বাংলাদেশের কারুশিল্প আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন রুবি গজনবী। তিনিই প্রথম এ দেশের মানুষের কাছে প্রাকৃতিক রং পরিচিত করে তোলেন। ১৯৭৯ সালে প্রাকৃতিক রঙের বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য ভারতের একটি কারুশিল্পের ওয়ার্কশপে যান। সেখানে কমলা দেবি তাকে প্রাকৃতিক রং নিয়ে কাজ করতে বলেন। ঢাকায় এসে জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান, রশিদ চৌধুরীদের সঙ্গে একটি কারুশিল্পের ন্যাশনাল এক্সিবিশন করেছিলেন ১৯৮২ সালে। এরপর ভাবেন কীভাবে প্রাকৃতিক রঙের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়।
গাছের গুড়া, ফুল, পাতা, পেঁয়াজের খোসা এমন কোনো সবজি নেই যা দিয়ে তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেননি। ভারত থেকে শিখে আসেন ছয়টি রং তৈরির কৌশল। এখানে তিনি তৈরি করেন আরও ৯টি রং। এভাবে তিনি মোট ১৫টি প্রাকৃতিক রং তৈরি করেন। এরপর তিনি ইউএনডিপির একটি ফান্ড নিয়ে শুরু করেন গবেষণা। সেখানে দুই বছরের মাথায় তৈরি করেন আরও ১৫টি রং। মোট তৈরি হয় ৩০টি প্রধান রং। মূলত রুবি দেশের প্রতি একটা দায়িত্ববোধ থেকে কাজ করেন প্রাকৃতিক রং দিয়ে। তার প্রচেষ্টায় প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার শুধু টেকসই শিল্পের দিকেই নয়, বরং বাংলাদেশি কারুশিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
১৯৩৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন রুবি গজনবী। বাবার চাকরির সুবাদে কলকাতায় কেটেছে তার স্কুলজীবন। পড়েছেন লরেটো স্কুলে। যা ছিল তার সৃজনশীল বিকাশের ভিত্তি। দেশভাগের পর পরিবারসহ বাংলাদেশে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে অর্থনীতিতে অনার্স এবং মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তার শিক্ষাজীবন তাকে কারুশিল্পের অর্থনৈতিক দিকগুলো নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়ের কাজ দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন এবং বাংলাদেশের কারুশিল্প উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত করার প্রতিজ্ঞা করেন।
রুবি গজনবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রাকৃতিক রঙের পুনরুজ্জীবন। ১৯৮২ সালে তিনি এই প্রকল্প শুরু করেন এবং মাত্র ছয়টি রং নিয়ে কাজ শুরু করলেও, পরে তা আরও প্রসারিত হয়। প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার নিয়ে তার কাজের সবচেয়ে বড় মাইলফলক ছিল ১৯৯০ সালে ‘অরণ্য ক্রাফট’ প্রতিষ্ঠা। এই প্রতিষ্ঠান ভেজিটেবল ডাই ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব পোশাক তৈরির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তার প্রচেষ্টায় প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার শুধু টেকসই শিল্পের দিকেই নয়, বরং বাংলাদেশি কারুশিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এরই মাঝে ১৯৮৫ সালে পটুয়া কামরুল হাসানসহ সমমনা ব্যক্তিরা বাংলাদেশের কারুশিল্প ও কারুশিল্পীদের উন্নয়নে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ।
বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রুবি গজনবী কারুশিল্পের উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে পরিষদের প্রেসিডেন্ট ও নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার সংগঠকসুলভ দক্ষতার ফলে ২০১৮ সালের জামদানি উৎসবটি স্মরণীয় হয়ে ওঠে। এই উৎসবের মাধ্যমে জামদানিকে সোনারগাঁওয়ে ওয়ার্ল্ড ক্রাফট সিটির স্বীকৃতি এনে দেন। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে জামদানির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রুবি গজনবী কারুশিল্পের উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে পরিষদের প্রেসিডেন্ট ও নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার সংগঠকসুলভ দক্ষতার ফলে ২০১৮ সালের জামদানি উৎসবটি স্মরণীয় হয়ে ওঠে। এই উৎসবের মাধ্যমে জামদানিকে সোনারগাঁওয়ে ওয়ার্ল্ড ক্রাফট সিটির স্বীকৃতি এনে দেন। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে জামদানির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
রুবি গজনবী ছিলেন ওয়ার্ল্ড ক্রাফটস কাউন্সিলের সদস্য এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের রঞ্জক কর্মসূচির চেয়ারপারসন। তার আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের কারুশিল্পের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তিনি দুটি উল্লেখযোগ্য বই, নকশা এবং রঙিন, রচনা করেন। বইগুলোতে তিনি কারুশিল্পের প্রাচীন ঐতিহ্য, বিশেষত জামদানি নকশার বিষয়ে আলোকপাত করেন। এ ছাড়া তিনি জামদানি নকশা নিয়ে বিভিন্ন সম্পাদনা প্রকল্পে কাজ করেছেন।
কারুশিল্পের বাইরেও রুবি গজনবী বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ট্রাস্টি ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সদস্য ছিলেন। তার সামাজিক কর্মকাণ্ড ও নেতৃত্ব সমাজে স্বচ্ছতা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের বার্তা বহন করেছে।
/ফারজানা ফাহমি
.jpg)