সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা দীপক চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘শিরিনের একাত্তর যাত্রা’-সহ কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানিয়েছেন। নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইয়ে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকা নারীর গল্প নিয়ে ‘আহার’ নামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ মিলে ৩০টি গ্রন্থ রয়েছে তার। স্বল্পদৈর্ঘ্য ও পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে ‘খবরের কাগজ’-এর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র থেকে কী পাই?
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র থেকে শুধু বিনোদনই পাই না, তা থেকে গভীর ও বিভিন্ন ধরনের গল্প এবং বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাই। সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, শিক্ষামূলক ও তথ্যবহুল ঘটনা দর্শকদের জানাতে সাহায্য করে। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে জীবন, সামাজিক চিত্র, নারীর অসহায়ত্বসহ বিভিন্ন বিষয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে দেখানো যায়। ছোটগল্পের মতো, ছোট প্রাণ, ছোট সুখ, ছোট ছোট দুঃখগাথা নিয়েও স্বল্পদৈর্ঘ্য নির্মাণ করা যায়। অল্প আয়োজনে বড় ম্যাসেজ দেওয়া সম্ভব হয়। তবে এটাও সত্য, টিভি-রেডিওর নাটকের ভাষা আর স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের ভাষা এক নয়।
কী কী উপায়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা সম্ভব?
বিশেষ ব্যবস্থায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে, শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমিতে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটা শুধু বিশেষ দিবসে নয়, প্রতি শুক্র-শনিবারে হতে পারে। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বহির্বিশ্বে তুলে ধরার অন্যতম মাধ্যম হতে পারে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। কম খরচে নির্মাণের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নিতে পারে আমাদের বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন।
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে কোনো প্রস্তাব রাখতে চান?
আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, অনেক রক্তে অর্জিত স্বাধীনতা ব্যর্থ হতে দিতে পারি না। এ মহৎ অর্জনের পেছনে রয়েছে বহু রক্ত ও ত্যাগ। ত্রিশ লক্ষ শহিদ আর কয়েক লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সঙ্গে মিশে আছে হাজার হাজার ছোট বড় ঘটনা। শুধু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রই নির্মাণ করা যেতে পারে কয়েক হাজার। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একশ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও হয়নি। এটা বড় ব্যর্থতা আমাদের। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বসভায় বিশেষ মর্যাদায় যেতে পারত। স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রদর্শনের সুযোগ খুব কম। টেলিভিশনগুলো বিশেষ বিশেষ দিবসে শুধু পছন্দ হলেই প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে থাকে। যেহেতু সিনেমা হলে প্রদর্শনের সুযোগ নেই সুতরাং প্রতিটি বেসরকারি টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে অন্তত একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে পারেন।
আপনার অভিজ্ঞতায় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য জরুরি ক্ষেত্র কী কী?
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আমার ধারণা নির্মাতা ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে পারস্পরিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং জরুরি। রিহার্সেল, শারীরিক প্রতিক্রিয়াশীলতা, ভোকাল রেসপন্সিভনেস, উচ্চারণের ধরন জরুরি। আমরা দেখি, আজকাল অধিকাংশ চলচ্চিত্রে সহিংসতা, আগ্রাসী স্বভাব, ধর্ষণ, খুন বেশি করে দেখানো হয়। শারীরিক আক্রমণের মতো ঘটনার ক্ষেত্রে কুশীলবের ভোকাল রেসপন্সিভনেস জরুরি। আমি বলতে চাই রিহার্সেল, প্রশিক্ষণ, কৌশল জানা দরকার। শুধু চেহারা সৌন্দর্য্যরে বড়াই নিয়ে অনেকে ফিল্মে কাজ করার জন্য মুখিয়ে থাকেন। কিন্তু অভিনয়টা কি এত সস্তা? চরিত্র ধারণের আগে মনস্ততাত্ত্বিক প্রস্তুতি দরকার। এক শ্রেণির নায়ক-নায়িকা দুয়েকটি নাটক-সিনেমায় ভালো করার পরই পা মাটিতে ফেলতে ভুলে যান। ফলে, অসাবধানতার জন্য বর্ণময় জীবনকে হঠাৎ বর্ণহীন হয়ে পড়তে হয়।
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে ভালো গল্প তো খুবই দরকার!
স্বল্পদৈর্ঘ্য বলুন বা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বলুন, গল্প ভালো থাকতেই হবে! তবে ভালো গল্প দিয়েই ভালো চলচ্চিত্র হয় না। এর অনেক আনুষঙ্গিকতা রয়েছে। সকল ভালো গল্প ভালো চলচ্চিত্রের উপযোগী নয়। আমরা মুখস্থ বলে থাকি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমুক গল্প অবলম্বনে এই চলচ্চিত্র বা নাটক ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কাউকে অসম্মান না করেও বলতে পারি, সবক্ষেত্রেই ‘অবলম্বন’ শব্দজুড়ে দেওয়া ঠিক নয়। দিনমজুর, নিরন্ন, অশিক্ষিত, অচ্ছুত হরিজনদের নিয়ে চলচ্চিত্র বানাতে হবে এখন। এ ছাড়াও আপনি যেকোনো ছবিই নির্মাণ করুন এতে সরলতা চাই। সরল-সহজ ভাষা চাই।
সরলতা মানে? গল্পের সরলতা, সরল-সহজ গল্প এসব?
না, সেটা বলছি না। আমরা সবাই তো জানি পথের পাঁচালির কথা।
সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’ চলচ্চিত্র?
হ্যাঁ, সেটাই বলছি। পথের পাঁচালির প্রধান গুণ ছিল তার সরলতা। সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্রসংক্রান্ত গ্রন্থে ‘শতাব্দীর সিকি ভাগ’ প্রবন্ধে বলেছেন, পথের পাঁচালির সরলতার পাশাপাশি তার আবেগ, কাব্যময়তা, বাস্তবানুগত্য, মানবিকতা ইত্যাদি গুণের সমাবেশ, যার সবই বিভূতিভূষণের উপন্যাসে বর্তমান। সে ছবি দর্শকের মনে এমনই একটি স্থান করে দিয়েছে, যেখান থেকে তাকে আর সরানো চলে না।
বাংলা চলচ্চিত্রের কথা বলতে গেলে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, অঞ্জন দত্ত, আজিজুর রহমান, এহতেশাম, আলমগীর কবীর, হুমায়ূন আহমেদ, তানভীর মোকাম্মেল, আমজাদ হোসেনের ছবি জনপ্রিয়তা হওয়ার কারণ কি সরলতা?
সরলতা তো বটেই, অন্যান্য দিকও আছে। তারা অত্যন্ত অভিজ্ঞ, গুণী ও পরিশ্রমী। একটি ছবি বিবিধ কারণে জনপ্রিয়তা পেতে পারে। বাস্তবতা, ভাষা, সংলাপ, চিত্রনাট্য, সিনেমাটোগ্রাফি, নির্মাণে মুন্সিয়ানা। মানুষ জটিল বিষয় পছন্দ করে না। চলচ্চিত্র একটি বিশাল শিল্প। বহু আয়োজন ও পরিশ্রমের। প্রয়োজনীয় জনসংবর্ধনা না পেলে এর স্বাস্থ্য দুর্বল হয়ে যায়। জনগণ ও দর্শককে টানতে পারে না। চলচ্চিত্রের একটি ব্যতিক্রম ভাষা রয়েছে, নির্মাণকালে মাথায় রাখেন গুণী নির্মাতারা।
ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য কোন বিষয়টিকে সবার আগে মাথায় রাখা দরকার বলে মনে করেন আপনি?
অভিজ্ঞ ও গুণী নির্মাতারা এমন প্রশ্নের ভালো জবাব দিতে পারবেন, যা আমরা নিজেরাও উপকৃত হব। ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় আমি বলব-আগ্রহ ও কল্পনাশক্তি থাকা চাই চলচ্চিত্র নির্মাতার। যেমন কোনো মানুষই তার গন্তব্যস্থলে উপস্থিত হতে পারবেন না যদি তার কোনো আগ্রহই না থাকে। তিনি উপস্থিত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেই সেখানে যেতে পারবেন। এই ‘আগ্রহ’ ব্যাপারটাই মূলত তীব্র শক্তি। যদি নির্মাতার মাথায় ঘুরপাক খায় একটা চমৎকার ধারণা আর বুকের মধ্যে চাপা থাকে তীব্র কোনো অনুভূতি তবেই কেবল সম্ভব। এগুলোই মূলত নির্মাতাকে শক্তি জোগায়। যেকোনো আগ্রহ জীবনকে ধারালো করে তোলে।
অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ভূমিকা তো এসব ক্ষেত্রে মুখ্য?
হ্যাঁ, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রত্যেকটি চলচ্চিত্রের পেছনে একটি জার্নি থাকে। তবে চলচ্চিত্র নির্মাতাকে যে কাজটি করতে হবে তা হলো গুহামানবকে গুহার মধ্য থেকে টেনে বের করে আনতে হবে। আলো, বাতাস, রোদ্দুর, কাদাপানিতে মেলে ধরতে হবে। ইদানীং আমাদের দেশে কুশীলবদের অনেকেই ‘স্ক্রিপ্ট’ না পড়েই শুটিং স্পটে চলে আসেন। নির্মাতাকে বিব্রত হতে হয়। নাটকের ক্ষেত্রে যাচ্ছেতাই নাকি অবস্থা। এক-দুজন কুশীলবের জন্য অন্যান্য কলাকুশলীকে সমস্যায় পড়তে হয়। এসব বিষয় এই শিল্পের জন্য খারাপ ফলাফল বয়ে আনে। এত গেল একটি দিক। চরিত্রের দোষ-গুণগুলো যদি গভীরভাবে অনুভব করতে না পারি তাহলে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কীভাবে কাজে লাগাব? চরিত্রের মধ্যে মেশাবো কীভাবে? সবচেয়ে জরুরি যেটি তা হচ্ছে- ঝগড়া করতে ভুলে যাওয়া। ভোলা দরকার সুষ্ঠু নির্মাণের স্বার্থে। শুটিং চলাকালে অপর ব্যক্তিকে নিচে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করাও চলচ্চিত্রের স্বার্থেই ভুলে যেতে হবে।
ভালো চলচ্চিত্রের জন্য ভালো চিত্রনাট্য দরকার। আমরা শুনে থাকি চিত্রনাট্য রচনার কাজই অনেকের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র পথ। সুন্দর চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য এর ভূমিকা কী?
আমার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি চিত্রনাট্য রচনায় যে দক্ষতা থাকতে হবে, তা অনস্বীকার্য। কিন্তু কেবল কল্পনা করে চিত্রনাট্য রচনা সম্ভব হলেও সুষ্ঠু নির্মাণ অসম্ভব। বাস্তবতা ও স্বচক্ষে দেখা স্পট ছাড়া ভালো চিত্রনাট্য লেখা সম্ভব হয় না, নির্মাতার দক্ষতা যতই থাকুক। আমরা প্রায়ই দেখি অনেকেই চিত্রনাট্য রচনা করেন, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো ছোঁয়া থাকে না। এ ক্ষেত্রে সিনেমাটোগ্রাফারের ভোগান্তি বাড়ে, বিভ্রান্ত হন তিনি। আমি মনে করি, সবচেয়ে জরুরি এ কাজটিতে অর্থ বাঁচানো মানে চলচ্চিত্রটির নির্মাণ কাজকে ক্ষতি করা। একটা কথা আছে, কোনো কোনো মৃত্যু বেঁচে থাকার চেয়েও ভালো।
/এমএস