কয়েক বছর আগ থেকে প্রেমের সম্পর্ক শুরু হয় শাহাদাত ও চাদনীর। বৃহস্পতিবার (৯ জানুয়ারি) পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করতে না পেরে প্রেমিক শাহাদাত আত্নহত্যা করে। শুক্রবার মেয়েটির পরিবার এক প্রবাসীর সঙ্গে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে। মেয়ের বাড়িতে সবধরনের আয়োজনও করা হয়েছে। কিন্তু এর আগের দিনই ঘটে লঙ্কাকাণ্ড।
নিহত শাহাদাত ইফাম (১৬) সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের কমার্স গ্রুপের ছাত্র। সে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। শাহাদাত উপজেলার ফকির হাট উকিল পাড়া এলাকার ওমান প্রবাসী মোহাম্মদ রফিকের ছেলে।
বৃহস্পতিবার সকালে প্রেমিক তার প্রেমিকাকে মোবাইলে ফোন করে জানায়, তাকে বিয়ে না করলে সে আত্মহত্যা করবে। বৃহস্পতিবার তারা দুজনই বিয়ে করতে চট্টগ্রামের আদালতে যান। আদালতে গিয়ে প্রেমিকা তার বাবা জসিমকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘শাহাদাতকে নিয়ে আদালতে এসেছি। আমি ভুল করেছি এখন বাড়ি চলে যাব।’ পরে প্রেমিকার বাবা জসিম আদালতে গিয়ে তাদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। ছেলেকে তাদের পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার বিকেলে ওই কিশোর নিজ ঘরে আত্মহত্যা করে। পরিবারের লোকজন তাকে উদ্ধার করে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক সীতাকুণ্ড থানায় খবর দিলে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে সীতাকুণ্ড থানায় নিয়ে যায়। সুরতহাল রিপোর্টের পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর জন্য সীতাকুণ্ড থানার সামনের মাঠে রাখা হয়। এর পরপরই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র পরিচয়ে ১০০-১৫০ জনের একটি দল থানায় এসে মরদেহটি নিয়ে যাওয়ার জন্য পুলিশকে চাপ দেয়। পরে আত্মহত্যাকারী কিশোরের মা ময়নাতদন্ত করবেন না বলে জানালে পুলিশ লাশ তার (মায়ের) হেফাজতে দেয়।
এরপর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র পরিচয়ধারী শতাধিক যুবক আত্মহত্যাকারী কিশোরের মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স থানা থেকে প্রেমিকার বাড়িতে নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তারা প্রেমিকার বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুর করে ও স্বর্ণলঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় তারা বিয়ের জন্য মেয়ের (প্রেমিকার) আনা ছাগল, মাছসহ যাবতীয় বিয়ের খাবার লুট করে। মেয়ের বাবা জসিমের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও নিয়ে যায় তারা।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে কথা হয় সীতাকুণ্ডের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম ছাত্র প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল ইমরানের সঙ্গে। তিনি জানান, ফকিরহাট আত্মহত্যার ঘটনার পর তার পূর্বপাশে নলুয়া পাড়ায় মেয়েটির বাড়িতে নৃশংস হামলা ও লুটপাটের কথা শুনেছেন তিনি। এই ঘটনার সঙ্গে বৈষম্যেবিরোধী ছাত্রদের কোনো সম্পর্ক নেই। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
মেয়েটির বাবা জসিম উদ্দীন বলেন, ‘ছেলে ও আমার মেয়ে একই শ্রেণিতে পড়ত। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তারা ছিলো অপ্রাপ্ত বয়স্ক। বৃহস্পতিবার আত্নহত্যা করবে বলে আমার মেয়েকে আত্নহত্যার (যা মোবাইলে রেকর্ড আছে) ভয়ভীতি দেখিয়ে চট্টগ্রাম আদালতে বিয়ে করার জন্য নিয়ে যায় ছেলে। মেয়ে তার ভুল বুঝতে পেরে আদালত থেকে আমাকে মোবাইলে ফোন করে বাড়িতে চলে আসতে বলে। আমি আদালতে গিয়ে মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে আসি। ছেলেকে পৃথক গাড়িতে তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেই। কিন্তু বিকেলে ছেলে তার নিজের ঘরে আত্নহত্যা করে। পুলিশ থানায় লাশ নিয়ে যায়। থানা থেকে মরদেহবাহী এ্যম্বুলেন্স আমার বাড়িতে নিয়ে আসে কিছু অপরিচিত যুবক। এসময় তারা আমার ঘরে ঢুকে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। প্রবাসীর সঙ্গে মেয়ে বিয়ের তারিখ নির্ধারিত ছিল শুক্রবার। কিন্তু বিয়ের খাবারের জন্য আনা ছাগল, মাছসহ সব খাদ্যসামগ্রী নিয়ে গেছে তারা। আমার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও নিয়ে গেছে। দুর্বৃত্তদের ভয়ে এলাকা ছাড়া হয়েছি। পরিবার নিয়ে এখন আত্নগোপনে আছি’।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান বলেন, এ জাতীয় হামলার কোনো সংবাদ পাইনি। এখনো কেউ থানায় অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মুসলেহ উদ্দীন/মাহফুজ