তীর্থযাত্রীদের সবাই জাতি, নাগরিকত্ব এবং সামাজিক অবস্থাননির্বিশেষে একই ধরনের বস্ত্র পরিধানের মধ্যদিয়ে ইসলামের মানবিক মর্যাদা এবং সম্মিলিত ভ্রাতৃত্বের যে আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, তার পক্ষান্তরে অভিবাসী শ্রমিকদের তীর্থযাত্রায় অর্থনীতিতে যে বিশাল অবদান রয়েছে, তা দুঃখজনকভাবে এসব শোষণের জন্য, অকথিত এবং অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র হিসেবে সরকারের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক অভিবাসী বাংলাদেশির মানবমর্যাদা রক্ষা করা।...

হজ ইসলাম ধর্মের পাঁচটি বাধ্যতামূলক স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম। শারীরিক এবং আর্থিকভাবে সমর্থ যেকোনো মুসলমানের জন্য হজ জীবনে অন্তত একবার পালন করা ফরজ। মানবজীবনে হজের তাৎপর্য কী তা হজের মূল ধাপগুলো পালন করার মধ্য থেকেই পরিষ্কারভাবে আমাদের মননশীল চিন্তামগ্নতায় ধরা পড়ে। ওমরাহ হজের মূল ছয়টি ধাপগুলো হলো: ১. ইহরাম বাধা; ২. মিনায় আগমন; ৩. আরাফাতে অবস্থান; ৪, মুজদালিফায় রাত্রি যাপন; ৫. জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা; ৬. তাওয়াফ ও সাই। প্রতিটি ধাপ পালনের তাৎপর্য কেবলমাত্র অনুচিন্তনের মাধ্যমেই একজন মুসলমান উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে।
ইহরাম বাধার মধ্যদিয়ে বিশ্বজনীন মানবসাম্যের বাণী পরিষ্কার হয়ে ওঠে। সব হাজির সেলাইবিহীন এক সাধারণ কাপড় পরিধানের মধ্যদিয়ে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে যে কোনো পার্থক্য নেই তা অনুধাবন করাই হলো আমাদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের মুখ্য প্রতিফলন। মিনায় আগমন হলো দেশ এবং সামাজিক অবস্থাননির্বিশেষে প্রত্যেক হাজিকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, আসন্ন উপাসনার দিনগুলোতে আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি সব তীর্থযাত্রীর জন্য এক কঠোর অনুশাসনের ওপর নির্ভরশীল। আরাফাত হলো ঐশ্বরিক করুণা, ক্ষমা এবং আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের এক বিস্ময়কর অবস্থান। আরাফাতের দিনটি হলো ইসলামিক বর্ষপঞ্জির সবচেয়ে পবিত্র দিন। এ দিনটিতে লাখ লাখ হাজি হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর অনুকরণে আরাফাতের ময়দানে একত্রিত হন। এই দিনটি হলো গভীর ধ্যান, অনুশোচনা এবং প্রার্থনার সময়। এই আরাফাতের দিনটিতেই হজরত মুহাম্মদ (স.) তার ঐতিহাসিক বিদায়ি ভাষণ দিয়েছিলেন এবং ইসলাম ধর্মের পূর্ণতা এই দিনটিতেই মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআনের সর্বশেষ দৈববাণীর মধ্যদিয়ে প্রকাশিত হয়। মুজদালিফায় খোলা আকাশের নিচে রাত্রী যাপন আধ্যাত্মিক মগ্নতা এবং অনুশোচনার এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। উন্মুক্ত মাঠে পার্থিব বস্তুগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অনুপস্থিতি জাগতিক অর্থে ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, এ কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহর কছে মানুষ হলো সাম্যের চূড়ান্ত প্রতীক। ধনসম্পদ, জাতিগোষ্ঠী এবং সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য ইসলাম ধর্মের পরিপূর্ণতার কাছে অর্থহীন। এর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সব বিশ্বাসীর একতা এবং সাম্যের প্রতীকী বাণীই বারবার ধ্বনিত হচ্ছে। কারণ, মরণশীল মানুষকে একদিন তার সৃষ্টিকর্তার কাছেই ফিরে যেতে হবে। মুজদালিফায় রাতে ছোট ছোট পাথর কুচি সংগ্রহ করা হয়। পরের দিন সকাল বেলা এ কঙ্করসহ জামারায় গিয়ে কংক্রিটের স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। এখানে কংক্রিটের স্তম্ভ তিনটিকে শয়তানের প্রতিভূ হিসেবে ধরা হয়। শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য আল্লাহর আদেশ পালনে ব্রতী হয়ে ইব্রাহিম (আ.) যখন ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে যাচ্ছিলেন তখনই তিনি শয়তানের ওপর পাথর নিক্ষেপ করেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর অনুকরণে হাজিদের জামারার তিনটি স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ এক গভীর প্রতীকী অর্থে কার্যকর করা হয়ে থাকে। শয়তান মানুষের চরিত্রের মধ্যেই অবস্থান করে। মানুষের জীবন ব্যক্তিগত স্বার্থ, ঈর্ষা, লোভলালসা, দ্বন্দ্বের মধ্যদিয়ে অতিবাহিত হয়। জামারায় শয়তানের ওপর কঙ্কর নিক্ষেপ মানুষের সব পাপকর্ম থেকে বিরত রাখার জন্য আজীবন মনের অন্তদ্বর্ন্দ্বকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিকে বোঝায়। হজের শেষপ্রান্তে তাওয়াফ এবং সাই সম্পাদানের মধ্যদিয়ে হাজিরা এক অদ্ভুত ধর্মাবলম্বীতে উজ্জীবিত হন। যখন লাখ লাখ মুসলমান কাঁধে কাঁধ রেখে কাবা শরিফ প্রদক্ষিণ করেন, তখন দৃশ্যটি পৃথিবীর কাছে আল্লাহর সামনে মানুষের ঐক্য এবং ভ্রাতৃত্বের একটি শক্তিশালী চাক্ষুষ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। ‘সাই’ হলো ইব্রাহিম (আ.)-এর স্ত্রী বিবি হাজেরার নবজাত শিশু ইসমাইলের সাহায্যের জন্য পানীর অন্বেষণে সাফা এবং মারওয়া টিলাদ্বয়ের মধ্যে সাতবার দৌড়ানোর ধর্মীয় রূপায়ণ। বিবি হাজেরার সহিষ্ণুতাকে জমজম কূপের আধিবৈদিক বিশুদ্ধ পানীয় জলের প্রক্ষেপণের মধ্যদিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। তার শিশুর জন্য বিবি হাজেরার এই কঠোর সংগ্রাম মাতৃ উৎসর্গ এবং আল্লাহর প্রতি পরম আস্থা স্থাপন করার প্রতিজ্ঞাকে বোঝায়।
ওপরের অনুচ্ছেদগুলোতে হজের প্রতিটি ধাপে যে এক গভীর তাৎপর্য রয়েছে, তা বোঝানোর জন্যই এত বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলো। মানুষ এবং তার স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের নিগূঢ় অর্থ অনুধাবনের এক আধিদৈবিক ধর্মানুষ্ঠানের পালনই হলো হজ। হজ পালনের পর মানুষের মনের মধ্যে যে মানসিক সৌকর্যের সৃষ্টি হয়, তা ধরে রাখতে পারলে ইসলাম শান্তির ধর্ম এই বাণীই বিশ্বসমাজে প্রতিধ্বণিত হয়। এ বছর হজ পালন করতে গিয়ে এ মর্মবাণীই আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, সৃষ্টিকর্তার আদেশ পালন করার উৎকৃষ্ট উপায় হলো মানুষ হিসেবে মন্দ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা এবং জাতি হিসেবে বিশ্বব্যবস্থায় শান্তির জন্য সংগ্রাম করে যাওয়া।
এ বছর প্রায় ১৭ লাখ তীর্থযাত্রী হজ পালন করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৭৮,৫০০ জন হজ পালন করেন। হজ কোটা হিসেবে প্রতি ১০০০ মুসলমানের জন্য একজন হাজির অনুপাতে বাংলাদেশের বরাদ্দ ছিল ১,২৭,০০০ জন হাজি। প্রায় ৫০,০০০ হাজির ব্যবধানের কারণ মূলত: হজ পালনের ন্যূনতম খরচ, যা ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার মধ্যে ছিল। সে অর্থ সংগ্রহে ব্যক্তিগতভাবে অনেক বাংলাদেশি ব্যর্থ হয়েছিলেন। অতএব, ভবিষ্যতে সরকারের যাতে অধিক সংখ্যায় বাংলাদেশিরা হজ করতে পারেন সেদিকে যত্নশীল হওয়া। বাংলাদেশের ওপরে ইন্দোনেশিয়া থেকে ২,৩১,০০০ জন, পাকিস্তান থেকে ১,৭৯,০০০ জন এবং ভারত থেকে ১,৭৫,০০০ জন হাজি উপস্থিত হয়েছিলেন। এতে প্রমাণিত হয যে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যাতে অন্ততপক্ষে তার কোটা পূরণ করতে পারে, সেদিকে সরকারের লক্ষ্য রাখা।
যে সংখ্যাটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে তা হলো ইরানের। ইরান থেকে আনুপাতিক হারে ৩০,০০০ জন হাজির সমাগম হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, যার মধ্যে সৌদি আরবও অন্তর্ভুক্ত, ইরানের সঙ্গে অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকলেও, হজের বিষয়টিতে ধর্মীয় মহিমার শ্রেষ্ঠত্বের গুণে হজের সর্বজনীন বাণীর বাধ্যবাধকতা স্বতঃসিদ্ধ। পৃথিবীর ১৬৫টি দেশ থেকে মানুষ হজ পালন করতে সৌদি আরবে আর্থিক, শারীরিক এবং ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করে আল্লাহর নিকট ক্ষমা নিবেদন এবং শয়তান দ্বারা পরিচালিত পাপকাজ থেকে মুক্ত থাকার একাগ্রচিত্তে প্রার্থনার যে দৃশ্য আমরা দেখি তা সত্যই ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে হজের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ অনুযায়ী তেলনির্ভর রাজস্ব কমানোর জন্য একটি সমৃদ্ধশালী অর্থনীতি গঠনের অন্যতম পদক্ষেপ ইসলামি মূল্যবোধ এবং ঐতিহ্যকে সমুন্নত করা। এর মধ্যে সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য হজ এবং ওমরাহ পালন সহজতর করার প্রচেষ্টায় উন্নতমানের সেবা প্রদানের ব্যবস্থাপনাকে সম্প্রসারিত করা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে হজের কার্যক্রমে সবার অংশীদারত্বকে নিশ্চিত করতে হলে সৌদি আরবের বিদেশি রাষ্ট্রের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে। সেটা হলে, ভিশন ২০৩০-এর আওতায় বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য নতুন ও বিস্তৃত অংশীদারির সুযোগ তৈরি হবে।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মভূমি হওয়ার সুবাদে সৌদি আরবের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের এক সহজাত ভালোবাসা ও আকর্ষণ রয়েছে, অধুনা সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছে। কেবলমাত্র ২০২৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ ৭,৫০,০০০ বাংলাদেশি সৌদি আরবে নতুন চাকরি নিয়ে গমন করেছেন। বর্তমানে সৌদি আরবে অভিবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ। প্রথম গন্তব্যস্থল হিসেবে বাংলাদেশ প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স হিসেবে অর্জন করে। বাংলাদেশিদের এক বিরাট অংশ অদক্ষ শ্রমসেবায় নিয়োজিত। মক্কা এবং মদিনায় প্রচুর বাংলাদেশি হজ এবং ওমরাহর সময়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং নিচু স্তরের কাজে নিয়োজিত দেখেছি। দুঃখের বিষয় হলো যেভাবে এই বাংলাদেশিদের সেবার শ্রমকে শোষণের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা উভয় দেশের জন্য অগ্রহণযোগ্য। এ শোষণের বেদনাদায়ক দিক হলো হজের সময়ে প্রতীকী প্রেক্ষাপটে তাদের দূরাবস্থার যে দৃশ্য অবলোকন করতে হয় তা সত্যিই বেদনাদায়ক। হজ বলতে বোঝায় মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য, সাম্য এবং সহমর্মিতার পরাকাষ্ঠাকে আত্মস্থ করা। তীর্থযাত্রীদের সবাই জাতি, নাগরিকত্ব এবং সামাজিক অবস্থাননির্বিশেষে একই ধরনের বস্ত্র পরিধানের মধ্যদিয়ে ইসলামের মানবিক মর্যাদা এবং সম্মিলিত ভ্রাতৃত্বের যে আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, তার পক্ষান্তরে অভিবাসী শ্রমিকদের তীর্থযাত্রায় অর্থনীতিতে যে বিশাল অবদান রয়েছে, তা দুঃখজনকভাবে এসব শোষণের জন্য, অকথিত এবং অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে।
হজ এবং ওমরাহ তীর্থযাত্রাকে বাংলাদেশ সরকার সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের কৌশল হিসেবে লক্ষায়িত করলে, ব্যক্তিগত তীর্থযাত্রীদের ধর্মীয় অভিলাষ পূরণের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যে তার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারবে বলে আমি মনে করি। সৌদি আরবের ভিশন-২০৩০-কে সামনে রেখেই সরকারকে একটি ইকো-ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে, যার মূল ভিত্তি হতে হবে, যেকোনো বাংলাদেশি যখন মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থানে গমন করবে, সে যাতে অন্যায়, শোষণ এবং অবিচারের হয়রানির সম্মুখীন না হয়। কারণ, রাষ্ট্র হিসেবে সরকারের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক অভিবাসী বাংলাদেশির মানবমর্যাদা রক্ষা করা। এই ধর্মীয় অনুশাসনটিই যেন ছিল আমার হজ পালনের প্রথম শিক্ষা।
লেখক: ডিস্টিংগুইস্ড এক্সপার্ট, অ্যাভিয়েশন
অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত
