‘সর্বজয়ার’ স্বত্বাধিকারী ইফ্ফাত আলম জেসিকা একজন ফ্যাশন ডিজাইনার। যিনি নিজস্ব ডিজাইনে পোশাককে আরও নান্দনিক করে তোলেন। কেমন ছিল তার উদ্যোক্তা হওয়ার পথ। তা নিয়ে এবারের আয়োজন। লিখেছেন ফারজানা ফাহমি
ছোটবেলা থেকেই রং নিয়ে খেলা তাকে আকর্ষণ করত। খাতা-কলম পেলেই তিনি আঁকতে শুরু করতেন। কখনো দৃশ্যপট, আবার কখনো নিজের কল্পনার জিনিস। সময়ের সঙ্গে বুঝতে পারেন, এটা শুধু শখ নয়, বরং এখানেই তার সব ভালো লাগা, কাজের স্বাধীনতা।ডিজাইন তার কাছে শুধু নান্দনিকতা নয়, এটা গল্প তৈরির মাধ্যম। তাই ধীরে ধীরে আঁকাআঁকি ও ডিজাইনকে পেশাগতভাবে নেওয়ার কথা ভাবেন জেসিকা। যেখানে তিনি তার সৃজনশীলতা ব্যবহার করে সবার মন জয় করতে পারবেন। তাই সবকিছু বিবেচনা করেই তিনি ব্যবসার পথে আসার সাহস করেন।
মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে বড় হয়েছেন জেসিকা। যেখানে শৃঙ্খলা, পরিশ্রম ও দায়িত্ববোধ, সততা এবং কীভাবে সীমিত আয়েও শৌখিনতার চর্চা করা যায় এগুলো পরিবার থেকেই শিখেছিলেন তিনি। ছোটবেলায় বাবা ঈদের জামা হিসেবে সাধারণ গজ কাপড় কিনে দিতেন। সেটিকে তিনি নিজ হাতে লেইস-পুঁতি বসিয়ে ডিজাইন করে বানিয়ে পরতেন। এ কাজ করার জন্য পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের কাছে বেশ প্রশংসা পেতেন। আঁকাআঁকি, ডিজাইন করা, কিছু নতুন তৈরি করা এগুলো তার অবসরে সময় কাটানোর অনুষঙ্গ ছিল।
আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের মতোই মা-বাবার স্বপ্ন ছিল, মেয়ে পড়াশোনা করে চাকরি করবে। স্বাভাবিকভাবেই পড়াশোনা শেষ করে ছোটখাটো একটা চাকরি নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সব সময় নিজের কিছু করার প্রবল ইচ্ছা ছিল তার, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার স্বাধীনতা খুঁজে বেড়াতেন তিনি।
তাই তিনি তার সহকর্মীকে তার করা কিছু কুশন কাভার দেখালে তিনি সেগুলো খুবই পছন্দ করেন। অনেকটা আবেগের বশেই ও সহকর্মীর উৎসাহে ফেসবুকে তার করা কিছু কাজ আপলোড করেন। এরপর তিনি তার বাসার জন্য কিছু কুশন কাভার বানিয়ে দিতে বলেন। সেটাই ছিল তার প্রথম কিছু বিক্রি। তার হাজারখানেক টাকা লাভ হয়, তা দিয়ে আরও কিছু গজ কাপড় কিনেছিলেন।
কুশন কাভার দিয়ে শুরুটা ছিল তার। এখন তিনি প্রতিদিন গড়ে ১২-১৫ পিস ব্লাউজের অর্ডার নেন, সঙ্গে শাড়ির কাজও করেন। তার সিগনেচার প্রোডাক্ট ব্লাউজের জন্যই বিশেষ করে সর্বজয়ার পরিচিতি। শূন্য থেকে শুরু করে এখন তার সেল হয় মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা।
এখন প্রতিনিয়ত প্রশংসা এবং অনুপ্রেরণা পেয়ে যাচ্ছেন তার ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে। তাই তিনি প্রতিদিন চেষ্টা করেন অনুপ্রেরণাগুলোকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু করতে এবং শিখতে।
শুরুটা ছিল খুব ছোট, শুধু একটা স্বপ্ন আর অল্প কিছু উপকরণ নিয়ে। কিন্তু ছিল অগাধ ইচ্ছাশক্তি। প্রথমে আঁকাআঁকি আর সেলাইয়ের কাজগুলো শুধু নিজের জন্য করতেন, পরে ধীরে ধীরে বন্ধুবান্ধব পরিচিত মহলে অর্ডার পেতে শুরু করেন। সেখান থেকেই আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।
এখন সর্বজয়া প্রায় ৩০-৩২ জনের টিম। রেগুলার তার ওয়ার্কশপে সাত থেকে আটজন কাজ করেন। আর বাকিরা বাসায় বসে সবাই হাতের কাজ করেন। আর সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে তার টিমে সবাই নারী। কেউ পড়াশোনা আর কেউ সংসারের কাজ সামলে অবসরে তার এখানে কাজ করছেন।
নারী হিসেবে কাজটা শুরু করা এতটা সহজ ছিল না। শুরুতে তাকে শুনতে হতো ‘মেয়েদের জন্য এসব না, ব্যবসা করা ছেলেদের কাজ।’ পরিবার থেকে বলত পড়াশোনা করেছ কি কাপড় বেচতে বা ‘এটা তো শখ, পেশা হিসেবে কতটা টিকবে? চাকরি ছেড়ে ভুল করেছ’ এমনকি এটাও বলতো ‘বিয়ে হলে আর কতটা সময় থাকবে এসবের জন্য?’-এ লড়াইটা সহজ ছিল না তার। তাকে প্রতিদিন নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হতো।
একসময় যখন কাজের প্রশংসা আসতে শুরু করল, ক্লায়েন্টরা তার ওপর আস্থা রাখতে শুরু করল, তখন তিনি বুঝলেন তিনি শুধু সেই পর্দাটাকে সরাইনি, বরং অন্যদের জন্যও দেখিয়ে দিয়েছেন যে, নারীর স্বপ্নেও শক্তি আছে, তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার সাহস আছে।তার মতে, এই সেক্টরে নারীদের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে, নারীরা ডিজাইন এবং ক্রিয়েটিভ কাজে পারদর্শী হলেও পেশা হিসেবে নেওয়ার সাহস করে কম।
তার সর্বজয়া টিমে সবাই নারী এবং সবাই সংসার ও পড়ালেখা সামলে কাজ করছেন। অনেকে তার এখানে কাজ শিখে নিজের উদ্যোগে কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছেন। সমাজ, পরিবার নারীদের পাশে দাঁড়ালে তারা সাহস হারাবে না বলে মনে করেন জেসিকা। তিনি বিশ্বাস করেন, ‘এই সেক্টরে নারীদের অংশগ্রহণ আগামী দিনে আরও বাড়বে। কারণ, এখন নারীরা শুধু আয় নয়, নিজেকে নিয়েও ভাবছেন।’
জেসিকার চান তার সর্বজয়া একদিন হয়ে উঠুক একটি স্বীকৃত ব্র্যান্ড, যা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে যাবে আন্তর্জাতিক বাজারে। আর সেই ব্র্যান্ডের প্রতিটি সেলাই বাঁধা থাকবে একেকটি নারীর গল্প, সংগ্রাম আর বিজয়ের চিহ্ন।
/ফারজানা ফাহমি
.jpg)