দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান নৌপথ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া। এসব জেলার মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে ২০০২ সালে আরিচা থেকে পাটুরিয়ায় ফেরিঘাট স্থানান্তর করা হয়। ফেরিঘাট সম্প্রসারণ ও যানবাহনের চাপ সামাল দিতে পাটুরিয়ায় পাঁচটি ঘাট নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের পরপরই ১ ও ২ নম্বর ঘাট চলে যায় স্থানীয় প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণেই আছে। সড়কের পাশে বালু পড়ে থাকায় ধুলোবালিতে নাজেহাল যাত্রী, চালক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ১ ও ২ নম্বর ঘাটের বিশালাকার জায়গাজুড়ে বালু স্তূপ করে রাখা হয়েছে। দখল করে রাখা হয়েছে নদীবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দিনের বেলায় ট্রাক-ট্রলারে চলে বালুর লেনদেন, সেই সঙ্গে চলে দিনরাত বালু পরিবহন। এদিকে, সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা বালু ও ট্রাকের চলাচলে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন যাত্রীবাহী বিভিন্ন গাড়ির চালক ও যাত্রীরা। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে আরিফ কাজী, রাসেল মোল্লাসহ স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ঘাট দখল করে দীর্ঘদিন এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত ২৫ জুন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. এম সাখাওয়াত হোসেন পাটুরিয়া ঘাট পরিদর্শনে এসে ঘাট এলাকা দখলমুক্ত করে ফেরি ও যান চলাচলের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে নির্দেশ দেন। তবে সেই নির্দেশের দুই সপ্তাহ পার হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
আনোয়ারুল হক নামের এক পথচারী জানান, ‘এ পথ দিয়ে আমাদের চলাচল করা অনেক কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। বাতাসে বালু এসে গায়ে পড়ে। বেশির ভাগ সময়ই এ পথ দিয়ে বালুবাহী ট্রাক চলাচল করে। ঘাট এলাকায় বালুর ট্রাকসহ অন্য সরঞ্জামাদিও রয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা রহমান শেখ বলেন, ‘নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাত দিনের মধ্যে ঘাট এলাকা থেকে বালু ব্যবসা অপসারণের নির্দেশ দেন। তার কয়েকদিন পর ঘাট এলাকা থেকে বালু ব্যবসা সরিয়ে নিতে মাইকিং করে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এখনো বালু ব্যবসা চলমান।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘পাটুরিয়ার পাঁচটির মধ্যে দুটি ঘাটই প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এতে, বন্ধ রয়েছে ফেরিঘাটের কার্যক্রম। সড়কের পাশে বালু স্তূপ করে রাখায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে চালক-যাত্রী ও স্থানীয়দের। বিআইডব্লিউটিএ ও প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে আরিফ কাজী, রাসেল মোল্লাসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ঘাট দখল করে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।’
অভিযোগ অস্বীকার করে বালু ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, তারা ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। বালু ব্যবসায়ী কাজী আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমরা কোনো সরকারি জায়গায় বালু ব্যবসা করছি না। আমরা যেসব জায়গায় বালুর ব্যবসা করছি সেগুলো ব্যক্তিমালিকানা জমি। এনিয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট করা আছে।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বন্দর ও পরিবহন বিভাগের আরিচা নদীবন্দরের উপপরিচালক মো. সেলিম শেখ বলেন, ‘নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ঘাট এলাকা পরিদর্শন করার পর আমাদের ঘাট এলাকা থেকে দ্রুত বালু ব্যবসা সরানোর নির্দেশ দেন। আমাদের কোনো ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকায় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) চিঠি দিয়েছি। আশা করছি, দ্রুতই তারা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা দেবেন।’
০ইউএনও মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকার জমি বিআইডব্লিউটিএর মালিকানাধীন। সে জন্য ইচ্ছে করলেই আমরা সেখানে এককভাবে কোনো অভিযান পরিচালনা করতে পারি না। যদি বিআইডব্লিউটিএ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও লিখিত অনুরোধ জানায়, তাহলে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেব। ঘাট এলাকা জনগণের সম্পদ, এখানে কেউ প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে দখল করে ব্যবসা চালাতে পারে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।’