জয়পুরহাটের কৃষকরা পাট চাষে ভালো লাভের স্বপ্ন দেখলেও কাটার পর তা কোথায় জাগ দেওয়া হবে, তা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। সরকারি খাল-পুকুর লিজ হওয়া এবং কৃষি বিভাগের সঠিক তদারকি না থাকায় উপযুক্ত জায়গার খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছেন তারা।
জানা গেছে, সোনালী আঁশ হিসেবে পরিচিত পাট নিয়ে স্বপ্ন দেখেন জয়পুরহাটের কৃষকরা। তবে নানা প্রতিকুলতায় এবার জেলায় কমেছে পাটের চাষ। সদরের বুলুপাড়া, নিশির মোড়, বেলআমলা, কেশবপুর, দোগাছী, জামালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গত বছর ব্যাপক পাট দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এবারের চিত্র আলাদা। এসব এলাকায় অনেকেই পাট চাষ বাদ দিয়ে অন্য ফসলের চাষ করেছেন।
আগামী ২০ দিনের মধ্যে শুরু হবে পাট কাটা। চলতি মৌসুমে জেলায় ২ হাজার ৪৩৭ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে, যা গতবছরের তুলনায় ২০০ হেক্টর কম। এ থেকে উৎপাদন লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ২৯৩ বেল।
কৃষকরা জানায়, বিঘাপ্রতি জমিতে পাট চাষ করতে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। আর বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে কৃষকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পাট পঁচানোর জন্য জাগ দেওয়ার জায়গা। আশেপাশের খাল, ছোট ছোট পুকুরগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় ও মাছ চাষ করায় কমে গেছে জাগ দেওয়ার জায়গা। অনেকেই দূর-দূরান্তে উপযুক্ত জলাশয়ের খোঁজ করছেন, আবার কেউ অতিরিক্ত খরচে বিকল্প ব্যবস্থা করছেন। অধিকাংশ কৃষক জানেন না, রিবন রেটিং পদ্ধতি, এতে জায়গাসঙ্কটে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
বেল আমলা এলাকার কৃষক গোপাল চন্দ্র বলেন, ‘পাট চাষ করে বাজারে ভাল দাম না পেলে লাভ হয় না। সবচেয়ে বড় সমস্যা পাট জাগ দেওয়ার জায়গা নেই। এখন যাদের নিজস্ব পুকুর আছে তারাই পাট চাষ করে। সরকার থেকে আমরা কোনো সহযোগিতা পাই না।’
করিমনগর গ্রামের রবিউল ইসলাম বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। সেই হিসেবে আমরা পাটের দাম পাই না। পাট জাগ দেওয়ার জায়গার অভাবে এই এলাকায় এবার অনেকে পাট চাষ করেননি। পুকুর ভাড়া নিতে হয়। আবার নদীতে জাগ দিলে পাট ভেসে যায়। সরকারের পাট জাগ দেওয়ার বিষয়ে আমাদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই, আমরা জানিও না সেই পদ্ধতি। কৃষি অফিস থেকে আমাদের কোনো খোঁজও নেয় না। সরকারের কাছে আবেদন এবার যেন আমরা পাটের ন্যায্যমূল্য পাই।’
কেশবপুর গ্রামের মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, ‘এবার দুই বিঘা জমিতে পাটের চাষ করেছি। কিন্তু কয়দিন পর পাট কেটে কোথায় জাগ দিব, সেই জায়গা খুজে বেরাচ্ছি। আশপাশে কোনো পুকুর নাই। সরকারি যেসব পুকুর ছিল তা লিজ দিয়েছে। অনেকের পুকুরে মাছ চাষ করার জন্য পাট জাগ দেওয়া যায় না।’
একই গ্রামের আনিছুর রহমান বলেন, ‘আমরা পাট চাষ করে বাজারে বিক্রি করতে গেলে সঠিক মূল্য পাই না। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পাটের দামে কমিয়ে দেয়। সরকারের কাছে অনুরোধ এবার যেন আমরা পাটের মূল্যটা পাই। পাটের টাকা পাটোক (শ্রমিককে) দিতেই চলে যায়। তাহলে আমাদের পাট চাষ করে লাভ কি?’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) সাদিয়া সুলতানা বলেন, ‘অল্প পানিতে পাট পঁচানো যায়, বা রিবন রেটিং পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। রোগবালাই বিষয়ে আমাদের মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন।’
পাট চাষ কমার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আগে পাটকেন্দ্রিক অনেক শিল্প-কারখানা ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কারখানা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। তাই পাটের চাহিদা কিছুটা কমায় চাষও কমেছে। তবে সরকার থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে করে পাটের আবারও সুদিন ফিরে আসবে।’
সাগর/খাদিজা রুমি/