আদর্শ-নিষ্ঠার সঙ্গে ৮৬ বছরের এক বর্ণাঢ্য জীবন অতিবাহিত করেলেন প্রয়াত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। এই বর্ণাঢ্য জীবনে, কখনোই অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়াননি; ক্ষুরধর বক্তব্য, লেখনিতে সব দল-মতের ঊর্ধ্বে গিয়ে নিজের স্বর-জারি রেখেছিলেন, বরাবরই জাতিকে দেখিয়েছেন আলোর দিশা। এছাড়া গড়েছেন অসংখ্য গুণী মানুষও। পারাপারে পাড়ি জমালেও শিক্ষার্থী ও ভক্ত-অনুরাগীদের প্রত্যাশা, রেখে যাওয়া সৃষ্টি কর্মের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন আবুল কাসেম ফজলুল হক।
সোমবার (৬ জুলাই) সর্বস্তরের মানুষের ফুলেল শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় শেষ বিদায় নিলেন প্রতিথযশা এই মানুষটি। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েক দফা শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিকেলে মিরপুরের শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। এর আগে বাদ ফজর মিরপুরে পল্লবীর মসজিদুল আমান মসজিদে অধ্যাপক আবুল কাসেম বজলুল হকের প্রথম নামাজ-ই জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সকাল ১০টা শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কর্মস্থল বাংলা একাডেমিতে নেওয়া হয়। পরে একাডেমির নজরুল মঞ্চে তার কফিন রাখা হলে একে একে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সহকর্মী, লেখক, সাহিত্যিকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
এছাড়া অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন স্বাধীনতাকামী দেশপ্রেমিক ছিলেন। দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তার অবদান অবিস্মরণীয়; হয়তো এমন আলোকিত পৃথিবীতে কমই আছে। তিনি মারা গেলেও তার চিন্তা-চেতনা ও আদর্শের মধ্য দিয়ে আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন।’
অধ্যাপক ফজলুল হকের কাজ-স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে জানিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রী বলেন, ‘অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের অসমাপ্ত কাজ ও স্মৃতি ধরে রাখতে যা যা করণীয় তা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় করবে।’
পরে বাংলা একাডেমিতে আবুল কাসেম ফজলুল হকের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে বেলা ১১টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানাতে মরদেহ নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে, সেখানে বেলা ১২টা পর্যন্ত চলে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব। জাতীয় কবিতা পরিষদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই পর্বে শেষবারের মতো ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভিন্ন সমাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ।
শ্রদ্ধা নিবেদন এসে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যার শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছিলেন। জীবনের শুরুতে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমিও ওই ছাত্র সংগঠন করতাম। তার সঙ্গে বিশেষ স্মৃতি হলো তিনি আমাদের শিক্ষক ছিলেন। তাকে আমি দেখেছি, একজন চিন্তক মানুষ হিসেবে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, তিনি চেয়েছিলেন একটি প্রগতির রাজনীতির উত্থান হোক, কেননা তারাই দেশকে রক্ষা করতে পারে। তাই আমি মনে করি, মস্তিষ্ক কারো কাছে বন্ধক না রেখে আজকের তরুণ প্রজন্মরা যদি স্যারকে অনুসরণ করে, একজন চিন্তাশীল মানুষ হয়, তবে সেটিই হবে স্যারের প্রতি সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা।’
তার মৃত্যুর শূন্যতা পূরণ হবার না উল্লেখ করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘যখন দেশ-জাতি কোন সংকটের মধ্যে পড়েছে, তখনই আবুল কাসেম ফজলুল হক তার বক্তৃতা-লেখনির মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সুচিন্তা-সুবুদ্ধি এবং সংস্কৃতি ক্ষেত্রে আমাদের যে যাত্রা, তার এই সময়ে চলে যাওয়া আমাদের জন্য বিশাল একটি ক্ষতি এবং এটি পূরণ হবার নয়।’
স্মৃতিচারণ করে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, ‘স্যারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক প্রায় ৩৫ বছরের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) যখন আমি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী, তার এক বছরের পর স্যারের স্নেহের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছিল। এই সুযোগটি হয়েছিল স্যারের ও আমার গ্রামের বাড়ি এক জায়গা হওয়ার কারণে। যখন আমি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি (উপাচার্য) হলাম, কথা ছিল তিনি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন কিন্তু মৃত্যুর কারণে সেটি পূরণ হলো না।’
আবুল কাসেমের শিক্ষার্থী এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও তিনি একটি বর্ণাঢ্য জীবন অতিবাহিত করেছেন। তিনি অধ্যাপনা করতেন, ক্লাসে লম্বা বক্তৃতা দিতেন। অন্যকে উদ্বুদ্ধ করতে চাইতেন এবং বুঝিয়ে ও পরিষ্কারভাবে বলার দিকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন। যারা তার লেখা ছেপেছেন, তারা হয়ত জানেন তিনি অনবরত সংশোধন করতেন এবং নতুন করে কথা যুক্ত করতেন, কেননা নিজের কথা তিনি সব সময় পরিচ্ছন্ন রাখতে চাইতেন। তিনি আসলে সত্য-সুন্দর আদর্শের ধ্যান করতেন, সেই কল্যাণকামিতাই লিখা-বলার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাইতেন। আমি তার জীবনকে আমি একটি সফল জীবন বলব। তার একটা চমৎকার জীবনী প্রণয়ন হওয়া উচিত, কেননা তার জীবনী আমাদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।’
সাবেক অন্তর্বতী সরকারের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, ‘স্যার যখন কোন বক্তব্য দিতো, মনে হতো যেন এটি ক্লাসের লেকচার। সবসময় তিনি ইতিহাসের কনটেক্সটে কথা বলতেন। উনার এই চলে যাওয়াতে হয়ত একটি শূন্যতা অবশ্যই তৈরি হয়েছে। যেসব শিক্ষার্থী স্যারের সান্নিধ্যে পেয়েছে, তারা তার মতোই স্কলার হবেন; এটিই প্রত্যাশা। স্যারকে ভীষণ ভালোবাসি, আজকে তাকে বিদায় দিতে হচ্ছে।’
ভয় উপেক্ষা করে আবুল কাসেম ফজলুল কথা বলে গেছেন উল্লেখ করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দীন স্টালিন বলেন, ‘তিনি কখনো ভয় পেয়ে কথা বলা বন্ধ করেননি, কোন শক্তিই তার কণ্ঠকে অবদমিত করতে পারেনি। উগ্রবাদীরা তার সন্তানকে হত্যা করার পরও তিনি দমে যাননি। তার লেখনী ও সম্পাদিত পত্রিকার মাধ্যমে তিনি অবিচলভাবে কাজ করে গেছেন।’
কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বাবার জন্য দোয়া চেয়ে প্রয়াত অধ্যাপকের মেয়ে শুচিতা শারমিন বলেন, ‘সবাইকে নিয়ে আমার বাবা কাজ করতে চেয়েছিলেন। সব সময় চেষ্টা করেছেন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের যাতে ভালো হয়, সেই লক্ষ্যে কাজ করতে। তিনি সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছেন। আমি বিশ্বাস করি, আমরা সবাই তার দেখানো সেই আদর্শের পথেই চলব। আপনারা সবাই আমার বাবার আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করবেন।’
এদিকে বেলা প্রায় ১২ শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ হতে না হতে না ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়তে পরতে থাকে। এর মধ্যেই শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনে জন্য দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবুল কাশেম ফজলুল হকের মরদেহ নেওয়া হয়। বেলা ১২টা ২০ মিনিটে মরদেহবাহী ফ্রিজার ভ্যানগাড়ি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পৌঁছায়। ফ্রিজার ভ্যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছামাত্রই বৃষ্টির বেগ বাড়তে শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব অনুষ্ঠিত হবার কথা থাকলে মুষলধারে বৃষ্টির কারণে কলা ভবনের প্রধান ফটকের সামনের শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের পক্ষ থেকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন বিভাগ ও সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
শ্রদ্ধা নিবেদন এসে প্রয়াত অধ্যাপককে ফজলুল হককে শিক্ষকদের শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সুপারনিউমারি অধ্যাপক ফেরদৌস হোসাইন বলেন, ‘আবুল কাসেম হক বাংলা বিভাগের শুধু শিক্ষক না, আমাদের মতো যারা শিক্ষক রয়েছেন, তিনি সেইসব শিক্ষকদের শিক্ষক। শিক্ষকদের সেই শিক্ষক বিদায় নিলেন কিন্তু রেখে গেলেন অনেক কিছু। আমাদের উচিৎ তার রেখে যাওয়া কীর্তি সমুন্নত রাখা এবং তার আদর্শ ও চেতনা অনুসরণ করে এগিয়ে চলা।’
বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তার কর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকব এবং তাকে আজীবন স্মরণ করব। তার প্রস্থান বাংলাদেশের এক প্রতিবাদী সত্তার অবসান।’
কর্মে বেঁচে থাকবেন আবুল কাসেম ফজলুল হক উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘ফজলুল স্যার একজন বিদগ্ধ মানুষ ছিলেন। এমন একজন মানুষ চলে যাওয়াতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। মানুষটি চলে গেছে কিন্তু তার কর্ম তাকে বেঁচে রাখবে। তার জীবন-চিন্তা ও আদর্শ আমরা চর্চা করব যাতে করে তিনি তার কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকেন। সেই সঙ্গে তার যেসব অসমাপ্ত কাজ রয়েছে; আশা করি, বাংলা বিভাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমারা যারা আছি তারা তা সমাপ্ত করবে।’
কলা ভবনের সামনে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুর পৌনে ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ মসজিদুল জামি’আতে মরদেহ আনা হয়। সেখানে বাদ জোহর জানাজা শেষে মরদেহ নেওয়া হয় মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। সেখানে বিকেল সাড়ে ৩টায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে রবিবার বিকালে মিরপুরের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলা একাডেমির সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।
আরিফ জাওয়াদ/রিফাত/