কল্পনা করুন, কোনো এক সুনসান শান্ত শুক্রবার সন্ধ্যায় জার্মানির একটি উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছেন। খলবলিয়ে হাসি-ঠাট্টার শব্দ শোনা যাচ্ছে। হবু বর ও কনে একসঙ্গে হাঁটু গেড়ে ঝাড় দিয়ে সাফসুতরো করছে উঠোনময় চীনামাটির ভাঙা থালাবাসনের জঞ্জাল। না, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি হচ্ছে পোল্টেরাবেন্ড, জার্মানির সবচেয়ে প্রাণবন্ত প্রতীকী ঐতিহ্যবাহী বিয়েপূর্ব আচারানুষ্ঠান।
শুধু হুল্লুড়েপনার নিছক এক আনন্দময় বিয়ের অনুষ্ঠান নয়, পোল্টেরাবেন্ড আরও অনেক বেশি কিছু। এ অনুষ্ঠানে পুরো সম্প্রদায়কে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং এটি সহযোগিতা, সমস্যা সমাধান ও হাস্যরসের এক ঐকতানে পরিণত হয়।
পোল্টেরাবেন্ড কী?
পোল্টেরাবেন্ড (পোল্টার্ন, যার অর্থ ‘শব্দ করা’ এবং অ্যাবেন্ড, অর্থ ‘সন্ধ্যা’) হলো একটি বিয়েপূর্ব অনুষ্ঠান, যা সাধারণত নাগরিক অনুষ্ঠানের আগের রাতে অনুষ্ঠিত হয়। এটি বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী, সহকর্মী এবং সম্প্রদায়ের সব পরিবারের জন্য উন্মুক্ত। অতিথিরা পুরোনো চীনামাটির বাসনকোসন নিয়ে আসেন এবং হবু দম্পতির সামনে আছড়ে আছড়ে সেসব ভেঙে ফেলেন। মহা আনন্দের এক ধুন্ধুমার হই-হট্টগোল শুরু হয়ে যায়। ভাঙা চীনামাটির বাসনকোসনে সয়লাব হয়ে যায় পুরো উঠোন। হবু বর ও কনেকে তখন একসঙ্গে সেসব জঞ্জাল সাফ করতে হয়। নতুন দম্পতি হিসেবে এটি তাদের প্রথম যৌথ কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা।
পোল্টেরাবেন্ডের উৎপত্তি এবং সাংস্কৃতিক শিকড়
পোল্টেরাবেন্ডের ঐতিহ্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে এবং ইতিহাসবিদদের বিশ্বাস, এর শেকড় রয়েছে খ্রিষ্টপূর্বাব্দে, যা হুল্লুড়ে শব্দের মাধ্যমে মন্দ আত্মাদের তাড়ানোর বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। চীনামাটির বাসনকোসন ভাঙার রয়েছে গভীর তাৎপর্য। যেমন-ক) অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা, খ) দুর্ভাগ্য দূর করা এবং গ) জীবনের অনিবার্য বিপর্যয়ের জন্য হবু দম্পতিকে প্রস্তুত করা। এর উদ্দেশ্য কখনোই ধ্বংসাত্মক ছিল না। বরং এর উদ্দেশ্য ছিল স্থিতিস্থাপকতা অর্জন, নবজীবন বিনির্মাণ এবং একাত্মতার চর্চা।
কী কী ভাঙা হয় আর কী কী একেবারেই ভাঙা হয় না
একটি যথার্থ পোল্টেরাবেন্ডে অতিথিরা ভাঙার জন্য আনেন পুরোনো চীনামাটির বাসনকোসন, সিরামিকের মগ বা ফুলদানি, মাটির পাত্র, মাটির ফুলদানি, টয়লেটের বাটি (হ্যাঁ, সত্যিই! তবে যদি পরিষ্কার থাকে)। কাচ, আয়না এবং স্ফটিক ভাঙা নিষিদ্ধ। কেন? জার্মান লোককাহিনী অনুযায়ী কাচ ভাঙা দুর্ভাগ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে চীনামাটির বাসনকে ইতিবাচক প্রতীকী শক্তির পাত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাসনকোসন ভাঙা জঞ্জালের স্তূপ যত পুরু হয় পোল্টেরাবেন্ডকে ততই সফল বলে বিবেচনা করা হয়। এর কোনো নির্ধারিত পোশাক থাকে না।
এই জঞ্জাল সাফসুতরো হচ্ছে হবু দম্পতির প্রথম যুগল পরীক্ষা। জঞ্জালের পরিমাণ খুব বেশি থাকে বলে এসব পরিষ্কার করা খুবই পরিশ্রমসাপেক্ষ। হবু বর ও কনের এই যৌথ পরিশ্রম যেসব তাৎপর্য তুলে ধরে তা হচ্ছে- একে অন্যের পাশে থেকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া; দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেওয়া এবং বিশৃঙ্খলাকে সহযোগিতায় রূপান্তর করা। দম্পতির ধৈর্য এবং পারস্পরিক সমঝোতা পরীক্ষার জন্য অতিথিরা বেশি বেশি থালাবাসন ভেঙে এবং নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে তাদের নাজেহাল করার চেষ্টা করেন।
তারেক
.jpg)