এটা শুধু এক মাসের অপরাধ পরিসংখ্যান নয়। এগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ১০০টি প্রশ্নচিহ্ন। প্রতিটি প্রশ্নের কেন্দ্রে আছে একই জিজ্ঞাসা–উন্নয়নের এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা কি সত্যিই আমাদের নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি আমরা এখনো অগ্রগতির সংখ্যার আড়ালে গভীর সামাজিক ব্যর্থতাকে লুকিয়ে রাখছি?...
জুন মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন মোট ১০০ জন নারী ও কিশোরী। তাদের মধ্যে ৭২ জনই শিশু। একই সময়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৪ জন, যাদের মধ্যে ১২ জন শিশু। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৩৪ জনের ওপর, যাদের মধ্যে ৩১ জনই শিশু। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ১১ জন, উত্ত্যক্তের শিকার ২৯ জন এবং সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন তিনজন। একই মাসে হত্যা করা হয়েছে ৫৪ জন নারীকে, রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন আরও ৩৩ জন। ধর্ষণের পর সাত শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
এই পরিসংখ্যান কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার ফল নয়, এটি বাংলাদেশের সংবাদপত্রের পাতায় উঠে আসা মাত্র এক মাসের ঘটনাপঞ্জি। ২ জুলাই প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ, এগুলো সেই ঘটনাগুলো, যেগুলো কোনোভাবে সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছেছে। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ, স্থানীয় প্রভাব কিংবা বিচারহীনতার আশঙ্কায় যে বিপুলসংখ্যক ঘটনা থানার জিডি কিংবা আদালতের নথিতেও পৌঁছায় না, সেগুলো এই হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে।
অপরাধতত্ত্বে একটি বহুল আলোচিত ধারণা আছে, ‘ডার্ক ফিগার অব ক্রাইম’। অর্থাৎ, সংঘটিত হলেও যেসব অপরাধ কখনোই রাষ্ট্রের নথিতে প্রবেশ করে না, সেগুলোই অপরাধের অদৃশ্য অংশ। যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে এই অদৃশ্য অংশ সাধারণত দৃশ্যমান অংশের চেয়েও বড় হয়ে থাকে। ফলে জুন মাসের ১০০ ধর্ষণের ঘটনা কেবল সংখ্যা নয়, বরং গভীরতর বাস্তবতার দৃশ্যমান প্রান্তভাগ মাত্র।
এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো–ধর্ষণের শিকার অধিকাংশই শিশু। ধর্ষণের শিকার ১০০ জনের মধ্যে ৭২ জনই শিশু। ধর্ষণের চেষ্টার শিকারদের মধ্যেও প্রায় সবাই শিশু। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকারদের অর্ধেকও শিশু। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সমাজে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে সেই জনগোষ্ঠী, যাদের নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষমতাই সবচেয়ে কম।
যেকোনো সমাজের নৈতিকতা পরিমাপের সবচেয়ে নির্ভুল উপায় হচ্ছে তার শিশুদের নিরাপত্তার মানদণ্ড। সেই বিচারে এই পরিসংখ্যান কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতির চিত্র নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক সংকটেরও দলিল।
ধর্ষণকে অনেক সময় ভুলভাবে কেবল যৌন অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। অথচ সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধতত্ত্বের গবেষণা বলছে, ধর্ষণ মূলত ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্যের অপরাধ। এটি নারীর শরীরের বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংসতা হলেও এর লক্ষ্য প্রায়ই নারীকে ভয় দেখানো, নিয়ন্ত্রণ করা এবং সামাজিকভাবে অধস্তন অবস্থানে রাখার প্রচেষ্টা। সে কারণেই যুদ্ধ, সামাজিক অস্থিরতা কিংবা দুর্বল আইনশৃঙ্খলার সময়ে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
সমকালের প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি নারী নির্যাতনের বহুমাত্রিক চরিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে। জুন মাসে বিভিন্ন ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৪ জন নারী ও কিশোরী। রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন আরও ৩৩ জন। আত্মহত্যা, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, পারিবারিক সহিংসতা, গৃহকর্মী নির্যাতন, অপহরণ, পাচার, শারীরিক নির্যাতন–সব মিলিয়ে এক মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৩৩ জন নারী ও কিশোরী। অর্থাৎ, সমস্যাটি কেবল ধর্ষণের নয়, সমস্যাটি নারীর প্রতি সামগ্রিক সামাজিক সহিংসতার।
বাংলাদেশের উন্নয়ন-আখ্যানের সঙ্গে এই বাস্তবতার গভীর বৈপরীত্য আছে। গত দুই দশকে নারীর শিক্ষার হার বেড়েছে, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বেও নারীর উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সূচকের বহু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশকেই ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু উন্নয়নের এই পরিসংখ্যান তখনই অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে পড়ে, যখন দেখা যায় মেয়েশিশু বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে নিরাপদ নয়, নারী কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে নিরাপদ নন, এমনকি অনেক সময় নিজের ঘরেও নিরাপদ নন।
আইন আছে, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আছে, কঠোর শাস্তির বিধানও আছে। অপরাধতত্ত্বের মৌলিক সত্য হলো, শাস্তির কঠোরতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চয়তা অপরাধ দমনে বেশি কার্যকর। একজন সম্ভাব্য অপরাধী মৃত্যুদণ্ডের ভয় যতটা না পায়, তার চেয়ে বেশি ভয় পায় দ্রুত ও নিশ্চিত বিচারের সম্ভাবনাকে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় তদন্তের ধীরগতি, ফরেনসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা প্রায়ই এই নিশ্চয়তাকে দুর্বল করে দেয়।
এখানে আরেকটি সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আমাদের সমাজ এখনো অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে অভ্যস্ত। অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীর পোশাক, চলাফেরা, সময় কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এই মানসিকতা শুধু ভুক্তভোগীর প্রতি অন্যায় নয়, এটা অপরাধীর জন্য সামাজিক আশ্রয়ও তৈরি করে। যে সমাজ ভুক্তভোগীকে নীরব থাকতে শেখায়, সে সমাজ অনিচ্ছাকৃতভাবেই অপরাধীকে সাহস জোগায়।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার পঞ্চম লক্ষ্য হলো নারী ও মেয়েশিশুর প্রতি সব ধরনের সহিংসতার অবসান এবং লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এই লক্ষ্য কেবল আইনের বইয়ে নতুন ধারা যুক্ত করে অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দ্রুত ও ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারব্যবস্থা, আধুনিক ও দক্ষ তদন্ত কাঠামো, শিক্ষাব্যবস্থায় পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মতির শিক্ষা এবং সর্বোপরি সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা অবকাঠামোগত সাফল্য দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক আরও সহজ প্রশ্ন–শিশু কি নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে? নারী কি নিরাপদে কর্মক্ষেত্র থেকে বাড়ি ফিরতে পারেন? কিশোরী কি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ের বদলে স্বপ্ন দেখতে পারে?
যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অনিশ্চিত থাকে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, রাষ্ট্রের নৈতিক হিসাবের খাতায় বড় ঘাটতি থেকেই যাবে।
জুন মাসের ১০০ ধর্ষণের ঘটনা তাই কেবল এক মাসের অপরাধ পরিসংখ্যান নয়। এগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ১০০টি প্রশ্নচিহ্ন। প্রতিটি প্রশ্নের কেন্দ্রে আছে একই জিজ্ঞাসা–উন্নয়নের এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা কি সত্যিই আমাদের নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি আমরা এখনো অগ্রগতির সংখ্যার আড়ালে গভীর সামাজিক ব্যর্থতাকে লুকিয়ে রাখছি?
লেখক: কথাসাহিত্যিক


