করা হলেও এখনো প্রায় ১০ লাখ শিশু প্রাথমিক স্তরে বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ লাখ। প্রতিবন্ধী শিশু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশু এবং দুর্গম ও প্রান্তিক এলাকার শিশুরাই সবচেয়ে বেশি শিক্ষাবঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর সঙ্গে আরেকটি সমস্যা, যেটি শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন এভাবে–‘অভিভাবকরা চান জিপিএ-৫; কিন্তু শিক্ষার্থীরা কিছু শিখল কি না, সেটি দেখতে চান না।’ জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠার কারণে মূল শিখনফল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। আমরা মনে করি, এখানে রাষ্ট্রকে যা করতে হবে শিক্ষার্থীরা জিপিএ-৫ পেলেই যেন সবাই কোনো ধরনের সন্দেহ ছাড়া বুঝতে পারে যে, ওই শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিষয়ে এবং শ্রেণি উপযোগী দক্ষতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এটি নিয়ে সমালোচনা, অভিভাবকদের দোষ দেওয়া আর এসব চিন্তা না করে নতুন নতুন কথা বলা এবং প্রজেক্ট চালু করলে এ ঘটনাই ঘটতে থাকবে। জিপিএ-৫ পেলে যেন উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বুঝতে পারে যে তাদের আর পরীক্ষা নেওয়ার দরকার নেই। সরকারকে এসব জায়গায় গভীরভাবে কাজ করতে হবে এবং এটি সবচেয়ে বড় কাজগুলোর মধ্যে একটি। এসব দিকে চিন্তা না দিয়ে অন্য সব আশার কথা বলা হলে আমাদের মনে সন্দেহ তো জাগবেই, কারণ ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে তো ভয় পাবেই!
আমরা স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি শিক্ষার কোনো সুরাহা করতে পারিনি। এর ব্যাকগ্রাউন্ড কিন্তু পাকিস্তানের ২৪ বছর এবং তারও পূর্বে ব্রিটিশ শাসনের সময়ও ইংরেজির সঙ্গে আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পরিচিত ছিলেন। তার পরও আমরা কিন্তু পার্শ্ববর্তী অনেক দেশ থেকে ইংরেজি ব্যবহারে এবং আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিযোগিতায় এখনো অনেক পিছিয়ে। ইংরেজি ভাষা শেখানো চলে গেছে বহুধাবিভক্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বেকার ও অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তিদের কাছে। তারা যে যেভাবে বুঝতেছেন এবং পারছেন, তিনি সেভাবে ইংরেজি পড়িয়ে যাচ্ছেন। কেউ বলছেন উচ্চারণ শিখতে হবে, কেউ বলছেন প্রিপজিশনের লিখিত বই পৃথিবীর সেরা আর বাকিরা গ্রামার কীভাবে আয়ত্ত করা যায়, সহজে মনে রাখা যায় ইত্যাদি ইত্যাদি বই ও আলোচনা নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে অত্যন্ত সরব। এমতাবস্থায় সরকার বৈশ্বিক চাহিদার কথা চিন্তা করে তৃতীয় আরেকটি ভাষা শেখানোর কথা বলছে। সরকার যখন বলে তৃতীয় ভাষা হিসেবে নতুন একটি ভাষা সংযোজন করা হবে, তখন ভয় হয় সেই ব্যবসা আবার কীভাবে চলবে? বিদেশি ভাষা বলতে এখন আরবি, চাইনিজ (মান্দারিন) আর জাপানিজ, ফ্রেন্স ভাষাই বেশি যুক্তিযুক্ত। প্রশ্ন হচ্ছে–সরকার সেটি কীভাবে করবে বা করার চিন্তা করছে? প্রশ্ন করা হলে বলা হবে এ নিয়ে সরকারের ব্যাপক পরিকল্পনা আছে, কিন্তু সেই ব্যাপক পরিকল্পনা কী তা আমরা কখনো জানতে পারব না, একসময় দেখব বিশাল এক প্রজেক্ট হাজির করা হবে। কিন্তু তাতে ভাষা শেখার যে কিছুই হয় না, সেটি আর দ্বিতীয়বার দেখার বা প্রশ্ন করার অবকাশ আর কারোর থাকে না।
আমরা তো ইংরেজি ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্যই বুঝতে পারছি না, আর তাই ইংরেজি শেখাচ্ছিও না। সেটিকে পড়ানো হচ্ছে অন্যান্য বিষয়ের মতো। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীদের তৃতীয় কোনো ভাষা শেখানোর চেষ্টা করা হলে, বিশেষ করে সরকারি পর্যায়ে চালু করা হলে শিক্ষার্থীরা না শিখবে শিক্ষার মৌলিক বিষয়গুলো, যেমন–বিজ্ঞান, গণিত, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি না শিখবে কোনো ভাষা। ভাষা শেখা তো দূরের কথা, ১০-১২ বছর সময় নষ্ট করে কেউ কেউ দু-একটি অক্ষর আর শব্দ হয়তো শিখবে, ইংরেজির যে অবস্থা ইংরেজির এত বিশাল ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা সত্ত্বেও এটি ৭৫ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত চলছে আমাদের দেশে, তারও আগে ব্রিটিশ আমলেও ইংরেজির সঙ্গে এ দেশের মানুষের পরিচয় ছিল, তারপর ইংরেজির কিছু নিয়ম শিখছে যারা বহু বছর, এই ভাষা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে আর বাকিরা অক্ষর আর কিছু শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। এর ব্যবহার কেউ অন্তত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ইংরেজি পড়ানো থেকে শেখেনি। যারা শিখছেন তারা শিখছেন বেসরকারি কোনো ব্যবস্থায় কিংবা নিজ উদ্যোগে। তৃতীয় ভাষা যার প্রয়োগ, পরিচিতি কিংবা চারপাশে কেউ নেই এমতাবস্থায় তারা এতটুকুও শিখবে কি না সন্দেহ! আর এবারকার বাজেটের অর্থ দিয়েই কি তৃতীয় ভাষা শেখানোর কাজ শুরু হবে, সেটিও স্পষ্ট নয়।
লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)
[email protected]


