দুর্গম চরের গর্ভবতী নারী জরুরি সময়ে সেবা পাচ্ছেন কি না, কোনো শিশু অপুষ্টির বদলে সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে কি না, কিংবা কোনো প্রবীণ ব্যক্তি চিকিৎসার খরচ মেটাতে নিজের সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কি না এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বাজেটকে একটি চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের একটি সম্ভাবনাময় সূচনা হিসেবে দেখা উচিত।...
বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার ১০০ নম্বর অনুচ্ছেদে এমন একটি স্বীকারোক্তি রয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের কোনো অর্থমন্ত্রী এর আগে এত স্পষ্টভাবে বলেননি। তার মতে, বছরের পর বছর অবহেলা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং জবাবদিহির অভাব দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ‘দুর্বল ও অকার্যকর’ করে তুলেছে। বাজেট বেড়েছে, কিন্তু সে তুলনায় সেবার মান উন্নত হয়নি। বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই মানুষ নিজের পকেট থেকে বহন করে। বিশ্বব্যাংক ও সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, এই হার শুধু দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ নয়; জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যেও পিছিয়ে রয়েছে।
এখন প্রশ্ন সরকার যে সমস্যাগুলোর কথা স্বীকার করেছে, বাজেটে প্রস্তাবিত সমাধানগুলো কি সেই সমস্যার গভীরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বরাদ্দের সংখ্যাগুলো কি সত্যিই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, নাকি এগুলো কেবল উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতির আরেকটি অধ্যায়? সর্বোপরি, ১৭ কোটি মানুষের দৈনন্দিন স্বাস্থ্য বাস্তবতা এবং ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে এই বাজেটকে কীভাবে মূল্যায়ন করা উচিত? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এই বিশ্লেষণটি এগোবে পাঁচটি পরস্পরসংযুক্ত ক্ষেত্র ধরে: স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের কাঠামো, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা, জনসংখ্যা ও প্রজনন স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তিত জনমিতিক বাস্তবতা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা, যা সংশোধিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য খাতের অংশ বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ০২ শতাংশে, যা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর একটি। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–এ বৃদ্ধি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট মোকাবিলায় কতটা কার্যকর হবে? স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেও বাংলাদেশ এখনো আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় পিছিয়ে। ভারত ও শ্রীলঙ্কা সরকারি স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির প্রায় যথাক্রমে ২ দশমিক ১ শতাংশ ও ১ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় করে, আর দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের প্রায় ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ১ শতাংশের সীমা অতিক্রম করলেও এখনো তা অপ্রতুল। এ ছাড়া ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ নিশ্চিত করতে যে ন্যূনতম সরকারি ব্যয়ের কথা WHO উল্লেখ করে (৮০ থেকে ১০০ ডলার), বর্তমান বরাদ্দ তারও অনেক কম (২৭ মার্কিন ডলার)। সরকার আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এই ৫ শতাংশে পৌঁছাতে হলে প্রতি বছর গড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট করে বৃদ্ধি দরকার হবে অর্থাৎ লক্ষ্যে পৌঁছাতে আরও দ্রুত গতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা-সম্পর্কিত বাজেট বরাদ্দ (২০২৬-২৭): স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়; ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ; ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ (সংশোধিত): ৩৫,৪৭৭ কোটি, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ; বার্ষিক পরিবর্তন: +৯৫.৬ শতাংশ; প্রাথমিক স্বাস্থ্য/জনসংখ্যা উদ্দেশ্য: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, জনবল, ইউএইচসি, পুষ্টি।
বাংলাদেশের জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশল ২০২৫-২০৩০ পরিবার পরিকল্পনায় শূন্য অপূর্ণ চাহিদা, শূন্য প্রতিরোধযোগ্য মাতৃমৃত্যু এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও ক্ষতিকর সামাজিক প্রথার অবসান। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই লক্ষ্যগুলো নিঃসন্দেহে সাহসী অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে অন্যতম। এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছরের আগেই হয়েছে, যা ২০১৯-এ ছিল ৫১.৪ শতাংশ। বর্তমান অগ্রগতির গতি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে শিশু বিবাহের হার ৪০ শতাংশের ওপরে থাকবে।
পরিবার পরিকল্পনা খাতেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১২ শতাংশ বিবাহিত নারীর পরিবার পরিকল্পনা সেবার অপূর্ণ চাহিদা রয়েছে এবং আধুনিক গর্ভনিরোধক ব্যবহার হার প্রায় ৬১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপূর্ণ চাহিদা কার্যকরভাবে দূর করতে এই হারকে ৭০ শতাংশেরও বেশি পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পুনর্গঠন এবং ৬০ হাজার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ যদিও এই বাজেটে গর্ভনিরোধক ব্যবহারের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, জনবল মোতায়েন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাস্তবায়ন ব্যয় সম্পর্কে বিস্তারিত পরিকল্পনা নেই।
২০২৬-২৭ সালের বাজেটের স্বাস্থ্য অধ্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো স্বাস্থ্য জনবলে বিনিয়োগ। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম, আর নার্সিং খাতও বছরের পর বছর পর্যাপ্ত গুরুত্ব ও বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে যার প্রায় ৮০ হাজার হবেন নারী স্বাস্থ্যকর্মী। এটি শুধু কর্মসংস্থানে নারীর ক্ষমতায়নের উদ্যোগ নয়; বরং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে নার্স ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, এমএসসি নার্সিং কর্মসূচি চালু, চার বছর মেয়াদি বিএসসি নার্সিং শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ এই বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এসব পদক্ষেপের সুফল তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাবে না। তবে দক্ষ নার্স, প্রশিক্ষক এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীর একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হলে আগামী দুই থেকে তিন দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা ও সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।
এই বাজেটে সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা খাত ৯০টিরও বেশি বিচ্ছিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে সমন্বয়ের অভাবে অনেক প্রকৃত সুবিধাভোগী আবার বাদ পড়ে যান। এই বাস্তবতায় সরকার ‘পরিবার কার্ড’কেন্দ্রিক একটি জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় ৪১ লাখ মা ও নারী-প্রধান পরিবারের কাছে মাসে ২,৫০০ টাকা করে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। গবেষণা বলছে, নারীদের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছালে সেই অর্থের বড় অংশ শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার পেছনে ব্যয় হয়। এ ছাড়া সম্প্রসারিত মা ও শিশু-সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে প্রায় ১৮ লাখ ৯৫ হাজার সুবিধাভোগী মাসে ৮৫০ টাকা করে পাচ্ছেন। এ কর্মসূচি গর্ভাবস্থা এবং শিশুর জীবনের প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে সহায়তা করে। এ ছাড়া ক্যানসারসহ ছয়টি গুরুতর দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য আর্থিক সহায়তার পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে, যা স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে পরিবারগুলোর আর্থিক ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে তার জনমিতিক লভ্যাংশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অবস্থান করছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬২ শতাংশই কর্মক্ষম বয়সী (১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়স ধরে), যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সুবিধার সময়সীমা অনন্ত নয়। আগামী দশকগুলোতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় নির্ভরশীল মানুষের হারও বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের বয়স্ক জনসংখ্যা মোটের শতকরা হিসাবে: ঐতিহাসিক ও আনুমানিক (২০২৫ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত) ২০২৫ সালে ৬০ বছর ঊর্ধ্ব বয়সের মোট জনসংখ্যা ছিল ৯.৩ শতাংশ, যা আনুমানিক ১ কোটি ৬০ লাখ। ২০৪০ সালে ৬০ বছর বয়স ঊর্ধ্ব মোট জনসংখ্যা হবে ১৮.৮ শতাংশ, যা আনুমানিক কোটি ২০ লাখ। ২০৫০ সালে ৬০ বছর বয়স ঊর্ধ্ব মোট জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২২.০ শতাংশে, যা আনুমানিক ৪ কোটি ৫০ লাখ।
সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বাজেটে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বাস্তবসম্মত ও ইতিবাচক উদ্যোগ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির পরিমাণ উন্নীত হওয়া, নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ যার বড় অংশ নারী; নতুন মিডওয়াইফ পদ সৃষ্টি; এবং নার্সিং শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার–এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি শক্তিশালী হবে। তবে এগুলোর পাশাপাশি শিশু বিবাহ, স্বাস্থ্য ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষার মতন বড় চ্যালেঞ্জগুলো এখনো রয়ে গেছে। আর এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য বরাদ্দের অঙ্কে নয়, বাস্তব ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে। দুর্গম চরের গর্ভবতী নারী জরুরি সময়ে সেবা পাচ্ছেন কি না, কোনো শিশু অপুষ্টির বদলে সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে কি না, কিংবা কোনো প্রবীণ ব্যক্তি চিকিৎসার খরচ মেটাতে নিজের সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কি না এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বাজেটকে একটি চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের একটি সম্ভাবনাময় সূচনা হিসেবে দেখা উচিত।
লেখক: অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
এবং
গবেষক, আইসিডিডিআর বি, ঢাকা
[email protected]


