ঢাকা ২১ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
সচিবালয়ের সামনে ভাত বিক্রি, আটক সোহানী শিফা আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রয়াণে শোক জানিয়েছে বাংলা একাডেমি ও ঢাবি হলিডে ইন ঢাকা সিটি সেন্টারে ফিরছে ‘বাংলার রসনা বিলাস ২.০’ ৩৬০ জোড়াকে সচল রাখার ইবাদত গোপালগঞ্জে দুই যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত ৪০ ব্রাজিল–নরওয়ে ম্যাচেও ব্রাজিলের জয় দেখছে ‘গণক’ বিড়াল মিলু ব্রাজিলই ফেভারিট: নরওয়ে কোচ প্রখ্যাত লোকসংগীতশিল্পী তীজন বাঈ আর নেই নরসিংদীতে ইয়াবাসহ যুবদলের সাবেক সভাপতির ছেলে আটক হালান্ড-গ্যাব্রিয়েল দ্বৈরথ এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রাণীর বিভিন্নতা ও শ্রেণিবিন্যাস অধ্যায়ের ৫টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৪র্থ পর্ব, এইচএসসির জীববিজ্ঞান ২য় পত্র পটিয়ায় মাদরাসাছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেপ্তার মাঠের লড়াই শেষে কথার লড়াই, বিতর্কে এমবাপ্পে জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্যের প্রতিশ্রুতি কতটুকু পূরণ করবে? রাঙামাটিতে সাবেক চেয়ারম্যানসহ আ.লীগ নেতা গ্রেপ্তার জুলাইয়ের প্রথম ৪ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫ কোটি ডলার যুদ্ধাপরাধ এবং স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতি ছিনতাইয়ের অভিযোগ, মসজিদের মাইকে ঘোষণার পর গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু হাতে কামড় দিয়ে বখাটের কবল থেকে রক্ষা পেল স্কুলছাত্রী আমের নাম যেভাবে এল শাবিপ্রবির আশরাফুলের চিকিৎসায় প্রয়োজন ৬০ লাখ টাকা বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সংস্থার সমাজ উন্নয়ন কার্যক্রম অধ্যায়ের ১০টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, এইচএসসির সমাজকর্ম ২য় পত্র সিলেটে দেশের প্রথম থানা ভিত্তিক ‘প্রবাসী হেল্প ডেস্ক’ উদ্বোধন নরওয়েকে কখনোই হারাতে পারেনি ব্রাজিল জনবল নেবে ওয়ান ব্যাংক সরকার উৎখাতের পরিকল্পনার অভিযোগে জাককানইবির শিক্ষক বরখাস্ত জীবনের নতুন অধ্যায় শুরুর আগেই মর্মান্তিক পরিণতি একদিনে হামের উপসর্গে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু ঐতিহ্যের টানে বরেন্দ্র জাদুঘরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত রাজশাহীতে কিশোর গ্যাংয়ের ৬ সদস্য গ্রেপ্তার

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্যের প্রতিশ্রুতি কতটুকু পূরণ করবে?

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্যের প্রতিশ্রুতি কতটুকু পূরণ করবে?
এ এইচ এম কিশোয়ার হোসেন এবং রেউন তানজিন অশ্রু

দুর্গম চরের গর্ভবতী নারী জরুরি সময়ে সেবা পাচ্ছেন কি না, কোনো শিশু অপুষ্টির বদলে সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে কি না, কিংবা কোনো প্রবীণ ব্যক্তি চিকিৎসার খরচ মেটাতে নিজের সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কি না এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বাজেটকে একটি চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের একটি সম্ভাবনাময় সূচনা হিসেবে দেখা উচিত।...

বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার ১০০ নম্বর অনুচ্ছেদে এমন একটি স্বীকারোক্তি রয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের কোনো অর্থমন্ত্রী এর আগে এত স্পষ্টভাবে বলেননি। তার মতে, বছরের পর বছর অবহেলা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং জবাবদিহির অভাব দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ‘দুর্বল ও অকার্যকর’ করে তুলেছে। বাজেট বেড়েছে, কিন্তু সে তুলনায় সেবার মান উন্নত হয়নি। বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই মানুষ নিজের পকেট থেকে বহন করে। বিশ্বব্যাংক ও সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, এই হার শুধু দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ নয়; জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যেও পিছিয়ে রয়েছে।

এখন প্রশ্ন সরকার যে সমস্যাগুলোর কথা স্বীকার করেছে, বাজেটে প্রস্তাবিত সমাধানগুলো কি সেই সমস্যার গভীরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বরাদ্দের সংখ্যাগুলো কি সত্যিই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, নাকি এগুলো কেবল উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতির আরেকটি অধ্যায়? সর্বোপরি, ১৭ কোটি মানুষের দৈনন্দিন স্বাস্থ্য বাস্তবতা এবং ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে এই বাজেটকে কীভাবে মূল্যায়ন করা উচিত? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এই বিশ্লেষণটি এগোবে পাঁচটি পরস্পরসংযুক্ত ক্ষেত্র ধরে: স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের কাঠামো, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা, জনসংখ্যা ও প্রজনন স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তিত জনমিতিক বাস্তবতা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা, যা সংশোধিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য খাতের অংশ বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ০২ শতাংশে, যা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর একটি। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–এ বৃদ্ধি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট মোকাবিলায় কতটা কার্যকর হবে? স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেও বাংলাদেশ এখনো আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় পিছিয়ে। ভারত ও শ্রীলঙ্কা সরকারি স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির প্রায় যথাক্রমে ২ দশমিক ১ শতাংশ ও ১ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় করে, আর দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের প্রায় ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ১ শতাংশের সীমা অতিক্রম করলেও এখনো তা অপ্রতুল। এ ছাড়া ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ নিশ্চিত করতে যে ন্যূনতম সরকারি ব্যয়ের কথা WHO উল্লেখ করে (৮০ থেকে ১০০ ডলার), বর্তমান বরাদ্দ তারও অনেক কম (২৭ মার্কিন ডলার)। সরকার আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এই ৫ শতাংশে পৌঁছাতে হলে প্রতি বছর গড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট করে বৃদ্ধি দরকার হবে অর্থাৎ লক্ষ্যে পৌঁছাতে আরও দ্রুত গতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা-সম্পর্কিত বাজেট বরাদ্দ (২০২৬-২৭): স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়; ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ; ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ (সংশোধিত): ৩৫,৪৭৭ কোটি, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ; বার্ষিক পরিবর্তন: +৯৫.৬ শতাংশ; প্রাথমিক স্বাস্থ্য/জনসংখ্যা উদ্দেশ্য: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, জনবল, ইউএইচসি, পুষ্টি।

বাংলাদেশের জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশল ২০২৫-২০৩০ পরিবার পরিকল্পনায় শূন্য অপূর্ণ চাহিদা, শূন্য প্রতিরোধযোগ্য মাতৃমৃত্যু এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও ক্ষতিকর সামাজিক প্রথার অবসান। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই লক্ষ্যগুলো নিঃসন্দেহে সাহসী অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে অন্যতম। এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছরের আগেই হয়েছে, যা ২০১৯-এ ছিল ৫১.৪ শতাংশ। বর্তমান অগ্রগতির গতি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে শিশু বিবাহের হার ৪০ শতাংশের ওপরে থাকবে।

পরিবার পরিকল্পনা খাতেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১২ শতাংশ বিবাহিত নারীর পরিবার পরিকল্পনা সেবার অপূর্ণ চাহিদা রয়েছে এবং আধুনিক গর্ভনিরোধক ব্যবহার হার প্রায় ৬১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপূর্ণ চাহিদা কার্যকরভাবে দূর করতে এই হারকে ৭০ শতাংশেরও বেশি পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পুনর্গঠন এবং ৬০ হাজার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ যদিও এই বাজেটে গর্ভনিরোধক ব্যবহারের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, জনবল মোতায়েন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাস্তবায়ন ব্যয় সম্পর্কে বিস্তারিত পরিকল্পনা নেই।

২০২৬-২৭ সালের বাজেটের স্বাস্থ্য অধ্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো স্বাস্থ্য জনবলে বিনিয়োগ। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম, আর নার্সিং খাতও বছরের পর বছর পর্যাপ্ত গুরুত্ব ও বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে যার প্রায় ৮০ হাজার হবেন নারী স্বাস্থ্যকর্মী। এটি শুধু কর্মসংস্থানে নারীর ক্ষমতায়নের উদ্যোগ নয়; বরং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে নার্স ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, এমএসসি নার্সিং কর্মসূচি চালু, চার বছর মেয়াদি বিএসসি নার্সিং শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ এই বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এসব পদক্ষেপের সুফল তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাবে না। তবে দক্ষ নার্স, প্রশিক্ষক এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীর একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হলে আগামী দুই থেকে তিন দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা ও সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।

এই বাজেটে সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা খাত ৯০টিরও বেশি বিচ্ছিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে সমন্বয়ের অভাবে অনেক প্রকৃত সুবিধাভোগী আবার বাদ পড়ে যান। এই বাস্তবতায় সরকার ‘পরিবার কার্ড’কেন্দ্রিক একটি জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় ৪১ লাখ মা ও নারী-প্রধান পরিবারের কাছে মাসে ২,৫০০ টাকা করে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। গবেষণা বলছে, নারীদের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছালে সেই অর্থের বড় অংশ শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার পেছনে ব্যয় হয়। এ ছাড়া সম্প্রসারিত মা ও শিশু-সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে প্রায় ১৮ লাখ ৯৫ হাজার সুবিধাভোগী মাসে ৮৫০ টাকা করে পাচ্ছেন। এ কর্মসূচি গর্ভাবস্থা এবং শিশুর জীবনের প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে সহায়তা করে। এ ছাড়া ক্যানসারসহ ছয়টি গুরুতর দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য আর্থিক সহায়তার পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে, যা স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে পরিবারগুলোর আর্থিক ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে তার জনমিতিক লভ্যাংশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অবস্থান করছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬২ শতাংশই কর্মক্ষম বয়সী (১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়স ধরে), যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সুবিধার সময়সীমা অনন্ত নয়। আগামী দশকগুলোতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় নির্ভরশীল মানুষের হারও বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের বয়স্ক জনসংখ্যা মোটের শতকরা হিসাবে: ঐতিহাসিক ও আনুমানিক (২০২৫ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত) ২০২৫ সালে ৬০ বছর ঊর্ধ্ব বয়সের মোট জনসংখ্যা ছিল ৯.৩ শতাংশ, যা  আনুমানিক ১ কোটি ৬০ লাখ। ২০৪০ সালে ৬০ বছর বয়স ঊর্ধ্ব মোট জনসংখ্যা হবে ১৮.৮ শতাংশ, যা আনুমানিক কোটি ২০ লাখ। ২০৫০ সালে ৬০ বছর বয়স ঊর্ধ্ব মোট জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২২.০ শতাংশে, যা আনুমানিক ৪ কোটি ৫০ লাখ।

সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বাজেটে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বাস্তবসম্মত ও ইতিবাচক উদ্যোগ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির পরিমাণ উন্নীত হওয়া, নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ যার বড় অংশ নারী; নতুন মিডওয়াইফ পদ সৃষ্টি; এবং নার্সিং শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার–এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি শক্তিশালী হবে। তবে এগুলোর পাশাপাশি শিশু বিবাহ, স্বাস্থ্য ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষার মতন বড় চ্যালেঞ্জগুলো এখনো রয়ে গেছে। আর এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য বরাদ্দের অঙ্কে নয়, বাস্তব ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে। দুর্গম চরের গর্ভবতী নারী জরুরি সময়ে সেবা পাচ্ছেন কি না, কোনো শিশু অপুষ্টির বদলে সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে কি না, কিংবা কোনো প্রবীণ ব্যক্তি চিকিৎসার খরচ মেটাতে নিজের সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কি না এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বাজেটকে একটি চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের একটি সম্ভাবনাময় সূচনা হিসেবে দেখা উচিত।


লেখক: অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
এবং
গবেষক, আইসিডিডিআর বি, ঢাকা
[email protected]

যুদ্ধাপরাধ এবং স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতি

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম
যুদ্ধাপরাধ এবং স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতি
আনু মুহাম্মদ

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ ঘটেছে অসংখ্য। মূল যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোকজন পার পেয়ে গেছে প্রথমেই। স্বাধীনতার পর ‘দালাল আইন’ করে দেশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়। একপর্যায়ে ১৯৭৩ সালে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বাদে বাকি সবার জন্য ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করা হয়। এর ফাঁক দিয়ে বড়-ছোট অনেক অপরাধীই পার পেয়ে যায়।... 

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘরে ঘরে ধর্মচর্চা বেড়ে গিয়েছিল। অনিশ্চয়তার মুখে নিরাপত্তার প্রার্থনায় নামাজ, কোরআন খতম, জিকির, দোয়া-দরুদ সবই বেড়েছিল মুসলিম পরিবারগুলোতে, আমাদের পরিবারে তার অংশীদার ছিলাম আমিসহ সব ভাইবোনই। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যারা অংশ নিয়েছেন, যারা সহায়তা করেছেন, মুসলমান হলে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর রাজাকার, আলবদরদের নৃশংসতার মুখে, আল্লাহ ও রসুলের ওপর ভরসাই ছিল তাদের বড় অবলম্বন।

কিন্তু অন্যদিকে জামায়াতসহ প্রায় সব ইসলামপন্থি দল পাকিস্তান সামরিক জান্তার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। অধিকাংশ প্রভাবশালী পীরের ভূমিকাও ছিল একইরকম। তাদের কেউ কেউ সরাসরি পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যা, নারী নির্যাতনের পক্ষে সাফাইও গেয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো–যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পীর বা নেতা হিসেবে এদেরই মেনেছেন জীবনভর, তারা উল্টো মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়েছেন। ধর্মীয় নেতাদের অবস্থান তাদের প্রভাবিত করতে পারেনি। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের মানুষ এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও চর্চা থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তারা আলাদা করে রেখেছেন।

ইতিহাস আরও সাক্ষ্য দেয় যে, বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানায়নি, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার জন্য কোনো মিছিল করেনি, সংবিধানকে পরিবর্তন করার জন্য দাবি তোলেনি, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার পক্ষেও কোনো মত প্রকাশ করেনি কিন্তু তবুও বিভিন্ন সময়ে শাসকগোষ্ঠী এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের নিজেদের সুবিধার্থে, অন্য ব্যর্থতাকে আড়াল করতে কিংবা জনগণের ধর্মানুভূতিকে ব্যবহার করে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে। লক্ষ্যণীয় যে, বাংলাদেশে (এবং ’৭১ পূর্ব ও পরবর্তী পাকিস্তানে) সামরিক শাসনের কালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসার ঘটেছে সব চেয়ে বেশি। এর বাইরে বুর্জোয়া রাজনীতির সংকট এবং বাম রাজনীতির বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তি ধর্মপন্থি রাজনীতির পরিসর বাড়িয়েছে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ ঘটেছে অসংখ্য। মূল যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোকজন পার পেয়ে গেছে প্রথমেই। স্বাধীনতার পর ‘দালাল আইন’ করে দেশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়। একপর্যায়ে ১৯৭৩ সালে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বাদে বাকি সবার জন্য ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করা হয়। এর ফাঁক দিয়ে বড়-ছোট অনেক অপরাধীই পার পেয়ে যায়।

এ সময়ে ইসলামি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা খাতে ব্যয়বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু কর্মসূচি নেন শেখ মুজিব। একই সঙ্গে তিনি ইসলামি শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেন। সম্ভবত, ‘ধর্মহীনতা’র মিথ্যা অভিযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্যই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী অর্থনীতির সংস্কারও শুরু হয় এ সময়েই। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় সরকারের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। ১৯৭৪-এ আসে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। এরপর জরুরি অবস্থা এবং একদলীয় শাসনে আপাতদৃষ্টিতে মহাপরাক্রমশালী সরকার প্রকৃতপক্ষে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হন সামরিক বাহিনীর একাংশ দ্বারা এবং শুরু হয় সামরিক শাসন।

সামরিক শাসনামলে পাকবাহিনীর সহযোগী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমে বৈধতা পায়। সেই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সক্রিয় ব্যক্তিরাও সমাজে রাজনীতিতে আবারও ফিরে আসতে থাকে। ১৯৭৮ সালে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে তার কার্যক্রম শুরু করলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে প্রথম আন্দোলন সূচিত হয়। সে সময় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ছিল ঐক্যবদ্ধ এবং দেশজুড়ে প্রভাবশালী। কর্নেল কাজী নূরুজ্জামানের নেতৃত্বে তারাই এই আন্দোলন সারা দেশে বিস্তৃত করে। জামান সাহেবের ভাষ্য অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮১ সালে জিয়া নিহত হন, একই সূত্রে আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসার নিহত হন। সে সময় সেনাপ্রধান হিসেবে এরশাদই ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রে।

১৯৮২ সালে নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে উচ্ছেদ করে এরশাদের নেতৃত্বে আবারও সামরিক শাসন শুরু হয় এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যু ধামাচাপা পড়ে যায়। পুরো ৮০ দশকজুড়ে এরশাদ তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখবার জন্য ধর্ম, ধর্মপন্থি দল, মাদ্রাসা, পীর, মাজার ইত্যাদির যথেচ্ছাচার ব্যবহার করেন। ক্ষমতার সুবিধার্থে দুর্বৃত্ত কিছু নেতাকে দুহাতে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। এই সময়েই ধর্মের বাণিজ্যিকীকরণ, পীর ও ধর্মপন্থি দলগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি সম্প্রসারণ ঘটে সব চেয়ে বেশি। শীর্ষপদ থেকে দুর্নীতির বিস্তার ঘটে তখনই।

এই দশকে এরশাদ স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৫ দল ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দল পরিচালিত আন্দোলনে সমঝোতার মধ্যদিয়েই যুগপৎ কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামী অংশীদার হয়ে যায়। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সংসদ নির্বাচন দিয়ে ক্রমবর্ধমান জনপ্রতিরোধ থেকে নিজের ক্ষমতা রক্ষা করতে চেষ্টা করেন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ ১৫ দলের কয়েকটি দলের সঙ্গে  জামায়াতও অংশ নেয়। নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ও কয়েকটি বাম দল। ১৫ দল ভেঙে ৫ বাম দল আলাদা হয়ে যায়। একদিকে প্রশাসনের প্রশ্রয় অন্যদিকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশীদারের বৈধতা নিয়ে এই দশকেই জামায়াতে ইসলাম দেশব্যাপী নিজেদের দলের সব চেয়ে বেশি সম্প্রসারণ ঘটাতে সমর্থ হয়। এ ছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাদের দক্ষ কৌশলী নানা প্রতিষ্ঠান সংগঠিত হয় এসময়েই।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের দ্বন্দ্ব সংঘাত বাড়তে থাকে। বিশেষত আশির দশকের দ্বিতীয় ভাগে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিবিরের সন্ত্রাস, রগকাটা, হত্যার বহু খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। শিবিরের সঙ্গে প্রধানত সংঘাত হয় বাম সংগঠনগুলোর, কিন্তু ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সঙ্গেও অনেক রক্তাক্ত সংঘাত দেখা যায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের হাতে ছাত্রদল নেতা কবির নিহত হন ১৯৮৯ সালে। এরপরই বাকি সব ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

এই দশকেই বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি জোরদারভাবে বাস্তবায়ন হতে থাকে। সে অনুযায়ী শিক্ষা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক তৎপরতার সুযোগ উন্মুক্ত হয়। ক্রমে শিক্ষা, ব্যাংক, বিমা, কম্পিউটার, এনজিও সব ক্ষেত্রে জামায়াত দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। সরকারি প্রশাসন, বিনিয়োগ খাত, এনজিওসহ কয়েকটি দেশের দূতাবাস মিলে জামায়াতের একটি শক্ত নেটওয়ার্ক দাঁড়ায়। একদিকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ, অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি দুই পক্ষের জন্যই অনুকূল সময় ছিল এরশাদের স্বৈরশাসন।

১৯৮৭ সালের শেষ দিকে এরশাদ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন ব্যাপক আকার নেয়। ১০ নভেম্বর বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে সরকারবিরোধী মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন নূর হোসেন। পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হওয়ার পর গণপ্রতিরোধ দ্রুত গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নেয়। জরুরি অবস্থা দিয়ে এরশাদ কোনোভাবে সামাল দিতে সক্ষম হন। ক্ষমতার বৈধতা তৈরি করতে তিনি আবার সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। সে নির্বাচন বর্জন করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দল, পাঁচ বাম দল, জামায়াতসহ সবাই।

১৯৮৮ সালে কতিপয় ‘গৃহপালিত’ দল নিয়ে করা এই প্রহসনের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে মানুষজনই দেখা যায়নি। তবে ঘোষিত ফলাফলে বিপুল ভোটে এরশাদের দল বিজয়ী হয়। এরশাদ সরকার নিজের জনধিকৃত গদির বৈধতা আদায় করতে সেই চরম প্রহসনমূলক ভোটারবিহীন নির্বাচনে গঠিত সংসদে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ করে সংবিধান সংশোধন করে। তবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ ওপরের সব দলই এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়।    

লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

তৃতীয় কোনো ভাষা শেখানোর চিন্তা কতটা বাস্তবসম্মত!

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম
তৃতীয় কোনো ভাষা শেখানোর চিন্তা কতটা বাস্তবসম্মত!
মাছুম বিল্লাহ

পঞ্চম শ্রেণি শেষ করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই বাংলা ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে নির্ধারিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ইংরেজির অবস্থা কী? শ্রেণিকক্ষে আনন্দদায়ক ও কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতির অভাব। শিক্ষার্থীরা দিন দিন মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে তাদের মধ্যে বিশ্লেষণমূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা গড়ে উঠছে না। প্রাথমিক স্তরের এই বড় ঘাটতি পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।...

শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নাকি নতুন সরকারের বাজেট তৈরি হয়েছে! প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, আনন্দময় ও বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে; যেখানে স্কাউট, গার্লস গাইড, বিএনসিসির মতো কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বিদেশি ভাষাও শেখার সুযোগ পাবেন। এমতাবস্তায় প্রশ্ন আসে–শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখা জরুরি কি না। এমন প্রশ্নে ৭২ শতাংশ মানুষ মনে করেন শিক্ষার্থীদের ভাষা শেখা জরুরি। দেশের শিক্ষাবিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পত্রিকা দৈনিক শিক্ষাডটকমের এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এদিকে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। পঞ্চম শ্রেণি শেষ করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই বাংলা ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে নির্ধারিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ১৪ জুন রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ শিক্ষা খাত বিশ্লেষণ (ইএসএ) ২০২৬’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের যাচাইকরণ কর্মশালায় বাংলাদেশ সরকার, ইউনিসেফ এবং গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন (জিপিই)-এর সহযোগিতায় আয়োজিত কর্মশালায় শিক্ষা খাতের বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পঞ্চম শ্রেণির প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলায় এবং ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে তাদের শ্রেণি উপযোগী ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ইংরেজির অবস্থা কী? সেটি নিয়ে কথা হয়নি। শ্রেণিকক্ষে আনন্দদায়ক ও কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতির অভাব এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের কারণে শিক্ষার্থীরা দিন দিন মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে তাদের মধ্যে বিশ্লেষণমূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা গড়ে উঠছে না। শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক স্তরের এই বড় ঘাটতি পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন ভর্তির দাবি করা হলেও এখনো প্রায় ১০ লাখ শিশু প্রাথমিক স্তরে বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ লাখ। প্রতিবন্ধী শিশু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশু এবং দুর্গম ও প্রান্তিক এলাকার শিশুরাই সবচেয়ে বেশি শিক্ষাবঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর সঙ্গে আরেকটি সমস্যা, যেটি শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন এভাবে–‘অভিভাবকরা চান জিপিএ-৫; কিন্তু শিক্ষার্থীরা কিছু শিখল কি না, সেটি দেখতে চান না।’ জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠার কারণে মূল শিখনফল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। আমরা মনে করি, এখানে রাষ্ট্রকে যা করতে হবে শিক্ষার্থীরা জিপিএ-৫ পেলেই যেন সবাই কোনো ধরনের সন্দেহ ছাড়া বুঝতে পারে যে, ওই শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিষয়ে এবং শ্রেণি উপযোগী দক্ষতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এটি নিয়ে সমালোচনা, অভিভাবকদের দোষ দেওয়া আর এসব চিন্তা না করে নতুন নতুন কথা বলা এবং প্রজেক্ট চালু করলে এ ঘটনাই ঘটতে থাকবে। জিপিএ-৫ পেলে যেন উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বুঝতে পারে যে তাদের আর পরীক্ষা নেওয়ার দরকার নেই। সরকারকে এসব জায়গায় গভীরভাবে কাজ করতে হবে এবং এটি সবচেয়ে বড় কাজগুলোর মধ্যে একটি। এসব দিকে চিন্তা না দিয়ে অন্য সব আশার কথা বলা হলে আমাদের মনে সন্দেহ তো জাগবেই, কারণ ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে তো ভয় পাবেই!

আমরা স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি শিক্ষার কোনো সুরাহা করতে পারিনি। এর ব্যাকগ্রাউন্ড কিন্তু পাকিস্তানের ২৪ বছর এবং তারও পূর্বে ব্রিটিশ শাসনের সময়ও ইংরেজির সঙ্গে আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পরিচিত ছিলেন। তার পরও আমরা কিন্তু পার্শ্ববর্তী অনেক দেশ থেকে ইংরেজি ব্যবহারে এবং আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিযোগিতায় এখনো অনেক পিছিয়ে। ইংরেজি ভাষা শেখানো চলে গেছে বহুধাবিভক্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বেকার ও অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তিদের কাছে। তারা যে যেভাবে বুঝতেছেন এবং পারছেন, তিনি সেভাবে ইংরেজি পড়িয়ে যাচ্ছেন। কেউ বলছেন উচ্চারণ শিখতে হবে, কেউ বলছেন প্রিপজিশনের লিখিত বই পৃথিবীর সেরা আর বাকিরা গ্রামার কীভাবে আয়ত্ত করা যায়, সহজে মনে রাখা যায় ইত্যাদি ইত্যাদি বই ও আলোচনা নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে অত্যন্ত সরব। এমতাবস্থায় সরকার বৈশ্বিক চাহিদার কথা চিন্তা করে তৃতীয় আরেকটি ভাষা শেখানোর কথা বলছে। সরকার যখন বলে তৃতীয় ভাষা হিসেবে নতুন একটি ভাষা সংযোজন করা হবে, তখন ভয় হয় সেই ব্যবসা আবার কীভাবে চলবে? বিদেশি ভাষা বলতে এখন আরবি, চাইনিজ (মান্দারিন) আর জাপানিজ, ফ্রেন্স ভাষাই বেশি যুক্তিযুক্ত। প্রশ্ন হচ্ছে–সরকার সেটি কীভাবে করবে বা করার চিন্তা করছে? প্রশ্ন করা হলে বলা হবে এ নিয়ে সরকারের ব্যাপক পরিকল্পনা আছে, কিন্তু সেই ব্যাপক পরিকল্পনা কী তা আমরা কখনো জানতে পারব না, একসময় দেখব বিশাল এক প্রজেক্ট হাজির করা হবে। কিন্তু তাতে ভাষা শেখার যে কিছুই হয় না, সেটি আর দ্বিতীয়বার দেখার বা প্রশ্ন করার অবকাশ আর কারোর থাকে না।

আমরা তো ইংরেজি ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্যই বুঝতে পারছি না, আর তাই ইংরেজি শেখাচ্ছিও না। সেটিকে পড়ানো হচ্ছে অন্যান্য বিষয়ের মতো। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীদের তৃতীয় কোনো ভাষা শেখানোর চেষ্টা করা হলে, বিশেষ করে সরকারি পর্যায়ে চালু করা হলে শিক্ষার্থীরা না শিখবে শিক্ষার মৌলিক বিষয়গুলো, যেমন–বিজ্ঞান, গণিত, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি না শিখবে কোনো ভাষা। ভাষা শেখা তো দূরের কথা, ১০-১২ বছর সময় নষ্ট করে কেউ কেউ দু-একটি অক্ষর আর শব্দ হয়তো শিখবে, ইংরেজির যে অবস্থা ইংরেজির এত বিশাল ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা সত্ত্বেও এটি ৭৫ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত চলছে আমাদের দেশে, তারও আগে ব্রিটিশ আমলেও ইংরেজির সঙ্গে এ দেশের মানুষের পরিচয় ছিল, তারপর ইংরেজির কিছু নিয়ম শিখছে যারা বহু বছর, এই ভাষা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে আর বাকিরা অক্ষর আর কিছু শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। এর ব্যবহার কেউ অন্তত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ইংরেজি পড়ানো থেকে শেখেনি। যারা শিখছেন তারা শিখছেন বেসরকারি কোনো ব্যবস্থায় কিংবা নিজ উদ্যোগে। তৃতীয় ভাষা যার প্রয়োগ, পরিচিতি কিংবা চারপাশে কেউ নেই এমতাবস্থায় তারা এতটুকুও শিখবে কি না সন্দেহ! আর এবারকার বাজেটের অর্থ দিয়েই কি তৃতীয় ভাষা শেখানোর কাজ শুরু হবে, সেটিও স্পষ্ট নয়।

লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)
[email protected]

অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক তাৎপর্য বাংলাদেশ-সৌদি আরবের সুসম্পর্ক স্থাপনে হজ

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৫:০৩ পিএম
বাংলাদেশ-সৌদি আরবের সুসম্পর্ক স্থাপনে হজ
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন (অব.)

তীর্থযাত্রীদের সবাই জাতি, নাগরিকত্ব এবং সামাজিক অবস্থাননির্বিশেষে একই ধরনের বস্ত্র পরিধানের মধ্যদিয়ে ইসলামের মানবিক মর্যাদা এবং সম্মিলিত ভ্রাতৃত্বের যে আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, তার পক্ষান্তরে অভিবাসী শ্রমিকদের তীর্থযাত্রায় অর্থনীতিতে যে বিশাল অবদান রয়েছে, তা দুঃখজনকভাবে এসব শোষণের জন্য, অকথিত এবং অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র হিসেবে সরকারের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক অভিবাসী বাংলাদেশির মানবমর্যাদা রক্ষা করা।...

হজ ইসলাম ধর্মের পাঁচটি বাধ্যতামূলক স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম। শারীরিক এবং আর্থিকভাবে সমর্থ যেকোনো মুসলমানের জন্য হজ জীবনে অন্তত একবার পালন করা ফরজ। মানবজীবনে হজের তাৎপর্য কী তা হজের মূল ধাপগুলো পালন করার মধ্য থেকেই পরিষ্কারভাবে আমাদের মননশীল চিন্তামগ্নতায় ধরা পড়ে। ওমরাহ হজের মূল ছয়টি ধাপগুলো হলো: ১. ইহরাম বাধা; ২. মিনায় আগমন; ৩. আরাফাতে অবস্থান; ৪, মুজদালিফায় রাত্রি যাপন; ৫. জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা; ৬. তাওয়াফ ও সাই। প্রতিটি ধাপ পালনের তাৎপর্য কেবলমাত্র অনুচিন্তনের মাধ্যমেই একজন মুসলমান উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে।

ইহরাম বাধার মধ্যদিয়ে বিশ্বজনীন মানবসাম্যের বাণী পরিষ্কার হয়ে ওঠে। সব হাজির সেলাইবিহীন এক সাধারণ কাপড় পরিধানের মধ্যদিয়ে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে যে কোনো পার্থক্য নেই তা অনুধাবন করাই হলো আমাদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের মুখ্য প্রতিফলন। মিনায় আগমন হলো দেশ এবং সামাজিক অবস্থাননির্বিশেষে প্রত্যেক হাজিকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, আসন্ন উপাসনার দিনগুলোতে আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি সব তীর্থযাত্রীর জন্য এক কঠোর অনুশাসনের ওপর নির্ভরশীল। আরাফাত হলো ঐশ্বরিক করুণা, ক্ষমা এবং আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের এক বিস্ময়কর অবস্থান। আরাফাতের দিনটি হলো ইসলামিক বর্ষপঞ্জির সবচেয়ে পবিত্র দিন। এ দিনটিতে লাখ লাখ হাজি হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর অনুকরণে আরাফাতের ময়দানে একত্রিত হন। এই দিনটি হলো গভীর ধ্যান, অনুশোচনা এবং প্রার্থনার সময়। এই আরাফাতের দিনটিতেই হজরত মুহাম্মদ (স.) তার ঐতিহাসিক বিদায়ি ভাষণ দিয়েছিলেন এবং ইসলাম ধর্মের পূর্ণতা এই দিনটিতেই মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআনের সর্বশেষ দৈববাণীর মধ্যদিয়ে প্রকাশিত হয়। মুজদালিফায় খোলা আকাশের নিচে রাত্রী যাপন আধ্যাত্মিক মগ্নতা এবং অনুশোচনার এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। উন্মুক্ত মাঠে পার্থিব বস্তুগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অনুপস্থিতি জাগতিক অর্থে ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, এ কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহর কছে মানুষ হলো সাম্যের চূড়ান্ত প্রতীক। ধনসম্পদ, জাতিগোষ্ঠী এবং সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য ইসলাম ধর্মের পরিপূর্ণতার কাছে অর্থহীন। এর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সব বিশ্বাসীর একতা এবং সাম্যের প্রতীকী বাণীই বারবার ধ্বনিত হচ্ছে। কারণ, মরণশীল মানুষকে একদিন তার সৃষ্টিকর্তার কাছেই ফিরে যেতে হবে। মুজদালিফায় রাতে ছোট ছোট পাথর কুচি সংগ্রহ করা হয়। পরের দিন সকাল বেলা এ কঙ্করসহ জামারায় গিয়ে কংক্রিটের স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। এখানে কংক্রিটের স্তম্ভ তিনটিকে শয়তানের প্রতিভূ হিসেবে ধরা হয়। শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য আল্লাহর আদেশ পালনে ব্রতী হয়ে ইব্রাহিম (আ.) যখন ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে যাচ্ছিলেন তখনই তিনি শয়তানের ওপর পাথর নিক্ষেপ করেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর অনুকরণে হাজিদের জামারার তিনটি স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ এক গভীর প্রতীকী অর্থে কার্যকর করা হয়ে থাকে। শয়তান মানুষের চরিত্রের মধ্যেই অবস্থান করে। মানুষের জীবন ব্যক্তিগত স্বার্থ, ঈর্ষা, লোভলালসা, দ্বন্দ্বের মধ্যদিয়ে অতিবাহিত হয়। জামারায় শয়তানের ওপর কঙ্কর নিক্ষেপ মানুষের সব পাপকর্ম থেকে বিরত রাখার জন্য আজীবন মনের অন্তদ্বর্ন্দ্বকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিকে বোঝায়। হজের শেষপ্রান্তে তাওয়াফ এবং সাই সম্পাদানের মধ্যদিয়ে হাজিরা এক অদ্ভুত ধর্মাবলম্বীতে উজ্জীবিত হন। যখন লাখ লাখ মুসলমান কাঁধে কাঁধ রেখে কাবা শরিফ প্রদক্ষিণ করেন, তখন দৃশ্যটি পৃথিবীর কাছে আল্লাহর সামনে মানুষের ঐক্য এবং ভ্রাতৃত্বের একটি শক্তিশালী চাক্ষুষ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। ‘সাই’ হলো ইব্রাহিম (আ.)-এর স্ত্রী বিবি হাজেরার নবজাত শিশু ইসমাইলের সাহায্যের জন্য পানীর অন্বেষণে সাফা এবং মারওয়া টিলাদ্বয়ের মধ্যে সাতবার দৌড়ানোর ধর্মীয় রূপায়ণ। বিবি হাজেরার সহিষ্ণুতাকে জমজম কূপের আধিবৈদিক বিশুদ্ধ পানীয় জলের প্রক্ষেপণের মধ্যদিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। তার শিশুর জন্য বিবি হাজেরার এই কঠোর সংগ্রাম মাতৃ উৎসর্গ এবং আল্লাহর প্রতি পরম আস্থা স্থাপন করার প্রতিজ্ঞাকে বোঝায়।

ওপরের অনুচ্ছেদগুলোতে হজের প্রতিটি ধাপে যে এক গভীর তাৎপর্য রয়েছে, তা বোঝানোর জন্যই এত বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলো। মানুষ এবং তার স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের নিগূঢ় অর্থ অনুধাবনের এক আধিদৈবিক ধর্মানুষ্ঠানের পালনই হলো হজ। হজ পালনের পর মানুষের মনের মধ্যে যে মানসিক সৌকর্যের সৃষ্টি হয়, তা ধরে রাখতে পারলে ইসলাম শান্তির ধর্ম এই বাণীই বিশ্বসমাজে প্রতিধ্বণিত হয়। এ বছর হজ পালন করতে গিয়ে এ মর্মবাণীই আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, সৃষ্টিকর্তার আদেশ পালন করার উৎকৃষ্ট উপায় হলো মানুষ হিসেবে মন্দ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা এবং জাতি হিসেবে বিশ্বব্যবস্থায় শান্তির জন্য সংগ্রাম করে যাওয়া।

এ বছর প্রায় ১৭ লাখ তীর্থযাত্রী হজ পালন করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৭৮,৫০০ জন হজ পালন করেন। হজ কোটা হিসেবে প্রতি ১০০০ মুসলমানের জন্য একজন হাজির অনুপাতে বাংলাদেশের বরাদ্দ ছিল ১,২৭,০০০ জন হাজি। প্রায় ৫০,০০০ হাজির ব্যবধানের কারণ মূলত: হজ পালনের ন্যূনতম খরচ, যা ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার মধ্যে ছিল। সে অর্থ সংগ্রহে ব্যক্তিগতভাবে অনেক বাংলাদেশি ব্যর্থ হয়েছিলেন। অতএব, ভবিষ্যতে সরকারের যাতে অধিক সংখ্যায় বাংলাদেশিরা হজ করতে পারেন সেদিকে যত্নশীল হওয়া। বাংলাদেশের ওপরে ইন্দোনেশিয়া থেকে ২,৩১,০০০ জন, পাকিস্তান থেকে ১,৭৯,০০০ জন এবং ভারত থেকে ১,৭৫,০০০ জন হাজি উপস্থিত হয়েছিলেন। এতে প্রমাণিত হয যে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যাতে অন্ততপক্ষে তার কোটা পূরণ করতে পারে, সেদিকে সরকারের লক্ষ্য রাখা।

যে সংখ্যাটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে তা হলো ইরানের। ইরান থেকে আনুপাতিক হারে ৩০,০০০ জন হাজির সমাগম হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, যার মধ্যে সৌদি আরবও অন্তর্ভুক্ত, ইরানের সঙ্গে অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকলেও, হজের বিষয়টিতে ধর্মীয় মহিমার শ্রেষ্ঠত্বের গুণে হজের সর্বজনীন বাণীর বাধ্যবাধকতা স্বতঃসিদ্ধ। পৃথিবীর ১৬৫টি দেশ থেকে মানুষ হজ পালন করতে সৌদি আরবে আর্থিক, শারীরিক এবং ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করে আল্লাহর নিকট ক্ষমা নিবেদন এবং শয়তান দ্বারা পরিচালিত পাপকাজ থেকে মুক্ত থাকার একাগ্রচিত্তে প্রার্থনার যে দৃশ্য আমরা দেখি তা সত্যই ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে হজের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ অনুযায়ী তেলনির্ভর রাজস্ব কমানোর জন্য একটি সমৃদ্ধশালী অর্থনীতি গঠনের অন্যতম পদক্ষেপ ইসলামি মূল্যবোধ এবং ঐতিহ্যকে সমুন্নত করা। এর মধ্যে সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য হজ এবং ওমরাহ পালন সহজতর করার প্রচেষ্টায় উন্নতমানের সেবা প্রদানের ব্যবস্থাপনাকে সম্প্রসারিত করা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে হজের কার্যক্রমে সবার অংশীদারত্বকে নিশ্চিত করতে হলে সৌদি আরবের বিদেশি রাষ্ট্রের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে। সেটা হলে, ভিশন ২০৩০-এর আওতায় বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য নতুন ও বিস্তৃত অংশীদারির সুযোগ তৈরি হবে।

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মভূমি হওয়ার সুবাদে সৌদি আরবের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের এক সহজাত ভালোবাসা ও আকর্ষণ রয়েছে, অধুনা সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছে। কেবলমাত্র ২০২৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ ৭,৫০,০০০ বাংলাদেশি সৌদি আরবে নতুন চাকরি নিয়ে গমন করেছেন। বর্তমানে সৌদি আরবে অভিবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ। প্রথম গন্তব্যস্থল হিসেবে বাংলাদেশ প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স হিসেবে অর্জন করে। বাংলাদেশিদের এক বিরাট অংশ অদক্ষ শ্রমসেবায় নিয়োজিত। মক্কা এবং মদিনায় প্রচুর বাংলাদেশি হজ এবং ওমরাহর সময়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং নিচু স্তরের কাজে নিয়োজিত দেখেছি। দুঃখের বিষয় হলো যেভাবে এই বাংলাদেশিদের সেবার শ্রমকে শোষণের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা উভয় দেশের জন্য অগ্রহণযোগ্য। এ শোষণের বেদনাদায়ক দিক হলো হজের সময়ে প্রতীকী প্রেক্ষাপটে তাদের দূরাবস্থার যে দৃশ্য অবলোকন করতে হয় তা সত্যিই বেদনাদায়ক। হজ বলতে বোঝায় মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য, সাম্য এবং সহমর্মিতার পরাকাষ্ঠাকে আত্মস্থ করা। তীর্থযাত্রীদের সবাই জাতি, নাগরিকত্ব এবং সামাজিক অবস্থাননির্বিশেষে একই ধরনের বস্ত্র পরিধানের মধ্যদিয়ে ইসলামের মানবিক মর্যাদা এবং সম্মিলিত ভ্রাতৃত্বের যে আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, তার পক্ষান্তরে অভিবাসী শ্রমিকদের তীর্থযাত্রায় অর্থনীতিতে যে বিশাল অবদান রয়েছে, তা দুঃখজনকভাবে এসব শোষণের জন্য, অকথিত এবং অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে।

হজ এবং ওমরাহ তীর্থযাত্রাকে বাংলাদেশ সরকার সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের কৌশল হিসেবে লক্ষায়িত করলে, ব্যক্তিগত তীর্থযাত্রীদের ধর্মীয় অভিলাষ পূরণের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যে তার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারবে বলে আমি মনে করি। সৌদি আরবের ভিশন-২০৩০-কে সামনে রেখেই সরকারকে একটি ইকো-ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে, যার মূল ভিত্তি হতে হবে, যেকোনো বাংলাদেশি যখন মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থানে গমন করবে, সে যাতে অন্যায়, শোষণ এবং অবিচারের হয়রানির সম্মুখীন না হয়। কারণ, রাষ্ট্র হিসেবে সরকারের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক অভিবাসী বাংলাদেশির মানবমর্যাদা রক্ষা করা। এই ধর্মীয় অনুশাসনটিই যেন ছিল আমার হজ পালনের প্রথম শিক্ষা।

লেখক: ডিস্টিংগুইস্ড এক্সপার্ট, অ্যাভিয়েশন 
অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত

এইচএসসি পরীক্ষা সন্তানের সবচেয়ে বড় যা প্রয়োজন

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম
সন্তানের সবচেয়ে বড় যা প্রয়োজন
দীপু মাহমুদ

এইচএসসি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কিন্তু এটা জীবনের শেষ পরীক্ষা নয়। একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার শেখার ক্ষমতা, মানসিক স্থিতি, মূল্যবোধ, পরিশ্রম এবং পরিবার থেকে পাওয়া আস্থা। যেকোনো ভালো ফল ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু প্রত্যাশার চেয়ে কম ফল কোনো সম্ভাবনাময় জীবনের দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেয় না।...

২ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। বাংলাদেশের লাখো শিক্ষার্থীর জন্য এটা শুধু একটি পাবলিক পরীক্ষা নয়, এটা কৈশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের দিকে যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রতি বছর এ সময় পরীক্ষার প্রস্তুতি, প্রশ্নের ধরন, কোচিং, সাজেশন কিংবা সম্ভাব্য ফল নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়–পরীক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা।

এই বয়সের ছেলেমেয়েদের আমরা প্রায়ই ভুল বুঝি। তারা নিজের মতো থাকতে চায়, সিদ্ধান্ত নিতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে চায়। বাইরে থেকে দেখে অনেক অভিভাবকের মনে হয়, সন্তান বুঝি পরিবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অথচ মনোবিজ্ঞান বলছে, কৈশোর এমন একটি সময় যখন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং পারিবারিক নিরাপত্তার প্রয়োজন–দুটোই একসঙ্গে কাজ করে। সন্তান স্বাধীন হতে চায়, কিন্তু একা হতে চায় না, সে নিজের পরিচয় গড়ে তুলতে চায়, আবার সংকটের মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি খোঁজে পরিবারের আশ্রয়।

কিশোর বয়স মানুষের জীবনের সবচেয়ে জটিল মানসিক পরিবর্তনের সময়। এই বয়সে আবেগ দ্রুত ওঠানামা করে, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে, বন্ধুদের প্রভাব গভীর হয়, আবার পরিবারের গ্রহণযোগ্যতা ও নিরাপত্তাবোধও সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি সাতজন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে একজন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে। উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও আচরণগত সমস্যার বড় অংশের সূচনা ঘটে কৈশোরেই। তাই এই বয়সকে শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় হিসেবে নয়, বরং মানসিক বিকাশের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময় হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের বাস্তবতাও উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের কিশোর-কিশোরীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রার মানসিক চাপের লক্ষণ বহন করে। অর্থাৎ তিনজন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে একজন উল্লেখযোগ্য মানসিক চাপে থাকে। গবেষণায় আরও দেখিয়েছে, অভিভাবকের সঙ্গে দুর্বল সম্পর্ক, অতিরিক্ত শিক্ষাগত চাপ, সহপাঠীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক চাপ মানসিক অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ। অর্থাৎ শুধু পড়াশোনার চাপ নয়, পারিবারিক সম্পর্কের গুণগত মানও একজন শিক্ষার্থীর মানসিক সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

এই গবেষণার ফল আমাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। পরীক্ষার আগে সন্তানকে আরও বেশি পড়তে বলা, আরও বেশি কোচিং করানো কিংবা অন্যের সঙ্গে তুলনা করার চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন তাকে মানসিকভাবে নিরাপদ অনুভব করানো। কারণ পরীক্ষার হলে সে একাই বসবে, কিন্তু তার আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি হয় পরিবারে।

কৈশোরের মনোবিজ্ঞান এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়। এই বয়সে মানুষের মস্তিষ্কের যে অংশ পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত, সেটির পূর্ণ বিকাশ তখনো সম্পন্ন হয় না। অন্যদিকে আবেগ, কৌতূহল এবং পুরস্কারের অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত অংশ অনেক বেশি সক্রিয় থাকে। ফলে একজন কিশোর বা কিশোরী একই সঙ্গে যুক্তিবাদী ও আবেগপ্রবণ, আত্মবিশ্বাসী ও অনিশ্চিত, স্বাধীনচেতা ও নির্ভরশীল–সবকিছুই হতে পারে। এই আচরণকে অবাধ্যতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে, বরং এটি স্বাভাবিক বিকাশের অংশ।

বাংলাদেশে অভিভাবকদের বড় অংশ সন্তানের নীরবতাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেন। সন্তান নিজের ঘরে বেশি সময় কাটালে মনে করা হয় সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। বন্ধুদের সঙ্গে বেশি কথা বললে মনে করা হয় বাবা-মায়ের আর প্রয়োজন নেই। অথচ গবেষণা বলছে, এই বয়সে কিশোর-কিশোরীরা বন্ধুদের সঙ্গে যতই ঘনিষ্ঠ হোক না কেন, সংকটের মুহূর্তে তারা এখনো পরিবারের স্বীকৃতি, সমর্থন এবং নিরাপত্তাই সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা করে। পরিবারে নিরাপদ সম্পর্ক থাকলে তাদের উদ্বেগ, হতাশা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের সম্ভাবনাও কমে যায়।

পরীক্ষাকেন্দ্রিক আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিও নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। পরীক্ষাকে আমরা প্রায়ই জীবনের চূড়ান্ত বিচার হিসেবে দেখি। ফল প্রকাশের আগেই আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলনা শুরু হয়ে যায়। এতে শিক্ষার্থীরা মনে করে, তাদের মূল্য যেন জিপিএ বা নম্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। যেকোনো পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট সময়ের প্রস্তুতির মূল্যায়ন করতে পারে, কিন্তু তার সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সহমর্মিতা কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার পূর্ণ মূল্যায়ন করতে পারে না। ইতিহাসে অসংখ্য সফল মানুষের জীবনে পরীক্ষার ফল কখনোই চূড়ান্ত পরিচয় হয়ে থাকেনি।

এখনকার পরীক্ষার্থীদের জন্য আরেকটি নতুন বাস্তবতা হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। আগে পরীক্ষার পর আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকত বন্ধুদের মধ্যে। এখন পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন, উত্তর, বিশ্লেষণ, গুজব এবং তুলনার ঝড়-বন্যা বয়ে যায়। ইউনিসেফের বাংলাদেশে পরিচালিত প্রায় ২৯ হাজার তরুণ-তরুণীর অংশগ্রহণে এক জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ, নেতিবাচক মন্তব্য ও অনলাইন বুলিং, এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট তরুণদের মানসিক চাপের বড় উৎস। একই জরিপে অর্ধেকেরও বেশি অংশগ্রহণকারী ক্ষতিকর আচরণ ঠেকাতে কার্যকর নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

এ কারণেই পরীক্ষার সময়ে সন্তানকে শুধু অফলাইনে নয়, অনলাইনেও মানসিকভাবে সহায়তা করা জরুরি। ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা, অন্যের নম্বরের সঙ্গে তুলনা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় সময় ব্যয়–এসব থেকে তাকে দূরে রাখতে হবে ইতিবাচক সংলাপের মাধ্যমে, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নয়।

ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশ এখন শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে। Mental Health Act 2018, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় স্কুলভিত্তিক Mental Health and Psychosocial Support (MHPSS) কর্মসূচি চালু হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রমেও শিক্ষার্থীদের সামাজিক-মানসিক দক্ষতার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে কোনো নীতিমালা পরিবারের বিকল্প হতে পারে না। একজন শিক্ষকের সঙ্গে একজন শিক্ষার্থীর যোগাযোগ দিনের কয়েক ঘণ্টা, কিন্তু একজন বাবা-মায়ের উপস্থিতি তার জীবনের প্রতিটি স্তরে।

এইচএসসি পরীক্ষার আগে তাই অভিভাবকদের প্রতি কয়েকটি অনুরোধ।

সন্তানকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করবেন না। পরীক্ষার আগের রাতে নতুন চাপ সৃষ্টি করবেন না। পরীক্ষা শেষে প্রথম প্রশ্নটি যেন না হয়-‘কত নম্বর পাবে?’ বরং জিজ্ঞেস করুন–‘আজ কেমন লাগল?’ ফল প্রকাশের দিনও মনে রাখুন, সন্তানের প্রয়োজন বিচারক নয়, সহযাত্রী।

যেকোনো পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি তখনই প্রকাশ পায়, যখন সন্তান জানে–সাফল্যে যেমন অভিনন্দন মিলবে, ব্যর্থতায়ও ভালোবাসা কমবে না।

এইচএসসি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কিন্তু এটা জীবনের শেষ পরীক্ষা নয়। একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার শেখার ক্ষমতা, মানসিক স্থিতি, মূল্যবোধ, পরিশ্রম এবং পরিবার থেকে পাওয়া আস্থা। যেকোনো ভালো ফল ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু প্রত্যাশার চেয়ে কম ফল কোনো সম্ভাবনাময় জীবনের দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেয় না।

এই ২ জুলাই যখন লাখো শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে যাবে, তখন তাদের হাতে থাকবে কলম, প্রবেশপত্র এবং স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে একটি বাক্য–‘ফল যা-ই হোক, আমরা তোমার পাশে আছি।’ এই বাক্যটিই হবে একজন পরীক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় মানসিক শক্তি।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য রপ্তানি বাড়াতে পণ্যে বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৩ পিএম
রপ্তানি বাড়াতে পণ্যে বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে
আবু আহমেদ

বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে পণ্যের মান বাড়াতে হবে। চীনের বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়াতে হলে পণ্যের গুণগতমান, পণ্য বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববাণিজ্যে শীর্ষ এই দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি কমানো যথেষ্ট কঠিন। বর্তমানে চীন ৯৮ শতাংশেরও বেশি বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে। এই সুবিধার আওতায় চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ, পাটজাত দ্রব্য, ফার্মাসিউটিক্যালস ও প্লাস্টিকপণ্য চীনে রপ্তানির পরিমাণ বহু গুণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।...

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বহুমুখী বাণিজ্য রয়েছে। তবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি বেড়েই চলেছে। চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্যঘাটতি কমাতে হলে চীনে রপ্তানি বাড়াতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে পণ্যের মান বাড়াতে হবে। চীনের বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়াতে হলে পণ্যের গুণগতমান, পণ্য বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববাণিজ্যে শীর্ষ এই দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি কমানো যথেষ্ট কঠিন। বর্তমানে চীন ৯৮ শতাংশেরও বেশি বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে। এই সুবিধার আওতায় চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ, পাটজাত দ্রব্য, ফার্মাসিউটিক্যালস ও প্লাস্টিকপণ্য চীনে রপ্তানির পরিমাণ বহু গুণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করতে হবে। বিশেষ করে চামড়া, ফার্মাসিউটিক্যালস, সোলার প্যানেল এবং ইলেকট্রনিক্সের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যগুলোয় চীনা বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে উৎপাদিত পণ্য চীনে রপ্তানি করে ঘাটতি কমানো সম্ভব।

তৈরি পোশাকশিল্পে ব্যবহৃত সুতা, কাপড়, রাসায়নিক পদার্থ, যন্ত্রাংশ ও যন্ত্রপাতির বড় অংশ আসে চীন থেকে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সড়ক, সেতু এবং অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পেও চীনা যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানি প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে চীন থেকে আমদানি ১৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

চীনে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষি (আম, কাঁঠাল, জাম) কৃষি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ এবং আইসিটি সেবার রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশে কাঁচামাল, সেমি ফিনিশড ও ফিনিশড পণ্যের স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে আমদানিনির্ভরতা কমে। চীনের সঙ্গে আরও বেশি ম্যাচমেকিং, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ এবং প্রাদেশিক বাজারভিত্তিক রপ্তানি কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া চীনের স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি এবং মানসম্পর্কিত বাধা দূর করতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। চীনের বাজারে আমাদের পণ্য বাড়ানোর উপায় স্বল্প মূল্যে অধিক মানসম্পন্ন মূল্যসংযোজনভিত্তিক পণ্য রপ্তানি করা।

দেশের সামস্টিক অর্থনীতির সূচকসহ রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাপী বিরাজমান কঠিন পরিস্থিতির কারণে ভীষণ চাপের মুখে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি-ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কার জরুরি।

প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বাজেট উপস্থাপনের পর প্রথম কার্যদিবসে মূল্যসূচকের উল্লেখযোগ্য উত্থান হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম। পাশাপাশি বেড়েছে লেনদেনের গতি। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে ১০০ পয়েন্টের ওপরে। লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি।

বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং তদারকির মান ক্রমাগতভাবে উন্নয়নের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া বাজেট বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারি আরও জোরদার করা দরকার। বাজেট বাস্তবায়নে উচ্চমূল্যস্ফীতি, কম কর-জিডিপি অনুপাত, খেলাপি ঋণের উচ্চহার, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।

আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। বাজেটের আকার বড় হলে রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালঞ্জে হবে। বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহার এবং সরকারের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার আলোকে বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসার পরিবেশ, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রভৃতি খাতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারবান্ধব কিছু উদ্যোগের পাশাপাশি করকাঠামোয় আনা পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে বাজেট-পরবর্তী বাজারে ক্রয়চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে বাজেটের পর প্রথম কার্যদিবসেই হয়েছে বড় উত্থান। আর্থিক খাতের ১৬টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে কমেছে পাঁচটির এবং দুটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এ ছাড়া বিমা খাতের ৪৭টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে দাম কমেছে আটটির এবং তিনটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩৫৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। তার আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ১ হাজার ২৩৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। লেনদেন বেড়েছে ১১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বাজেটঘাটতি মেটাতে স্থানীয় ব্যাংকব্যবস্থার পরিবর্তে যথাসম্ভব সুলভ সুদে ও সতর্কতার সঙ্গে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের জন্য নজর দেওয়া যেতে পারে।

পুঁজিবাজারকে আরও স্বচ্ছ, বহুমাত্রিক ও আস্থাভিত্তিক করতে মূলধন সংগ্রহ সহজীকরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা যায়। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। শিল্প, অবকাঠামো, নগর উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ এবং সম্ভাবনাময় ব্যবসা শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করলে আর্থিক খাতের ওপর চাপ বাড়ে। তাই পুঁজিবাজারকে গভীর, বহুমাত্রিক, স্বচ্ছ ও আস্থাভিত্তিক করে উৎপাদনশীল খাত ও সম্ভাবনাময় কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা হবে। ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলো কেন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হয় না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত ব্যয়, একই ধরনের কাগজপত্র বারবার দাখিল এবং অনুমোদন ও পরিপালনসংক্রান্ত অস্পষ্টতা ধাপে ধাপে কমানো হবে বলে জানা যায়। বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা অক্ষুণ্ন রেখে তালিকাভুক্তির মানদণ্ড আরও স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত এবং প্রবৃদ্ধিশীল কোম্পানির জন্য সহায়ক হবে।

দেশি কোম্পানির জন্য আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তের সুযোগ এবং বাছাইকৃত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। অনাবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ সহজ করতে এনআইটিএ হিসাব খোলা ও পরিচালনার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হবে। বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়াতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির তথ্য প্রকাশ, আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, শেয়ার মূল্যায়ন, ক্রেডিট রেটিং, আইপিও ব্যবস্থাপনা ও রিসার্চ রিপোর্টের মান উন্নত করা হবে। লেনদেনের পর শেয়ার ও অর্থ হস্তান্তর দ্রুত নিরাপদ করতে সেটেলমেন্টের সময় ধাপে ধাপে কমানো হবে। এ কথাও উল্লেখ আছে, পুঁজিবাজারসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত নিষ্পত্তি আদালত গঠনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে, যার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আইনি ক্ষমতা থাকবে। এতে বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়বে এবং বাজারে শৃঙ্খলা শক্তিশালী হবে। এসব উদ্যোগ পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্র নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ, অবকাঠামো অর্থায়ন, সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করবে, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান, আইসিবি