আমাদের সমাজে নারীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে হেনস্তার মুখোমুখি হতে হয়। কারাতে জানা থাকলে নারী নিজেকে অনেক বৈরী পরিস্থিতি থেকে সহজে রক্ষা করতে পারে। নারীর আত্মরক্ষায় কারাতে কীভাবে সহায়তা করে তা নিয়ে এবারের আয়োজন।
বর্তমান সমাজে নারীর নিরাপত্তা দিন দিন কমে যাচ্ছে। নারী আসলে কোথায় নিরাপদ–এ বিষয়ে আমরা কেউই জোর দিয়ে কিছু বলতে পারি না। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় নারী ও শিশুদের নেতিবাচক সংবাদ মনকে বিষিয়ে তোলে। সব সময় কন্যাদের নিয়ে পরিবারে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করতে থাকে। ঘরে-বাইরে সর্বত্র কন্যাসন্তান খুবই অনিরাপদ। ভীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় মাঝে মধ্যেই। তাই নারীর আত্মরক্ষায় কারাতে শেখা একটি অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারাতে জাপানি শব্দ, এর অর্থ ‘খালি হাত’। কারাতে হলো খালি হাতে এক ধরনের ‘মার্শাল আর্ট বা মল্লযুদ্ধ। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কারাতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর বিচিত্র কলাকৌশলের কারণেই অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারাতের উদ্ভব সম্পর্কে চীন ও জাপানে একটি উপকথা রয়েছে। বৌদ্ধধর্মে প্রাণী হত্যা নিষিদ্ধ। তাই খ্রিষ্টীয় ৫০০ শতকে বোধিধর্ম যখন বৌদ্ধধর্ম প্রচারের উদ্দেশে হিমালয় অতিক্রম করে ভারত থেকে চীন গেলেন, সে সময় শ্বাপদসংকুল যাত্রাপথে বন্যপ্রাণী ও দস্যু-তস্করের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য যে কৌশল অবলম্বন করেন পরবর্তী সময়ে সে পদ্ধতিই চীন ও জাপানে খালি হাতে আত্মরক্ষা বা কারাতে হয়ে ওঠে।
অনেকে মনে করেন, কারাতে মানেই মারামারি। কিন্তু এটি ভুল ধারণা মাত্র। এটি একটি আর্ট। যা চর্চা করলে শরীর ঠিক থাকে। আমাদের যেখানে প্রতিদিন ব্যায়াম করার প্রয়োজন, সেখানে আমরা কারাতে শিখলেও পারি। কারাতে চর্চা করলে রক্ত সঞ্চালন ঠিক থাকে। মন ভালো থাকে। শারীরিক বৃদ্ধি দ্রুত হয়। অতিরিক্ত মেদ থাকলে কেটে যায়। হতাশা বা নেতিবাচক অনুভূতিও তৈরি হয় না।
সমাজে বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নারীদের জন্য কারাতে একটি অত্যন্ত কার্যকরী হাতিয়ার। কারাতে নারীদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তাই কারাতে শেখেন এমন কয়েকজন নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। দেখা গেছে, যারা কারাতে শেখার পর অনেক নারীর আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে।
ঢাকার কাঁটাবন এলাকায় থাকেন মালিহা কবির জয়া। তিনিএকজন সরকারি চাকরিজীবী । তাকে সব সময় অফিসের কাজে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। তাই তিনি নিজের আত্মরক্ষার জন্য কারাতে শেখেন বাংলাদেশ কারাতে একাডেমিতে। কারাতে শেখার পর এখন তার আর বাইরে বের হতে ভয় লাগে না এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি যে কোনো সিচুয়েশন হ্যান্ডেল করতে পারেন। তিনি বলেন, কারাতে শুধু আত্মবিশ্বাস তৈরি করে না বরং শরীর ফিট রাখতেও সহায়তা করে।
ওয়াফা জারিন ক্লাস সিক্সের শিক্ষার্থী। থাকে হাতিরপুল এলাকায়। কারাতে কেন শিখেছে এ প্রশ্নের জবাবে সে বলে, আমার আম্মু চাকরি করে। তাই আমার যাতে সময় কাটে এবং খেলার বন্ধু পাই তাই বাসার পাশে কারাতে একাডেমিতে তিনি আমাকে ভর্তি করিয়েছেন। কারাতে শেখার জন্য আম্মু আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন। ঢাকা শহরে বা যেসব শিশু বাসায় একা থাকে তারা সহজেই ভীতু প্রকৃতির হয়। কিন্তু কারাতে মনোবল বাড়ায়। এটাও একটা কারণ ছিল আম্মুর আমাকে কারাতে শিখতে ভর্তি করানোর।
প্রথমা প্রিয়দর্শিনী থাকেন ধানমন্ডি এলাকায়। কারাতে শিখতে তার মা তাকে বাংলাদেশ কারাতে একাডেমিতে ভর্তি করিয়েছেন। কারাতে শিখে তার মধ্যে কী ইম্প্রুভমেন্ট এসেছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কারাতে শেখার উপকারিতা অনেক। কারাতে হচ্ছে মূলত খালি হাতে আত্মরক্ষার কৌশল। কারাতে হলো ৫০ শতাংশ হাতের কাজ ও ৫০ শতাংশ পায়ের কাজ। এটাতে আত্মরক্ষা করা শেখায় বেশি। আমার ধারণা কারাতে শিখে আমার মনোবল অনেক বেড়েছে এবং অন্যদের চেয়ে বেশি। সাহস বেড়েছে, আমাকে কেউ আক্রমণ করলে আমি সহজেই আত্মরক্ষা করতে পারি। প্রয়োজনে আক্রমণও করতে পারব, যদিও এখনো তা করার প্রয়োজন পড়েনি।আম্মু আমাকে কখনো মারতে এলে আমার অটোমেটিক ডিফেন্স চলে আসে। কিন্তু আমি সহজে অ্যাটাক করি না। আমার ফিটনেস বলব অনেক ভালো। আমি আল্লাহর রহমতে অসুস্থ খুব কম হই। কারাতে নিয়মিত চর্চার কারণে প্রচুর পরিশ্রম করতে পারি। ভালো খেতে পারি। শরীর-মন ভালো থাকে। অনেক বন্ধু হয়েছে। আমার ইচ্ছা আছে আমি একদিন ন্যাশনাল গেমস বা বাংলাদেশ গেমস হয়ে খেলতে পারব এবং সামনে অংশ নেব ইনশাল্লাহ।’
মেয়েদের কারাতে কেন শেখা উচিত এ বিষয়ে বাংলাদেশ কারাতে একাডেমির হেড কোচ আওলাদ হুসেইন বলেন, আমাদের দেশের নারীরা এখন সব দিক দিয়ে এগিয়ে, ফুটবল থেকে শুরু করে ক্রিকেট সব জায়গায় সাফল্য অর্জন করছে। ১৩তম এসএ গেমসে ২০১৯ সালে স্বর্ণপদক জয়ী মারজানা আক্তার প্রিয়া ও হোমায়রা আক্তার অন্তরা স্বর্ণপদক জয় করেছেন। আমি মনে করি নারীরা কারাতে-তে আবারও স্বর্ণপদক অর্জন করবেন। এখন নারীরা অনেক সচেতন তারা তাদের আত্মরক্ষার জন্য কারাতে শিখতে আসছেন। কারাতে শুধু নারীকে আত্মবিশ্বাসীই করে না বরং শারীরিকভাবে ফিট থাকতে ও মনকে ভালো রাখতে সহায়তা করে। আমি মনে করি প্রত্যেক মা-বাবার উচিত শিশুকে ছোট থেকে কারাতে শেখানো। এর ফলে শিশুর শারীরিক গঠন যেমন ঠিক থাকে তেমনি মানসিকভাবেও সে সুস্থ থাকে। যা তার বিকাশে অনেক সহায়তা করে। সরকারেরও উচিত প্রতিটা স্কুল কলেজে কারাতে শিখা বাধ্যতামূলক করতে যাতে করে সব মেয়ে কারাতে শিখতে পারে।
.jpg)