একজন কর্মজীবী নারীর দিনের সূচনা হয় ভোরে। পরিবারের সব সদস্যের জন্য নাশতার আয়োজন, সন্তানকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করা ইত্যাদি সামলিয়েই তাকে বের হতে হয় অফিসের পথে। অফিসে অপেক্ষা করছে নতুন নতুন দায়িত্ব, মিটিং, টার্গেট, সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা, আবার অনেক সময় বৈষম্যেরও লড়াই। কাজ শেষে বাড়ি ফিরে আবার অপেক্ষা করে সংসারের টানাপোড়েন।
এত দায়িত্বের ভিড়ে তার নিজের জন্য সময় যেন নেই বললেই চলে। আর দিনের শেষে যখন শরীর-মনের প্রয়োজন হয় সবচেয়ে বেশি বিশ্রামের, তখনই দেখা দেয় ঘুমের সমস্যা। অনেক নারী জানান, বিছানায় গেলেও ঘুম আসতে চায় না, আবার কারও ঘুম এলেও মাঝরাতে ভেঙে যায়। কেউ আবার সকালে উঠে বুঝতে পারেন, দীর্ঘ সময় ঘুমালেও তা ছিল অগভীর ও অশান্ত।
এই সমস্যাটি তুচ্ছ মনে হলেও এর প্রভাব ভয়াবহ। একদিন-দুদিন নয়, বরং দীর্ঘদিন ঘুমের সংকট চলতে থাকলে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কর্মজীবী নারীর জন্য এটি দ্বিগুণ চাপের কারণ। কারণ দিনের কাজ সামলাতে যেমন লাগে কর্মক্ষমতা ও মনোযোগ, তেমনি ঘরে ফিরে পরিবার সামলানোর জন্য লাগে ধৈর্য আর মানসিক প্রশান্তি; যা পর্যাপ্ত ঘুম ছাড়া অসম্ভব।
কেন হয় এই ঘুমের সংকট?
ঘুমের সমস্যা নানা কারণে হতে পারে; তবে কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে কিছু কারণ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। প্রথমত, সারা দিনের মানসিক চাপ। অফিসে লক্ষ্যপূরণ, বসের চাপ, সহকর্মীদের প্রতিযোগিতা, আবার সংসারে সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব- সবকিছু একসঙ্গে মাথায় ঘুরতে থাকে। ফলে মস্তিষ্ক রাতে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল আসক্তি। আধুনিক সময়ে অনেক নারী ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করেন। স্ক্রিনের আলো মস্তিষ্ককে বিভ্রান্ত করে। ফলে ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না।
তৃতীয়ত, হরমোনাল পরিবর্তন। বিশেষ করে ৩০ বছরের পর থেকে নারীর শরীরে হরমোনের ওঠানামা শুরু হয়, যা ঘুমের ছন্দে ব্যাঘাত ঘটায়। মাসিক চক্রের সময়, গর্ভধারণ বা সন্তান জন্মের পর, এমনকি মেনোপজের কাছাকাছি বয়সে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়।
পাশাপাশি রয়েছে শারীরিক কারণ। সারা দিন বসে কাজ করা, ব্যায়ামের অভাব, কিংবা পিঠ-ঘাড়ের ব্যথা ঘুম ব্যাহত করে। অনেকের ক্ষেত্রে অ্যাসিডিটি বা হজমজনিত অস্বস্তিও ঘুমের শত্রু হয়ে ওঠে।
ঘুমের সংকট শুধু চোখে কালি বা ক্লান্তি এনে দেয় না, বরং নারীর জীবনযাত্রাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে তোলে। দীর্ঘমেয়াদে ঘুমের ঘাটতি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। মানসিকভাবে নারীরা হয়ে ওঠেন খিটখিটে, অস্থির, মনোযোগহীন। অফিসে বারবার ভুল হয়, সৃজনশীলতা কমে যায়। বাড়িতে সন্তান বা স্বামীর সঙ্গে অকারণে ঝগড়া হয়। অর্থাৎ ঘুমের সংকট একসঙ্গে পেশাগত জীবন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও স্বাস্থ্য সব জায়গাতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সমাধান কোথায়?
ঘুমের সমস্যার সমাধানে ওষুধ অনেক সময় দ্রুত ফল দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়। প্রকৃত সমাধান লুকিয়ে আছে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার মধ্যেই। কর্মজীবী নারীর জন্য ঘুমকে অবহেলা না করে অগ্রাধিকার দেওয়া সবচেয়ে জরুরি বিষয়। কাজের তালিকা যত দীর্ঘই হোক না কেন, সুস্থতার জন্য ঘুমকেই প্রথমে স্থান দিতে হবে। নিয়মিত রুটিন তৈরি করা, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে শোয়া ও জেগে ওঠার অভ্যাস শরীরকে এক ধরনের ছন্দে নিয়ে আসে, যা ঘুমকে সহজ করে।
একইভাবে, ঘুমের অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার বন্ধ করা প্রয়োজন। কারণ অতিরিক্ত স্ক্রিন-আলো মস্তিষ্ককে উত্তেজিত রাখে। এর পরিবর্তে বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে গল্প করা বা হালকা সংগীত শোনা ঘুমের প্রস্তুতিতে সাহায্য করে। পাশাপাশি বেডরুমকে গোছালো, শান্ত ও আরামদায়ক রাখা ঘুমের পরিবেশ তৈরি করে। খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারী ও ঝাল খাবারের বদলে হালকা, সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ এবং এক কাপ গরম দুধ বা হারবাল চা উপকারী হতে পারে। নিয়মিত হাঁটা, যোগব্যায়াম বা হালকা ব্যায়াম শরীর-মনকে সুস্থ রাখে। তবে ঘুমের আগে ভারী ব্যায়াম এড়িয়ে চলা ভালো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিক প্রশান্তি- চিন্তা মাথায় নিয়ে বিছানায় যাওয়া নয়, বরং ডায়েরি লেখা বা শ্বাস-প্রশ্বাসের চর্চা কার্যকর হতে পারে। তবুও যদি সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সর্বোত্তম সমাধান।
ঘুমকে আমরা প্রায়ই ‘সময় নষ্ট’ মনে করি। বিশেষ করে কর্মজীবী নারীরা মনে করেন, ঘুমের চেয়ে কাজ বা দায়িত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন কর্মজীবী নারী যখন প্রশান্তির ঘুম ঘুমাকে পারেন, তখন তিনি পরের দিন আরও শক্তিশালী হয়ে অফিস, সংসার ও ব্যক্তিজীবনে নিজেকে নতুন করে প্রকাশ করতে পারেন।
তথ্যসূত্র: নিওরোলজি অ্যান্ড স্লিপ সেন্টার
/এস লুপিন
.jpg)