গ্রামের ঠিক মাঝখানে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রকাণ্ড আমগাছ। সেই আমগাছের কোটরে ছোট্ট একটা বাসা। আর সেখানে থাকে এক চঞ্চল কাঠবিড়ালী। নাম তার কুটুস। সারা দিন তার কাজ হলো লেজ ফুলিয়ে গাছের এ ডাল থেকে ও ডালে লাফিয়ে বেড়ানো আর গোল গোল চোখে উঁকি মেরে চারপাশের জগৎ দেখা।
কুটুসের গাছের ঠিক পাশে একটা বড় বাড়ি। সেই বাড়ির স্নেহময়ী দাদিকে কুটুসের বড়ই ভালো লাগে। দাদি যখন উঠানে নতুন ধান শুকাতে দেন, কুটুস তখন সুযোগ বুঝে চুপিচুপি দুয়েকটা ধান মুখে পুরে লেজ তুলে দৌড় দেয়। দাদি এসব দেখেও কখনো বকেন না, শুধু মিটিমিটি হাসেন।
আজ সেই বাড়িতে নবান্ন উৎসব। সকাল থেকে একটা অদ্ভুত ঘ্রাণে কুটুসের ছোট্ট মনটা আনচান করছে। এমন মন-মাতানো মিষ্টি ঘ্রাণ সে আগে কখনো পায়নি। ঘ্রাণটা আসছে রান্নাঘর থেকে। নতুন চাল, দুধ আর খেজুরের গুড়ের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
কুটুসের তর সইছে না। সে আমগাছ থেকে নেমে এল। বাড়ির মাটির দেয়ালের ওপর বসে উন্মুখ চোখে তাকাল রান্নাঘরের দিকে। ছোট্ট জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে, চুলার ওপরে বসানো হয়েছে একটা বড় হাঁড়ি। দাদি একটা লম্বা হাতলওয়ালা খুন্তি দিয়ে কিছু রান্না করছেন। হাঁড়ির ভেতর টগবগ করে সেটা ফুটছে, আর সেই ধোঁয়াতেই লুকিয়ে আছে ওই ঘ্রাণটা।
শুধু কুটুস নয়, ওই লোভনীয় ঘ্রাণে ছুটে এল আরও অনেকে। পিন্টু ইঁদুর তার অন্ধকার গর্ত থেকে বেরিয়ে এল, একদল পিঁপড়ে সারি বেঁধে চলতে শুরু করল রান্নাঘরের দিকে আর চিড়িক নামের ছোট্ট চড়ুই পাখিটা উড়ে এসে বসল জানালার পাশে। সবার নজর ওই পায়েসের হাঁড়ির দিকে।
বিকেল গড়াতেই দাদি যত্ন করে পায়েসের হাঁড়িটা চুলা থেকে নামিয়ে আনলেন। বারান্দার এক কোনায় ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য রেখে দিলেন। তারপর চলে গেলেন অন্য কাজে।
এই তো সুযোগ! কুটুস, পিন্টু আর চিড়িক দ্রুত একে অপরের দিকে তাকাল। চোখে চোখেই সব গোপন কথা বলা হয়ে গেল। কিন্তু বাঁধ সাধল হাঁড়িটা। সেটা যে অনেক উঁচু আর মুখে একটা ভারী পিতলের ঢাকনা। কী করে নাগাল পাওয়া যায়?
পিন্টু ইঁদুর বলল, আমি নিচ থেকে ধাক্কা দিই?
চিড়িক পাখি উঠে বলল, আমি ঠোঁট দিয়ে ঢাকনাটা সরানোর চেষ্টা করি?
কুটুস বলল, আর আমি প্রচণ্ড জোরে লাফ দিয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করছি।
কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। হাঁড়ি একচুলও নড়ল না।
ওদের এই প্রাণপণ কাণ্ডকারখানা দেখতে পেল বাড়ির ছোট্ট নাতনি মিলি। গোলগাল মুখে সে ওদের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসল।
মিলি তৎক্ষণাৎ দৌড়ে গিয়ে দাদিকে সবটা খুলে বলল। দাদি একটুও রাগ করলেন না, বরং হেসে উঠলেন। তিনি একটা ছোট্ট কলাপাতা নিলেন আর তাতে কিছুটা পায়েস ঢেলে দিলেন। মিলি সেই পাতাটা সাবধানে নিয়ে এসে উঠানের এক কোনায় রেখে দিল।
কুটুস, পিন্টু, চিড়িক আর পিঁপড়ের দল দেখল, তাদের জন্যেই খাবার রাখা হয়েছে। তারা আর দেরি না করে, সবাই মিলে সেই কলাপাতার পায়েস খেতে লাগল। আহা, কী তার স্বাদ!
পেট ভরে পায়েস খেয়ে ওরা সবাই মিলি আর দাদির দিকে কৃতজ্ঞতাভরা চোখে তাকাল। কুটুস তার ঝাঁকড়া লেজ নেড়ে বুঝিয়ে দিল, এই নবান্নের দিনে সে ভীষণ খুশি হয়েছে।