ঢাকা ২০ আষাঢ় ১৪৩৩, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
৬ জুলাই থেকে ৬৪ জেলায় পদযাত্রা করবে এনসিপি সন্তানের কর্মসংস্থান চাই মোহসিন মিয়ার পুলিশ সংস্কার প্রস্তাব তৃতীয় কোনো ভাষা শেখানোর চিন্তা কতটা বাস্তবসম্মত! সিংড়ায় পুকুরে ডুবে প্রাণ গেল প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর উত্তরা মোটর্স বাংলাদেশে নিয়ে এলো ইসুজু লাক্সারি এনকিউআর বাস দেবহাটায় ব্ল্যাকমেইল করে কিশোরীকে একাধিকবার ধর্ষণ, এরপর... ‘কে পাবেন ফ্যামিলি কার্ড, তা ঠিক করবে কম্পিউটার’ ধনবাড়ীতে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় মাছ, হুমকিতে শতাধিক প্রজাতি টাকা খেলেন, জেল পেলেন! উখিয়ার ট্রে ওভেন প্রকল্প ঘুরে দেখলেন জাইকা প্রেসিডেন্ট আবারও বড় ধাক্কা খেলেন মমতা ব্যানার্জী The Grocer and the Fruit seller বিষয়ক Story Writing নিয়ে আলোচনা, ৮ম পর্ব, এইচএসসির ইংরেজি ১ম পত্র ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পের পর ম্যাকডোনাল্ডস-বাস টার্মিনাল এখন ক্লিনিক অপহরণ-মানবপাচার রোধে টেকনাফে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ চট্টগ্রামের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাজেটে অনেক পরিকল্পনা রাখা হয়েছে: অর্থমন্ত্রী খামেনির দাফন, ট্রাম্পের কটাক্ষ আর ‘রফা’ প্রসঙ্গে নতুন বিতর্ক চকবাজারে আশিক টাওয়ারের আগুন নিয়ন্ত্রণে শ্যামনগরে ১৮ লাখ ৮৩ হাজার টাকার মাদক জব্দ স্বাস্থ্যখাতে খারাপ চর্চার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে: অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশ-সৌদি আরবের সুসম্পর্ক স্থাপনে হজ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ অধ্যায়ের ১৭টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, এইচএসসির ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র অপরিচ্ছন্ন টয়লেটে স্বাস্থ্যঝুঁকি, দুর্ভোগে বেরোবির শিক্ষার্থীরা ইংল্যান্ড-মেক্সিকো ম্যাচে বজ্রঝড়ের শঙ্কা কোটচাঁদপুরে হ্যান্ডকাফসহ পালিয়েও শেষ রক্ষা হলো না আসামির বিশ্ব নাগরিক হয়ে ওঠার প্রস্তুতি আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সেমিফাইনাল, আর্জেন্টিনা-পর্তুগাল ফাইনাল, হবে কি পাগলাটে বিশ্বকাপ? ২৪ ঘণ্টায় হামে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ৮৩৩ ইসলামপুর সরকারি কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে অস্ত্রসহ কেএনএফ সদস্য আটক

আমেরিকা: ২৫০ বছরের স্বাধীনতার আলো, সংগ্রাম আর স্বপ্নের এক অনন্য ইতিহাস

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম
আমেরিকা: ২৫০ বছরের স্বাধীনতার আলো, সংগ্রাম আর স্বপ্নের এক অনন্য ইতিহাস
মোহম্মদ শরীফ

আজ ৪ জুলাই। স্বাধীনতার এমন একদিন, যা শুধু একটি জাতির জন্মদিন নয়; এটি স্বাধীনতার প্রতি মানুষের অদম্য আকাঙ্ক্ষা, গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার এবং সীমাহীন সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

১৭৭৬ সালে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্ণ করবে। আড়াই শতাব্দীর এই পথচলা কখনো সহজ ছিল না। যুদ্ধ, বিভাজন, অর্থনৈতিকসংকট, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং নানা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আজকের আধুনিক, শক্তিশালী ও উদ্ভাবনী আমেরিকার জন্ম হয়েছে।

আমেরিকার প্রকৃত শক্তি তার আকাশচুম্বী ভবন, প্রযুক্তি কিংবা সামরিক সক্ষমতায় নয়–এর প্রকৃত শক্তি তার মানুষ। প্রতিদিন ভোরে কাজে বেরিয়ে পড়া শ্রমিক, রোগীর সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও নার্স, নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে বিভোর শিক্ষার্থী, গবেষণাগারে কর্মরত বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষক এবং অসংখ্য নীরব কর্মীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে এই দেশ।

বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা অভিবাসীরা নিজেদের শ্রম, মেধা ও সততার মাধ্যমে আমেরিকাকে সমৃদ্ধ করেছেন। সেই ইতিহাসে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অবদানও অত্যন্ত গর্বের। তারা শুধু নিজেদের পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করছেন না, বরং শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, ব্যবসা ও জনসেবার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রযাত্রায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।

স্বাধীনতা শুধু একটি অধিকার নয়; এটি একটি দায়িত্ব। আইনকে সম্মান করা, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা, কঠোর পরিশ্রম করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আরও সুন্দর সমাজ গড়ে তোলাই স্বাধীনতার প্রকৃত চর্চা।

আজ আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি সেই সব নারী-পুরুষকে, যাদের সাহস, আত্মত্যাগ ও দূরদর্শিতা স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে। একই সঙ্গে সম্মান জানাই আজকের সেই সব মানুষকে, যারা প্রতিদিন নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করে আমেরিকার অগ্রযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছেন।

স্বাধীনতার ২৫০ বছরের এই গৌরবময় অধ্যায় আমাদের একটি শিক্ষা দেয়–যে জাতি পরিশ্রমকে সম্মান করে, আইনের শাসনকে ধারণ করে এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেয়, সেই জাতিই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দেয়।

আজকের এই বিশেষ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সব নাগরিক, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী বিশ্বের সব মানুষকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।

শুভ স্বাধীনতা দিবস, আমেরিকা।

লেখক: রাষ্ট্রচিন্তক; সিলিকন ভ্যালি, আমেরিকা

ব্যাংক থেকে টাকা তুললেন? প্রতারকদের সুযোগ দেবেন না

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০১:১২ পিএম
ব্যাংক থেকে টাকা তুললেন? প্রতারকদের সুযোগ দেবেন না
রিয়াজুল হক

‎ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট নেই, এরকম মানুষ পাওয়া বেশ দুষ্কর। মেয়াদি আমানত, সঞ্চয়ী আমানত কিংবা চলতি আমানতের মাধ্যমে আমরা ব্যাংকে টাকা জমা রেখে থাকি। আবার বিভিন্ন সময় অনেকের নগদ টাকার প্রয়োজন হয়। তখন জমানো টাকা ব্যাংক থেকে উঠিয়ে নিই। টাকা উঠানোর পর নিরাপত্তাই হতে হবে অগ্রাধিকার। অসাবধানতার জন্য প্রতারকরা সুযোগ পেয়ে যায়। এজন্য আমাদের অবশ্যই কিছু সাবধানতা আমাদের নেওয়া উচিত।

১) ব্যাংক থেকে টাকা উঠানোর সময় নিজের কাউকে সঙ্গে রাখার চেষ্টা করুন। বয়স্ক মানুষ অবশ্যই সঙ্গে আত্মীয়-স্বজনকে রাখবেন। তবে সঙ্গে কাউকে রাখতে গিয়ে ৭-৮ বছরের নাতি-নাতনিকে নিয়ে যদি ব্যাংকে যান, তবে সঙ্গে না নেওয়াই ভালো, কারণ তখন আপনাকে আপনার সেই অবুঝ নাতি-নাতনির দিকে বেশি খেয়াল রাখতে হবে।

২) ক্যাশ কাউন্টার থেকে টাকা নেওয়ার পর প্রয়োজনে কাউন্টারের সামনেই টাকা গুনে নিন। একই টাকা বিভিন্ন জায়গায় বসে গোনার দরকার নেই। এতে আপনার নোটের সংখ্যা বাড়বে কিংবা কমবেও না। ক্যাশ কর্মকর্তারা আপনার সামনেই সাধারণত একবার হাতে টাকা গুনে দেখার পর কাউন্টার মেশিন দিয়ে টাকা চেক করে নেন।

৩) অনেকেই থাকেন টাকা গুনে দেখার পর আবার কাউন্টারে গিয়ে ১০০০ টাকার নোট খুচরা করে দেন, এই নোট পরিবর্তন করে দেন, জাল টাকা কিনা পরীক্ষা করে দেন ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের সমস্যা নিয়ে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। টাকা ভাংতি নেওয়ার পর কিংবা অন্যান্য সমস্যা সমাধানের পর আবার টাকা সব টাকা গণনা শুরু করেন। এতে আপনি প্রতারক চক্রের চোখে পড়ে যেতে পারেন। কারণ এই ধরনের প্রতারক দ্বিধাগ্রস্থ কিংবা বয়স্ক মানুষকে বেশি টার্গেট করে।

৪) যতদূর সম্ভব ভিড়ের মধ্যে থাকবেন না। আপনাকে কেউ খেয়াল করছে কিনা কিংবা নিজে থেকে কেউ এসে পরিচিত হতে চাচ্ছে কিনা, লক্ষ্য রাখুন। ঠিক মতো কথার উত্তর না দিলে কে কি মনে করবে, এসব পাত্তা দেবেন না।

৫) ব্যাংকের ভেতর বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে ওঠা থেকে বিরত থাকুন। এই বাতিক কিছু মানুষের মধ্যে দেখা যায়। 

৬) টাকা-পয়সা নিয়ে ব্যাংকের ভিতর সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে থাকার চেষ্টা করুন। এতে আপনার ওপর যারা নজর রাখছেন কিংবা ব্যাংকের ভিতর আপনার সঙ্গে যারা কথা বলেছেন, তাদের মধ্যে কেউ অপরাধী হলে পরবর্তীতে তাদের সনাক্ত করা সহজ হবে।

৭) যদি প্রয়োজন মনে করে করেন, টাকা উঠানোর পর কিভাবে বাসায়/নির্দিষ্ট স্থানে যাবেন, তবে তার জন্য আগে থেকে পরিবহনের ব্যবস্থা করে রাখতে পারেন।

৮) ব্যাংক থেকে টাকা উঠানোর পর আশেপোশে চা-বিস্কুট, নাস্তা খাওয়া, ঘোরাঘুরি থেকে বিরত থাকুন। সোজা নিজের গন্তব্যে চলে যান। এতে প্রতারক চক্র সহজে আপনাকে টার্গেট করতে পারবে না।

৯) টাকার পরিমাণ বেশি হলে পুলিশি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

‎প্রতারণার যে কত রকম ফের হতে পারে, তার কোনো ইয়াত্তা নেই। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। সহজ সরল মানুষগুলোই বিপদে পড়ে বেশি। কারণ তারা সাবধান থাকেন না। একটা মানিব্যাগ ছিনতাইয়ের জন্য একজন অন্যজনকে খুন, জখম করছে। মানিব্যাগে সর্বোচ্চ কত টাকা থাকতে পারে? ৩ হাজার বা ৫ টাকা। সামান্য এই টাকার জন্য ছিনতাইকারী যখন একজনকে আহত কিংবা হত্যা করে, তখন ব্যাংক থেকে বেশি টাকা নিয়ে যখন আপনি বের হবেন, তখন অবশ্যই সাবধানতা জরুরি।

লেখক: অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

এইচএসসির আগেই থেমে যাচ্ছে শিক্ষা

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম
এইচএসসির আগেই থেমে যাচ্ছে শিক্ষা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ শিক্ষার্থী। সংখ্যাটি বড়, কিন্তু এর পেছনে আরও বড় একটি সংখ্যা আছে–প্রায় সাড়ে ৫ লাখ। কারণ, দুই বছর আগে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত হয়েছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে এবার ফরম পূরণ করেছে মাত্র সাড়ে ৯ লাখ। অর্থাৎ নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শেষ ধাপে এসে আর উপস্থিত নেই।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ঝরে পড়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু এই সংখ্যাটি স্বাভাবিক প্রবণতার সীমা অতিক্রম করেছে। গত বছর নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি। এক বছরের ব্যবধানে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এ হার ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৪৪ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ সমস্যাটি কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষা ধারার নয়, এটা সমগ্র মাধ্যমিকোত্তর শিক্ষাব্যবস্থার একটি কাঠামোগত সংকেত।

এই বাস্তবতাকে কেবল ‘পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। কারণ, একজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না মানে সে কেবল একটি পরীক্ষা মিস করছে তাই নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ধারাবাহিকতা থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্নটি পরীক্ষা ব্যবস্থার নয়, বরং শিক্ষা ধরে রাখার সক্ষমতার।

শিক্ষা প্রশাসনের কাছে এখনো এই বিপুল সংখ্যক অনুপস্থিতির সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। তবে বিদ্যমান তথ্য কিছু কারণ নির্দেশ করে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের একটি অংশের ওপর পরিচালিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৪১ শতাংশের বিয়ে হয়েছে। অর্থাৎ বাল্যবিবাহ ছিল সবচেয়ে বড় একক কারণ। এটা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মাধ্যমিকের পর মেয়েদের শিক্ষার ধারাক্রম ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন এখনো সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষে লিপ্ত।

অর্থনৈতিক কারণও সমানভাবে প্রভাব ফেলেছে। এসএসসি পাসের পর অনেক শিক্ষার্থী শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য একজন তরুণ সদস্যের সম্ভাব্য আয় প্রায়ই উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি লাভের চেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে উচ্চমূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং পারিবারিক ব্যয়ের চাপের সময়ে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধি। সরকারি কলেজে টিউশন ফি কম হলেও বাস্তবে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা এখন বই, কোচিং, প্রাইভেট টিউশন, যাতায়াত ও প্রযুক্তি ব্যয়সহ একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা অবৈতনিক হলেও বাস্তবে তা বহু পরিবারের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মনস্তাত্ত্বিক চাপ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা এখনো উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের প্রধান নির্ধারক। ফলে যারা কাঙ্ক্ষিত ফলের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী নয়, তাদের একটি অংশ পরীক্ষা পেছানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিবও উল্লেখ করেছেন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত বছরে পরীক্ষায় অংশ নেয় না এবং পরবর্তী বছর পরীক্ষায় বসার পরিকল্পনা করে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা আংশিক। কারণ, পরীক্ষা স্থগিতকারী শিক্ষার্থীদের কতজন পরবর্তীতে সত্যিই ফিরে আসে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্রটি কারিগরি শিক্ষায়। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলছে। কিন্তু যদি এই ধারার অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগেই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে দক্ষতা উন্নয়ন কৌশলের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে যে জনমিতিক সুবিধা বা demographic dividend-এর সম্ভাবনার কথা বলে, তার পূর্বশর্ত হলো শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণ জনগোষ্ঠী। শ্রমশক্তিতে প্রবেশের আগে বিপুলসংখ্যক তরুণ যদি উচ্চমাধ্যমিক স্তর সম্পন্ন করতে না পারে, তাহলে জনমিতিক সুবিধা প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতায় রূপ নাও নিতে পারে।
নীতিগতভাবে এ সমস্যাকে তিনটি স্তরে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

প্রথমত, নিবন্ধন থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কার্যকর ট্র্যাকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমানে শিক্ষার্থী কখন এবং কেন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ডেটা নেই।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা নীতিকে সামাজিক নীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক উপবৃত্তি কর্মসূচি শিক্ষায় ধরে রাখার কৌশলের অংশ হওয়া উচিত।

তৃতীয়ত, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি হিসেবে না দেখে দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মজীবনের প্রস্তুতির একটি ধাপ হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। কারণ, যে শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের কাছে প্রাসঙ্গিকতা হারায়, সেই ব্যবস্থায় ঝরে পড়া অনিবার্য হয়ে ওঠে।

সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি তাই কেবল শিক্ষা প্রশাসনের একটি পরিসংখ্যানগত সমস্যা নয়। এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, শ্রমবাজার, নারী শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় প্রশ্ন।

এই শিক্ষার্থীরা কোথায় গেল, কেন গেল এবং তাদের কতজনকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব–এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে জরুরি কাজ হওয়া উচিত। কারণ, একটি শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য কেবল কতজন পরীক্ষায় অংশ নিল বা কতজন ভালো ফল করল, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং নির্ধারিত হয় কতজন শিক্ষার্থীকে শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবস্থার ভেতরে ধরে রাখা গেল, তার ওপর।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

কেঁচো: মাটির নীরব শ্রমিক, কৃষির অদৃশ্য নায়ক

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম
কেঁচো: মাটির নীরব শ্রমিক, কৃষির অদৃশ্য নায়ক
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

একটি উর্বর জমির সবচেয়ে পরিশ্রমী কৃষক কে? অনেকেই হয়তো বলবেন কৃষকই। কিন্তু কৃষকেরও আগে, দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করে এমন এক নীরব কর্মী রয়েছে, যার নাম কেঁচো (Earthworm)। আমরা যাকে অনেক সময় ঘৃণার চোখে দেখি বা তুচ্ছ প্রাণী বলে মনে করি, সেই কেঁচোই প্রকৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীব। পৃথিবীর উর্বর মাটি, স্বাস্থ্যকর কৃষি, জৈব বর্জ্যব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কেঁচোর অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, বিখ্যাত বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন একে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী প্রাণী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Formation of Vegetable Mould through the Action of Worms-এ তিনি দেখিয়েছেন, কেঁচো ছাড়া উর্বর মাটির স্বাভাবিক বিকাশ কল্পনা করা কঠিন। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের জীবনমান এবং অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভর করে সুস্থ ও উর্বর মাটির ওপর। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমরা মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম প্রধান সহযোগী কেঁচোর গুরুত্ব সম্পর্কে খুব কমই সচেতন। আধুনিক কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, মাটির জৈব পদার্থের ঘাটতি, শিল্পবর্জ্য এবং পরিবেশদূষণের কারণে দেশের অনেক অঞ্চলে কেঁচোর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। এটি শুধু একটি জীবের সংখ্যা কমে যাওয়ার ঘটনা নয়; বরং মাটির স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়ার একটি নীরব সংকেত।

কেঁচোকে বিজ্ঞানীরা ‘Ecosystem Engineer’ বা বাস্তুতন্ত্রের প্রকৌশলী বলে থাকেন। কারণ তারা মাটির ভেতরে অসংখ্য সুড়ঙ্গ তৈরি করে, যার মাধ্যমে বাতাস সহজে প্রবেশ করে এবং বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে পৌঁছাতে পারে। এতে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে, গাছের শিকড় সহজে বিস্তার লাভ করে এবং মাটির গঠন উন্নত হয়। একটি সুস্থ মাটিতে কেঁচোর উপস্থিতি সেই মাটির জীবন্ত থাকার অন্যতম নির্দেশক।

কেঁচোর আরেকটি অসাধারণ অবদান হলো জৈব সার উৎপাদন। শুকনো পাতা, গাছের অবশিষ্টাংশ, গবাদিপশুর গোবর এবং রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য খেয়ে কেঁচো যে মল ত্যাগ করে, সেটিই ভার্মিকম্পোস্ট নামে পরিচিত। এই প্রাকৃতিক সারে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়ামসহ উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় নানা পুষ্টি উপাদান থাকে। একই সঙ্গে এতে প্রচুর উপকারী অণুজীব থাকে, যা মাটির জীবন্ত পরিবেশ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমে এবং কৃষি উৎপাদন আরও টেকসই হয়।

আজ বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ব্যস্ত, তখন কেঁচোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। স্বাস্থ্যকর মাটি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম। কেঁচো মাটিতে জৈব পদার্থের সঞ্চালন এবং মাটির গঠন উন্নত করার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে কার্বন সংরক্ষণে সহায়তা করে। একই সঙ্গে জৈব বর্জ্যকে দ্রুত পচিয়ে পুনরায় সম্পদে পরিণত করে, যা বর্জ্যব্যবস্থাপনায় একটি পরিবেশবান্ধব সমাধান।

বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জৈববর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্যের একটি বড় অংশ খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হয়, যা দুর্গন্ধ, রোগজীবাণু এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের উৎসে পরিণত হয়। অথচ খুব সহজেই কেঁচোর সাহায্যে এসব জৈববর্জ্যকে উচ্চমানের জৈব সারে রূপান্তর করা সম্ভব। এতে একদিকে পরিবেশদূষণ কমবে, অন্যদিকে কৃষক স্বল্প খরচে মানসম্মত জৈব সার পাবেন।

বাস্তবতা হলো, আমরা এখনো কেঁচোর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারিনি। অধিক ফলনের আশায় অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে আমরা নিজেরাই মাটির জীবন্ত প্রাণকে ধ্বংস করছি। এর ফলে মাটির জৈব পদার্থ কমে যাচ্ছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। একসময় যে জমিতে সামান্য সার দিয়েই ভালো ফলন পাওয়া যেত, এখন সেখানে আগের তুলনায় অনেক বেশি সার প্রয়োগ করতে হচ্ছে। এটি মাটির অবনতিশীল স্বাস্থ্যেরই একটি লক্ষণ।

বর্তমান সময়ে টেকসই কৃষি এবং পুনর্জীবনশীল (Regenerative) কৃষি নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা হচ্ছে। এই কৃষিব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো জীবন্ত মাটি। আর জীবন্ত মাটির অন্যতম প্রধান কর্মী কেঁচো। তাই কৃষি উন্নয়নের পরিকল্পনায় কেঁচো সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করা, কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা, মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি করা এবং গ্রাম পর্যায়ে ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন সম্প্রসারণ করা এখন সময়ের দাবি।

শুধু কৃষক নয়, সাধারণ মানুষও এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। বাসাবাড়ির জৈববর্জ্য আলাদা করে ভার্মিকম্পোস্ট তৈরি করা, অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব কৃষিপণ্য ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে আমরা প্রত্যেকেই কেঁচো সংরক্ষণে অবদান রাখতে পারি।

আমাদের দেশের অধিকাংশ শিশু প্রথম কেঁচোকে দেখে ঘৃণা করতে শেখে, ভালোবাসতে নয়। বাড়িতে, স্কুলে কিংবা আশপাশের মানুষজন প্রায়ই কেঁচোকে ‘নোংরা’ বা ‘অপ্রীতিকর’ প্রাণী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে প্রাণীটি প্রতিনিয়ত মাটিকে উর্বর করছে, জৈববর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করছে এবং আমাদের খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তি শক্তিশালী করছে, তাকে আমরা যথাযথ গুরুত্ব দিই না।

জাতীয় শিক্ষাক্রমে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা থাকলেও কেঁচোর মতো মাটির উপকারী প্রাণীর পরিবেশগত ও কৃষিগত গুরুত্ব খুব সীমিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা কেঁচোকে একটি বৈজ্ঞানিক সম্পদ হিসেবে নয়, বরং একটি সাধারণ বা বিরক্তিকর প্রাণী হিসেবেই চিনে বড় হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে কেঁচোর ভূমিকা, মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, জৈব সার উৎপাদন এবং টেকসই কৃষির সঙ্গে এর সম্পর্ক আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। শুধু পাঠ্যবই নয়, বিদ্যালয়ভিত্তিক বিজ্ঞান ক্লাব, প্রকৃতি শিক্ষা কার্যক্রম, স্কুল-বাগান এবং ভার্মিকম্পোস্ট প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখানোর সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। একটি শিশু যখন বুঝতে শিখবে যে কেঁচো তার প্রতিদিনের খাবার উৎপাদনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তখন সে আর কেঁচোকে ঘৃণা করবে না; বরং প্রকৃতির একজন নীরব সহযোগী হিসেবে মূল্যায়ন করবে।

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের কৃষিবিদ, পরিবেশবিদ, নীতিনির্ধারক এবং সচেতন নাগরিক। তাই তাদের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং মাটির জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। আমরা যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কেঁচোর গুরুত্ব শেখাতে পারি, তবে তারা শুধু একটি প্রাণীকেই রক্ষা করবে না; তারা রক্ষা করবে মাটি, কৃষি, পরিবেশ এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ।

কেঁচো আমাদের চোখে ছোট হতে পারে, কিন্তু প্রকৃতির কাছে তার অবদান বিশাল। পৃথিবীর ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি এবং সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে এই ক্ষুদ্র প্রাণীর গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করতে হবে। কারণ, মাটি যদি জীবন্ত থাকে, তবে কৃষি টিকে থাকবে; আর সেই জীবন্ত মাটির অন্যতম প্রধান প্রাণ হলো কেঁচো। কেঁচোকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; বরং আমাদের কৃষি, পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বকে সুরক্ষিত করা। কেঁচোকে অবহেলা করার সময় শেষ। এখন সময় তাকে নতুন করে মূল্যায়ন করার। কারণ, মাটি বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে; আর মাটি বাঁচানোর অন্যতম নায়ক এই ছোট্ট কেঁচো।

লেখক: পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: তিস্তা চুক্তি, করিডর ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৮:১২ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: তিস্তা চুক্তি, করিডর ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

‘উঠন্তি মুলো পত্তনে চেনা যায়’ অর্থাৎ কোনো কাজের প্রাথমিক উপসর্গ দেখেই ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বা পরিণতির পূর্বাভাস পাওয়া যায়। মেজবানের আন্তরিকতা ও উষ্ণ সংবর্ধনা দেখলে অনুমান করা যায় অতিথি কতটুকু তার কাছে সম্মানের ও গুরুত্বের দাবি রাখে। রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক পর্যায়ে এই সম্মান নির্ধারণ হয় সেই রাষ্ট্রের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক অবস্থানকে বিবেচনায় রেখে। বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে সমুদ্রসীমা, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বন্দর একদিকে যেমন অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতিতে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও এ দেশকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। উদীয়মান অর্থনীতি ও ২০ কোটি মানুষের বিশাল বাজার হওয়ায় পরাশক্তিগুলোর লোলুপ দৃষ্টি থেকে বাংলাদেশ নিজেকে আড়াল করতে সক্ষম হচ্ছে না। ফলে পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড় ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী। সম্ভাব্য কারণেই চীনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলকে রাজসিক ও আড়ম্বরপূর্ণ সৌজন্য দেখিয়েছে। এটা অবশ্যই দেশের জন্য গৌরব ও মর্যাদা বয়ে এনেছে। 

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সবকিছু ছাপিয়ে তিস্তা চুক্তি, বন্দর উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং মায়ানমারের ভেতর দিয়ে করিডর তৈরির চীনা প্রস্তাবটি প্রাধান্য পেয়েছে। বর্তমান পৃথিবীতে চীন অর্থ-সম্পদের ওপর ভাসছে বললে ভুল হবে না। ফলে চীন তার উদ্বৃত্ত তারল্য অলস ফেলে না রেখে বিনিয়োগ করা যুক্তিযুক্ত মনে করছে। বাংলাদেশকে তার ভঙ্গুর ও টালমাটাল অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে বিনিয়োগ দরকার। আবার পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক আধিপত্য ও শক্তিশালী অবস্থান এখন আর আগের মতো নেই। সুতারং চীন ব্যতিরেকে বিকল্প চিন্তা করা বা বিনিয়োগ নিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। তবে সর্বক্ষেত্রে চীনের বিনিয়োগ অর্থনীতির জন্য আদৌ কতটা ইতিবাচক হবে, সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আমাদের দেশে দক্ষ মানবসম্পদ খুবই অল্প। চীনসহ বৃহৎ বিনিয়োগকারী দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষাসহ সব দিক থেকেই অনেক পিছিয়ে আছে। ফলে সর্বক্ষেত্রে চীন অথবা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এ দেশের ব্যবসায়ীরা ধোপে টিকে থাকতে পারবে না। ইতোমধ্যে চীনের মতো আরও কিছু দেশ চিপস, চানাচুর, কেক, বিস্কুট উৎপাদনের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। বিনিয়োগ যদি ‘মাৎসন্যায়’ অবস্থা তৈরি করে, সে ক্ষেত্রে দেশীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে পারবে এবং কোন ক্ষেত্রে পারবে না তা যাচাই-বাছাইয়ের দাবি রাখে, অর্থাৎ বিনিয়োগের জন্য সংরক্ষিত খাত বা যেগুলোতে বিনিয়োগ নিষিদ্ধ তা পুনর্মূল্যায়ন করে তালিকা প্রণয়ন করা অতীব জরুরি। তা না হলে এ দেশের মানুষ গার্মেন্ট শিল্পের মতো সস্তা শ্রম দিয়ে শ্রমের মূল্যটা পাবে না। আর এ দেশের পানি, মাটি, বায়ু ও পরিবেশ দূষণ করে বিদেশিরা ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জিত নগদ লভ্যাংশ তাদের দেশে নিয়ে যাবে। ব্রিটিশরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে এ দেশ থেকে বাণিজ্যের নামে একচেটিয়া শোষণ চালাত। যাতে এমনটা না ঘটে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তাই সর্বক্ষেত্রে বিনিয়োগ যাতে সর্বগ্রাসী না হয়, তার জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশের বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে চীনা ভাষা ম্যান্ডারিন অন্তর্ভুক্তকরণ এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মানোন্নয়নে দুটি পৃথক চুক্তি করা হয়েছে। সামরিকভাবে ক্ষমতাধর, রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তারকারী এবং অর্থনীতিতে শক্তিশালী দেশগুলো ভাষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে বিশ্বময় প্রভাব বিস্তার করে। আবার পৃথিবীর অন্য দুর্বল দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে প্রভাবশালীদের ভাষা শিখতে ও সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করে। ২০১১ সালে বারাক ওবামার মেয়ে সাশা ওবামা চীনের প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওকে হোয়াইট হাউসে চীনা ম্যান্ডারিন ভাষায় অভিবাদন জানিয়েছিল। চীনা ভাষার গুরুত্ব অনুধাবন করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার মেয়ে সাশাকে স্কুলে বিদেশি ভাষা হিসেবে চীনা ম্যান্ডারিন শিখাতেন। সুতরাং চীনা ম্যান্ডারিন ভাষা আগামীর বিশ্বে প্রাধান্য বিস্তার করবে তা বলাই বাহুল্য।

চীন সফরে তিস্তা চুক্তির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে, তা আগেই অনুমান করা হয়েছিল। চীনও তিস্তায় বিনিয়োগে আগ্রহী। ইতোমধ্যে চীন সফর শেষে সংসদ অধিবেশনে অংশগ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন, ‘যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ করা হবে।’ চীন, নেপাল, ভারত ও ভুটান থেকে আসা নদীগুলো বাংলাদেশের প্রাণ প্রবাহ। কিন্তু আন্তর্জাতিক সব আইন-আদালত ও নীতি উপেক্ষা করে ভারত ৫৪টি নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ার আগ্রাসী তৎপরতার ফলে পানি প্রবাহ কমে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল মরুকরণের হুমকির মুখে পড়েছে। অথচ তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিদার বাংলাদেশ। একসময় বাংলাদেশে ১২০০-এর অধিক নদী ছিল। তবে এটা নির্জলা সত্য যে, সরকারগুলোর ভ্রান্তনীতি ও দখল-দূষণের প্রভাবে নদী মরে গিয়ে এখন ২৩০টির কাছাকাছি নেমে এসেছে। এক সময়ের প্রমত্তা নদীগুলো এখন খাল-নালায় পরিণত হয়েছে। ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ৭০ কি.মি. উজানে গজলডোবায় তিস্তা নদীতে বাঁধ দেওয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমে ২০১১ সালের পর থেকে পানি পাচ্ছে না এ দেশের উত্তরাঞ্চল। পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্রের পরেই তিস্তা চতুর্থ বৃহত্তম আন্তর্জাতিক নদী। সুতরাং দেশের উত্তরাঞ্চল বাঁচাতে হলে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতকরণ অথবা পানির বিকল্প ব্যবস্থা করা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই।

ফারাক্কা বাঁধের কারণে সুন্দরবনে পানি প্রবাহ কমে নদী, খাল ভরাট হয়ে মাছ ও বিভিন্ন জলজপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। অথচ এই বনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল ২০ লক্ষাধিক মানুষ। নদীর পানির গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়ার কারণে সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং তিস্তা ও ফারাক্কার বাঁধের কারণে অদূর ভবিষ্যতে নির্মিত বাঁধ অববাহিকায় বড় ধরনের যেকোনো বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। ফলে দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে বাংলাদেশের পানি লাগবেই। তবে অনেকেই বলছেন, তিস্তা প্রকল্পে সরকার অগ্রসর হলে ভারত সরকার ১৯৯৬ সালে ৩০ বছরের জন্য চুক্তি হওয়া ‘গঙ্গা পানি চুক্তি’ নবায়ণ করবে না। 

চীন থেকে বাংলাদেশে সাগর পথে পণ্য আনতে সর্বনিম্ম ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগে। জাহাজ থেকে মালামাল খালাসসহ সব মিলিয়ে এক মাসের অধিক সময় লেগে যায়। সে কারণে আমদানি খরচ এবং সময় দুটিই বেড়ে যায়। তারা চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে আধুনিকীকরণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চীন নিজের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে বাণিজ্য সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের কার্যক্রম প্রসার করতে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। 

মায়ানমারের মধ্য দিয়ে চীন করিডর তৈরি করার প্রস্তাব দিয়েছে। শিল্পমন্ত্রীর ভাষ্যানুযায়ী এই করিডর হলে ২৪ ঘণ্টায় চীন থেকে পণ্য আমদানি-রপ্তানি সম্ভব। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের সব পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করায় এই করিডর দু-দেশের বাণিজ্য ঘাটতি অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে। চীন বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানি করতে চুক্তি করেছে। করিডর বাস্তবায়ন হলে কাঁঠালসহ অন্যান্য কৃষি ও দ্রুত পচনশীল পণ্য রপ্তানিতে ব্যাপকভাবে সহায়ক হবে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, এই শীর্ষ পর্যায়ের সফরগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক নিয়ম-নীতি, ফটোসেশন ও কিছু কাগুজে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে পারে না। অনেকেই সমালোচনা করে বলছে, দেশের পররাষ্ট্রনীতির কেবলা পরিবর্তন করে পূর্বমুখী হয়েছে। কেবলা পূর্ব ও পশ্চিমে পরিবর্তনের চেয়ে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা এবং কাউকে রুষ্ট না করে বিনিয়োগে আকর্ষণ করা জরুরি। আর এই বিনিয়োগ ‘সদর দরজা দিয়ে আসুক বা খিড়কি দরজা দিয়ে আসুক’ সেটা বড় কথা নয়, কারণ দিন শেষে অর্থের জোগানটাই বড় কথা।

লেখক: কলামিস্ট ও সংবাদ বিশ্লেষক
[email protected]

এনসিটি পরিচালনায় বিশ্বমানের অপারেটর 'ডিপি ওয়ার্ল্ড': কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন সমীকরণ

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ১১:১০ পিএম
আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬, ১১:১৭ পিএম
এনসিটি পরিচালনায় বিশ্বমানের অপারেটর 'ডিপি ওয়ার্ল্ড': কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন সমীকরণ
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) খ্যাতনামা টার্মিনাল অপারেটর 'ডিপি ওয়ার্ল্ড' এর সাথে সরকারের আলোচনা ও দরকষাকষি চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে। হঠাৎ করেই নয়, বরং দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক মানের বন্দর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখছে। টার্মিনালটির পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতেই মূলত এই আন্তর্জাতিক জায়ান্টকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বিনিয়োগ প্রস্তাব বাংলাদেশের
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। তখন সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে একটি জিটুজি ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কাঠামোর অধীনে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকারই ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বন্দর খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশ-ইউএই জয়েন্ট পিপিপি প্ল্যাটফর্মের প্রথম ও দ্বিতীয় বৈঠকে বন্দর খাতে বিশেষ করে এনসিটিতে বিনিয়োগের বিষয়টি আলোচিত হয়। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় অনুষ্ঠিত তৃতীয় প্ল্যাটফর্ম বৈঠকে বিষয়টি ছিল অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। বর্তমান সরকারের শুরুর দিকে এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত চতুর্থ প্ল্যাটফর্ম বৈঠকেও এটি প্রধান এজেন্ডা হিসেবে আলোচনা হয়েছে। এ আলোচনার পথ ধরেই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে দরকষাকষি ও বাংলাদেশের স্বার্থ সমুন্নত রেখে বিনিয়োগ প্রস্তাব চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার।

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ইতিহাসে অন্যতম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত একটি মাইলফলক। কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বাড়াতে এটি নির্মিত হয়েছিল। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্দরের ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ২০০০ সালের দিকে এনসিটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেময়কার জেটিগুলো কনটেইনারের চাপ সামলাতে পারছিল না। এই সমস্যার সমাধানে বন্দরের নিউমুরিং এলাকায় একটি সম্পূর্ণ আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানের কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। ২০০৭ সালে টার্মিনালের জেটি ও অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ৫টি জেটি সমৃদ্ধ এই টার্মিনাল নির্মাণে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৫৮২ কোটি টাকা ব্যয় হয়। জেটি ও ইয়ার্ডের নির্মাণ কাজ শেষ হলেও বিভিন্ন কারণে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গরূপে চালু করা সম্ভব হয়নি। ক্রমান্বয়ে যন্ত্রপাতি সংযোজনের মাধ্যমে ২০১৭ সালে টার্মিনালটি পুরোদমে কনটেইনার হ্যান্ডলিং শুরু করে। চালুর পর থেকেই আধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ এই টার্মিনাল নিরবচ্ছিন্নভাবে হ্যান্ডলিং করছে। ফলে যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা কমেছে, কমেছে উৎপাদনশীলতা। টার্মিনালে ইক্যুইপমেন্ট অ্যাভেইলেভিলিটি বা যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতার (কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য যন্ত্রপাতি প্রস্তুত বা সচল থাকা) বৈশ্বিক মান যেখানে গড়ে ৯৩ শতাংশ, সেখানে এনসিটিতে এই মান প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থ্যাৎ অবকাঠামোগত সুবিধা থাকার পরও যন্ত্রপাতির পূর্ণ কার্যক্ষমতার অভাবে কাঙ্খিত মাত্রায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হচ্ছে না। এ সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ। এককভাবে সবচেয়ে বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হওয়া এই টার্মিনালে প্রতিঘন্টায় ২০-২২ টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়। আন্তর্জাতিক মান বিবেচনায় নিলে একইসময়ে ৩০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে। এতে বাড়বে কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং কমবে জাহাজের টার্ণ অ্যারাউন্ড টাইম। বিদ্যমান অবকাঠামোয় উন্নত যন্ত্রপাতি ও দক্ষতার সংযোজন এই টার্মিনালের সক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

এনসিটিতে কেন ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল অপারেটর (ITO)?
টার্মিনাল অপারেশনে ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল অপারেটর (International Terminal Operator) যুক্ত করার বিষয়টি কেবল ক্রেন বা জাহাজ পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক লজিস্টিকস চেইন এবং ভূরাজনীতির সাথে গভীরভাবে জড়িত একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কোনো দেশের প্রবেশদ্বার বা বন্দরকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে এবং এর পরিচালন ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে আন্তর্জাতিক অপারেটরদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার পেছনে যে সুদূরপ্রসারী কৌশলগত, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত কারণগুলো রয়েছে, তা

নিচে আরও বিস্তারিত ও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. বিশাল মূলধন ও বিনিয়োগ
একটি আধুনিক টার্মিনাল পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। ইন্টারন্যাশনাল অপারেটররা নিজেদের অর্থ বিনিয়োগ করে টার্মিনালে সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি স্থাপন করে। এতে একদিকে যেমন বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ে তেমনি সরকারের ওপর আর্থিক ব্যয়ের চাপ কমে।

২. সক্ষমতা
ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল অপারেটরের পরিচালনগত সক্ষমতা অনেক বেশি। তারা বিশ্বমানের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (TOS) ব্যবহার করে জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম ২৪ ঘণ্টার নিচে নামিয়ে আনতে সক্ষম। তাদের অবকাঠামোগত সক্ষমতায় রয়েছে আধুনিক মেগা-ভেসেল হ্যান্ডলিংয়ের জন্য আধুনিক ক্রেন এবং স্বয়ংক্রিয় ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা। সর্বোপরি, তাদের কৌশলগত সক্ষমতা ও বৈশ্বিক শিপিং নেটওয়ার্ক আমাদের বন্দরকে একটি আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাব-এ রূপান্তর করতে শতভাগ সক্ষম।

৩. আধুনিক প্রযুক্তি
আন্তর্জাতিক মানের অপারেটরদের অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্বয়ংক্রিয় লজিস্টিকস সফটওয়‍্যার, গ্রিন পোর্ট টেকনোলজি (পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি), আধুনিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম রয়েছে। শুধু একটি টার্মিনাল অপারেশনে নয় বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগীদের থেকে এগিয়ে থাকতে অপারেটরগুলো সর্বশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

৪. বৈশ্বিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সাথে যোগাযোগ
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় টার্মিনাল অপারেটরদের অনেকেরই নিজেদের মালিকানাধীন শিপিং লাইন আছে অথবা শীর্ষ শিপিং জোটগুলোর সাথে কৌশলগত চুক্তি আছে। ফলে যখন কোনো ইন্টারন্যাশনাল অপারেটর একটি টার্মিনালের দায়িত্ব নেয়, তারা তাদের বৈশ্বিক ক্লায়েন্টদের (শিপিং লাইন) সেই বন্দরে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ বা বাধ্য করে। এর ফলে একটি সাধারণ বা আঞ্চলিক বন্দর আন্তর্জাতিক রুটের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায়, যা দেশের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৫. স্বচ্ছতা
আন্তর্জাতিক অপারেটর সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও কাগজবিহীন 'টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম' ব্যবহার করে। রিয়েল-টাইম ডাটা ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি কনটেইনার ও জাহাজের অবস্থান কাস্টমস এবং অংশীজনদের কাছে সরাসরি দৃশ্যমান থাকে, যা মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং অন্যায্য দাবির সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এছাড়া, আন্তর্জাতিক কর্পোরেট সুশাসন, সুনির্দিষ্ট ট্যারিফ কাঠামো এবং বৈশ্বিক অ্যান্টি-করাপশন পলিসি মেনে চলার কারণে কোনো ধরনের লুকানো খরচ বা সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ থাকে না; যা নিয়মিত থার্ড-পার্টি অডিটের মাধ্যমে সরকারের কাছে সর্বোচ্চ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।

৬. দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় বন্দরে কাজ করার কারণে এই অপারেটরদের অভিজ্ঞতা থাকে ব্যাপক। ফলে তারা জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম বা বন্দরে জাহাজের অবস্থানকাল কমিয়ে আনতে পারে। দক্ষ লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্দরের সামগ্রিক কর্মক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৭. রূপান্তর (ট্রান্সফরমেশন)
একটি আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হওয়ার সাথে সাথে টার্মিনালের পরিচালনগত ও বাণিজ্যিক চেহারায় একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। বিশ্বমানের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও কাগজবিহীন 'স্মার্ট পোর্ট' এ রূপান্তরিত হয়। এর ফলে, একটি জাহাজের কনটেইনার ওঠানামার গতি ঘণ্টায় ১০-১২টি থেকে বেড়ে ৩০টিরও বেশিতে উন্নীত হয়, যা জাহাজের বন্দরে অবস্থানকাল কমিয়ে ২৪ ঘণ্টার নিচে নামিয়ে আনে। একই সাথে, অপারেটরের নিজস্ব বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের কারণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিপিং লাইন ও বিশাল মাদার ভেসেলগুলো সরাসরি এই বন্দরে ভিড়তে শুরু করে। ফলশ্রুতিতে, একটি সাধারণ আঞ্চলিক ফিডার পোর্ট রাতারাতি আন্তর্জাতিক রুটের একটি প্রধান সাপ্লাই চেইন হাবে পরিণত হয়, যা দেশের আমদানি-রপ্তানি খরচ এক ধাক্কায় প্রায় ৩০% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।

কেন ডিপি ওয়ার্ল্ড?

১. ডিপি ওয়ার্ল্ড আমিরাত সরকারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সম্পূর্ণ মালিকানা সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের। একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানি। ডিপি ওয়ার্ল্ড 'দুবাই ওয়ার্ল্ড' এর অধীনে পরিচালিত হয়। দুবাই ওয়ার্ল্ড দুবাই সরকারের একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা। দুবাই ওয়ার্ল্ডের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান পোর্ট অ্যান্ড ফ্রি জোন ওয়ার্ল্ড সরাসরি ডিপি ওয়ার্ল্ডের শতভাগ শেয়ারের মালিক। যে প্রতিষ্ঠান টার্মিনাল পরিচালনার সাথে সাথে বিভিন্ন দেশে ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপন ও পরিচালনা করে। বাংলাদেশ সরকারের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের ঐতিহাসিক, বন্ধুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সম্পর্কের কারণে এনসিটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সংযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে তুলবে। যা বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

২. আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর টার্মিনাল অপারেটর
ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম টার্মিনাল অপারেটর, যা প্রায় ৭০টিরও বেশি দেশে ৮০টি টার্মিনাল ও লজিস্টিকস কার্যক্রম পরিচালনা করে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের রয়েছে অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্বয়ংক্রিয় লজিস্টিকস সফটওয়্যার, গ্রিন পোর্ট টেকনোলজি (পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি), আধুনিক কোয়ান্টাম ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। যা প্রয়োগ করলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বজুড়ে কেবল পোর্ট অপারেটর হিসেবেই নয়, বরং একটি মাল্টি-মডাল লজিস্টিকস জায়ান্ট (সমুদ্র, রেল ও সড়কপথের সমন্বিত নেটওয়ার্ক) হিসেবে কাজ করে। রেড সী কান্ট্রি বা লোহিত সাগরের অববাহিকার দেশ এবং মধ্য এশিয়ার আজারবাইজান পর্যন্ত রেল সংযোগের উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক করিডোর উন্নয়নে কাজ করেছে ডিপি ওয়ার্ল্ড।

২. উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা
বর্তমানে এনসিটি দক্ষতার সাথে পরিচালিত হলেও বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বন্দরের দক্ষতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় টার্মিনাল অপারেটর। তাদের উন্নত অপারেটিং সিস্টেম ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনার কারণে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর গতি (হ্যান্ডলিং স্পিড) বৈশ্বিক মানের (ঘন্টায় ৩৫ একক কনটেইনার)। এর ফলে বন্দরে জাহাজের অবস্থান করার সময় বা 'টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম' বর্তমানের চেয়ে অনেক কমে আসবে। জাহাজ যত দ্রুত পণ্য খালাস করে চলে যেতে পারবে, বন্দরের সামগ্রিক দক্ষতা তত বাড়বে।

৩. বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা
ডিপি ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশে লজিস্টিকস ও অবকাঠামো খাতে প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এনসিটিতে প্রতিষ্ঠানটি যুক্ত হলে বাংলাদেশে তাদের বড় অঙ্কের বৈদেশিক বিনিয়োগের পথ সুগম হবে, যা বন্দরের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

৪. দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বৃদ্ধি
প্রস্তাব অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাওয়া যাবে, তাতে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকবে। উপরন্তু, হ্যান্ডলিং সক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় বন্দরে জাহাজের সংখ্যা এবং কনটেইনারের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘমেয়াদে কনটেইনার ভলিউম বাড়ার কারণে শুল্ক ও অন্যান্য খাত থেকে সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব আয়ের পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি হবে।

৫. বৈশ্বিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সাথে সংযোগ
ডিপি ওয়ার্ল্ডের উপস্থিতি চট্টগ্রাম বন্দরকে বৈশ্বিক শিপিং লাইন এবং লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সাথে সরাসরি যুক্ত করবে। বিশ্বের বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলোর সাথে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কৌশলগত সম্পর্ক থাকায়, তারা চট্টগ্রাম বন্দরকে তাদের প্রধান রুটে অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী হবে। এতে করে কনটেইনার পরিবহন ব্যয় কমে আসবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের বিশ্বস্ততা ও রেটিং বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া আমিরাত সরকার চালু করেছে আমিরাত শিপিং লাইন। যা তাদের লজিস্টিকস ও বন্দর ইকোসিস্টেমকে আরো বেশি শক্তিশালী করে তুলবে।

৬. আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের খরচ কমবে
টার্মিনালের কর্মক্ষমতা বাড়লে ব্যবসায়ীদের বিলম্ব মাশুল দিতে হবে না। পণ্য দ্রুত খালাস হওয়ায় ব্যবসায়ীদের লিড-টাইম (পণ্য উৎপাদন থেকে বাজারে পৌঁছানোর সময়) কমে আসবে। এর ফলে দেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্য বিশ্ববাজারে আরও বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠবে।

৭. বন্দরের ব্যয় সাশ্রয়
বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়ে নিজেরা বিনিয়োগ করবে। এ ছাড়া এখন কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির বর্তমান মূল্য পরিশোধ করে অপারেশনাল কাজে ব্যবহার করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। ফলে নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষকে বিনিয়োগ করতে হবে না, একই সাথে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির মূল্য কর্তৃপক্ষের তহবিলে যোগ হবে। এ ছাড়া যন্ত্রপাতির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় না থাকায় কর্তৃপক্ষের বার্ষিক বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে।

৮. বে টার্মিনাল ও অন্যান্য মেগা প্রকল্পে সহায়তার পথ সুগম হওয়া
এনসিটি পরিচালনার মাধ্যমে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে সফল অংশীদারিত্ব তৈরি হলে, চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল কিংবা মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও বিদেশি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অনেক সহজ হবে।

৯. মানবসম্পদ উন্নয়ন
আন্তর্জাতিক এই অপারেটরটি তাদের সাথে অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্বয়ংক্রিয় লজিস্টিকস সফটওয়‍্যার এবং গ্রিন পোর্ট টেকনোলজি (পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি) নিয়ে আসবে। এর ফলে বাংলাদেশের স্থানীয় কর্মকর্তা ও বন্দর শ্রমিকরা আধুনিক বিশ্বমানের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ পাবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক বন্দর ব্যবস্থাপনার মানবসম্পদকে দক্ষ করে তুলবে।

টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড, নিরাপত্তার চাবিকাঠি দেশ ও বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তি হবে শুধুমাত্র 'টার্মিনাল অপারেশন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা' সংক্রান্ত, কোনোভাবেই নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের বিষয় নয়। বন্দর এলাকার সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বহির্নোঙ্গর নজরদারি এবং সাইবার গেটওয়ে নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও দেশীয় নিরাপত্তাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দর একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং আইএসপিএস (ISPS) কোড কমপ্লায়েন্ট বন্দর। এই বৈশ্বিক কোডের নিয়ম অনুযায়ী, টার্মিনালের চূড়ান্ত নিরাপত্তার চাবিকাঠি থাকবে বন্দরের হাতে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের নিজস্ব বা বিদেশি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী আমাদের পূর্বানুমতি এবং কঠোর স্ক্রিনিং ছাড়া বন্দরের স্পর্শকাতর কোনো ডেটা বা সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করতে পারবেন না।

নিয়মিতভাবে বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংস্থা (যেমন ইউএস কোস্ট গার্ড এবং আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন-IMO) দ্বারা অডিট হয় বন্দরে। চট্টগ্রাম বন্দর সর্বদা 'নিরাপত্তা ঝুঁকিমুক্ত' ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়ে আসছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো একটি আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর নিজেদের বাণিজ্যিক সুনাম ধরে রাখতেই ISPS কোডের নিরাপত্তা মানদণ্ড শতভাগ মেনে চলতে বাধ্য। নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো সামান্যতম গাফিলতি বা বিচ্যুতির ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষের 'জিরো টলারেন্স' নীতি বলবৎ থাকবে এবং প্রস্তাবিত চুক্তি বাতিলের কঠোর আইনি ধারা রয়েছে। এ ছাড়া ডিপি ওয়ার্ল্ড বন্দরে যে স্বয়ংক্রিয় টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (TOS) ব্যবহার করবে, তার প্রতিটি ডেটা এবং সিসিটিভি (CCTV) ফিড রিয়েল-টাইমে বাংলাদেশ কাস্টমস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবং দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে সরাসরি সংযুক্ত থাকবে। ফলে বন্দরের ভেতরে কোন কনটেইনার আসছে বা যাচ্ছে, তার প্রতিটি তথ্যের ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। তথ্য পাচার বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো প্রযুক্তিগত সুযোগ থাকবে না।

ল্যান্ডলর্ড মডেলের উৎকৃষ্ট প্রয়োগ
বিশ্বজুড়ে আধুনিক এবং বড় বড় সমুদ্রবন্দরগুলোর প্রায় ৮০% এরও বেশি বর্তমানে 'ল্যান্ডলর্ড মডেল' নীতিতে পরিচালিত হয়। রটারড্যাম, সিঙ্গাপুর, কিংবা দুবাইয়ের মতো বিশ্বসেরা বন্দরগুলো এই মডেল ব্যবহার করেই সফল হয়েছে। একটি আধুনিক বন্দর চালাতে প্রতিনিয়ত শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। ল্যান্ডলর্ড মডেলে এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের দায়িত্ব বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক অপারেটরের ওপর চলে যায়। ফলে সরকারের বা সাধারণ জনগণের ট্যাক্সের টাকা এই ঝুঁকিপূর্ণ বাণিজ্যিক বিনিয়োগে খরচ করতে হয় না। রাষ্ট্র সেই টাকা শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অন্যান্য সামাজিক খাতে ব্যবহার করতে পারে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোনো নষ্ট যন্ত্রপাতি মেরামত করতে বা নতুন প্রযুক্তি কিনতে দীর্ঘ আইনি ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা বন্দরের গতি কমিয়ে দেয়। বেসরকারি অপারেটররা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক নিয়মে চলে। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হয় এবং আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনের সাথে তাদের সরাসরি যোগাযোগ থাকে। এর ফলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়ে এবং জাহাজের বন্দরে অবস্থানকাল কমে যায়। অনেকের মনে ভয় থাকে, বেসরকারি বা বিদেশি কোম্পানিকে দিলে দেশ বন্দর হারাতে পারে। ল্যান্ডলর্ড মডেল এই ভয়কে সম্পূর্ণ দূর করে। এই মডেলে বন্দরের জমি, জেটি, জলসীমা এবং যাবতীয় স্থাবর সম্পত্তির মূল মালিকানা চিরকাল রাষ্ট্রের হাতেই থাকে। কোম্পানিটিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য 'অপারেশন বা পরিচালনার লাইসেন্স' দেওয়া হয়। মেয়াদ শেষে বা শর্ত ভঙ্গ করলে সরকার যেকোনো সময় তাদের বের করে দিতে পারে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো গ্লোবাল অপারেটরদের নিজস্ব বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক থাকে। তারা যখন কোনো বন্দরে যোগ দেয়, তখন বিশ্বের বড় বড় শিপিং লাইনগুলো সেই বন্দরে আসতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এর ফলে বন্দরে জাহাজের আগমন বাড়ে। অপারেটর লাভ করুক বা না করুক, ল্যান্ডলর্ড মডেলের চুক্তি অনুযায়ী রাষ্ট্র প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্থির রয়‍্যালটি, লিজ রেন্ট এবং প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ওপর নির্দিষ্ট ফি সরাসরি পেয়ে যায়। অর্থাৎ, ঝুঁকি ছাড়াই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত হয়। এ ছাড়া একই সংস্থাকে যখন নিয়ম বানাতে হয় এবং নিজেই সেই নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে হয়, তখন সেখানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা দক্ষতার অভাব দেখা দিতে পারে। ল্যান্ডলর্ড মডেল এই দুটি কাজকে আলাদা করে দেয়। সরকার বা বন্দর কর্তৃপক্ষ এখানে কাজ করে 'রেগুলেটর' হিসেবে (নিরাপত্তা, ট্যারিফ ও আইন দেখবে)। আর বিদেশি বা বেসরকারি অপারেটর কাজ করবে, যারা শুধু ব্যবসা ও অপারেশন চালাবে। এতে বন্দরের সার্বিক সুশাসন নিশ্চিত হয়।

বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক সুদূরপ্রসারী ও কৌশলগত
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, গতিশীল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে আরব আমিরাত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক অংশীদার। মূলত শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এই তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে।

১. শ্রমবাজার এবং রেমিট্যান্স
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ১২ লাখের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি বসবাস করছেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। সংখ্যার দিক থেকেভারতীয় ও পাকিস্তানি প্রবাসীদের পরেই বাংলাদেশিদের অবস্থান। সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ রেমিট্যান্স উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরব আমিরাত থেকে গড়ে বছরে ৪ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন (৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বাংলাদেশে এসেছে।

মাসিক গড় প্রবাহ
বর্তমানে আরব আমিরাত থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৩৫ কোটি থেকে 4৬ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স ব্যাংকিং চ্যানেলে বাংলাদেশে আসে। চলতি বছরের মে মাসের এক মাসের হিসাবেই দেশটি থেকে প্রায় ৪৬ কোটি ৮১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

২. দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য
দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলার। দুই দেশই এই বাণিজ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।

৩. বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন
Currently বাংলাদেশে শীর্ষ ৫টি বিনিয়োগকারী দেশের একটি হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। সাম্প্রতিক সময়ে তারা বাংলাদেশের জ্বালানি, বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে বড় বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে।

৪. সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চুক্তি ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ককে সাধারণ পর্যায় থেকে 'কৌশলগত অংশীদারিত্বে' রূপান্তরের চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো CEPA (Comprehensive Economic Partnership Agreement) বা ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি। এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে দুই দেশের বাণিজ্য শুল্কমুক্ত হবে এবং বিনিয়োগের প্রবাহ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

চট্টগ্রাম বন্দরকে এগিয়ে নিতে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে ডিপি ওয়ার্ল্ডের অন্তর্ভুক্তি কেবল একটি টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার চুক্তি নয় বরং এটি বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে এগিয়ে যাওয়ার এক দূরদর্শী কৌশল। গ্লোবাল লজিস্টিকস জায়ান্ট ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাত ধরে যুক্ত হবে বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ও আধুনিক প্রযুক্তি। আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত 'ল্যান্ডলর্ড মডেল' এবং 'আইএসপিএস কোড'-এর দ্বিমুখী সুরক্ষাকবচের কারণে একদিকে যেমন বন্দরের মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব শতভাগ অক্ষুণ্ণ থাকছে। নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক 'আইএসপিএস (ISPS) কোড' নিশ্চিত করবে বন্দরের বাণিজ্যিক গতি বাড়লেও এর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার চাবিকাঠি সবসময় বন্দর কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতেই সুরক্ষিত থাকবে। বৈশ্বিক মানদণ্ড এবং জাতীয় স্বার্থের এই সুষম সমন্বয় চট্টগ্রাম বন্দরকে আগামী দিনে আঞ্চলিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।

সুফি বিশ্বাস: কলাম লেখক