‘চাকরি নয়, চাকরি দেব’- এই আত্মবিশ্বাসী স্লোগানকে সামনে রেখে আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন নারী উদ্যোক্তা আরজুনা আক্তার। দিনাজপুর সদর উপজেলার উলিপুর গ্রামের এই তরুণী বর্তমানে দিনাজপুর সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছেন হোমমেড ফুড ব্র্যান্ড ‘আরু’স ইয়াম্মী কিচেন’, যা ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা আরজুনা ২০২৩ সালে প্রথম কেক তৈরির মাধ্যমে নিজের উদ্যোক্তা যাত্রা শুরু করেন। খাদ্যপ্রস্তুতিতে গভীর আগ্রহ থেকেই এ পথচলার সূচনা। যদিও শুরুর দিনগুলো কঠিন ছিল। কিন্তু, তিনি সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতা ও পরিবারের প্রাথমিক অনীহা পেরিয়ে আত্মবিশ্বাস আর কঠোর পরিশ্রমে এগিয়ে গেছেন।
বর্তমানে তিনি নিজের তৈরি কেক, বিস্কুট, পিজ্জা, তেহারি, বিরিয়ানি ও অন্যান্য মুখরোচক খাবার অনলাইন এবং অফলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করছেন । প্রতি মাসে গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করে নিজ পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত খরচ চালাচ্ছেন নিজেই।
আরজুনার স্বপ্ন কেবল নিজের স্বাবলম্বিতা নয়, বরং অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। তিনি বলেন, আমরা যদি শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হই, তাহলে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানো সম্ভব। সেই সঙ্গে অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়।’

তিনি আরও জানান, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকীসহ নানা অনুষ্ঠানের জন্য তার তৈরি খাবারগুলো এখন স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন। অর্ডার দেওয়ার পর পণ্য হাতে পেয়েই গ্রাহকরা মূল্য পরিশোধ করেন। যার ফলে, তার প্রতি ক্রেতাদের আস্থা ও সন্তুষ্টি তৈরি হয়।
নিজ গ্রামের সীমিত পরিবেশ, সামাজিক বাধা ও নিরুৎসাহ সত্ত্বেও থেমে যাননি আরজুনা। বরং এ সবকিছু তাকে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করেছে। পরিবারের যারা একসময় অনুৎসাহিত করেছিলেন, এখন তারাই তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন।
আরজুনার বান্ধবী মনীষা আক্তার বলেন, ‘বর্তমান সময়ে পড়াশোনার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়া সত্যিই চ্যালেঞ্জিং। আরজুনা যেভাবে তা সামলে সাফল্য পেয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য।’
স্থানীয় বাসিন্দা মর্জিনা বেগম জানান, ‘আরজুনা আমাদের এলাকার গর্ব। তার সাফল্য অন্য মেয়েদেরও অনুপ্রাণিত করছে।’
দিনাজপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আল আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আরজুনা আক্তার আমাদের কলেজের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী। সে পড়াশোনার পাশাপাশি একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মনির্ভরশীল হয়েছে, যা অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকরণীয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু একজন কিশোরী নয়, আরজুনা এখন নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক। তার উদ্যোগ অন্যদের স্বপ্ন দেখাতে ও বাস্তবতা মোকাবিলায় সাহস জোগায়।’
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আরজুনা বলেন, ‘আমি চাই, গ্রামের আরও অনেক বেকার তরুণীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তুলতে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোই নারীদের সত্যিকারের শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে।’
তরুণ উদ্যোক্তা আরজুনা আক্তার শুধুই একজন সফল ফুড প্রডিউসার নন, বরং নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। ‘চাকরি নয়, চাকরি দেবো’- এ মন্ত্রে অনুপ্রাণিত হয়ে গড়ে তুলতে চান আরও বহু নারীর সাফল্যের গল্প।