বারকিশ্রমিক ফয়জুল ইসলামের দাদা মুনসের আলী বারকি কিনে ভাড়ায় খাটাতেন। তার বাবা মো. ওসমান আলী সারা জীবন বারকি বয়েছেন। বংশপরম্পরায় বারকিশ্রমিক ফয়জুল বলেন, ‘আমরার এক ধলাইয়ে কম কইরা অইলেও ২০০-৩০০ বছর ধরি বারকি বাওয়া চলে। কোয়ারি (মহাল) বন্ধ, বারকিও না চালাইয়া নষ্ট। বারকি-বেকার, আমরাও বেকার!’
ফয়জুলের বলা ‘বেকার-বারকি’ কথাটির অবসান আর হয়নি। প্রতিবছর বর্ষাকালকে সামনে রেখে প্রস্তুতি চলে। কিন্তু শুষ্ককালে যে বারকি নৌকা জলে ভিজিয়ে সতেজ রাখার পন্থা অবলম্বন করা হয়, সেটি উত্তোলন করে বারকি চলাচল সম্ভব হচ্ছে না। তাই বারকি-বেকার কথাটিরও আর অবসান হচ্ছে না। কবে খুলবে বারকি চলার পথ? এ প্রশ্নের উত্তরও আর কেউ দিতে পারছে না। তাই সংকটে রয়েছে বারকিশ্রম পেশাটি।
‘বারকি বাওয়া’ সিলেট অঞ্চলের বালু-পাথরমহালের স্বতন্ত্র এক পেশার নাম। বারকি নামের নৌকায় ভার বহনের প্রচলন প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। ব্রিটিশ শাসনের গোড়াপত্তনকালে ‘জন বারকি’ নামে একজন ব্রিটিশ নৌ-কারিগর দলছুট হয়ে ভোলাগঞ্জ এলাকায় আশ্রয় নেন। এর পর সেখানকার ধলাই হয়ে সুরমা নদীতে তখনকার চুনাম বাণিজ্যের প্রসারে জলপথে চুন পরিবহন দেখে নিজেই তৈরি করেন একটি নৌকা। হাতে তৈরি হাতে বাওয়ার নৌকাটি জন বারকি তৈরি করেছিলেন বলে এর নাম হয়ে যায় ‘বারকি নাও’। সেই থেকে পাথর ও বালুমহালের আরেক পেশা হয়ে ওঠে ‘বারকি বাও, বারকি নাও’।
স্থানীয় ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেছে, ভোলাগঞ্জ দেশের সর্ববৃহৎ পাথর ও বালুমহাল (কোয়ারি)। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী ধলাই নদ অববাহিকায় সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা থেকে প্রথম বারকির প্রচলন হয়েছিল। প্রায় ৩০০ বছরের পথপরিক্রমায় বারকি নাও ছড়িয়ে পড়েছে পুরো সিলেট অঞ্চলে। জলপথে জীবিকায় বর্ষাকালে ব্যাপকভাবে চলে বারকি। এতে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক নিয়োজিত থাকেন। বারকি বাওয়ার বাড়তি শ্রমের সঙ্গে জড়িত আরও লক্ষাধিক মানুষ। তবে প্রায় চার বছর ধরে পাথরমহাল একটানা বন্ধ থাকায় শত শত বারকি নাও বেহাল হয়ে পড়ে রয়েছে। বারকি শ্রমিকরা পার করছেন সংকটাপন্ন জীবন।
জানা গেছে, বারকি চলার পথে কাঁটা থেকে অনেকটা পেরেক মারা হয় অন্তর্বর্তী সরকার আমলে। গত বছরের ২৭ এপ্রিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ সভায় সারা দেশের গেজেটভুক্ত পাথর, সিলিকা বালু, নুড়িপাথর, সাদা মাটি মহালগুলোর ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সভায় পরিবেশ সংকটাপন্ন বিবেচনায় দেশের ৫১টি পাথরমহালের মধ্যে ১৭টির ইজারা দেওয়া স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। তখন থেকে বন্ধ রয়েছে সিলেট জেলার ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দি, লোভাছড়া, রতনপুর, উৎমা ও শ্রীপুরস পাথরমহাল।
অন্তর্বর্তী সরকারের এ নির্দেশনা এখনো কার্যকর রয়েছে। যদিও সিলেটের বালু-পাথরমহালসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। সেই আন্দোলনে একাত্মতাও প্রকাশ করেছিল বিএনপি-জামায়াতসহ নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিও। জাতীয় নির্বাচনে বারকি চলার অঞ্চল তথা নির্বাচনি এলাকাগুলোতে ভোটের প্রতিশ্রুতিও ছিল। কিন্তু ভোটের পর সেই প্রতিশ্রুতিরও বাস্তবায়ন নেই।
বালু ও পাথরমহালগুলোতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার বারকি নৌকায় নির্ভরশীল শ্রমিকের সংখ্যা লক্ষাধিক। হাজার হাজার বারকি নৌকা আর লাখো শ্রমিকের রোজগারে ছেদ পড়ে যন্ত্রচালিত নৌযানের প্রচলনে। ‘ড্রেজার’ নামে যন্ত্র পাথর কোয়ারিতে প্রবেশ করায় বারকি বাওয়ার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। ধলাই নদ ছাড়াও বারকি চলে সিলেটের গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি, জাফলংয়ের পিয়াইন নদ, কানাইঘাটের লোভাছড়া, সুনামগঞ্জের চলতি ও জাদুকাটা নদীসহ সিলেট অঞ্চলের হাওর জনপদে।
বারকি শ্রমিকরা বলছেন, একটি বারকি নৌকায় অন্তত চারজন শ্রমিকের জীবিকা নির্বাহ হয়। রোজ ২০০ টাকায় নৌকা ভাড়া নিয়ে তাদের সম্মিলিত রোজগার চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। এ হিসাবে একটি বারকি নৌকার মালিক থেকে শ্রমিক পর্যন্ত পাঁচজন মানুষের কর্মসংস্থান হয়। প্রতি বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে কোম্পানীগঞ্জের টুকেরবাজার, পূর্ব ইসলামপুর ও বুধবারিবাজারে বারকি নৌকার হাট বসে। একেকটি নতুন নৌকা ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা দামে বিক্রি হয়। এই হিসাবে ছয় মাস নৌকা ভাড়া দিয়ে মালিকের পুঁজি উঠে আসে। পরবর্তী বর্ষা মৌসুম থেকে বারকি নৌকা ভাড়া দিয়ে লাভের মুখ সহজে দেখা যায়।
সিলেটে সবচেয়ে বেশি বারকি চলে গোয়াইনঘাট উপজেলায়। সেখানে প্রতিটি ইউনিয়নে রয়েছে বারকি শ্রমিক সংগঠন। সদস্যসংখ্যা ৬০০ থেকে ২২০০ পর্যন্ত আছে। বারকি চলাচল সীমিত হওয়ায় ঘরে ঘরে লোকজন বেকার বলে জানিয়েছেন ‘গোয়াইনঘাট বারকি শ্রমিক’ নামের সংগঠনটির সভাপতি মো. লোকমান হোসেন।
আজ ১ মে। শ্রমিক অধিকারের দিবসটি তারা গোয়াইনঘাটের রাধানগরে উদযাপন করে বারকিশ্রমিক অধিকারের বিষয়টি তুলে ধরবেন জানিয়ে বারকিশ্রমিক সংগঠনের নেতা লোকমান বলেন, ‘যন্ত্র ছাড়া ওই একটি বাহনই টিকে আছে। যন্ত্রের মতো খাটছে মানুষ। কিন্তু কায়িক শ্রমের কোনো মূল্যায়ন নেই। আমরা জাতীয় নির্বাচনের আগে শুনেছিলাম, কোয়ারি না খুললে বিকল্প ব্যবস্থায় বারকি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান দেওয়া হবে। বিকল্প কী হবে–এসব নিয়ে কেউ আর কিছু বলছে না।’