বাংলাদেশে রপ্তানি আয় টানা ৮ মাস ধরে পতনের পর গত এপ্রিল মাসে সেই ধারা ভেঙে রেকর্ড প্রায় ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থনীতির মেরুদণ্ড তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি আয় বাড়ায় এই রেকর্ড হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ শীর্ষ ২০ দেশে রপ্তানি ইতিবাচক ধারা ফিরেছে। এর মধ্যে ১০টি দেশে ৪০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে। বহির্বিশ্বের মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে এসেছে। তার প্রভাবে বেড়েছে রপ্তানি। তবে চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম ৯ মাসে প্রবৃদ্ধি কমেছে ২ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
রবিবার (৩ মে) ইপিবি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
ইপিবি জানায়, এই প্রবৃদ্ধির মূল কারণ হলো তৈরি পোশাকের চালান বৃদ্ধি এবং প্রধান বাজারগুলোতে নতুন করে চাহিদা তৈরি হওয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বাজারে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে এপ্রিলে। গত মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ। কারণ এ মাসে আয় ৪০০ কোটি ৯৯ লাখ ডলারে পৌঁছে, যা আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ বছরের এপ্রিলে এ খাতে ৩১৪ কোটি ডলার আয় হয়েছে, যা গত বছরের এপ্রিলে এসেছিল ২৩৯ কোটি ৩৭ লাখ ডলার।
ইপিবির প্রতিবেদনে দেখা যায়, এপ্রিল মাসে তৈরি পোশাকের মতো প্রায় সব প্রধান রপ্তানি খাতেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এই মাসে ৮ কোটি ৫৯ লাখ কৃষিপণ্য রপ্তানি করে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। কারণ গত বছরের একই মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৫ কোটি ১৮ লাখ ডলার। ১০ কোটি ৯০ লাখ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। কারণ গত বছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৮ কোটি ৫ লাখ ডলার। প্রকৌশলী পণ্যে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ, হোম টেক্সটাইলে ৪৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। তবে কাঠ ও কাঠপণ্যের রপ্তানি তেমন হয়নি বলা যায়।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গত বছরের তুলনায় রেকর্ড ৪৩ দশমিক ০১ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যের বাজারে ২৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সৌদি আরবে ৩ কোটি ৪১ লাখ ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি হলেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯২ দশমিক ৪০ শতাংশ। কারণ আগের বছরে একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ১ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ায় গত মাসে ৬ কোটি ডলার রপ্তানি করে ৫৩ দশমিক ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কারণ গত বছরের একই সময়ে এই দেশে রপ্তানি হয়েছিল ৩ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। তুরস্কে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৮ শতাংশ, সুইডেনে ৪৫ শতাংশ, স্পেনে প্রায় ৪৪ শতাংশ। এভাবে ১০টি দেশে ৪০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
ইপিবির প্রতিবেদনে দেখা যায়, এপ্রিল মাসে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেলেও চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল মেয়াদে বা ৯ মাসে সামগ্রিক রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ০২ শতাংশ কমেছে। কারণ এই ৯ মাসে ৩ হাজার ৯৩৯ কোটি ৬৪ লাখ ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ৪ হাজার ২০ কোটি ৮১ লাখ ডলার এসেছিল।
জুলাই-এপ্রিলে তৈরি পোশাক খাতের মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৭১ কোটি ৯৩ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৩ হাজার ২৬৪ কোটি ডলার। বছরের ব্যবধানে এ খাতে রপ্তানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ। তৈরি পোশাকশিল্পের মধ্যে নিটওয়্যারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ০২ এবং ওভেনে বেড়েছে ৩২ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি-বিজিএমইএর সভাপতি ও রাইজিং ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত এপিল মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে। এটা ভালো খরব। কারণ দেশে বহু ঘটনার পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সেই বার্তায় বিশ্বের মানুষের মধ্যে আস্থা বেড়েছে। আবার এপ্রিলের পুরো মাসেই অফিস খোলা ছিল বলা যায়। কিন্তু গত বছরের এপ্রিল মাসে সপ্তাহ ব্যাপী ঈদের ছুটি ছিল। এই ছুটিতে সব কিছু বন্ধ ছিল। এর ফলে তুলনামূলক রপ্তানি আয় কম হয়েছে। এই জন্যই বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় অনেক বেড়েছে।’
বিকেএমইএর সভাপতি এবং ইএবির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘গত এপ্রিল মাসে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে যে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, তা মূলত আগের মাসে রপ্তানি কম হওয়ার কারণে হয়েছে। মার্চ মাসে রপ্তানি কমার প্রধান কারণ ছিল ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আমাদের কারখানাগুলোতে প্রায় ১০ দিনের দীর্ঘ ছুটি। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং রপ্তানি কম হয়েছে। যার প্রভাব এপ্রিল মাসে এসে যুক্ত হয়েছে অর্থাৎ মার্চ মাসে শিপমেন্ট না হওয়া পণ্যগুলো এপ্রিলে শিপমেন্ট হয়েছে। আমাদের জানা মতে, কোনো কারখানাতেই অতিরিক্ত অর্ডার আসেনি কিংবা হঠাৎ করে নতুন ক্রেতার চাপও বাড়েনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মনে করছি, চলতি মাস শেষে আবারও রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে। কারণ, এই মাসের শেষ সপ্তাহে আবার ঈদুল আজহার একটি বড় ছুটি থাকবে। যার ফলে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তাই রপ্তানির প্রকৃত অবস্থা বুঝতে হলে আমাদের জুলাই মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ মে মাসের ঈদের প্রভাবের কারণে জুন মাসেও রপ্তানি সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।’