ঢাকার নবাবগঞ্জের পানালিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া মাধুরী বণিকের বয়স প্রায় ৭০। বইপ্রেমীদের মাঝে বই বিলিয়ে দেওয়া যার প্রধান কাজ। খুব ভোরে ঘুম ভাঙার পর প্রাত্যহিক কাজ সেরে ঝোলায় বই নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। যান গ্রামের ঘরে ঘরে। মূলত মায়েদের কাছে তিনি বই দিতে বেশি যান। যার যে বই পছন্দ হয় পড়তে দিয়ে আসেন। আবার আগের দেওয়া বই ফেরত নিয়ে আসেন।
মাধুরী বই বিলি করেন মানুষকে জ্ঞানের আনন্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। কাজটা করেন একেবারেই বিনা পয়সায়। পাশাপাশি সপ্তাহে পাঁচ দিন শিশুদের পড়ান। এটিও বিনা পয়সায়।
২০০২ সালে মাত্র পাঁচটি বই দিয়ে পাঠাগার শুরু করেছিলেন মাধুরী বণিক। তখনো তিনি বিশেষ করে নারীদের বই পাঠে উৎসাহিত করতেন। তার স্লোগানও ‘মায়েদের জন্য বই’। এখন তার পাঠাগারের বইয়ের সংখ্যা ছয় শতাধিক। এসবের মধ্যে আছে গল্প, কবিতা, উপন্যাস ছাড়াও মনীষীদের জীবনী ও গবেষণাধর্মী বই। বইগুলোর বেশির ভাগই অন্যদের কাছ থেকে সহায়তা হিসেবে পাওয়া। মাধুরী বণিক বলেন, ‘সমাজে এখন নীতি-নৈতিকতার অভাব। দিন দিন অবক্ষয় বাড়ছে। এসব রোধে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তাই মায়েদের বই পড়ানোর মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করার চেষ্টা করছি। কারণ মায়েরা বই পড়লে তাদের সন্তানরাও সুশিক্ষিত হবে।’
১৯৬৮ সালে তৎকালীন নবাবগঞ্জ গার্লস হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন মাধুরী। গ্রামে লেখাপড়া জানা লোক ছিল হাতে গোনা। একদিন মাধুরী তার মা মিলন দাসী বণিককে বললেন, তিনি স্কুলে না যাওয়া আশপাশের কিছু শিশুকে পড়াতে চান। শুনে খুশি হয়েছিলেন মা। উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, খুব ভালো কথা। তখন বাড়ির উঠানে মাদুর বিছিয়ে শিশুদের বর্ণমালা শেখাতে শুরু করেন মাধুরী। কিশোরী মাধুরীর সেই পাঠশালা এখন হয়েছে ‘মা ও শিশু শিক্ষাকেন্দ্র’।
সেখানে শিশুদের পাশাপাশি নিরক্ষর মায়েদের অক্ষরজ্ঞান দেওয়া হয়। এখনো চট কিংবা মাদুর বিছিয়ে গাছতলা কিংবা বাড়ির উঠানে শিশুদের পাঠদানের কাজ করছেন মাধুরী। পাঠশালায় আসতে আগ্রহী করতে ছুটির সময় শিশুদের হাতে চকলেট, বিস্কুটসহ বিভিন্ন কিছু উপহার দেন। ভবিষ্যতে তাদের স্কুলব্যাগ, টিফিন বক্স, ছাতা ও বইখাতা দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তার।
স্কুলে পড়ার বয়স থেকেই অল্প অল্প অর্থ জমিয়ে অবহেলিত মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছেন মাধুরী। নবাবগঞ্জে নারীদের প্রথম সংগঠন ‘নবাবগঞ্জ মহিলা সংঘ’ প্রতিষ্ঠার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল মাধুরীর।
কাজটা শুরু করেছিলেন নিজের গ্রাম পানালিয়া থেকে। এখন আশপাশের সামসাবাদ, কাসেমপুর, নবাবগঞ্জ ও সুরগঞ্জ এলাকার লোকদেরও বই পড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। এসব গ্রামের মানুষ বলছে, মাধুরী জ্ঞানের আলো বিলিয়ে সমাজ থেকে অশিক্ষা ও কুসংস্কার দূর করতে ভূমিকা রাখছেন। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাধুরী সেই কঠিন কাজটিই এখনো করে যাচ্ছেন। নবাবগঞ্জ বাজারে একটা জুতার দোকান চালান মাধুরী। সেখান থেকে আয়ের একটা অংশ ব্যয় করেন শিক্ষার্থীদের পেছনে।
ব্যক্তিগত জীবনে মাধুরী অবিবাহিত। সমাজের জন্য কাজ করতে গিয়ে তার আর ঘর-সংসার করা হয়নি। এখন শরীর ততটা সায় দেয় না। তবু মনের জোরে বই হাতে চলেন এ-পাড়া ও-পাড়া। পানালিয়ার পৈতৃক ভিটায় তিনি একাই থাকেন। মাধুরী স্বপ্ন দেখেন, তার পাঠাগারটি একদিন অনেক বড় হবে, সেখান থেকে এলাকার মানুষ বই নিয়ে পড়ে আনন্দ পাবে, বাড়বে জ্ঞানের পরিধিও।
পৈতৃক সূত্রে ২৫ শতাংশের মতো জমি পাওয়ার কথা মাধুরীর। সেই জমিসহ নিজের যা আছে তা পাঠাগারের নামে দান করে যেতে চান। তার মৃত্যুর পরও যেন জ্ঞানের আলো ছড়ানোর কাজটা অব্যাহত থাকে, সেটাই প্রত্যাশা মাধুরীর।
/ফারজানা ফাহমি
.jpg)