শত বছরের অমলিন কীর্তি রংপুরের তাজহাট জমিদারবাড়ি। কালের পরিক্রমায় আমাদের অনেক কীর্তি হারিয়ে গেলেও এখনো অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে তাজহাট জমিদারবাড়ি। রংপুর শহর থেকে অল্প কিছুদূরেই এর অবস্থান। রিকশায় যেতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগে।
অনেক দিনের পরিকল্পনার শেষে আজ আমরা রংপুরে উপস্থিত ভ্রমণের নিমিত্তে।
সঙ্গে আছে আমার সব সময়ের ভ্রমণ সঙ্গী মা। রংপুরে শহরে উঠেছি আমার মাসির বাসায়। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই তৈরি হয়ে নিলাম গন্তব্য তাজহাট জমিদারবাড়ি। স্থাপত্যের নিদর্শন এই বাড়িটি ১৯৮৪ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বেঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কিন্তু এখন এটি সোনালি অতীতের সাক্ষী হয়ে একটি সুন্দর জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। বৃহত্তর রংপুরে একসময় বেশ কয়েকটি জমিদার বাড়ি ছিল। তবে তাজহাট জমিদার বাড়ি ছাড়া সবকটিই প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। দূর থেকেই সবার চোখ চলে সেই রাজবাড়ির দিকে।
বাড়িটির ইতিহাস আমার আগে থেকেই কিছুটা জানা ছিল। ওখানে গিয়ে আবার নতুন করে জানতে পারি অনেক কিছু। এই প্রাসাদটি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় (জিএল রায়) নির্মাণ করেন। এ বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মান্নান লাল রায়।
তিনি সুদূর পাঞ্জাব থেকে রংপুরের সমৃদ্ধ স্থান মাহিগঞ্জে স্বর্ণ ব্যবসা করার জন্য এসেছিলেন, তা প্রাচীন রংপুরের ইতিহাস পুস্তক থেকে জানা যায়। প্রথমে তিনি নানা ধরনের নামিদামি হীরা, মানিক, জহরতখচিত তাজ বা টুপির ব্যবসা করেছিলেন। সেই তাজ বিক্রির জন্য এখানে হাট বসে, যা পরবর্তী সময়ে বিরাট প্রসিদ্ধি লাভ করে। আর এ তাজহাটকে কেন্দ্র করে এই জমিদার বাড়ির নামকরণ করা হয় ‘তাজহাট জমিদারবাড়ি’।
জানা যায়, চমৎকার এই স্থাপনা তৈরিতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগে। ৭৬ দশমিক ২০ মিটার দৈর্ঘ্য ভবনটি তৈরি করতে ইতালি থেকে আমদানি করা শ্বেতপাথর ব্যবহার করা হয়। শ্বেতপাথরের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম আমি আর মা। দ্বিতীয় তলায়ই রয়েছে জমিদার বাড়ির সংগ্রহশালা বা জাদুঘর। ক্ষুদ্রাকার কোরআন শরিফ, সম্রাট আওরঙ্গজেবের স্বহস্তে লেখা খুতবা, কবি শেখ সাদীর স্বহস্তে লেখা কবিতা, শিবলিঙ্গ, কষ্টিপাথরের মূর্তি, শিলামূর্তি, পোড়ামাটির ফলক, প্রাচীন মুদ্রা, সংস্কৃত ভাষায় লিখিত কিছু চিঠি, শিলালিপিসহ বেশকিছু চমৎকার সংগ্রহ চোখে পড়ল।
ঢাকার আহসান মঞ্জিলের মতো দেখতে এই জমিদার বাড়িটির তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় রয়েছে রাজা গোপালের ব্যবহৃত নানা জিনিস। চারতলা এই বাড়িটির ভেতরে রয়েছে অসংখ্য কক্ষ, গোসলখানা ও অতিথি শয়নশালা। প্রাসাদটি প্রায় ২১০ ফুটের মতো প্রশস্ত ও চারতলার সমান উঁচু। এর গঠনশৈলী প্রাচীন মোগল স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত বলে মনে করা হয়।
এর প্রমাণ মেলে মধ্যভাগে একটি বিশাল গম্বুজ ও দুই পাশে তার ছড়িয়ে যাওয়া দালানগুলোর মধ্যে একটি মসজিদের অবয়ব থেকে। তবে বাংলাদেশের অন্য সব প্রাসাদের থেকে এই বাড়িটিকে আলাদা করা যায়, তা হলো এর সিঁড়িগুলো। এতে ৩১টি সিঁড়ি আছে, যেগুলো ইতালীয় মার্বেল পাথরে তৈরি। সিঁড়ি থেকে উঠে জাদুঘর পর্যন্ত মেঝের পুরোটা এই পাথরে তৈরি। রাজবাড়িটির পেছনের দিকে গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে। সিঁড়িটি একটি সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত, যা সরাসরি ঘাট নদীর সঙ্গে যুক্ত, এমন কথা লোকমুখে শোনা যায়।
তবে নিরাপত্তার কারণে সিঁড়িটি এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শ্বেতশুভ্র মার্বেল ও তার সবুজাভ নকশায় তৈরি প্রাসাদের সুন্দর ফোয়ারাটি কালের বিবর্তনে কিছুটা মলিন হলেও এখনো এর জৌলুস শেষ হয়ে যায়নি। যা-ই হোক, ২০০৫ সালের আগে জমিদার বাড়িটি তাজহাট রাজবাড়ি হিসেবেই সবার কাছে পরিচিতি পায়। জাদুঘর দেখা শেষে ঘুরে দেখলাম বাড়ির অন্য কক্ষগুলো। পুরো ভবনটিতে রয়েছে মোট ২৮টি কক্ষ। এখানে একটা গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে, যা কোনো সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঘাঘট নদীতে মিলেছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে তা এখন বন্ধ। নিচতলায় সবাই মিলে বেশকিছু ছবিও তোলা হলো। অতঃপর প্রাসাদের ভেতর থেকে বের হয়ে নিচে এলাম সবাই। প্রাসাদ চত্বরে ফুল-ফলের নানা গাছের সারি ছাড়াও একটা ছোট দীঘি রয়েছে। তার পাশেই রয়েছে বিশাল বাগান। দুপুর হয়ে গেছে। এখান থেকে যাওয়ার কথা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও কারমাইকেল কলেজ। ভ্রমণার্থীদের জন্য বলে রাখি, এখান থেকে কারমাইকেল কলেজ বেশ কাছেই।
তাই এখানে এলে ঘুরে যেতে ভুলবেন না এ ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর দেরি করলাম না। তাজহাটকে সেদিনের মতো বিদায় জানিয়ে রওনা হলাম নতুন গন্তব্যে।
কীভাবে যাবেন
রাজধানীর গাবতলী, কল্যাণপুর ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন পরিবহনের বাস যেকোনো সময় রংপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এসি, নন-এসি ভেদে প্রতি যাত্রীর ভাড়া পড়বে ৫৫০-১২০০ টাকা। তবে কুড়িগ্রামের বাসে উঠলে জাদুঘরের ঠিক সামনে নামা যায়। তা ছাড়া রংপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে জাদুঘর যেতে ২০ টাকা ভাড়ায় রিকশা পাওয়া যায়। আর অটোতে গেলে ১০ টাকা লাগে।