বাংলায় মধুমাসের জনপ্রিয় ফল হলো আম। মধুর মতো স্বাদ, অতুলনীয় রূপ ও মোহনীয় ঘ্রাণ আমকে বানিয়েছে সব ফলের রাজা। আমের আছে অসংখ্য প্রজাতি যেগুলোর মধ্যে কিছু প্রজাতি সুপরিচিত। সেগুলোর ইতিহাসও আমাদের মুগ্ধ করে।
হিমসাগর: আমের যদি রাজা থেকে থাকে তবে তা হিমসাগর। একে আদর করে খিরসাপাত নামেও অনেকে ডেকে থাকেন। স্বাদ, সুমিষ্ট ঘ্রাণ আর পুষ্টির এক অসাধারণ সমন্বয় হিমসাগরের রাজকীয় স্বাদ যে কারও মন জয় করে নিতে বাধ্য। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী এবং সাতক্ষীরার হিমসাগর তার অতুলনীয় স্বাদের জন্য দেশজুড়ে বিখ্যাত। হিমসাগরের আমের ইতিহাস বহু শতাব্দীর পুরোনো এবং মুঘল আমলে অবিভক্ত বাংলার মালদহ, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে এই আমের ব্যাপক প্রসার ঘটে। লোকেমুখে প্রচলিত ছিল যে, প্রচণ্ড গরমের দিনে এই আম খেলে অতিরিক্ত মিষ্টি রস ও শাঁস ভেতরে এক ধরনের শীতল বা ঠাণ্ডা আমেজ তৈরি করে, যা হিম বা বরফের মতো অনুভূতি দেয়। সেই সঙ্গে স্বাদের গভীরতা ও সুবাসের বিস্তৃতি বোঝাতে সাগর শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে।
ফজলি: ফজলি বা ফকিরভোগ আম বাংলাদেশের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি নাবী জাতের সুস্বাদু আম। বড় আকারের ও মিষ্টি স্বাদের আমটির পেছনে রয়েছে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এক চমকপ্রদ ইতিহাস। ঔপনিবেশিক সময়ে প্রায় ১৮০০ সালের দিকে বাংলার গৌড়ে ফজলি বিবি নামে এক বৃদ্ধা বাস করতেন। নিজস্ব চিন্তাধারা অনুসারে তিনি সন্ন্যাসী-ফকিরদের ভোগ দিতেন গাছের আম দিয়ে।
আরো পড়ুন: যে অনুষ্ঠানে হবু দম্পতিরা জঞ্জাল সাফ করেন
একদিন মালদহের কালেক্টর র্যাভেনস বৃদ্ধার বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় তৃষ্ণার্ত হয়ে তিনি ওই বৃদ্ধার বাড়িতে এসে পানি চান। পানির সঙ্গে ফজলি বিবি তাকে নিজের গাছের আমও খেতে দেন। রসালো ও সুমিষ্ট আম খেয়ে খুব ভালো লাগায় তখন তিনি সেই আমের জাতের নাম জানতে চান। কিন্তু ইংরেজি না বুঝে শুধু ‘নেম’ শুনেই নিজের নাম বলে দেন ফজলি বিবি। সেই থেকেই এই জাতের আম ‘ফজলি’ হিসেবে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এসবই লোকমুখে প্রচলিত গল্প, অনেকেই বিশ্বাস করেন না। কারণ অনেকের মতে, পঞ্চদশ শতাব্দীতে সুলতান ইউসুফের আদরের নর্তকী ফজল বিবির নামেই নাকি এসেছে ফজলি আম।
ল্যাংড়া: ল্যাংড়া আম ভারত ও বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় এবং সুস্বাদু একটি আমের জাত। প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ বছর আগে ভারতের বেনারসে (বর্তমান বারাণসী) এই আমের উৎপত্তি হয়। ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেছে, আঠারো শতকে বিহার প্রদেশে বেনারসের এক চাষি ব্যক্তি বা এক ফকির একটি বিশেষ জাতের সুস্বাদু আম খেয়ে বীজটি নিজ বাড়ির আঙিনায় রোপণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন মন্দিরের এক খোঁড়া পুরোহিত, লোকজন তাকে ল্যাংড়া পুরোহিত বলে সম্বোধন করত। সেই গাছের ফলগুলো যখন আশপাশের মানুষের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তখন সেই খোঁড়া বা শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নাম বা উপাধি অনুসারেই আমটির নাম দেওয়া হয় ল্যাংড়া আম। তবে স্থানভেদে এটি ‘বারাণসী আম’ বা পশ্চিমবঙ্গের মালদা অঞ্চলে ‘মালদা আম’ নামেও পরিচিত।
আম্রপালি: দেশের বাজারে যেসব জাতের আম পাওয়া যায় তার মধ্যে আম্রপালি বেশ জনপ্রিয়। কিছুটা নাবি জাতের আম্রপালিকে অনেকে আমের রানি বলে থাকেন। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন ভারতে আম্রপালি নামক এক নর্তকীর নামে এ আমের নামকরণ করা হয়। বিহারের বৈশালী শহরে ২৫০০ বছর আগে আম্রপালি জন্ম নেন। তিনি ছিলেন সে সময়ের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী এবং নর্তকী। তার রূপে পাগল ছিল পুরো পৃথিবী আর এই রূপই তার জন্য কাল হয়ে ওঠে। যার কারণে তিনি ছিলেন ইতিহাসের এমন একজন নারী, যাকে রাষ্ট্রীয় আদেশে নগরবধূ বানানো হয়েছিল। মাহানামন নামে এক ব্যক্তি শিশুকালে আম্রপালিকে আম গাছের নিচে খুঁজে পান। তার আসল বাবা-মা কে ইতিহাস ঘেঁটেও তা জানা যায়নি। যেহেতু তাকে আম গাছের নিচে পাওয়া যায় তাই তার নাম রাখা হয় আম্রপালি। সংস্কৃতে আম্র মানে আম এবং পল্লব হল পাতা অর্থাৎ আমগাছের নবীন পাতা।
হাঁড়িভাঙা: রংপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু ‘হাঁড়িভাঙা’ আম সম্পূর্ণ আঁশবিহীন এবং মিষ্টি স্বাদের জন্য দেশ-বিদেশে বিখ্যাত। এর উৎপত্তি রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানী গ্রাম থেকে। আমটির ইতিহাসের গোড়াপত্তন করেছিলেন নফল উদ্দিন পাইকার নামের এক বৃক্ষবিলাসী মানুষ। শুরুতে এ আমের নাম মালদিয়া ছিল। রাজা তাজ বাহাদুর সিংয়ের আমলে আমদানি করা ও রোপিত বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ছিল, যা যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। জমিদার বাগান থেকে আনা চারা পরম যত্নে কলম করে মাটির হাঁড়ি বেঁধে ফিল্টার দিয়ে পানি দিতেন। এক রাতে কারা যেন মাটির হাঁড়িটি ভেঙে ফেলে। তবে পরবর্তী সময়ে গাছটিতে বিপুল পরিমাণ আম ধরে এবং সেগুলো ছিল খুবই সুস্বাদু। বিক্রির জন্য বাজারে নিয়ে গেলে মানুষ ওই আম সম্পর্কে জানতে চায়। তখন নফল উদ্দিন মানুষকে বলেছিলেন, যে গাছে লাগানো হাঁড়িটি মানুষ ভেঙে ফেলেছিল সেই হাঁড়িভাঙা গাছের আম এগুলো। তখন থেকেই ওই গাছটির আম ‘হাঁড়িভাঙা’ নামে পরিচিতি পায়। হাঁড়িভাঙার মাতৃগাছটির বয়স প্রায় ৬৪ বছর।
জনপ্রিয় আমগুলো ছাড়াও আছে ব্রিটিশ আমলে চণ্ডিপুরের বাসিন্দা লক্ষণ চাষির স্বাদে-ঘ্রাণে অতুলনীয় লক্ষণভোগ আম। নরহাট্টার গোপাল চাষির গোপালভোগ আম। গোলাপ ফুলের মতো ঘ্রাণ ও আভা থাকায় এক প্রজাতির আমের নামকরণ হয় গোলাপখাস। আশ্বিন মাসে পরিপক্ব হয় বলে এক প্রজাতির আমের নামকরণ হয় আশ্বিনা আম। এছাড়া আরও অনেক প্রজাতির আম আছে যাদের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় না বললেই চলে। যেমন–অরুণা, মল্লিকা, কালীভোগ, সুবর্ণরেখা, তোতাপুরী, কারাবাউ, পাহুতান, ছাতাপরা, নিলাম্বরী, মিশ্রিদানা, কলাবতী, লখনা ইত্যাদি।
তারেক/
.jpg)
.jpg)