একাদশ অধ্যায় : খনিজ সম্পদ: জীবাশ্ম
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর-২
উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ।
জীবাশ্ম জ্বালানি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেট্রোলিয়ামের উপাদানগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পেট্রোলিয়াম তেল পরিশোধনাগারে পেট্রোলিয়াম থেকে পেট্রোল, কেরোসিন, ডিজেল, বিটুমিন ছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পৃথক করা হয়।
ক. কোক কী?
খ. পেট্রোলিয়াম কীভাবে সৃষ্টি হয়, ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকে উল্লিখিত উপাদানগুলো কীভাবে পেট্রোলিয়াম থেকে পৃথকীকরণ করা যায় ব্যবহারসহ উল্লেখ করো।
ঘ. পেট্রোলিয়ামের উল্লিখিত উপাদানগুলো ছাড়া বাকি উপাদানগুলো কীভাবে পৃথক করা যায় এবং দৈনন্দিন জীবনে তাদের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: ক. কোক হলো কার্বনের একটি প্রায় বিশুদ্ধ রূপ, যা বায়ুবিহীন অবস্থায় কয়লাকে উত্তপ্ত করে (পাতন প্রক্রিয়ায়) প্রাপ্ত হয়। এটি ধূসর বর্ণের কঠিন পদার্থ এবং ছিদ্রযুক্ত। কোক মূলত কার্বনের (প্রায় ৮৫-৯৫ শতাংশ) বিশুদ্ধ রূপ এবং এতে সামান্য পরিমাণে সালফার, ফসফরাস ও অন্যান্য অজৈব পদার্থ মিশ্রিত থাকতে পারে। এটি একটি উত্তম জ্বালানি এবং শিল্প ক্ষেত্রে বিজারক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
খ. পেট্রোলিয়াম হলো জীবাশ্ম জ্বালানি। লাখ লাখ বছর আগে সমুদ্রের তলদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র উদ্ভিদ ও প্রাণী মারা যাওয়ার পর ধীরে ধীরে পলিমাটির নিচে চাপা পড়ে। উচ্চ চাপ ও তাপে, অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে ওই জৈব পদার্থগুলো ধীরে ধীরে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে জটিল হাইড্রোকার্বনে (পেট্রোলিয়াম) রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে (প্রায় মিলিয়ন বছর) চলে।
পলিমাটির স্তর ভেদ করে পেট্রোলিয়াম শিলাস্তরের ছিদ্রযুক্ত স্থানে জমা হয়। প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া প্রযোজ্য, যা পেট্রোলিয়ামের ওপরে অথবা তার সঙ্গে মিশ্রিত অবস্থায় থাকতে পারে। ভূতাত্ত্বিক জরিপের মাধ্যমে এই জমাটবদ্ধ পেট্রোলিয়াম খনি খুঁজে বের করা হয় এবং কূপ খনন করে তা উত্তোলন করা হয়।
আরো পড়ুন : খনিজ সম্পদ: জীবাশ্ম অধ্যায়ের ১টি সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব
গ. উদ্দীপকে উল্লিখিত উপাদানগুলো (পেট্রোল, কেরোসিন, ডিজেল, বিটুমিন) পেট্রোলিয়াম থেকে আংশিক পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথক করা হয়। এই পদ্ধতিতে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়ামকে একটি লম্বা স্তম্ভের নিচে উত্তপ্ত করা হয়। পেট্রোলিয়ামের বিভিন্ন উপাদান তাদের স্ফুটনাঙ্কের ভিন্নতার কারণে বিভিন্ন উচ্চতায় ঘনীভূত হয় এবং সংগ্রহ করা হয়।
নিচে উপাদানগুলোর পৃথকীকরণ এবং ব্যবহার উল্লেখ করা হলো-
পেট্রোল: স্ফুটনাঙ্ক: ৩০°C - ৭০°C।
পৃথকীকরণ: স্তম্ভের উপরের দিকের অংশে ঘনীভূত হয়।
ব্যবহার: মোটরগাড়ির জ্বালানি হিসেবে, দ্রাবক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কেরোসিন: স্ফুটনাঙ্ক: ১৭৫°C - ২৫০°C
পৃথকীকরণ: স্তম্ভের মাঝামাঝি অংশে ঘনীভূত হয়।
ব্যবহার: জেট বিমানের জ্বালানি হিসেবে, স্টোভ ও ল্যাম্পে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ডিজেল : স্ফুটনাঙ্ক: ২৫০°C - ৩৫০°C
পৃথকীকরণ: কেরোসিনের নিচের অংশে ঘনীভূত হয়।
ব্যবহার: বাস, ট্রাক, ট্রেন এবং ডিজেল ইঞ্জিনের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বিটুমিন : স্ফুটনাঙ্ক: ৩৫০°C এর উপরে (অবশিষ্ট অংশ)
পৃথকীকরণ: স্তম্ভের একেবারে নিচে অবশিষ্টাংশ হিসেবে জমা হয়।
ব্যবহার: রাস্তা তৈরি, পানিরোধীর কাজে ব্যবহৃত হয়।
আংশিক পাতন স্তম্ভে তাপমাত্রার পার্থক্য বজায় রাখার মাধ্যমে বিভিন্ন স্ফুটনাঙ্কের উপাদানগুলোকে আলাদা আলাদা স্তরে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
ঘ. উদ্দীপকে উল্লিখিত উপাদানগুলো ছাড়াও পেট্রোলিয়াম থেকে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আংশিক পাতনের মাধ্যমে পৃথক করা যায়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
পেট্রোলিয়াম গ্যাস: স্ফুটনাঙ্ক: ২০°C-এর নিচে।
পৃথকীকরণ: স্তম্ভের সবচেয়ে উপরের অংশে গ্যাসীয় অবস্থায় সংগ্রহ করা হয়।
গুরুত্ব: গৃহস্থালির জ্বালানি (LPG - Liquefied Petroleum Gas) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি বহন করা সহজ।
ন্যাপথালিন : স্ফুটনাঙ্ক: ৭০°C - ১২০°C
পৃথকীকরণ: পেট্রোলের ঠিক নিচের অংশে ঘনীভূত হয়।
গুরুত্ব: রাসায়নিক শিল্পে বিভিন্ন জৈব যৌগ (যেমন: বেনজিন, টলুইন, জাইলিন) তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্লাস্টিক, কৃত্রিম তন্তু, কীটনাশক ইত্যাদি উৎপাদনে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
লুব্রিকেটিং তেল: স্ফুটনাঙ্ক: ৩৫০°C - ৪০০°C।
পৃথকীকরণ: বিটুমিনের উপরের অংশে অপেক্ষাকৃত ঘন তরল হিসেবে পাওয়া যায়।
গুরুত্ব: বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ঘর্ষণ কমানোর জন্য এবং যন্ত্রকে মসৃণভাবে পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হয়। ইঞ্জিন অয়েল, গ্রিজ ইত্যাদি এর উদাহরণ।
প্যারাফিন ওয়াক্স: স্ফুটনাঙ্ক: কঠিন অবস্থায় পাওয়া যায়।
পৃথকীকরণ: লুব্রিকেটিং তেল নিষ্কাশনের পর পাওয়া যায়।
গুরুত্ব: মোমবাতি, কসমেটিকস, কাগজ মোড়ানোর কাজে এবং পানিরোধী আবরণ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
পেট্রোলিয়াম থেকে প্রাপ্ত এই উপাদানগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য। জ্বালানি হিসেবে পরিবহনে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং রান্নার কাজে এদের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। রাসায়নিক শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় প্লাস্টিক, ওষুধ, কীটনাশকসহ অসংখ্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদনে এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। লুব্রিকেটিং তেল কলকারখানা ও যানবাহনের যন্ত্রাংশ সচল রাখতে সাহায্য করে। প্যারাফিন ওয়াক্স বিভিন্ন গৃহস্থালি ও শিল্পজাত পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, পেট্রোলিয়াম এবং এর উপাদানের সঠিক ব্যবহার আমাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
লেখক : প্রধান শিক্ষক
হাজী রফিজুদ্দিন ভূঁইয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ
কবীর