বিশ্ববাজারে অস্থিরতার অজুহাতে দেশে ভোজ্যতেলের দাম আবারও বাড়িয়েছে সরকার। লিটারপ্রতি বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম চার টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাজারের চিত্র ভিন্ন। খুচরা ব্যবসায়ীরা সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের তোয়াক্কা না করে আরও বেশি দামে তেল বিক্রি করছেন। এতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) নেতাদের অভিযোগ, সরকার সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত বুধবার থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন ১৯৯ টাকা, ৫ লিটারের বোতল ৯৭৫ টাকা ও প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ১৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাণিজ্য সচিব আবদুর রহিম খান জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় আমদানিকারক ও রিফাইনারদের পক্ষ থেকে মূল্য সমন্বয়ের জোরালো দাবি ছিল। বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আলোচনার পর সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে সরকারি ঘোষণার পরদিন গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের হালিশহর, কাজীর দেউড়ি, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে বিশৃঙ্খলা। বাজারে নির্ধারিত ১৯৯ টাকার বোতলজাত সয়াবিন ২০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৮০ টাকা হলেও ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা। হালিশহরের খুচরা বিক্রেতা মো. শোয়াইব জানান, যুদ্ধের প্রভাবে পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব খুচরা পর্যায়ে পড়েছে। নতুন দরের তেল বাজারে সরবরাহ না হওয়া পর্যন্ত ক্রেতাদের আগের বাড়তি দামেই কিনতে হবে।
নগরের সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। ব্যাপারীপাড়া এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন জানান, জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের দাম যেভাবে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, তাতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়ে চলায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা দিশেহারা। তার মতে, ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে সরকার নতি স্বীকার করায় সাধারণ মানুষ বাড়তি দামের বোঝা বইছেন। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে জীবনযাপন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বিশ্ববাজারের যে তথ্য দিচ্ছেন, তাতে দেখা যায়, চলতি বছরের শুরু থেকেই সয়াবিন ও পাম অয়েলের বুকিং রেট ঊর্ধ্বমুখী। জানুয়ারিতে প্রতি টন সয়াবিন তেলের বুকিং রেট ১ হাজার ১৫৩ ডলার থাকলেও মার্চে তা ১ হাজার ৪৮১ ডলারে ঠেকেছে। একইভাবে পাম অয়েলের দাম ১ হাজার ৪ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ১০২ ডলার হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধিকে পুঁজি করেই দেশের বাজারে দাম বাড়ানোর ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীদের এই যুক্তি মানতে নারাজ ক্যাব। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, ভোজ্যতেলের এই দাম বৃদ্ধি কেবল ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার প্রয়াস। তিনি অভিযোগ করেন, বুধবার সকালে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিলেন আর বিকেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বৈঠকে বসে ওই সিদ্ধান্তকে বৈধতা দিল। তার মতে, বর্তমানে বাজারে যে তেল রয়েছে তা অন্তত তিন থেকে ছয় মাস আগে কম দামে আমদানি করা। ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিলেন যেন দাম বাড়ানো সহজ হয়। সরকার জনগণের স্বার্থের চেয়ে আমদানিকারকদের মুনাফাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ জানান, সরকার নির্ধারিত দামের বাইরে এক টাকাও বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। বাজার তদারকি জোরদার করা হয়েছে। কোনো বিক্রেতা বাড়তি দাম নিলে কিংবা ক্রেতাদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনভোগান্তি রোধে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, নজরদারি সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী।