ঢাকা ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত ডেঙ্গুতে আরও ১ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ৪৩৯ অরবিটাল বুস্টার পুনরুদ্ধারে চীনের বড় সাফল্য আসছে রেঞ্জ রোভারের নতুন ইলেকট্রিক জিটি কুবিতে প্রবেশে ফয়জুল করিম অনুমতি পেলেও বাধার মুখে নেতাকর্মীরা চট্টগ্রামে পরিত্যক্ত অবস্থায় আমেরিকার তৈরি অস্ত্র উদ্ধার স্যামসাংয়ের নতুন গ্যালাক্সি ওয়াচ দ্বিতীয় দিনে আরও ১টি ড্রোন ভূপাতিত করল রোমানিয়া শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ জমা ২৭ জুলাই: চিফ প্রসিকিউটর মানবিক সেবার অঙ্গীকারে ‘শেষ বিদায়ের বন্ধু’র নতুন পথচলা মোহাম্মদ আতাউল করিম এর বই ‘যে শুরুর শেষ নেই’ প্রকাশনা অনুষ্ঠান বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প: প্রধানমন্ত্রী গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ বাংলাদেশের নতুন অর্জন AKS রাঙ্গুনিয়ায় ৭ বছরের নাতনিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে নানা গ্রেপ্তার বিইউএফটিতে সিসিপি কর্মসূচির উদ্বোধন, সনদ বিতরণ ও চাকরি মেলা অনুষ্ঠিত মেটলাইফের ৬ মাসে ১৩৮৪ কোটি টাকার বীমা দাবি নিষ্পত্তি লালমনিরহাটে মাদরাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগ নাভারণে মসজিদ নির্মাণকাজে বিএনপি নেতার বাধা দেশ বদলাতে হলে আগে বদলাতে হবে নিজেদের: সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বোয়ালমারীতে প্রতিবন্ধী নারী ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, বাবা কে? ঢাকা রিজেন্সি ও রিহ্যাবের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর বাজিতপুরে খালের পানিতে ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু সমালোচনা করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে: মাহমুদুর রহমান ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিদায়ে আন্দোলন প্রত্যাহার করল সিজেপি জনগণের ভোগান্তি কমাতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে সরকার: বাণিজ্যমন্ত্রী শ্রীনগরে বাস-নসিমনের সংঘর্ষে নিহত ২ বার্সেলোনা অধ্যায় শেষে আয়াক্সে পাড়ি জমাচ্ছেন টের স্টেগেন সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না: প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে: যথাযথ সমীক্ষা হয়েছে কি না তদন্তের দাবি হাতীবান্ধা থানার ৪ পুলিশ কর্মকর্তা ক্লোজড

মালাউই: আফ্রিকার উষ্ণ হৃদয়ে কাটানো ১২টি দিন

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০১:১৮ পিএম
আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০১:২০ পিএম
মালাউই: আফ্রিকার উষ্ণ হৃদয়ে কাটানো ১২টি দিন

আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ছোট্ট দেশ মালাউই। বিশাল লেক মালাউইকে ঘিরেই যেন দেশটির জন্ম। আয়তনে ছোট হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই দেশটি বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র রাষ্ট্রের একটি। চারদিকে সবুজ পাহাড়, নীল লেক, সহজ-সরল মানুষ আর সীমাহীন দারিদ্র্য–সব মিলিয়ে মালাউই এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার নাম। দেশের প্রধান দুটি শহর লিলংওয়ে ও ব্ল্যান্টায়ার। রাজধানী লিলংওয়ে হওয়ায় আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বেশির ভাগই এখান থেকেই পরিচালিত হয়।

মালাউই সফরের আগে বাংলাদেশের তানজানিয়ায় অনারারি কনসাল রফিক ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল দীপু ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি লিলংওয়েতে থাকেন। আগে থেকেই কথা ছিল, আমি তার বাসায় থাকব। বিমানবন্দর থেকে নেওয়ার জন্য তিনি ড্রাইভার পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ছোট্ট বিমানবন্দর আর শান্ত শহর–প্রথম দেখায় খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হয়নি। শহরে একটি বড় শপিং মল, কয়েকটি কফিশপ ছাড়া তেমন কিছুই নেই।

মালাউইয়ের অর্থনীতি অত্যন্ত নাজুক। সরকারি হিসাবে এক ডলারের মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৭০০ কওয়াচা, কিন্তু ব্ল্যাক মার্কেটে সেই ডলারই বিক্রি হচ্ছিল সাড়ে ৩ হাজার কওয়াচারও বেশি দামে। বিমানবন্দরে মাত্র পাঁচ ডলার ভেঙে একটি সিম কার্ড কিনেছিলাম। তখনো বুঝতে পারিনি, এই মুদ্রা সংকট-পরবর্তী দিনগুলোয় আমার ভ্রমণকে কতটা কঠিন করে তুলবে।

মালাউইয়ের ভিসা পাওয়া সহজ নয়। ইনভাইটেশন লেটার ছাড়া প্রায় অসম্ভব। আমার জার্মান বন্ধু ফিলিপ, যার Soul Rebel Resort নখাটা বেতে অবস্থিত, সে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। দুদিন লিলংওয়েতে থাকার পর বাসে করে নখাটা বের উদ্দেশে রওনা হলাম।
সমস্যা শুরু হলো বাসস্ট্যান্ডে। পথে কোথাও টাকা পরিবর্তন করতে পারিনি। ফলে বাসভাড়া দেওয়ার মতো স্থানীয় মুদ্রাও ছিল না। ঠিক তখনই পরিচয় হয় ফ্রান্সের পর্যটক ইলোর সঙ্গে। সে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির একজন ফটোগ্রাফার। আমার সমস্যার কথা শুনে সে কোনো দ্বিধা না করে বাসভাড়া ধার দিল। অচেনা দেশে এক অচেনা মানুষের এই আন্তরিকতা আজও মনে গেঁথে আছে।

নখাটা বেতে পৌঁছে যেন অন্য এক মালাউইকে দেখলাম। বিশাল লেক মালাউই, পাহাড়ঘেরা সৈকত আর শান্ত পরিবেশ মন জয় করে নিল। ইলোর সঙ্গে আমরা ঈগলকে খাবার দিয়েছি, মাছ ধরেছি, লেকে সাঁতার কেটেছি এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখেছি। এখানেই পরিচয় হয় ব্লেস নামের আরেক বন্ধুর সঙ্গে।

মালাউইয়ের বিখ্যাত মাছ চাম্বো (Chambo) এবং বাটার ফিশ আমার ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। বাজার থেকে তাজা মাছ কিনে রেস্টুরেন্টে দিলে তারা অসাধারণ বারবিকিউ করে পরিবেশন করত। আমি যেহেতু মুরগি খাই না, তাই পুরো সফরেই মাছ ছিল আমার প্রধান খাবার।

চার দিন নখাটা বেতে কাটানোর পর ইলো ন্যাশনাল পার্কের উদ্দেশে রওনা দিল। আমিও তার সঙ্গে রাজধানী লিলংওয়ের পথে ফিরলাম। কারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি ছিল। বিমানবন্দরে আমাকে পাসপোর্টে পূর্ণাঙ্গ ইমিগ্রেশন সিল না দিয়ে একটি অস্থায়ী কাগজ দিয়েছিল এবং জানিয়েছিল পরে ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে স্ট্যাম্প নিতে হবে। শুক্রবার হওয়ায় অফিস বন্ধ থাকায় আমি তখন সরাসরি নখাটা বেতে চলে এসেছিলাম।

ভোর ৫টায় উঠে সাত ঘণ্টার বাসযাত্রা শেষে ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে আরেকটি মজার অভিজ্ঞতা হলো। সেদিন ছিল বুধবার। জানতে পারলাম, প্রতি বুধবার দুপুরের পর সরকারি কর্মচারীদের স্পোর্টস ডে থাকায় সব সরকারি অফিস বন্ধ থাকে। পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করেছি, কিন্তু এমন নিয়ম আগে কোথাও দেখিনি।

এরপর রওনা হলাম কেপ ম্যাকলিয়ারের উদ্দেশ্যে। সেখানে যাওয়ার সরাসরি কোনো বাস নেই। তাই শেয়ার ট্যাক্সি বদলাতে বদলাতে প্রথমে মাঙ্গোচি পৌঁছালাম। রাত হয়ে যাওয়ায় সেখানেই একটি সুন্দর হোটেলে উঠলাম। প্রথমে তারা ৮০ হাজার কওয়াচা ভাড়া চাইলেও, আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতার কথা শুনে এবং ভালো রিভিউ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে শেষ পর্যন্ত ৪০ হাজার কওয়াচায় একটি চমৎকার কক্ষ দিল।

পরদিন আবার যাত্রা শুরু। মাঙ্গোচি থেকে কেপ ম্যাকলিয়ার মাত্র ৭৫ কিলোমিটার দূরে হলেও পৌঁছাতে যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছে। তখন বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বেড়ে গিয়েছিল। মালাউইতে এক লিটার জ্বালানি ব্ল্যাক মার্কেটে প্রায় ছয় ডলারে বিক্রি হচ্ছিল। ফলে যানবাহনের তীব্র সংকট ছিল। শেয়ার ট্যাক্সি যাত্রী না পেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করত, অনেক সময় ট্রিপ বাতিল হয়ে যেত। শেষ পর্যন্ত পথের একাংশ মোটরসাইকেলে পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাই।

কেপ ম্যাকলিয়ার ছিল আমার মালাউই সফরের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়। লেক মালাউইয়ের নীল জল, ছোট ছোট জেলেপাড়া, শান্ত পরিবেশ আর অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করে। তিন দিন ধরে সাঁতার কেটেছি, স্থানীয় গ্রাম ঘুরেছি এবং মানুষের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখেছি।
এখানে বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা পর্যটকদের সঙ্গে পরিচয় হয়। সবচেয়ে অবাক করেছিল ৭৪ বছর বয়সী এক আমেরিকান নারীকে। তিনি বিয়ে করেছেন ৩১ বছর বয়সী এক মালাউই যুবককে। এক বছর আগে বেড়াতে এসে পরিচয়, পরে বিয়ে, আর এখন আড়াই লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে একটি হোটেল নির্মাণ করছেন।

টুম্বা ভিউ রিসোর্টে থাকাকালে এক জনপ্রিয় ইউটিউবারের সঙ্গে পরিচয় হয়, যিনি কয়েক মাস আগেই বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছিলেন। পাশাপাশি ফিনল্যান্ডের এক দম্পতির সঙ্গেও পরিচয় হয়। সন্ধ্যার আড্ডা, গল্প আর ছোট্ট পার্টিতে দারুণ সময় কেটেছে।

ফেরার যাত্রা ছিল আরও কঠিন। রাজধানীতে ফিরতে ছয়-সাতবার গাড়ি পরিবর্তন করতে হয়েছে। ছয় ঘণ্টার পথ শেষ করতে লেগেছে প্রায় ১০ ঘণ্টা। প্রতিটি গাড়ি কিছুদূর গিয়ে আবার নতুন যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকত। ফলে পুরো যাত্রাই হয়ে উঠেছিল ধৈর্যের পরীক্ষা।

রাজধানীতে ফিরে বাংলাদেশি কয়েকজন পরিচিত ভাইয়ের আতিথেয়তা পেলাম। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশি খাবার খেয়ে ভালো লাগলেও, মালাউইয়ের তাজা মাছের স্বাদ কখনো ভুলতে পারব না।

১২ দিনের সফরের শেষ সকালে গুগলে খুঁজে দেখি রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ এখনো দেখা হয়নি। দ্রুত সেটি দেখে বিমানবন্দরে পৌঁছে যাই। ছোট বিমানবন্দর হওয়ায় কোনো ঝামেলা ছাড়াই মালাউইকে বিদায় জানাই।
মালাউইকে আমি মনে রাখব তার সীমাহীন সবুজ, বিশাল লেক, আন্তরিক মানুষ আর সরল জীবনযাপনের জন্য। তবে একই সঙ্গে এখানকার দারিদ্র্যও চোখে পড়ার মতো। অধিকাংশ মানুষ সাইকেলেই চলাচল করে, সেই সাইকেলেই কাঠ, ছাগল, মুরগি এমনকি যাত্রীও বহন করে।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বহু বাংলাদেশি অবৈধভাবে মালাউই হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এর ফলে বাংলাদেশিদের প্রতি দেশটির আস্থা কমে গেছে এবং ভিসা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু অসাধু দালালের কারণে পুরো জাতিকেই এর মূল্য দিতে হচ্ছে।

তবু আমি বিশ্বাস করি, মালাউই একটি সম্ভাবনাময় দেশ। শিক্ষাব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো, মানুষ অত্যন্ত আন্তরিক এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনন্য। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সুশাসন পেলে এই দেশ একদিন দারিদ্র্যকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে। আর আমার কাছে মালাউই চিরকালই থাকবে–আফ্রিকার উষ্ণ হৃদয়ে কাটানো এক অবিস্মরণীয় ১২ দিনের গল্প।

লেখক: ১৬০ দেশ ভ্রমণকারী পর্যটক

/এমটি 

ঘুরে আসুন কালাপানি

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০১:৪১ পিএম
ঘুরে আসুন কালাপানি

রিমঝিম বৃষ্টি মানেই প্রকৃতির সজীবতা। পাহাড়ের গায়ে মেঘমালার খেলা। ঝিরি, ঝর্ণার প্রাণ ঝুম বৃষ্টি। গাছগাছালির চকচকে সবুজ পাতা। পাহাড়ি খালগুলো হয়ে ওঠা খরস্রোতা। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়রা এরকম সময়টা বেছে নেয় পাহাড়, ঝর্ণা, ঝিরিপথে ট্রেইল করার জন্য। বলা যায় অনেকেই সারা বছর বৃষ্টির মৌসুমের অপেক্ষায় থাকে। 
 
দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের দামালরা একদিন রাতে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাসে উঠে পড়ি। ভোরে বিবির হাট নেমে সিএনজিতে চেপে চলে যাই হাজারিখিল লালার হাটবাজার। পূর্বপরিচিত আশিষ দাদা আগেভাগেই প্রয়োজনীয় কাজ সেরে রাখায়, সেখানে পৌঁছেই গাইড নিয়ে বের হয়ে যাই। শুরুটা রাঙ্গাপানি চা বাগানের কচিপাতার ঘ্রাণ শুকতে শুকতে এগোতে থাকি। নয়নাভিরাম চা বাগান পেছনে ফেলতেই নান্দনিক ঝিরিপথের দেখা মেলে। গন্তব্য কালাপানি ঝর্ণা। ছোট-বড় পাথর মারিয়ে ছুটে চলা।

দৈত্যাকৃতির গাছ, লতা, গুল্মে ঠাসা চারপাশ। এমনই নৈসর্গিক মায়াবী পরিবেশে নিজেদের ধীরে ধীরে সঁপে দিতে থাকি। পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে দিচ্ছে কালাপানি ট্রেইল অন্য ট্রেইলগুলো থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম হবে। হয়েছেও তাই। ঝিরির পানির নিচে ঘনঘন বেশ গভীর খাদ। একটু বেখেয়াল হলেই কুপোকাত। সামনে যতই যাচ্ছি ততই রোমাঞ্চকর ট্রেইল।

কখনো টিলা পার হয়ে, কখনো পড়ে যাওয়া বড় বড় গাছের তল দিয়ে, কখনোবা আবার লতা-গুল্মর সাহায্যে ঝুলে সামনে এগোতে হচ্ছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক হাইকিং করার পরে নুডলস বিরতি। কেউ পাথর কুড়িয়ে চুলা বানাতে ব্যস্ত, কেউবা জঙ্গল থেকে জোগাড় করে আনল লাকড়ি। আগুন ধরিয়ে ঝিরির পানি দিয়েই তৈরি করা হলো মজাদার নুডলস। আহ কী স্বাদ। মূলত স্বাদের মাত্রাটা বেড়ে যায় বুনো পরিবেশের কারণে। কোথাও কেউ নেই। শুধু ‘দে-ছুট’-এর দামাল ছাড়া। 

খেয়েদেয়ে আবারও নব উদ্যমে হাইকিং। মজার ব্যাপার হলো নামটা কালাপানি হলেও পানি কিন্তু ফুটফুটে সাদা। হয়তো পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে এরকমটা হয়েছে। কারণ, জোঁকের কোনো যন্ত্রণা নেই। যা আমাদের বিস্মিত করেছে। যেতে যেতে বেশ ঘামিয়ে গেলাম। জঙ্গল হলেও বাতাস নেই। ক্লান্তি দূর করতে সবাই নেমে পড়লাম। প্রচুর ঠাণ্ডা পানি। নিমিষেই ক্লান্তি উবে গেল। ইচ্ছামতো হলো জলকেলি। দেহ-মনে প্রশান্তি ভর করতেই সঙ্গে নেওয়া পাহাড়ি পাকা আমের ওপর চলল হামলা। এক্কেবারে ছিল্লা কাইট্টা চাবাইয়া চুইষা পারলে শক্ত আঁটিটাও সাবাড় করে দিতে ঐক্যজোট খাদকের দল।

ভ্রমণকালীন ভ্রমণসঙ্গীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এসবই পরবর্তী সময়ের জন্য হয়ে থাকে মধুর স্মৃতি। যা অবসরে মানুষকে আন্দোলিত করে। ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই সময়টাতে। নির্দিষ্ট কোনো স্থান উপলক্ষ করে যাওয়াটা ভ্রমণ নয়। ভ্রমণ হলো সেই স্থানে পৌঁছানো পর্যন্ত, আগে-পরে যা ঘটবে তাই মিলিয়ে একটি সফল ভ্রমণ। আত্মার পরিশুদ্ধতা ও মানসিক প্রশান্তির অন্যতম উপকরণ সুন্দর একটি ভ্রমণ। যা একজন ভ্রমণপিপাসুকে যুগযুগান্তর গল্প বলতে প্রেরণা জোগায়। এবার উঠি। যেতে হবে আরও কিছুদূর। এপাশটায় ট্রেইলটা এবার আরও বেশি বুনো। যেতে যেতে কানে ভেসে আসে বন্য পরিবেশের অচেনা শব্দ। দুই পাহাড়ের সরু ফাঁক গলে এগোতে হচ্ছে। কোন কোন জায়গা বুক সমান পানি। অল্প কিছু জায়গা পার হতে হলো সাঁতরে।

পানির কলকল আওয়াজ যতই বাড়ে ততই যেন অ্যাডভেঞ্জারের ষোলোকলা ভর করে। প্রাগৈতিহাসিক স্থানের মতো দেখতে একটা জায়গা পার হওয়ার পরেই, চোখে ধরা দেয় তীব্র গতিতে পানীয় ধারা ছুটে চলার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। বড় বড় বোল্ডার, পাথরের ফাঁক গলে গড়িয়ে যাওয়া পানির তীব্রতা দেখতে দারুণ। এর শব্দ মনের মাঝে চমৎকার অনুভূতি সঞ্চার করে। যা আপনাকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও থমকে যেতে বাধ্য করবে। পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে বোঝাই যাচ্ছে ঝর্ণা আর বেশি দূরে নয়। ম্যাঙ্গোবার, পিনাটবার মুখে পুরে বেশ সতর্কতার সঙ্গে এগোতে থাকি। ঝিরির পাথরগুলো বেশ পিচ্ছিল।

তবে ক্যাসকেডগুলো বেশ চমৎকার। সামান্য কিছু সময় ট্রেইল করার পরেই চোখ আটকায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকা প্রকাণ্ড এক বাঁশঝাড়ের ওপর। আরেকটু সামনে যাওয়ার পরেই পতিত বাঁশঝাড়ের ফাঁক গলে চোখ পড়ে রিমঝিম ছন্দ তোলা ঝর্ণার গায়ে। অবিরাম ধারায় বিলিয়ে দিয়ে যায়, কালাপানি ট্রেইলে গড়িয়ে যাওয়া শ্বেত শুভ্র শীতল পানীয় ধারা। হরকাবানের আশঙ্কায় ফ্লাশ ফ্ল্যাড বাঁশঝাড় সরিয়ে, ঝর্ণায় গোসল করার সিদ্ধান্ত বাতিল করে সেখানেই বসে পড়ি। নৈশ পরিবেশে শুধু ঝর্ণার রিমঝিম শব্দ উপভোগ করি। ঘড়ির কাঁটা জানান দেয় দুপুর গড়িয়েছে অনেক আগেই। তাই আর দেরি না করে ফিরতি পথ ধরি। 

যোগাযোগ: সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল হতে বিভিন্ন পরিবহনের গাড়ি চলাচল করে ফটিকছড়ি। সেখান থেকে সিএনজি করে হাজারিখিল। 

থাকা-খাওয়া: লালার হাটবাজারে অথবা হাজারিখিল অভয়ারণ্যে সুব্যবস্থা রয়েছে। 

ভ্রমণ তথ্য: রাতের বাসে গিয়ে সারা দিন ঘুরে চলে আসা যাবে। থাকতে চাইলে বিকেলটা চা বাগানে, পরের দিন হাজারিখিল অভয়ারণ্য ও ভান্ডারিয়া ঝর্ণায় ঢুঁ মারতে পারেন। কালাপানি নামকরণের ইতিহাস জানা যায়নি। তবে স্থানীয়রা কালাপাইন্না ছড়া নামেও চিনে থাকে। ঝর্ণার সৌন্দর্য যেমন-তেমন, কিন্তু কালাপানি ঝিরির ট্রেইলটা অসাধারণ রোমাঞ্চকর। যা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ভ্রমণপিপাসুদের চোখে বিস্ময়কর সৌন্দর্যের রূপে ধরা দেবে।

/এমটি 

শত বছরের অমলিন কীর্তি তাজহাট জমিদারবাড়ি

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
শত বছরের অমলিন কীর্তি তাজহাট জমিদারবাড়ি

শত বছরের অমলিন কীর্তি রংপুরের তাজহাট জমিদারবাড়ি। কালের পরিক্রমায় আমাদের অনেক কীর্তি হারিয়ে গেলেও এখনো অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে তাজহাট জমিদারবাড়ি। রংপুর শহর থেকে অল্প কিছুদূরেই এর অবস্থান। রিকশায় যেতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগে।
অনেক দিনের পরিকল্পনার শেষে আজ আমরা রংপুরে উপস্থিত ভ্রমণের নিমিত্তে।

সঙ্গে আছে আমার সব সময়ের ভ্রমণ সঙ্গী মা। রংপুরে শহরে উঠেছি আমার মাসির বাসায়। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই তৈরি হয়ে নিলাম গন্তব্য তাজহাট জমিদারবাড়ি। স্থাপত্যের নিদর্শন এই বাড়িটি ১৯৮৪ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বেঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। 

কিন্তু এখন এটি সোনালি অতীতের সাক্ষী হয়ে একটি সুন্দর জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। বৃহত্তর রংপুরে একসময় বেশ কয়েকটি জমিদার বাড়ি ছিল। তবে তাজহাট জমিদার বাড়ি ছাড়া সবকটিই প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। দূর থেকেই সবার চোখ চলে সেই রাজবাড়ির দিকে। 

বাড়িটির ইতিহাস আমার আগে থেকেই কিছুটা জানা ছিল। ওখানে গিয়ে আবার নতুন করে জানতে পারি অনেক কিছু। এই প্রাসাদটি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় (জিএল রায়) নির্মাণ করেন। এ বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মান্নান লাল রায়। 

তিনি সুদূর পাঞ্জাব থেকে রংপুরের সমৃদ্ধ স্থান মাহিগঞ্জে স্বর্ণ ব্যবসা করার জন্য এসেছিলেন, তা প্রাচীন রংপুরের ইতিহাস পুস্তক থেকে জানা যায়। প্রথমে তিনি নানা ধরনের নামিদামি হীরা, মানিক, জহরতখচিত তাজ বা টুপির ব্যবসা করেছিলেন। সেই তাজ বিক্রির জন্য এখানে হাট বসে, যা পরবর্তী সময়ে বিরাট প্রসিদ্ধি লাভ করে। আর এ তাজহাটকে কেন্দ্র করে এই জমিদার বাড়ির নামকরণ করা হয় ‘তাজহাট জমিদারবাড়ি’। 

জানা যায়, চমৎকার এই স্থাপনা তৈরিতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগে। ৭৬ দশমিক ২০ মিটার দৈর্ঘ্য ভবনটি তৈরি করতে ইতালি থেকে আমদানি করা শ্বেতপাথর ব্যবহার করা হয়। শ্বেতপাথরের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম আমি আর মা। দ্বিতীয় তলায়ই রয়েছে জমিদার বাড়ির সংগ্রহশালা বা জাদুঘর। ক্ষুদ্রাকার কোরআন শরিফ, সম্রাট আওরঙ্গজেবের স্বহস্তে লেখা খুতবা, কবি শেখ সাদীর স্বহস্তে লেখা কবিতা, শিবলিঙ্গ, কষ্টিপাথরের মূর্তি, শিলামূর্তি, পোড়ামাটির ফলক, প্রাচীন মুদ্রা, সংস্কৃত ভাষায় লিখিত কিছু চিঠি, শিলালিপিসহ বেশকিছু চমৎকার সংগ্রহ চোখে পড়ল। 

ঢাকার আহসান মঞ্জিলের মতো দেখতে এই জমিদার বাড়িটির তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় রয়েছে রাজা গোপালের ব্যবহৃত নানা জিনিস। চারতলা এই বাড়িটির ভেতরে রয়েছে অসংখ্য কক্ষ, গোসলখানা ও অতিথি শয়নশালা। প্রাসাদটি প্রায় ২১০ ফুটের মতো প্রশস্ত ও চারতলার সমান উঁচু। এর গঠনশৈলী প্রাচীন মোগল স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত বলে মনে করা হয়। 

এর প্রমাণ মেলে মধ্যভাগে একটি বিশাল গম্বুজ ও দুই পাশে তার ছড়িয়ে যাওয়া দালানগুলোর মধ্যে একটি মসজিদের অবয়ব থেকে। তবে বাংলাদেশের অন্য সব প্রাসাদের থেকে এই বাড়িটিকে আলাদা করা যায়, তা হলো এর সিঁড়িগুলো। এতে ৩১টি সিঁড়ি আছে, যেগুলো ইতালীয় মার্বেল পাথরে তৈরি। সিঁড়ি থেকে উঠে জাদুঘর পর্যন্ত মেঝের পুরোটা এই পাথরে তৈরি। রাজবাড়িটির পেছনের দিকে গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে। সিঁড়িটি একটি সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত, যা সরাসরি ঘাট নদীর সঙ্গে যুক্ত, এমন কথা লোকমুখে শোনা যায়। 

তবে নিরাপত্তার কারণে সিঁড়িটি এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শ্বেতশুভ্র মার্বেল ও তার সবুজাভ নকশায় তৈরি প্রাসাদের সুন্দর ফোয়ারাটি কালের বিবর্তনে কিছুটা মলিন হলেও এখনো এর জৌলুস শেষ হয়ে যায়নি। যা-ই হোক, ২০০৫ সালের আগে জমিদার বাড়িটি তাজহাট রাজবাড়ি হিসেবেই সবার কাছে পরিচিতি পায়। জাদুঘর দেখা শেষে ঘুরে দেখলাম বাড়ির অন্য কক্ষগুলো। পুরো ভবনটিতে রয়েছে মোট ২৮টি কক্ষ। এখানে একটা গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে, যা কোনো সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঘাঘট নদীতে মিলেছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। 

তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে তা এখন বন্ধ। নিচতলায় সবাই মিলে বেশকিছু ছবিও তোলা হলো। অতঃপর প্রাসাদের ভেতর থেকে বের হয়ে নিচে এলাম সবাই। প্রাসাদ চত্বরে ফুল-ফলের নানা গাছের সারি ছাড়াও একটা ছোট দীঘি রয়েছে। তার পাশেই রয়েছে বিশাল বাগান। দুপুর হয়ে গেছে। এখান থেকে যাওয়ার কথা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও কারমাইকেল কলেজ। ভ্রমণার্থীদের জন্য বলে রাখি, এখান থেকে কারমাইকেল কলেজ বেশ কাছেই। 

তাই এখানে এলে ঘুরে যেতে ভুলবেন না এ ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর দেরি করলাম না। তাজহাটকে সেদিনের মতো বিদায় জানিয়ে রওনা হলাম নতুন গন্তব্যে।

কীভাবে যাবেন
রাজধানীর গাবতলী, কল্যাণপুর ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন পরিবহনের বাস যেকোনো সময় রংপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এসি, নন-এসি ভেদে প্রতি যাত্রীর ভাড়া পড়বে ৫৫০-১২০০ টাকা। তবে কুড়িগ্রামের বাসে উঠলে জাদুঘরের ঠিক সামনে নামা যায়। তা ছাড়া রংপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে জাদুঘর যেতে ২০ টাকা ভাড়ায় রিকশা পাওয়া যায়। আর অটোতে গেলে ১০ টাকা লাগে। 

হাঁড়িভাঙা আমের দেশে

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম
হাঁড়িভাঙা আমের দেশে

ছোটবেলা থেকেই ভ্রমণ কাহিনির প্রতি আলাদা একটি টান ছিল। সময় পেলেই ভ্রমণ কাহিনি নিয়ে পড়তে বসে যেতাম। আর ভাবতাম বড় হয়ে ইবনে বতুতার মতো বের হয়ে যাব বিশ্ব ভ্রমণে। ভেবে দেখুন বতুতা সাহেব মাত্র ২০ বছর বয়সে পৃথিবী দেখতে বেরিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন তার ৪৯ বছর বয়সে। অর্থাৎ পৃথিবীর পথে পথেই কেটেছে তার ২৯ বছর। 

সেটা সেই ১৪ শতকের ঘটনা। জলদস্যু, মরুভূমির ঝড় আর পাগলা রাজাদের আক্রমণ ঠেকিয়ে বতুতা কখনো হেঁটে, কখনো জাহাজে চড়ে তার বিশ্বভ্রমণ করেছেন। আর এখনকার এই দারুণ প্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থার যুগে আমরা তিন দিন চার রাত ধরনের প্যাকেজ ট্যুর ছাড়া কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি না। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে জটিল অঙ্ক শেষ করে এক মাস আগে থেকে ঠিক করি কোথায় যাব, কীভাবে যাব, কত দিন থাকব, কোথায় থাকব ইত্যাদি। 

এরই মাঝে সবকিছুকে উড়িয়ে দিয়ে ‘বতুতাদর্শে’ উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম দেশের উত্তরাঞ্চলের দিকে, ভ্রমণ সঙ্গী আমার মা। কোনো দর্শনীয় জায়গা দেখার ইচ্ছা নিয়ে নয়, ইচ্ছাটা ছিল উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনধারা দেখব। যেখানে রাত হবে, সেখানেই কাত হব; যেতে যেতে যে রাস্তা ভালো লাগবে, সেদিকেই চলতে শুরু করব। 

এদিকে শুক্র-শনিবারের বন্ধসহ অফিসের ছুটি পেয়েছি একদিন মাত্র তাই তিন দিন সময় এর মাঝে আমাকে ঘুরে আসতে হবে আগে ভেবেছিলাম ছুটি আরেকটু বেশি দিন পাব। তা পেলে উত্তরাঞ্চলে মোটামুটি ঘুরে আসা যাবে কিন্তু বিধি বাম জুন মাস তাই বড় স্যারের হুকুম একদিনের বেশি ছুটি দেওয়া যাবে না। তাই আর ভালোভাবে উত্তরাঞ্চল ঘুরার প্ল্যানটা মাঠে মারা যাওয়ার জোগাড়। 

আমার অফিসের সবাই এক বাক্যে না বলছে, এবার না যাওয়ার জন্য খুব গরম পড়েছে আর এত অল্প সময়ে তেমন কিছুই দেখতে পারব না। এদিকে আমি নাছোড়বান্দা যেহেতু যাব বলেছি সেহেতু যাবই। সব প্রতিকূলতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে আমি আর আমার মা রওনা হলাম উত্তরাঞ্চলের দিকে। আমার আবার ট্রেনে ভ্রমণ করতে খুব ভালো লাগে। 

সে মোতাবেক ঢাকা থেকে সকালের ট্রেনে উত্তরাঞ্চলে দিকে আমরা রওনা হলাম। সকাল ৯টায় আমাদের ট্রেন রংপুর এক্সপ্রেস। ৯টার আগেই আমরা স্টেশনে এসে উপস্থিত কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়ে কিছুটা বিলম্বে যাত্রা যেন প্রথা গত ব্যাপার। ৯টার ট্রেন ১০টায় ছাড়ল আমরা যাত্রা শুরু করলাম। প্রকৃতির মায়াবী রূপকে সঙ্গী করে ট্রেন তার সেই মধুর কু ঝিক ঝিক ঝিক শব্দে এগিয়ে চলল। ট্রেনের ঝক ঝক শব্দ, যানজটবিহীন পথ যে কারও ভালো লাগার কথা। 

ট্রেন লাইনের দুই পাশে কখনো বস্তি আবার কখনো সারি সারি গাছের মাঝে ছুটে চলছে। আশপাশে ঘরবাড়ি সবকিছুকে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে ট্রেন তার গন্তব্যে। ট্রেনের জানালার পাশে বসে প্রকৃতির রূপ দেখা খুবই উপভোগ্য। মাঝে মাঝে ট্রেনের গতি কমে এলে কেউ কেউ গন্তব্যে নেমে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব, চাটমোহর, নাটোর, সান্তাহার, বগুড়া পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের গন্তব্যে। 

ট্রেনে বসে কথা হলো প্রকৃতি বাংলাদেশ-এর সুজন সেন গুপ্তের সঙ্গে। তিনি বললেন, সময় যেহেতু কম তাই কম সময়ে রংপুর বিখ্যাত হাঁড়িভাঙা আমের বাগান দেখে আসার পরামর্শ দিলেন। সঙ্গে দিলেন আবু জাহিদ ভাইয়ের মোবাইল নম্বর। আবু জাহিদ ভাইয়ের বাড়ি রংপুরে তার রংপুরের পদাগঞ্জ এলাকায় চার একর জায়গার ওপর আম বাগান আছে। রাত ৮টা আমাদের ট্রেন এসে নোঙর করল, রংপুর স্টেশনে আগে থেকে আবু জাহিদ ভাই স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। 

রংপুর স্টেশন থেকে আমরা রিকশা করে জাহাজ কোম্পানি মোড়ে গোল্ডেন টাওয়ার হোটেলে পৌঁছালাম বেশ শান্ত-নিরিবিলি পরিবেশ। কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম রাতের আঁধারে রংপুর শহর ঘুরতে। রংপুর শহরের জুম্মাপাড়া, গোমস্তপাড়া, বেদ পট্টি, স্টেশন রোড, নবাব বাড়ি, আমলাতলা এলাকাগুলো আমরা রিকশা করে ঘুরে বেড়ালাম। পায়রা চত্বরে এসে দেখা মিলল মিষ্টি দোকান পুষ্টির। আমি আবার মিষ্টি দেখলে লোভ সামলাতে পারি না, অগত্যা মা না বলার পরও মিষ্টি দোকানে ঢুকে হরেক রকম মিষ্টি চেখে দেখলাম। অসাধারণ টেস্ট, ঢাকা শহরের তুলনায় মিষ্টির দাম তুলনামূলক কিছুটা কম তাই তিন বাক্স শুকনো মিষ্টি সঙ্গে করে নিলাম ঢাকাবাসীর জন্য। পরের দিন সকাল বেলা আবু জাহিদ ভাই এসে উপস্থিত, আমরা নাশতা করে বের হলাম গন্তব্য মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ গ্রামে আমের বাগান। 

আমরা সিএনজি করে যাত্রা শুরু করলাম, পথিমধ্যে আবু জাহিদ জানান, আমের নাম কেন হাঁড়িভাঙা হলো। এ নিয়ে লোকজনের মাঝে নানা কথার প্রচলন রয়েছে। তবে যতদূর জানা যায়, পদাগঞ্জের এক ব্যক্তি বাজার থেকে আম কিনে আনেন। সেই আম খেয়ে তিনি বীজটি রেখে দেন একটি পরিত্যক্ত হাঁড়িতে। ওই হাঁড়িতেই বীজ থেকে চারা গাছ বের হয়ে আসে। আর সেই গাছটি তিনি বাড়ির পাশে রোপণ করেন। ওই ব্যক্তির নিবিড় পরিচর্যায় গাছে আম ধরতে শুরু করে। হাঁড়ি থেকে ওই আমের উৎপত্তি হওয়ায় এর নাম হয় হাঁড়িভাঙা আম। 

এদিকে মা শুরু করলেন তার স্মৃতির কুঠোর থেকে আমের ইতিহাস বলা–খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে দিগি জয়ী বীর সম্রাট আলেকজান্ডার ভারতবর্ষ আক্রমণের পর এক আম বাগানে তাঁবু গেড়ে বিশ্রাম নেওয়ার সময় আমের সঙ্গে পরিচিত হন। সুস্বাদু আম খেয়ে এতটাই ভক্ত হয়ে পড়েন যে, প্রাসাদের চার ধারে আমের বাগানে ছেয়ে দেন। প্রাচীন শাস্ত্রে আম গাছকে ‘কল্প বৃক্ষ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কখনো বলা হয়ে ইচ্ছাপূরণের বৃক্ষ। আমের পাতা মঞ্জরিকে নিয়ে আছে লোক কাহিনি।

আমের কচি পাতার ডাল শুভ ও মঙ্গল কাজে ব্যবহার হয়। ১৫ শতকের দিকে স্পেনিশ পরিব্রাজক ও পর্তুগিজরা মহাদেশে আম নিয়ে রীতিমতো গবেষণা শুরু করে। যার ধারাবাহিকতায় প্রাচীন চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং ও আরব অভিযাত্রী ইবনে হানকাল আমের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করে ভ্রমণ কাহিনিকে সমৃদ্ধ করেন। তারও বহু আগে প্রেমের দেবতা কিউপিড মানব হৃদয়ে প্রণয় জাগাতে প্রেমের তীরের অগ্রভাগে আমের মুকুল গেঁথে দেন। আম মুঘল সম্রাট আকবরের এতটাই প্রিয় ছিল যে, আম দিয়েই শুরু হতো অতিথি আপ্যায়ন। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছালাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য পদাগঞ্জে। এসেই চোখে পড়ল বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে শুধু হাঁড়িভাঙা আমের বাগান। 

যেদিকে দুচোখ যায়, সেদিকে শুধু বাগান আর বাগান। এমন কেউ নেই যিনি বাড়ির আঙিনা, উঠান কিংবা ফসলি জমিতে আমের গাছ রোপণ করেননি। আবু জাহিদ ভাই তার বাগানে নিয়ে গেলেন। বিশাল এলাকা নিয়ে জাহিদ ভাইয়ের আম বাগান কতটুকু। এলাকা নিয়ে আম বাগান জানতে চাইলে জাহিদ ভাই জানালেন চার একর জায়গার ওপর তার বাগান। ছয় বছর ধরে তিনি আমের বাগান করছেন। আর আপনারা যে গাছগুলো দেখছেন তাদের বয়স চার বছর। প্রতিটি গাছ থেকে তিন থেকে চার মণ আম পাওয়া যায়। আম পাকলে কিছুটা লালচে রং ধারণ করে। 

প্রতিটি আমের ওজন ২০০ থেকে ৪০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। এত আম দেখে লোভ কি সামলানো যায়? আপনারাই বলুন? তাই নির্লজ্জের মতো জাহিদ ভাইকে বললাম আম খাওয়াবেন না? জাহিদ ভাই জিভে কামড় দিয়ে বলে আরে ভুলেই গিয়েছিলাম আপনাদের সঙ্গে গল্প করতে করতে সঙ্গে সঙ্গে ডাক পড়ল দুলাল ভাইয়ের, উনি এখানে দেখভাল করেন। শুরু হলো আমাদের আম খাওয়ার পর্ব। একের পর এক আম সাবাড় করছি হঠাৎ মনে হলো অনেক সময় শুনি আম বাগানে আম পাকানোর জন্য কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়, তাই জাহিদ ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম আপনারা কীটনাশক দেননি তো? আম পাকানোর জন্য জাহিদ ভাই বললেন আপনারা নিশ্চিন্তে খেতে পারেন আম। আমার এখানে শুধু আমের মুকুল আসার আগে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়, শুধু পোকা মাকড় আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য। দেখতে দেখতে আমাদের শহর পানে ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে এল। ফিরে যাওয়ার আগে আবু জাহিদ ভাই মিল বাজার এলাকার বিখ্যাত লুচি আর সবজি খাইয়ে আমাদের বিদায় দিলেন। 

পথের ঠিকানা: ঢাকা থেকে ট্রেন করে রংপুর ভাড়া নেবে ৩৯০ থেকে ১৩৯৫ টাকা অথবা বাসে করে (এস আর ট্রাভেলস, এসএ পরিবহন, নাবিল এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন প্রতিটির এসি বা নন-এসি বাস আছে) রংপুর ভাড়া ৪৫০ থেকে ৬৫০ টাকা। রংপুর শহর থেকে অটো করে পদাগঞ্জ রিজার্ভ নিলে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আর বাসে করে গেলে ৩০ টাকা।

/এমটি 

রামু বৌদ্ধ বিহারে একদিন

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম
রামু বৌদ্ধ বিহারে একদিন

ডান হাতের ওপর মাথা রেখে পা টান করে শুয়ে আছেন গৌতম বুদ্ধ! খোলা চোখে পৃথিবীর সব প্রাণীর প্রতি সুদৃষ্টি রাখছেন তিনি। চোখের দিকে তাকালে মনে হবে যেন আশীর্বাদ দিচ্ছেন। 

এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে কক্সবাজারের রামু উপজেলার উত্তর মিঠাছড়ি গ্রামের বৌদ্ধবিহারে। আমি আর আমার ভ্রমণসঙ্গীর আজ দ্বিতীয় দিন কক্সবাজারে। ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর ৫টা হবে, আমি গভীর নিদ্রায় শায়িত। সানন্দার ডাকাডাকির চোটে আমায় ঘুম থেকে উঠতেই হলো। ঘুম থেকে উঠেই চলে গেলাম সমুদ্র সৈকতের বালুকাবেলায়। 

সেখানে ঘণ্টা দুয়েক কাটিয়ে ফিরে এলাম আমাদের অস্থায়ী নিবাসে। সকালের নাশতা শেষ করতেই খাবারের টেবিলে সানন্দার প্রশ্ন–আজ কোথায় যাব আমরা? আমি বললাম, আমিও ভাবছি আজ কোথায় যাওয়া যায়। ভেবে কোনো উত্তর পাচ্ছি না প্রশ্নের। ভাবলাম এখানকার লোকদের কাছ থেকেই জেনে নিই কোথায় যাওয়া যেতে পারে আজ। 

আমি ইশারা দিতেই একজন এসে উপস্থিত। বললাম, ভাই আপনাদের শহরে এসেছি, নতুন কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায় বলুন তো? উত্তরে হাসিমুখে বললেন, হিমছড়ি কি গিয়েছেন। আমি বললাম, গতকালই ঘুরে এসেছি। পরে বলল, ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে। আমি বললাম, তাও গিয়েছি। পরে বেচারা একটু চিন্তার মধ্যেই পড়ে গেলেন। কিছু সময় চিন্তা করে বললেন, তাহলে আপনি রামু উপজেলায় অবস্থিত ভুবন শান্তি ১০০ সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধের মূর্তি দেখে আসেন, ভালো লাগবে। আমি বললাম, ভালোই বলেছেন, পেপারে পড়েছি এই সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধের মূর্তির খবর। কিন্তু সৌভাগ্য হয়নি দেখার। আমি বললাম, ঠিক আছে তবে চলতি পথের ঠিকানাটা আমার পাইলটকে একটু বুঝিয়ে বলেন যেন আমরা সহজেই পৌঁছে যেতে পারি। 

এদিকে ভেবেছিলাম সব আইটেম চেখে দেখব, কিন্তু আর খেতে ইচ্ছা করছিল না। আমরা গন্তব্যের পানে যাত্রা শুরু করলাম। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা এসে পৌঁছালাম রামুতে। সেখানে হাতের বাঁয়ে প্রবেশ করলাম আমরা। দেখতে পেলাম বড় সাইনবোর্ড–‘এদিকে ভুবন শান্তি ১০০ সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধের মূর্তি’। ওই দিকেই আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। 

আমরা চলছি এগিয়ে, দেখা পেলাম ধান খেতের। বেশ ভালোই লাগছিল চলতি পথে, কিছু দূর যাওয়ার পর বাধল বিপত্তি। সামনের ব্রিজ ভাঙা, তাই আর গাড়ি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। অগত্যা গাড়ি থেকে নেমে আমরা পদব্রজে এগিয়ে গেলাম। 
চার-পাঁচ মিনিট হাঁটার পর আমরা এসে পৌঁছালাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। আমরা প্রবেশদ্বার পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম।

সেখানে জুতা রেখে নগ্ন পায়ে এগিয়ে গেলাম। দূর থেকে গৌতম বুদ্ধের পায়ের দেখা পেলাম। সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে গেলাম আমরা। প্রায় শতাধিক সিঁড়ি পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ভুবন শান্তি ১০০ সিংহশয্যা গৌতমবুদ্ধের মূর্তির কাছে। গৌতম বুদ্ধের মূর্তি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। গৌতম বুদ্ধ যেন খোলা চোখে পৃথিবীর সব প্রাণীর প্রতি সুদৃষ্টি রাখছেন। চোখের দিকে তাকালে মনে হবে যেন আশীর্বাদ দিচ্ছেন। 

কিছু সময় আমরা দাঁড়িয়ে থাকলাম। কথা হলো ওই মন্দিরের এক ভিক্ষুর সঙ্গে। তিনি বললেন, ২০০৬ সালে সোনালি রঙের মূর্তিটি একেবারেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরির কাজ শুরু করেন শ্রীমৎ করুণা শ্রীভিক্ষু। 

২০০৯ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। মায়ানমার থেকে আসা দক্ষ একজন শিল্পীর সঙ্গে নিজেই স্থপতি হিসেবে কাজ করেন তিনি। করুণাশ্রী ভিক্ষু প্রায় দুই একর জায়গায় ২০০২ সালে বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনাকেন্দ্র বৌদ্ধবিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর মূর্তি তৈরির পরিকল্পনা মাথায় আসে তার। আমরা গৌতম বুদ্ধের মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে লাগলাম। পরে গেলাম পাশের গৌতম বুদ্ধের মন্দিরে। সেখানে গৌতম বুদ্ধকে দর্শন করে কিছু সময় থেকে এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। আমরা বের হয়ে যাব, সে সময় এক ভিক্ষু আমাদের পেছন থেকে ডাকতে লাগলেন। বললেন, প্রসাদ খেয়ে যান আপনারা। 

খিচুড়ি এমনিতেই আমার পছন্দের খাবার, অন্যদিকে পেটেও খিদে লেগেছে, তাই আর না বললাম না। পেটপূজা শেষ করে আমরা এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। পাশেই দেখা পেলাম সবুজের সমাহার। বলা যায়, বন-পাহাড়-সমতলের মিলনমেলা যেন। প্রায় কোটি টাকা খরচে নির্মিত মূর্তিটি দেখতে শ্রীলঙ্কা, বার্মা, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ বৌদ্ধ ধর্ম‍াবলম্বী দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সাধারণ পর্যটকরা নিয়মিত আসেন এখানে।

কীভাবে যাবেন? 
এই ‘ভুবন শান্তি ১০০ সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধ মূর্তি’ দেখতে আপনাকে যেতে হবে কক্সবাজার। বাসভাড়া ঢাকা থেকে ৮০০-২২০০ টাকা। তাই দেশের যে প্রান্তেই থাকুন প্রথমেই চলে আসুন কক্সবাজার। কক্সবাজার জেলা সদর থেকে সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মিনিবাসে রামু থানার উত্তর মিঠাছড়িতে এলেই পাওয়া যাবে বৌদ্ধবিহারটি। 

রাবার বাগান স্টেশন থেকে সোজা পশ্চিমে (চা-বাগান) বৌদ্ধবিহারটি অবস্থিত। কক্সবাজার শহর থেকে ট্যাক্সি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা টমটম নিয়ে যেতে পারেন বৌদ্ধবিহারে। ভাড়া হবে জনপ্রতি ৪০ টাকা। আর রিজার্ভ গেলে ভাড়া পড়বে ২০০-২৫০ টাকা।

/এমটি 

বিমানবাহিনী জাদুঘরে

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০২:৩২ পিএম
বিমানবাহিনী জাদুঘরে

আকাশে ওড়ার স্বপ্ন কমবেশি আমাদের সবারই আছে। পাখির মতো আকাশে ভেসে বেড়াতে না পারলেও এখন উড়োজাহাজে করে মানুষ আকাশে উড়তে পারে। স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন দেখতে কার না ভালো লাগে। সেটা যদি হয় ‘যুদ্ধবিমান’ বিষয়ক কোনো নিদর্শন–তাহলে কৌতূহলের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। তেমনই কৌতূহলের এক জাদুঘর ‘বাংলাদেশ বিমান জাদুঘর’। 

যেখানে রয়েছে ডাকোটা বিমানসহ অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন। অনেক দিন ধরে শুধু পরিকল্পনাই করে যাচ্ছিলাম বিমান বাহিনী জাদুঘর ঘুরতে যাব। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে হয়ে উঠছিল না। শেষ পর্যন্ত আমি আর পৃথু বের হলাম ভ্রমণ গন্তব্যের পানে। শুক্রবার বলে রাস্তায় তেমন যানজট নেই বললেই চলে। 

প্রায় ৩৯ মিনিটেই আমরা এসে উপস্থিত হলাম জাদুঘরের প্রবেশদ্বারে। শুরুতেই কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে নিলাম। জাদুঘরের বাইরে দিকটা দেখে আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ছোটখাটো একটি পরিসরের মধ্যে এটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ করার পর বুঝতে পারলাম এটি আয়তনের দিক থেকে বেশ বড়।

জাদুঘরটি বিশাল জায়গাজুড়ে অবস্থিত এবং এখানে একটি ছোটখাটো বিনোদনকেন্দ্রও আছে। নরম ঘাসের ওপর দিয়ে পদব্রজে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। অন্য সব জাদুঘর থেকে এ জাদুঘরটি আলাদা। এটি কোনো বদ্ধ ঘরে নয়। 

খোলামেলা সবুজ প্রান্তরে মনোমুগ্ধকর পরিবেশে এ ঐতিহাসিক জাদুঘর। জাদুঘরের মধ্যে প্রবেশ করলে চোখে পড়ল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বিমান বাহিনীর গৌরবের জঙ্গিবিমান, হেলিকপ্টার ও রাডার। আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। আমরা দর্শনীর বিনিময়ে চেপে বসলাম হেলিকপ্টারে। ছোটবেলায় খুব আগ্রহ ছিল কীভাবে বিমান আকাশে ঘুরে বেড়ায়। 

একজন আমাদের বলছিলেন কীভাবে হেলিকপ্টার আকাশে ডানা মেলে। আজ নিজের চোখে দেখতে পেলাম। মোট ১৯টি বিমান এবং ৩টি রাডার রয়েছে এ জাদুঘরে। যুদ্ধবিমান ডাকোটার পাশাপাশি রয়েছে ‘অ্যালিউট’ হেলিকপ্টার। এটি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান বাহিনীর সেনানিবাসে আঘাত হানা হয়েছিল। মূল গেট থেকে খানিক এগোলে চোখে পড়ল বিশাল একটি বিমান।

 

বাংলাদেশের প্রথম পরিবহন উড়োজাহাজ এটি। রাশিয়ার তৈরি এন-২৪ বিমানটি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে ১৯৭৩ সালে ‘বলাকা’ নামে সংযোজিত হয়। বিমানটির যাত্রী ধারণক্ষমতা ৪৪ জন। বলাকায় দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগও রয়েছে। বলাকা ছাড়াও আরও তিনটি বিমানে দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। বিমানগুলোয় প্রবেশের জন্য টিকিট মূল্য ৩০ টাকা। বিমানগুলোয় প্রবেশ করলে প্রদর্শন করা হয় বিমান বাহিনীর ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র। দেখা পেলাম হান্টার বিমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিমানটি দিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের ওপর হামলা চালানো হতো। ওই সময়ে এটি খুবই শক্তিশালী এবং নির্ভরশীল বিমান ছিল। 

বিমান বাহিনীতে ১৯৮৯ সালে চীনের তৈরি ‘এফটি-৭ বিমান’ যুদ্ধবিমান হিসেবে প্রথম সংযোজিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৮৬ যুদ্ধবিমানটি ব্যবহার করে। যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয়ে বিমানটিকে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় ফেলে রেখে যায়। পরে বিমান বাহিনীর প্রকৌশল কর্মকর্তা ও টেকনিশিয়ানরা বিমানটি মেরামত করেন এবং ১৯৭২ সালে সফলভাবে উড্ডয়ন করান। বিমানটি ১৯৪৭ সালের তৈরি। 

মুক্তিযুদ্ধের সময় ৪ ডিসেম্বর বিমান বাহিনীর বৈমানিকরা কানাডায় নির্মিত অটার-৭২১ বিমান দিয়ে হানাদার বাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটিতে আঘাত হানে। সেটিও আছে এই জাদুঘরে। রয়েছে মিগ-২১ এফএল বিমান। বিমানটি প্রধানত আকাশ প্রতিরক্ষা ও ভূমি পাহারার জন্য ব্যবহৃত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এ বিমানটি আকাশ প্রতিরক্ষা ও আকাশ থেকে ভূমিতে আক্রমণের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখে। ‘ন্যাট-৯১৬ বিমান’ জঙ্গিবিমানগুলোর মধ্যে সর্বাধিক হালকা এবং আয়তনে ছোট।

১৯৫০ সালে ভারতীয় বিমান বাহিনীতে এটি অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। সে সময়ে ন্যাট বিমান আকাশযুদ্ধে অত্যন্ত চৌকস বিমান হিসেবে পরিচিতি ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে তিনটি ন্যাট বিমান পাকিস্তানের তিনটি স্যাবর জেট (এফ-৮৬) ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর বগুড়ায় আকাশযুদ্ধে এ বিমানটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখে। জাদুঘরে স্থাপিত প্রতিটি নিদর্শনের সঙ্গে আছে তথ্যাবলি। আগ্রহীরা তা থেকে জেনে নিতে পারেন প্রয়োজনীয় তথ্য। 

মুক্তিযুদ্ধে বিমান বাহিনীর শহিদদের স্মরণ করতে তৈরি করা হয়েছে শহিদ কর্নার। জাদুঘরে দর্শনার্থীদের খাবারের সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রাঙ্গণের দক্ষিণ দিকে নির্মাণ করা হয়েছে একটি ফুড কোর্ট। এছাড়া বিমান বাহিনীর বিভিন্ন দ্রব্যাদি দিয়ে সজ্জিত হয়েছে স্যুভেনির শপ ‘নীলাদ্রি’। শিশুদের মনোরঞ্জন ও উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য শিশু পার্কের পাশাপাশি ফুটপাথের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে জিরাফ, শিম্পাঞ্জি, হরিণ ইত্যাদি নানা রকম পশুপাখির প্রতিকৃতি। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘চিলড্রেন হেভেন’। রয়েছে পানির ফোয়ারাও। এছাড়া পাহাড়ের আদলে তৈরি হচ্ছে ‘থিম পার্ক’।

বিমান জাদুঘরের সময়সূচি
বিমান বাহিনী জাদুঘর সোম থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং শুক্র থেকে শনিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি।


বিমান জাদুঘরের টিকিট মূল্য
৫০ টাকা মূল্যের টিকিট সংগ্রহ করে জাদুঘরে প্রবেশ করা যায়। মাত্র ৩০ টাকায় বিমান ভ্রমণ! এখানে ৩০-১০০ টাকার টিকিটের বিনিময়ে ভেতরের হেলিকপ্টার বা বিমানে ওঠা যায়।

কীভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে আগারগাঁও চলে আসুন। রাজধানীর গুলিস্তান থেকে বিহঙ্গ, হিমাচল, স্বাধীন, হাজি ট্রান্সপোর্ট, ইটিসি ট্রান্সপোর্টসহ অনেক বাসে আগারগাঁও যেতে পারবেন। বিমান বাহিনী জাদুঘর বললেই নামিয়ে দেবে। এছাড়া রামপুরা থেকে হিমাচল, আলিফ পরিবহনেও যেতে পারবেন। কিংবা নিজস্ব পরিবহন বা সিএনজি নিয়ে ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে সহজে যেতে পারবেন।

/এমটি