বাংলা চলচ্চিত্রে যদি স্বাভাবিক অভিনয়, সহজ হাসি আর চোখের ভাষা দিয়ে চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার কথা বলা হয়— প্রথম সারিতেই উঠে আসে রবি ঘোষের নাম। আজ (২৪ নভেম্বর) সেই কিংবদন্তি অভিনেতার জন্মদিন। ১৯৩১ সালের ২৪ নভেম্বর কোচবিহারের মামাবাড়িতে জন্ম নেওয়া রবীন্দ্রনাথ ঘোষ দস্তিদার—যিনি দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন শুধু ‘রবি’ নামে, আর বাংলা সিনেমায় অমর হয়ে গেছেন ‘বাঘা’ হয়ে।
‘এ আপনি কী বলছেন রাজামশাই?’— গুপী গাইন বাঘা বাইন চলচ্চিত্রের এই বিখ্যাত সংলাপটি আজও যেমন জনপ্রিয়, তেমনই জনপ্রিয় বাঘা চরিত্রটির সেই স্বভাবসুলভ নির্ভার মাধুর্য। বছরের পর বছর কেটে গেছে, কিন্তু সেই দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে দর্শকের।
রবি ঘোষের অভিনয়ের পথটি সহজ ছিল না। চেহারা নিয়ে ঘরেই ছিল সংশয়—“ওই গড়নে কি অভিনয় হয়?” কিন্তু মায়ের প্রেরণা আর নিজের অদম্য ইচ্ছা তাকে ঠেলে দেয় নাট্যমঞ্চে। আশুতোষ কলেজের ছাদে ‘বন্ধুমন’ নাট্যদলের মহড়া, পরে উৎপল দত্তের লিটল থিয়েটার গ্রুপ— সেখানেই তার অভিনয়ের ভিত শক্ত হয়।
১৯৫৯ সালের ‘অঙ্গার’ নাটকে বলা সংলাপ—“আমি একজন ভূতপূর্ব লোক”—রবি ঘোষকে এনে দেয় উল্টো রথ পুরস্কার। সেই নাটকই খুলে দেয় সিনেমার দরজা।
চলচ্চিত্রে রবি ঘোষের উপস্থিতি মানেই ছিল একধরনের স্বস্তি। অভিনয়ে অতিরঞ্জন নয়— ছিল বাস্তবতা, তাল-লয়ে চমৎকার দক্ষতা, আর মুখভঙ্গিতে নিখুঁত ছন্দ।
তার উল্লেখযোগ্য কাজ—
> গল্প হলেও সত্যি
> গুপী গাইন বাঘা বাইন
> অরণ্যের দিনরাত্রি
> কাপুরুষ ও মহাপুরুষ
> হীরক রাজার দেশে
সত্যজিৎ রায় তার সম্পর্কে বলেছিলেন— “রবির চোখ দুটোই কথা বলে।”
উত্তমকুমার মজা করে বলতেন— “দৃশ্যে যদি রবি থাকে, হাসিটা কে কাড়বে?”
হৃষিকেশ মুখার্জির মন্তব্য ছিল আরও বিশেষ— “সবাই সমান নম্বর পায় না—রবি পেয়েছিল একশতে একশ।”
রবি ঘোষ বাস্তবে ছিলেন শান্ত, নির্লিপ্ত, সংযত ও ভদ্রস্বভাবের মানুষ। পর্দায় তার যে প্রাণোচ্ছলতা দেখা যেত— তা যেন চরিত্রে ঢুকে গিয়ে পুরোপুরি নিজেকে সঁপে দেওয়ার ফল।
অভিনয় নিয়ে অহংকার ছিল না কখনোই। তিনি বলতেন— “আমি চরিত্রাভিনেতা। কৌতুক তারই একটি রং, সবটুকু নয়।”
রবি ঘোষ অভিনয় করেছেন— ২০০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে, ৪০টিরও বেশি নাটকে। এই বিশাল ভাণ্ডারই প্রমাণ করে, অভিনয় তার কাছে শুধু পেশা ছিল না— ছিল সাধনা।
১৯৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রয়াত হন। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন এমন সব চরিত্র, যা বাংলা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে, আর কোটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।
এত বছর পরেও গুপী গাইন বাঘা বাইন সিনেমা দেখার সময় নতুন দর্শক বিস্মিত হয়— এমন সরল, এমন স্বাভাবিক এবং এমন নিখুঁত অভিনেতা কীভাবে সম্ভব?