আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ছোট্ট দেশ মালাউই। বিশাল লেক মালাউইকে ঘিরেই যেন দেশটির জন্ম। আয়তনে ছোট হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই দেশটি বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র রাষ্ট্রের একটি। চারদিকে সবুজ পাহাড়, নীল লেক, সহজ-সরল মানুষ আর সীমাহীন দারিদ্র্য–সব মিলিয়ে মালাউই এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার নাম। দেশের প্রধান দুটি শহর লিলংওয়ে ও ব্ল্যান্টায়ার। রাজধানী লিলংওয়ে হওয়ায় আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বেশির ভাগই এখান থেকেই পরিচালিত হয়।
মালাউই সফরের আগে বাংলাদেশের তানজানিয়ায় অনারারি কনসাল রফিক ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল দীপু ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি লিলংওয়েতে থাকেন। আগে থেকেই কথা ছিল, আমি তার বাসায় থাকব। বিমানবন্দর থেকে নেওয়ার জন্য তিনি ড্রাইভার পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ছোট্ট বিমানবন্দর আর শান্ত শহর–প্রথম দেখায় খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হয়নি। শহরে একটি বড় শপিং মল, কয়েকটি কফিশপ ছাড়া তেমন কিছুই নেই।
মালাউইয়ের অর্থনীতি অত্যন্ত নাজুক। সরকারি হিসাবে এক ডলারের মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৭০০ কওয়াচা, কিন্তু ব্ল্যাক মার্কেটে সেই ডলারই বিক্রি হচ্ছিল সাড়ে ৩ হাজার কওয়াচারও বেশি দামে। বিমানবন্দরে মাত্র পাঁচ ডলার ভেঙে একটি সিম কার্ড কিনেছিলাম। তখনো বুঝতে পারিনি, এই মুদ্রা সংকট-পরবর্তী দিনগুলোয় আমার ভ্রমণকে কতটা কঠিন করে তুলবে।
মালাউইয়ের ভিসা পাওয়া সহজ নয়। ইনভাইটেশন লেটার ছাড়া প্রায় অসম্ভব। আমার জার্মান বন্ধু ফিলিপ, যার Soul Rebel Resort নখাটা বেতে অবস্থিত, সে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। দুদিন লিলংওয়েতে থাকার পর বাসে করে নখাটা বের উদ্দেশে রওনা হলাম।
সমস্যা শুরু হলো বাসস্ট্যান্ডে। পথে কোথাও টাকা পরিবর্তন করতে পারিনি। ফলে বাসভাড়া দেওয়ার মতো স্থানীয় মুদ্রাও ছিল না। ঠিক তখনই পরিচয় হয় ফ্রান্সের পর্যটক ইলোর সঙ্গে। সে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির একজন ফটোগ্রাফার। আমার সমস্যার কথা শুনে সে কোনো দ্বিধা না করে বাসভাড়া ধার দিল। অচেনা দেশে এক অচেনা মানুষের এই আন্তরিকতা আজও মনে গেঁথে আছে।
নখাটা বেতে পৌঁছে যেন অন্য এক মালাউইকে দেখলাম। বিশাল লেক মালাউই, পাহাড়ঘেরা সৈকত আর শান্ত পরিবেশ মন জয় করে নিল। ইলোর সঙ্গে আমরা ঈগলকে খাবার দিয়েছি, মাছ ধরেছি, লেকে সাঁতার কেটেছি এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখেছি। এখানেই পরিচয় হয় ব্লেস নামের আরেক বন্ধুর সঙ্গে।
মালাউইয়ের বিখ্যাত মাছ চাম্বো (Chambo) এবং বাটার ফিশ আমার ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। বাজার থেকে তাজা মাছ কিনে রেস্টুরেন্টে দিলে তারা অসাধারণ বারবিকিউ করে পরিবেশন করত। আমি যেহেতু মুরগি খাই না, তাই পুরো সফরেই মাছ ছিল আমার প্রধান খাবার।
চার দিন নখাটা বেতে কাটানোর পর ইলো ন্যাশনাল পার্কের উদ্দেশে রওনা দিল। আমিও তার সঙ্গে রাজধানী লিলংওয়ের পথে ফিরলাম। কারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি ছিল। বিমানবন্দরে আমাকে পাসপোর্টে পূর্ণাঙ্গ ইমিগ্রেশন সিল না দিয়ে একটি অস্থায়ী কাগজ দিয়েছিল এবং জানিয়েছিল পরে ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে স্ট্যাম্প নিতে হবে। শুক্রবার হওয়ায় অফিস বন্ধ থাকায় আমি তখন সরাসরি নখাটা বেতে চলে এসেছিলাম।
ভোর ৫টায় উঠে সাত ঘণ্টার বাসযাত্রা শেষে ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে আরেকটি মজার অভিজ্ঞতা হলো। সেদিন ছিল বুধবার। জানতে পারলাম, প্রতি বুধবার দুপুরের পর সরকারি কর্মচারীদের স্পোর্টস ডে থাকায় সব সরকারি অফিস বন্ধ থাকে। পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করেছি, কিন্তু এমন নিয়ম আগে কোথাও দেখিনি।
এরপর রওনা হলাম কেপ ম্যাকলিয়ারের উদ্দেশ্যে। সেখানে যাওয়ার সরাসরি কোনো বাস নেই। তাই শেয়ার ট্যাক্সি বদলাতে বদলাতে প্রথমে মাঙ্গোচি পৌঁছালাম। রাত হয়ে যাওয়ায় সেখানেই একটি সুন্দর হোটেলে উঠলাম। প্রথমে তারা ৮০ হাজার কওয়াচা ভাড়া চাইলেও, আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতার কথা শুনে এবং ভালো রিভিউ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে শেষ পর্যন্ত ৪০ হাজার কওয়াচায় একটি চমৎকার কক্ষ দিল।
পরদিন আবার যাত্রা শুরু। মাঙ্গোচি থেকে কেপ ম্যাকলিয়ার মাত্র ৭৫ কিলোমিটার দূরে হলেও পৌঁছাতে যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছে। তখন বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বেড়ে গিয়েছিল। মালাউইতে এক লিটার জ্বালানি ব্ল্যাক মার্কেটে প্রায় ছয় ডলারে বিক্রি হচ্ছিল। ফলে যানবাহনের তীব্র সংকট ছিল। শেয়ার ট্যাক্সি যাত্রী না পেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করত, অনেক সময় ট্রিপ বাতিল হয়ে যেত। শেষ পর্যন্ত পথের একাংশ মোটরসাইকেলে পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাই।
কেপ ম্যাকলিয়ার ছিল আমার মালাউই সফরের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়। লেক মালাউইয়ের নীল জল, ছোট ছোট জেলেপাড়া, শান্ত পরিবেশ আর অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করে। তিন দিন ধরে সাঁতার কেটেছি, স্থানীয় গ্রাম ঘুরেছি এবং মানুষের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখেছি।
এখানে বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা পর্যটকদের সঙ্গে পরিচয় হয়। সবচেয়ে অবাক করেছিল ৭৪ বছর বয়সী এক আমেরিকান নারীকে। তিনি বিয়ে করেছেন ৩১ বছর বয়সী এক মালাউই যুবককে। এক বছর আগে বেড়াতে এসে পরিচয়, পরে বিয়ে, আর এখন আড়াই লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে একটি হোটেল নির্মাণ করছেন।
টুম্বা ভিউ রিসোর্টে থাকাকালে এক জনপ্রিয় ইউটিউবারের সঙ্গে পরিচয় হয়, যিনি কয়েক মাস আগেই বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছিলেন। পাশাপাশি ফিনল্যান্ডের এক দম্পতির সঙ্গেও পরিচয় হয়। সন্ধ্যার আড্ডা, গল্প আর ছোট্ট পার্টিতে দারুণ সময় কেটেছে।
ফেরার যাত্রা ছিল আরও কঠিন। রাজধানীতে ফিরতে ছয়-সাতবার গাড়ি পরিবর্তন করতে হয়েছে। ছয় ঘণ্টার পথ শেষ করতে লেগেছে প্রায় ১০ ঘণ্টা। প্রতিটি গাড়ি কিছুদূর গিয়ে আবার নতুন যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকত। ফলে পুরো যাত্রাই হয়ে উঠেছিল ধৈর্যের পরীক্ষা।
রাজধানীতে ফিরে বাংলাদেশি কয়েকজন পরিচিত ভাইয়ের আতিথেয়তা পেলাম। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশি খাবার খেয়ে ভালো লাগলেও, মালাউইয়ের তাজা মাছের স্বাদ কখনো ভুলতে পারব না।
১২ দিনের সফরের শেষ সকালে গুগলে খুঁজে দেখি রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ এখনো দেখা হয়নি। দ্রুত সেটি দেখে বিমানবন্দরে পৌঁছে যাই। ছোট বিমানবন্দর হওয়ায় কোনো ঝামেলা ছাড়াই মালাউইকে বিদায় জানাই।
মালাউইকে আমি মনে রাখব তার সীমাহীন সবুজ, বিশাল লেক, আন্তরিক মানুষ আর সরল জীবনযাপনের জন্য। তবে একই সঙ্গে এখানকার দারিদ্র্যও চোখে পড়ার মতো। অধিকাংশ মানুষ সাইকেলেই চলাচল করে, সেই সাইকেলেই কাঠ, ছাগল, মুরগি এমনকি যাত্রীও বহন করে।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বহু বাংলাদেশি অবৈধভাবে মালাউই হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এর ফলে বাংলাদেশিদের প্রতি দেশটির আস্থা কমে গেছে এবং ভিসা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু অসাধু দালালের কারণে পুরো জাতিকেই এর মূল্য দিতে হচ্ছে।
তবু আমি বিশ্বাস করি, মালাউই একটি সম্ভাবনাময় দেশ। শিক্ষাব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো, মানুষ অত্যন্ত আন্তরিক এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনন্য। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সুশাসন পেলে এই দেশ একদিন দারিদ্র্যকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে। আর আমার কাছে মালাউই চিরকালই থাকবে–আফ্রিকার উষ্ণ হৃদয়ে কাটানো এক অবিস্মরণীয় ১২ দিনের গল্প।
লেখক: ১৬০ দেশ ভ্রমণকারী পর্যটক
/এমটি