ঢাকা ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
হালান্ডের সঙ্গে তুলনায় যেতে চান না হ্যারি কেইন ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪১১৮ বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সংস্থার সমাজ উন্নয়ন কার্যক্রম অধ্যায়ের ১টি সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, এইচএসসির সমাজকর্ম ২য় পত্র মুন্সীগঞ্জে ২৪ লাখ টাকার তেল ডাকাতি, গ্রেপ্তার ২ কৃষি কর্মকর্তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে যুবদল নেতা বহিষ্কার ২০২৬ বিশ্বকাপে রেফারির পারিশ্রমিক কত? রেফারিং নিয়ে সন্তুষ্ট মার্তিনেজ পাটগ্রাম সীমান্তে ৩ নারীকে পুশইনের চেষ্টা রোনালদো চাইলে পর্তুগাল দলেই থাকবেন: নতুন কোচ জেসুস বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে: কৃষিমন্ত্রী ‘বাংলা কিউআর’ সেবা চালু করলো স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক পিএলসি আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতির কারণেই রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হয়েছে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বেনাপোল বন্দরে জলাবদ্ধতায় শত কোটি টাকার পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত ৪ সমুদ্রবন্দরের সতর্কসংকেত প্রত্যাহার ঘরেই বানান প্রাকৃতিক সাবান জয়পুরহাট সীমান্তে ৩ জনকে পুশইনের চেষ্টা আর্জেন্টিনার দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছে সুইজারল্যান্ড শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ৩০ হাজার দাবি বিএসকেএফ সভাপতির ইরানের দিকে তাক করা আছে ১০০০ ক্ষেপণাস্ত্র: ট্রাম্প শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের টাকা গণনা শুরু গৌরীপুরে ক্রিয়েটিভ সন্ধানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্লাবের কুইজ প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ মিসরকে হারানোর পর এএফএর ই-মেইল সিস্টেমে সাইবার হামলা বৃক্ষরোপণে নিষেধাজ্ঞা জাককানইবি প্রশাসনের শত বছরের অমলিন কীর্তি তাজহাট জমিদারবাড়ি জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন ময়মনসিংহে লালনের গানে শেকড়ের সংস্কৃতি তুলে ধরল ‘ভাব তরঙ্গ’ নীলাম্বরী সাজে লালপুরে মেয়ের ধর্ষণের মামলায় গ্রেপ্তার বাবা কোয়ার্টারের আগে রক্ষণে সতর্ক আর্জেন্টিনা জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

শত বছরের অমলিন কীর্তি তাজহাট জমিদারবাড়ি

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
শত বছরের অমলিন কীর্তি তাজহাট জমিদারবাড়ি

শত বছরের অমলিন কীর্তি রংপুরের তাজহাট জমিদারবাড়ি। কালের পরিক্রমায় আমাদের অনেক কীর্তি হারিয়ে গেলেও এখনো অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে তাজহাট জমিদারবাড়ি। রংপুর শহর থেকে অল্প কিছুদূরেই এর অবস্থান। রিকশায় যেতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগে।
অনেক দিনের পরিকল্পনার শেষে আজ আমরা রংপুরে উপস্থিত ভ্রমণের নিমিত্তে।

সঙ্গে আছে আমার সব সময়ের ভ্রমণ সঙ্গী মা। রংপুরে শহরে উঠেছি আমার মাসির বাসায়। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই তৈরি হয়ে নিলাম গন্তব্য তাজহাট জমিদারবাড়ি। স্থাপত্যের নিদর্শন এই বাড়িটি ১৯৮৪ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বেঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। 

কিন্তু এখন এটি সোনালি অতীতের সাক্ষী হয়ে একটি সুন্দর জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। বৃহত্তর রংপুরে একসময় বেশ কয়েকটি জমিদার বাড়ি ছিল। তবে তাজহাট জমিদার বাড়ি ছাড়া সবকটিই প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। দূর থেকেই সবার চোখ চলে সেই রাজবাড়ির দিকে। 

বাড়িটির ইতিহাস আমার আগে থেকেই কিছুটা জানা ছিল। ওখানে গিয়ে আবার নতুন করে জানতে পারি অনেক কিছু। এই প্রাসাদটি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় (জিএল রায়) নির্মাণ করেন। এ বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মান্নান লাল রায়। 

তিনি সুদূর পাঞ্জাব থেকে রংপুরের সমৃদ্ধ স্থান মাহিগঞ্জে স্বর্ণ ব্যবসা করার জন্য এসেছিলেন, তা প্রাচীন রংপুরের ইতিহাস পুস্তক থেকে জানা যায়। প্রথমে তিনি নানা ধরনের নামিদামি হীরা, মানিক, জহরতখচিত তাজ বা টুপির ব্যবসা করেছিলেন। সেই তাজ বিক্রির জন্য এখানে হাট বসে, যা পরবর্তী সময়ে বিরাট প্রসিদ্ধি লাভ করে। আর এ তাজহাটকে কেন্দ্র করে এই জমিদার বাড়ির নামকরণ করা হয় ‘তাজহাট জমিদারবাড়ি’। 

জানা যায়, চমৎকার এই স্থাপনা তৈরিতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগে। ৭৬ দশমিক ২০ মিটার দৈর্ঘ্য ভবনটি তৈরি করতে ইতালি থেকে আমদানি করা শ্বেতপাথর ব্যবহার করা হয়। শ্বেতপাথরের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম আমি আর মা। দ্বিতীয় তলায়ই রয়েছে জমিদার বাড়ির সংগ্রহশালা বা জাদুঘর। ক্ষুদ্রাকার কোরআন শরিফ, সম্রাট আওরঙ্গজেবের স্বহস্তে লেখা খুতবা, কবি শেখ সাদীর স্বহস্তে লেখা কবিতা, শিবলিঙ্গ, কষ্টিপাথরের মূর্তি, শিলামূর্তি, পোড়ামাটির ফলক, প্রাচীন মুদ্রা, সংস্কৃত ভাষায় লিখিত কিছু চিঠি, শিলালিপিসহ বেশকিছু চমৎকার সংগ্রহ চোখে পড়ল। 

ঢাকার আহসান মঞ্জিলের মতো দেখতে এই জমিদার বাড়িটির তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় রয়েছে রাজা গোপালের ব্যবহৃত নানা জিনিস। চারতলা এই বাড়িটির ভেতরে রয়েছে অসংখ্য কক্ষ, গোসলখানা ও অতিথি শয়নশালা। প্রাসাদটি প্রায় ২১০ ফুটের মতো প্রশস্ত ও চারতলার সমান উঁচু। এর গঠনশৈলী প্রাচীন মোগল স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত বলে মনে করা হয়। 

এর প্রমাণ মেলে মধ্যভাগে একটি বিশাল গম্বুজ ও দুই পাশে তার ছড়িয়ে যাওয়া দালানগুলোর মধ্যে একটি মসজিদের অবয়ব থেকে। তবে বাংলাদেশের অন্য সব প্রাসাদের থেকে এই বাড়িটিকে আলাদা করা যায়, তা হলো এর সিঁড়িগুলো। এতে ৩১টি সিঁড়ি আছে, যেগুলো ইতালীয় মার্বেল পাথরে তৈরি। সিঁড়ি থেকে উঠে জাদুঘর পর্যন্ত মেঝের পুরোটা এই পাথরে তৈরি। রাজবাড়িটির পেছনের দিকে গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে। সিঁড়িটি একটি সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত, যা সরাসরি ঘাট নদীর সঙ্গে যুক্ত, এমন কথা লোকমুখে শোনা যায়। 

তবে নিরাপত্তার কারণে সিঁড়িটি এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শ্বেতশুভ্র মার্বেল ও তার সবুজাভ নকশায় তৈরি প্রাসাদের সুন্দর ফোয়ারাটি কালের বিবর্তনে কিছুটা মলিন হলেও এখনো এর জৌলুস শেষ হয়ে যায়নি। যা-ই হোক, ২০০৫ সালের আগে জমিদার বাড়িটি তাজহাট রাজবাড়ি হিসেবেই সবার কাছে পরিচিতি পায়। জাদুঘর দেখা শেষে ঘুরে দেখলাম বাড়ির অন্য কক্ষগুলো। পুরো ভবনটিতে রয়েছে মোট ২৮টি কক্ষ। এখানে একটা গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে, যা কোনো সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঘাঘট নদীতে মিলেছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। 

তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে তা এখন বন্ধ। নিচতলায় সবাই মিলে বেশকিছু ছবিও তোলা হলো। অতঃপর প্রাসাদের ভেতর থেকে বের হয়ে নিচে এলাম সবাই। প্রাসাদ চত্বরে ফুল-ফলের নানা গাছের সারি ছাড়াও একটা ছোট দীঘি রয়েছে। তার পাশেই রয়েছে বিশাল বাগান। দুপুর হয়ে গেছে। এখান থেকে যাওয়ার কথা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও কারমাইকেল কলেজ। ভ্রমণার্থীদের জন্য বলে রাখি, এখান থেকে কারমাইকেল কলেজ বেশ কাছেই। 

তাই এখানে এলে ঘুরে যেতে ভুলবেন না এ ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর দেরি করলাম না। তাজহাটকে সেদিনের মতো বিদায় জানিয়ে রওনা হলাম নতুন গন্তব্যে।

কীভাবে যাবেন
রাজধানীর গাবতলী, কল্যাণপুর ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন পরিবহনের বাস যেকোনো সময় রংপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এসি, নন-এসি ভেদে প্রতি যাত্রীর ভাড়া পড়বে ৫৫০-১২০০ টাকা। তবে কুড়িগ্রামের বাসে উঠলে জাদুঘরের ঠিক সামনে নামা যায়। তা ছাড়া রংপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে জাদুঘর যেতে ২০ টাকা ভাড়ায় রিকশা পাওয়া যায়। আর অটোতে গেলে ১০ টাকা লাগে। 

শত বছরের অমলিন কীর্তি তাজহাট জমিদারবাড়ি

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
শত বছরের অমলিন কীর্তি তাজহাট জমিদারবাড়ি

শত বছরের অমলিন কীর্তি রংপুরের তাজহাট জমিদারবাড়ি। কালের পরিক্রমায় আমাদের অনেক কীর্তি হারিয়ে গেলেও এখনো অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে তাজহাট জমিদারবাড়ি। রংপুর শহর থেকে অল্প কিছুদূরেই এর অবস্থান। রিকশায় যেতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগে।
অনেক দিনের পরিকল্পনার শেষে আজ আমরা রংপুরে উপস্থিত ভ্রমণের নিমিত্তে।

সঙ্গে আছে আমার সব সময়ের ভ্রমণ সঙ্গী মা। রংপুরে শহরে উঠেছি আমার মাসির বাসায়। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই তৈরি হয়ে নিলাম গন্তব্য তাজহাট জমিদারবাড়ি। স্থাপত্যের নিদর্শন এই বাড়িটি ১৯৮৪ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বেঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। 

কিন্তু এখন এটি সোনালি অতীতের সাক্ষী হয়ে একটি সুন্দর জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। বৃহত্তর রংপুরে একসময় বেশ কয়েকটি জমিদার বাড়ি ছিল। তবে তাজহাট জমিদার বাড়ি ছাড়া সবকটিই প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। দূর থেকেই সবার চোখ চলে সেই রাজবাড়ির দিকে। 

বাড়িটির ইতিহাস আমার আগে থেকেই কিছুটা জানা ছিল। ওখানে গিয়ে আবার নতুন করে জানতে পারি অনেক কিছু। এই প্রাসাদটি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় (জিএল রায়) নির্মাণ করেন। এ বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মান্নান লাল রায়। 

তিনি সুদূর পাঞ্জাব থেকে রংপুরের সমৃদ্ধ স্থান মাহিগঞ্জে স্বর্ণ ব্যবসা করার জন্য এসেছিলেন, তা প্রাচীন রংপুরের ইতিহাস পুস্তক থেকে জানা যায়। প্রথমে তিনি নানা ধরনের নামিদামি হীরা, মানিক, জহরতখচিত তাজ বা টুপির ব্যবসা করেছিলেন। সেই তাজ বিক্রির জন্য এখানে হাট বসে, যা পরবর্তী সময়ে বিরাট প্রসিদ্ধি লাভ করে। আর এ তাজহাটকে কেন্দ্র করে এই জমিদার বাড়ির নামকরণ করা হয় ‘তাজহাট জমিদারবাড়ি’। 

জানা যায়, চমৎকার এই স্থাপনা তৈরিতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগে। ৭৬ দশমিক ২০ মিটার দৈর্ঘ্য ভবনটি তৈরি করতে ইতালি থেকে আমদানি করা শ্বেতপাথর ব্যবহার করা হয়। শ্বেতপাথরের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম আমি আর মা। দ্বিতীয় তলায়ই রয়েছে জমিদার বাড়ির সংগ্রহশালা বা জাদুঘর। ক্ষুদ্রাকার কোরআন শরিফ, সম্রাট আওরঙ্গজেবের স্বহস্তে লেখা খুতবা, কবি শেখ সাদীর স্বহস্তে লেখা কবিতা, শিবলিঙ্গ, কষ্টিপাথরের মূর্তি, শিলামূর্তি, পোড়ামাটির ফলক, প্রাচীন মুদ্রা, সংস্কৃত ভাষায় লিখিত কিছু চিঠি, শিলালিপিসহ বেশকিছু চমৎকার সংগ্রহ চোখে পড়ল। 

ঢাকার আহসান মঞ্জিলের মতো দেখতে এই জমিদার বাড়িটির তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় রয়েছে রাজা গোপালের ব্যবহৃত নানা জিনিস। চারতলা এই বাড়িটির ভেতরে রয়েছে অসংখ্য কক্ষ, গোসলখানা ও অতিথি শয়নশালা। প্রাসাদটি প্রায় ২১০ ফুটের মতো প্রশস্ত ও চারতলার সমান উঁচু। এর গঠনশৈলী প্রাচীন মোগল স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত বলে মনে করা হয়। 

এর প্রমাণ মেলে মধ্যভাগে একটি বিশাল গম্বুজ ও দুই পাশে তার ছড়িয়ে যাওয়া দালানগুলোর মধ্যে একটি মসজিদের অবয়ব থেকে। তবে বাংলাদেশের অন্য সব প্রাসাদের থেকে এই বাড়িটিকে আলাদা করা যায়, তা হলো এর সিঁড়িগুলো। এতে ৩১টি সিঁড়ি আছে, যেগুলো ইতালীয় মার্বেল পাথরে তৈরি। সিঁড়ি থেকে উঠে জাদুঘর পর্যন্ত মেঝের পুরোটা এই পাথরে তৈরি। রাজবাড়িটির পেছনের দিকে গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে। সিঁড়িটি একটি সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত, যা সরাসরি ঘাট নদীর সঙ্গে যুক্ত, এমন কথা লোকমুখে শোনা যায়। 

তবে নিরাপত্তার কারণে সিঁড়িটি এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শ্বেতশুভ্র মার্বেল ও তার সবুজাভ নকশায় তৈরি প্রাসাদের সুন্দর ফোয়ারাটি কালের বিবর্তনে কিছুটা মলিন হলেও এখনো এর জৌলুস শেষ হয়ে যায়নি। যা-ই হোক, ২০০৫ সালের আগে জমিদার বাড়িটি তাজহাট রাজবাড়ি হিসেবেই সবার কাছে পরিচিতি পায়। জাদুঘর দেখা শেষে ঘুরে দেখলাম বাড়ির অন্য কক্ষগুলো। পুরো ভবনটিতে রয়েছে মোট ২৮টি কক্ষ। এখানে একটা গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে, যা কোনো সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঘাঘট নদীতে মিলেছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। 

তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে তা এখন বন্ধ। নিচতলায় সবাই মিলে বেশকিছু ছবিও তোলা হলো। অতঃপর প্রাসাদের ভেতর থেকে বের হয়ে নিচে এলাম সবাই। প্রাসাদ চত্বরে ফুল-ফলের নানা গাছের সারি ছাড়াও একটা ছোট দীঘি রয়েছে। তার পাশেই রয়েছে বিশাল বাগান। দুপুর হয়ে গেছে। এখান থেকে যাওয়ার কথা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও কারমাইকেল কলেজ। ভ্রমণার্থীদের জন্য বলে রাখি, এখান থেকে কারমাইকেল কলেজ বেশ কাছেই। 

তাই এখানে এলে ঘুরে যেতে ভুলবেন না এ ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর দেরি করলাম না। তাজহাটকে সেদিনের মতো বিদায় জানিয়ে রওনা হলাম নতুন গন্তব্যে।

কীভাবে যাবেন
রাজধানীর গাবতলী, কল্যাণপুর ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন পরিবহনের বাস যেকোনো সময় রংপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এসি, নন-এসি ভেদে প্রতি যাত্রীর ভাড়া পড়বে ৫৫০-১২০০ টাকা। তবে কুড়িগ্রামের বাসে উঠলে জাদুঘরের ঠিক সামনে নামা যায়। তা ছাড়া রংপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে জাদুঘর যেতে ২০ টাকা ভাড়ায় রিকশা পাওয়া যায়। আর অটোতে গেলে ১০ টাকা লাগে। 

হাঁড়িভাঙা আমের দেশে

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম
হাঁড়িভাঙা আমের দেশে

ছোটবেলা থেকেই ভ্রমণ কাহিনির প্রতি আলাদা একটি টান ছিল। সময় পেলেই ভ্রমণ কাহিনি নিয়ে পড়তে বসে যেতাম। আর ভাবতাম বড় হয়ে ইবনে বতুতার মতো বের হয়ে যাব বিশ্ব ভ্রমণে। ভেবে দেখুন বতুতা সাহেব মাত্র ২০ বছর বয়সে পৃথিবী দেখতে বেরিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন তার ৪৯ বছর বয়সে। অর্থাৎ পৃথিবীর পথে পথেই কেটেছে তার ২৯ বছর। 

সেটা সেই ১৪ শতকের ঘটনা। জলদস্যু, মরুভূমির ঝড় আর পাগলা রাজাদের আক্রমণ ঠেকিয়ে বতুতা কখনো হেঁটে, কখনো জাহাজে চড়ে তার বিশ্বভ্রমণ করেছেন। আর এখনকার এই দারুণ প্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থার যুগে আমরা তিন দিন চার রাত ধরনের প্যাকেজ ট্যুর ছাড়া কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি না। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে জটিল অঙ্ক শেষ করে এক মাস আগে থেকে ঠিক করি কোথায় যাব, কীভাবে যাব, কত দিন থাকব, কোথায় থাকব ইত্যাদি। 

এরই মাঝে সবকিছুকে উড়িয়ে দিয়ে ‘বতুতাদর্শে’ উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম দেশের উত্তরাঞ্চলের দিকে, ভ্রমণ সঙ্গী আমার মা। কোনো দর্শনীয় জায়গা দেখার ইচ্ছা নিয়ে নয়, ইচ্ছাটা ছিল উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনধারা দেখব। যেখানে রাত হবে, সেখানেই কাত হব; যেতে যেতে যে রাস্তা ভালো লাগবে, সেদিকেই চলতে শুরু করব। 

এদিকে শুক্র-শনিবারের বন্ধসহ অফিসের ছুটি পেয়েছি একদিন মাত্র তাই তিন দিন সময় এর মাঝে আমাকে ঘুরে আসতে হবে আগে ভেবেছিলাম ছুটি আরেকটু বেশি দিন পাব। তা পেলে উত্তরাঞ্চলে মোটামুটি ঘুরে আসা যাবে কিন্তু বিধি বাম জুন মাস তাই বড় স্যারের হুকুম একদিনের বেশি ছুটি দেওয়া যাবে না। তাই আর ভালোভাবে উত্তরাঞ্চল ঘুরার প্ল্যানটা মাঠে মারা যাওয়ার জোগাড়। 

আমার অফিসের সবাই এক বাক্যে না বলছে, এবার না যাওয়ার জন্য খুব গরম পড়েছে আর এত অল্প সময়ে তেমন কিছুই দেখতে পারব না। এদিকে আমি নাছোড়বান্দা যেহেতু যাব বলেছি সেহেতু যাবই। সব প্রতিকূলতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে আমি আর আমার মা রওনা হলাম উত্তরাঞ্চলের দিকে। আমার আবার ট্রেনে ভ্রমণ করতে খুব ভালো লাগে। 

সে মোতাবেক ঢাকা থেকে সকালের ট্রেনে উত্তরাঞ্চলে দিকে আমরা রওনা হলাম। সকাল ৯টায় আমাদের ট্রেন রংপুর এক্সপ্রেস। ৯টার আগেই আমরা স্টেশনে এসে উপস্থিত কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়ে কিছুটা বিলম্বে যাত্রা যেন প্রথা গত ব্যাপার। ৯টার ট্রেন ১০টায় ছাড়ল আমরা যাত্রা শুরু করলাম। প্রকৃতির মায়াবী রূপকে সঙ্গী করে ট্রেন তার সেই মধুর কু ঝিক ঝিক ঝিক শব্দে এগিয়ে চলল। ট্রেনের ঝক ঝক শব্দ, যানজটবিহীন পথ যে কারও ভালো লাগার কথা। 

ট্রেন লাইনের দুই পাশে কখনো বস্তি আবার কখনো সারি সারি গাছের মাঝে ছুটে চলছে। আশপাশে ঘরবাড়ি সবকিছুকে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে ট্রেন তার গন্তব্যে। ট্রেনের জানালার পাশে বসে প্রকৃতির রূপ দেখা খুবই উপভোগ্য। মাঝে মাঝে ট্রেনের গতি কমে এলে কেউ কেউ গন্তব্যে নেমে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব, চাটমোহর, নাটোর, সান্তাহার, বগুড়া পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের গন্তব্যে। 

ট্রেনে বসে কথা হলো প্রকৃতি বাংলাদেশ-এর সুজন সেন গুপ্তের সঙ্গে। তিনি বললেন, সময় যেহেতু কম তাই কম সময়ে রংপুর বিখ্যাত হাঁড়িভাঙা আমের বাগান দেখে আসার পরামর্শ দিলেন। সঙ্গে দিলেন আবু জাহিদ ভাইয়ের মোবাইল নম্বর। আবু জাহিদ ভাইয়ের বাড়ি রংপুরে তার রংপুরের পদাগঞ্জ এলাকায় চার একর জায়গার ওপর আম বাগান আছে। রাত ৮টা আমাদের ট্রেন এসে নোঙর করল, রংপুর স্টেশনে আগে থেকে আবু জাহিদ ভাই স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। 

রংপুর স্টেশন থেকে আমরা রিকশা করে জাহাজ কোম্পানি মোড়ে গোল্ডেন টাওয়ার হোটেলে পৌঁছালাম বেশ শান্ত-নিরিবিলি পরিবেশ। কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম রাতের আঁধারে রংপুর শহর ঘুরতে। রংপুর শহরের জুম্মাপাড়া, গোমস্তপাড়া, বেদ পট্টি, স্টেশন রোড, নবাব বাড়ি, আমলাতলা এলাকাগুলো আমরা রিকশা করে ঘুরে বেড়ালাম। পায়রা চত্বরে এসে দেখা মিলল মিষ্টি দোকান পুষ্টির। আমি আবার মিষ্টি দেখলে লোভ সামলাতে পারি না, অগত্যা মা না বলার পরও মিষ্টি দোকানে ঢুকে হরেক রকম মিষ্টি চেখে দেখলাম। অসাধারণ টেস্ট, ঢাকা শহরের তুলনায় মিষ্টির দাম তুলনামূলক কিছুটা কম তাই তিন বাক্স শুকনো মিষ্টি সঙ্গে করে নিলাম ঢাকাবাসীর জন্য। পরের দিন সকাল বেলা আবু জাহিদ ভাই এসে উপস্থিত, আমরা নাশতা করে বের হলাম গন্তব্য মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ গ্রামে আমের বাগান। 

আমরা সিএনজি করে যাত্রা শুরু করলাম, পথিমধ্যে আবু জাহিদ জানান, আমের নাম কেন হাঁড়িভাঙা হলো। এ নিয়ে লোকজনের মাঝে নানা কথার প্রচলন রয়েছে। তবে যতদূর জানা যায়, পদাগঞ্জের এক ব্যক্তি বাজার থেকে আম কিনে আনেন। সেই আম খেয়ে তিনি বীজটি রেখে দেন একটি পরিত্যক্ত হাঁড়িতে। ওই হাঁড়িতেই বীজ থেকে চারা গাছ বের হয়ে আসে। আর সেই গাছটি তিনি বাড়ির পাশে রোপণ করেন। ওই ব্যক্তির নিবিড় পরিচর্যায় গাছে আম ধরতে শুরু করে। হাঁড়ি থেকে ওই আমের উৎপত্তি হওয়ায় এর নাম হয় হাঁড়িভাঙা আম। 

এদিকে মা শুরু করলেন তার স্মৃতির কুঠোর থেকে আমের ইতিহাস বলা–খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে দিগি জয়ী বীর সম্রাট আলেকজান্ডার ভারতবর্ষ আক্রমণের পর এক আম বাগানে তাঁবু গেড়ে বিশ্রাম নেওয়ার সময় আমের সঙ্গে পরিচিত হন। সুস্বাদু আম খেয়ে এতটাই ভক্ত হয়ে পড়েন যে, প্রাসাদের চার ধারে আমের বাগানে ছেয়ে দেন। প্রাচীন শাস্ত্রে আম গাছকে ‘কল্প বৃক্ষ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কখনো বলা হয়ে ইচ্ছাপূরণের বৃক্ষ। আমের পাতা মঞ্জরিকে নিয়ে আছে লোক কাহিনি।

আমের কচি পাতার ডাল শুভ ও মঙ্গল কাজে ব্যবহার হয়। ১৫ শতকের দিকে স্পেনিশ পরিব্রাজক ও পর্তুগিজরা মহাদেশে আম নিয়ে রীতিমতো গবেষণা শুরু করে। যার ধারাবাহিকতায় প্রাচীন চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং ও আরব অভিযাত্রী ইবনে হানকাল আমের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করে ভ্রমণ কাহিনিকে সমৃদ্ধ করেন। তারও বহু আগে প্রেমের দেবতা কিউপিড মানব হৃদয়ে প্রণয় জাগাতে প্রেমের তীরের অগ্রভাগে আমের মুকুল গেঁথে দেন। আম মুঘল সম্রাট আকবরের এতটাই প্রিয় ছিল যে, আম দিয়েই শুরু হতো অতিথি আপ্যায়ন। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছালাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য পদাগঞ্জে। এসেই চোখে পড়ল বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে শুধু হাঁড়িভাঙা আমের বাগান। 

যেদিকে দুচোখ যায়, সেদিকে শুধু বাগান আর বাগান। এমন কেউ নেই যিনি বাড়ির আঙিনা, উঠান কিংবা ফসলি জমিতে আমের গাছ রোপণ করেননি। আবু জাহিদ ভাই তার বাগানে নিয়ে গেলেন। বিশাল এলাকা নিয়ে জাহিদ ভাইয়ের আম বাগান কতটুকু। এলাকা নিয়ে আম বাগান জানতে চাইলে জাহিদ ভাই জানালেন চার একর জায়গার ওপর তার বাগান। ছয় বছর ধরে তিনি আমের বাগান করছেন। আর আপনারা যে গাছগুলো দেখছেন তাদের বয়স চার বছর। প্রতিটি গাছ থেকে তিন থেকে চার মণ আম পাওয়া যায়। আম পাকলে কিছুটা লালচে রং ধারণ করে। 

প্রতিটি আমের ওজন ২০০ থেকে ৪০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। এত আম দেখে লোভ কি সামলানো যায়? আপনারাই বলুন? তাই নির্লজ্জের মতো জাহিদ ভাইকে বললাম আম খাওয়াবেন না? জাহিদ ভাই জিভে কামড় দিয়ে বলে আরে ভুলেই গিয়েছিলাম আপনাদের সঙ্গে গল্প করতে করতে সঙ্গে সঙ্গে ডাক পড়ল দুলাল ভাইয়ের, উনি এখানে দেখভাল করেন। শুরু হলো আমাদের আম খাওয়ার পর্ব। একের পর এক আম সাবাড় করছি হঠাৎ মনে হলো অনেক সময় শুনি আম বাগানে আম পাকানোর জন্য কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়, তাই জাহিদ ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম আপনারা কীটনাশক দেননি তো? আম পাকানোর জন্য জাহিদ ভাই বললেন আপনারা নিশ্চিন্তে খেতে পারেন আম। আমার এখানে শুধু আমের মুকুল আসার আগে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়, শুধু পোকা মাকড় আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য। দেখতে দেখতে আমাদের শহর পানে ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে এল। ফিরে যাওয়ার আগে আবু জাহিদ ভাই মিল বাজার এলাকার বিখ্যাত লুচি আর সবজি খাইয়ে আমাদের বিদায় দিলেন। 

পথের ঠিকানা: ঢাকা থেকে ট্রেন করে রংপুর ভাড়া নেবে ৩৯০ থেকে ১৩৯৫ টাকা অথবা বাসে করে (এস আর ট্রাভেলস, এসএ পরিবহন, নাবিল এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন প্রতিটির এসি বা নন-এসি বাস আছে) রংপুর ভাড়া ৪৫০ থেকে ৬৫০ টাকা। রংপুর শহর থেকে অটো করে পদাগঞ্জ রিজার্ভ নিলে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আর বাসে করে গেলে ৩০ টাকা।

/এমটি 

রামু বৌদ্ধ বিহারে একদিন

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম
রামু বৌদ্ধ বিহারে একদিন

ডান হাতের ওপর মাথা রেখে পা টান করে শুয়ে আছেন গৌতম বুদ্ধ! খোলা চোখে পৃথিবীর সব প্রাণীর প্রতি সুদৃষ্টি রাখছেন তিনি। চোখের দিকে তাকালে মনে হবে যেন আশীর্বাদ দিচ্ছেন। 

এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে কক্সবাজারের রামু উপজেলার উত্তর মিঠাছড়ি গ্রামের বৌদ্ধবিহারে। আমি আর আমার ভ্রমণসঙ্গীর আজ দ্বিতীয় দিন কক্সবাজারে। ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর ৫টা হবে, আমি গভীর নিদ্রায় শায়িত। সানন্দার ডাকাডাকির চোটে আমায় ঘুম থেকে উঠতেই হলো। ঘুম থেকে উঠেই চলে গেলাম সমুদ্র সৈকতের বালুকাবেলায়। 

সেখানে ঘণ্টা দুয়েক কাটিয়ে ফিরে এলাম আমাদের অস্থায়ী নিবাসে। সকালের নাশতা শেষ করতেই খাবারের টেবিলে সানন্দার প্রশ্ন–আজ কোথায় যাব আমরা? আমি বললাম, আমিও ভাবছি আজ কোথায় যাওয়া যায়। ভেবে কোনো উত্তর পাচ্ছি না প্রশ্নের। ভাবলাম এখানকার লোকদের কাছ থেকেই জেনে নিই কোথায় যাওয়া যেতে পারে আজ। 

আমি ইশারা দিতেই একজন এসে উপস্থিত। বললাম, ভাই আপনাদের শহরে এসেছি, নতুন কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায় বলুন তো? উত্তরে হাসিমুখে বললেন, হিমছড়ি কি গিয়েছেন। আমি বললাম, গতকালই ঘুরে এসেছি। পরে বলল, ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে। আমি বললাম, তাও গিয়েছি। পরে বেচারা একটু চিন্তার মধ্যেই পড়ে গেলেন। কিছু সময় চিন্তা করে বললেন, তাহলে আপনি রামু উপজেলায় অবস্থিত ভুবন শান্তি ১০০ সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধের মূর্তি দেখে আসেন, ভালো লাগবে। আমি বললাম, ভালোই বলেছেন, পেপারে পড়েছি এই সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধের মূর্তির খবর। কিন্তু সৌভাগ্য হয়নি দেখার। আমি বললাম, ঠিক আছে তবে চলতি পথের ঠিকানাটা আমার পাইলটকে একটু বুঝিয়ে বলেন যেন আমরা সহজেই পৌঁছে যেতে পারি। 

এদিকে ভেবেছিলাম সব আইটেম চেখে দেখব, কিন্তু আর খেতে ইচ্ছা করছিল না। আমরা গন্তব্যের পানে যাত্রা শুরু করলাম। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা এসে পৌঁছালাম রামুতে। সেখানে হাতের বাঁয়ে প্রবেশ করলাম আমরা। দেখতে পেলাম বড় সাইনবোর্ড–‘এদিকে ভুবন শান্তি ১০০ সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধের মূর্তি’। ওই দিকেই আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। 

আমরা চলছি এগিয়ে, দেখা পেলাম ধান খেতের। বেশ ভালোই লাগছিল চলতি পথে, কিছু দূর যাওয়ার পর বাধল বিপত্তি। সামনের ব্রিজ ভাঙা, তাই আর গাড়ি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। অগত্যা গাড়ি থেকে নেমে আমরা পদব্রজে এগিয়ে গেলাম। 
চার-পাঁচ মিনিট হাঁটার পর আমরা এসে পৌঁছালাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। আমরা প্রবেশদ্বার পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম।

সেখানে জুতা রেখে নগ্ন পায়ে এগিয়ে গেলাম। দূর থেকে গৌতম বুদ্ধের পায়ের দেখা পেলাম। সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে গেলাম আমরা। প্রায় শতাধিক সিঁড়ি পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ভুবন শান্তি ১০০ সিংহশয্যা গৌতমবুদ্ধের মূর্তির কাছে। গৌতম বুদ্ধের মূর্তি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। গৌতম বুদ্ধ যেন খোলা চোখে পৃথিবীর সব প্রাণীর প্রতি সুদৃষ্টি রাখছেন। চোখের দিকে তাকালে মনে হবে যেন আশীর্বাদ দিচ্ছেন। 

কিছু সময় আমরা দাঁড়িয়ে থাকলাম। কথা হলো ওই মন্দিরের এক ভিক্ষুর সঙ্গে। তিনি বললেন, ২০০৬ সালে সোনালি রঙের মূর্তিটি একেবারেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরির কাজ শুরু করেন শ্রীমৎ করুণা শ্রীভিক্ষু। 

২০০৯ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। মায়ানমার থেকে আসা দক্ষ একজন শিল্পীর সঙ্গে নিজেই স্থপতি হিসেবে কাজ করেন তিনি। করুণাশ্রী ভিক্ষু প্রায় দুই একর জায়গায় ২০০২ সালে বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনাকেন্দ্র বৌদ্ধবিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর মূর্তি তৈরির পরিকল্পনা মাথায় আসে তার। আমরা গৌতম বুদ্ধের মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে লাগলাম। পরে গেলাম পাশের গৌতম বুদ্ধের মন্দিরে। সেখানে গৌতম বুদ্ধকে দর্শন করে কিছু সময় থেকে এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। আমরা বের হয়ে যাব, সে সময় এক ভিক্ষু আমাদের পেছন থেকে ডাকতে লাগলেন। বললেন, প্রসাদ খেয়ে যান আপনারা। 

খিচুড়ি এমনিতেই আমার পছন্দের খাবার, অন্যদিকে পেটেও খিদে লেগেছে, তাই আর না বললাম না। পেটপূজা শেষ করে আমরা এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। পাশেই দেখা পেলাম সবুজের সমাহার। বলা যায়, বন-পাহাড়-সমতলের মিলনমেলা যেন। প্রায় কোটি টাকা খরচে নির্মিত মূর্তিটি দেখতে শ্রীলঙ্কা, বার্মা, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ বৌদ্ধ ধর্ম‍াবলম্বী দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সাধারণ পর্যটকরা নিয়মিত আসেন এখানে।

কীভাবে যাবেন? 
এই ‘ভুবন শান্তি ১০০ সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধ মূর্তি’ দেখতে আপনাকে যেতে হবে কক্সবাজার। বাসভাড়া ঢাকা থেকে ৮০০-২২০০ টাকা। তাই দেশের যে প্রান্তেই থাকুন প্রথমেই চলে আসুন কক্সবাজার। কক্সবাজার জেলা সদর থেকে সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মিনিবাসে রামু থানার উত্তর মিঠাছড়িতে এলেই পাওয়া যাবে বৌদ্ধবিহারটি। 

রাবার বাগান স্টেশন থেকে সোজা পশ্চিমে (চা-বাগান) বৌদ্ধবিহারটি অবস্থিত। কক্সবাজার শহর থেকে ট্যাক্সি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা টমটম নিয়ে যেতে পারেন বৌদ্ধবিহারে। ভাড়া হবে জনপ্রতি ৪০ টাকা। আর রিজার্ভ গেলে ভাড়া পড়বে ২০০-২৫০ টাকা।

/এমটি 

বিমানবাহিনী জাদুঘরে

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০২:৩২ পিএম
বিমানবাহিনী জাদুঘরে

আকাশে ওড়ার স্বপ্ন কমবেশি আমাদের সবারই আছে। পাখির মতো আকাশে ভেসে বেড়াতে না পারলেও এখন উড়োজাহাজে করে মানুষ আকাশে উড়তে পারে। স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন দেখতে কার না ভালো লাগে। সেটা যদি হয় ‘যুদ্ধবিমান’ বিষয়ক কোনো নিদর্শন–তাহলে কৌতূহলের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। তেমনই কৌতূহলের এক জাদুঘর ‘বাংলাদেশ বিমান জাদুঘর’। 

যেখানে রয়েছে ডাকোটা বিমানসহ অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন। অনেক দিন ধরে শুধু পরিকল্পনাই করে যাচ্ছিলাম বিমান বাহিনী জাদুঘর ঘুরতে যাব। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে হয়ে উঠছিল না। শেষ পর্যন্ত আমি আর পৃথু বের হলাম ভ্রমণ গন্তব্যের পানে। শুক্রবার বলে রাস্তায় তেমন যানজট নেই বললেই চলে। 

প্রায় ৩৯ মিনিটেই আমরা এসে উপস্থিত হলাম জাদুঘরের প্রবেশদ্বারে। শুরুতেই কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে নিলাম। জাদুঘরের বাইরে দিকটা দেখে আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ছোটখাটো একটি পরিসরের মধ্যে এটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ করার পর বুঝতে পারলাম এটি আয়তনের দিক থেকে বেশ বড়।

জাদুঘরটি বিশাল জায়গাজুড়ে অবস্থিত এবং এখানে একটি ছোটখাটো বিনোদনকেন্দ্রও আছে। নরম ঘাসের ওপর দিয়ে পদব্রজে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। অন্য সব জাদুঘর থেকে এ জাদুঘরটি আলাদা। এটি কোনো বদ্ধ ঘরে নয়। 

খোলামেলা সবুজ প্রান্তরে মনোমুগ্ধকর পরিবেশে এ ঐতিহাসিক জাদুঘর। জাদুঘরের মধ্যে প্রবেশ করলে চোখে পড়ল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বিমান বাহিনীর গৌরবের জঙ্গিবিমান, হেলিকপ্টার ও রাডার। আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। আমরা দর্শনীর বিনিময়ে চেপে বসলাম হেলিকপ্টারে। ছোটবেলায় খুব আগ্রহ ছিল কীভাবে বিমান আকাশে ঘুরে বেড়ায়। 

একজন আমাদের বলছিলেন কীভাবে হেলিকপ্টার আকাশে ডানা মেলে। আজ নিজের চোখে দেখতে পেলাম। মোট ১৯টি বিমান এবং ৩টি রাডার রয়েছে এ জাদুঘরে। যুদ্ধবিমান ডাকোটার পাশাপাশি রয়েছে ‘অ্যালিউট’ হেলিকপ্টার। এটি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান বাহিনীর সেনানিবাসে আঘাত হানা হয়েছিল। মূল গেট থেকে খানিক এগোলে চোখে পড়ল বিশাল একটি বিমান।

 

বাংলাদেশের প্রথম পরিবহন উড়োজাহাজ এটি। রাশিয়ার তৈরি এন-২৪ বিমানটি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে ১৯৭৩ সালে ‘বলাকা’ নামে সংযোজিত হয়। বিমানটির যাত্রী ধারণক্ষমতা ৪৪ জন। বলাকায় দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগও রয়েছে। বলাকা ছাড়াও আরও তিনটি বিমানে দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। বিমানগুলোয় প্রবেশের জন্য টিকিট মূল্য ৩০ টাকা। বিমানগুলোয় প্রবেশ করলে প্রদর্শন করা হয় বিমান বাহিনীর ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র। দেখা পেলাম হান্টার বিমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিমানটি দিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের ওপর হামলা চালানো হতো। ওই সময়ে এটি খুবই শক্তিশালী এবং নির্ভরশীল বিমান ছিল। 

বিমান বাহিনীতে ১৯৮৯ সালে চীনের তৈরি ‘এফটি-৭ বিমান’ যুদ্ধবিমান হিসেবে প্রথম সংযোজিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৮৬ যুদ্ধবিমানটি ব্যবহার করে। যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয়ে বিমানটিকে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় ফেলে রেখে যায়। পরে বিমান বাহিনীর প্রকৌশল কর্মকর্তা ও টেকনিশিয়ানরা বিমানটি মেরামত করেন এবং ১৯৭২ সালে সফলভাবে উড্ডয়ন করান। বিমানটি ১৯৪৭ সালের তৈরি। 

মুক্তিযুদ্ধের সময় ৪ ডিসেম্বর বিমান বাহিনীর বৈমানিকরা কানাডায় নির্মিত অটার-৭২১ বিমান দিয়ে হানাদার বাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটিতে আঘাত হানে। সেটিও আছে এই জাদুঘরে। রয়েছে মিগ-২১ এফএল বিমান। বিমানটি প্রধানত আকাশ প্রতিরক্ষা ও ভূমি পাহারার জন্য ব্যবহৃত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এ বিমানটি আকাশ প্রতিরক্ষা ও আকাশ থেকে ভূমিতে আক্রমণের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখে। ‘ন্যাট-৯১৬ বিমান’ জঙ্গিবিমানগুলোর মধ্যে সর্বাধিক হালকা এবং আয়তনে ছোট।

১৯৫০ সালে ভারতীয় বিমান বাহিনীতে এটি অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। সে সময়ে ন্যাট বিমান আকাশযুদ্ধে অত্যন্ত চৌকস বিমান হিসেবে পরিচিতি ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে তিনটি ন্যাট বিমান পাকিস্তানের তিনটি স্যাবর জেট (এফ-৮৬) ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর বগুড়ায় আকাশযুদ্ধে এ বিমানটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখে। জাদুঘরে স্থাপিত প্রতিটি নিদর্শনের সঙ্গে আছে তথ্যাবলি। আগ্রহীরা তা থেকে জেনে নিতে পারেন প্রয়োজনীয় তথ্য। 

মুক্তিযুদ্ধে বিমান বাহিনীর শহিদদের স্মরণ করতে তৈরি করা হয়েছে শহিদ কর্নার। জাদুঘরে দর্শনার্থীদের খাবারের সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রাঙ্গণের দক্ষিণ দিকে নির্মাণ করা হয়েছে একটি ফুড কোর্ট। এছাড়া বিমান বাহিনীর বিভিন্ন দ্রব্যাদি দিয়ে সজ্জিত হয়েছে স্যুভেনির শপ ‘নীলাদ্রি’। শিশুদের মনোরঞ্জন ও উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য শিশু পার্কের পাশাপাশি ফুটপাথের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে জিরাফ, শিম্পাঞ্জি, হরিণ ইত্যাদি নানা রকম পশুপাখির প্রতিকৃতি। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘চিলড্রেন হেভেন’। রয়েছে পানির ফোয়ারাও। এছাড়া পাহাড়ের আদলে তৈরি হচ্ছে ‘থিম পার্ক’।

বিমান জাদুঘরের সময়সূচি
বিমান বাহিনী জাদুঘর সোম থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং শুক্র থেকে শনিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি।


বিমান জাদুঘরের টিকিট মূল্য
৫০ টাকা মূল্যের টিকিট সংগ্রহ করে জাদুঘরে প্রবেশ করা যায়। মাত্র ৩০ টাকায় বিমান ভ্রমণ! এখানে ৩০-১০০ টাকার টিকিটের বিনিময়ে ভেতরের হেলিকপ্টার বা বিমানে ওঠা যায়।

কীভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে আগারগাঁও চলে আসুন। রাজধানীর গুলিস্তান থেকে বিহঙ্গ, হিমাচল, স্বাধীন, হাজি ট্রান্সপোর্ট, ইটিসি ট্রান্সপোর্টসহ অনেক বাসে আগারগাঁও যেতে পারবেন। বিমান বাহিনী জাদুঘর বললেই নামিয়ে দেবে। এছাড়া রামপুরা থেকে হিমাচল, আলিফ পরিবহনেও যেতে পারবেন। কিংবা নিজস্ব পরিবহন বা সিএনজি নিয়ে ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে সহজে যেতে পারবেন।

/এমটি

পদ্মার জলের হাতছানি...

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০২:২২ পিএম
আপডেট: ২৩ মে ২০২৬, ০২:২২ পিএম
পদ্মার জলের হাতছানি...

রাজধানীর কোলাহল ছেড়ে একদিনের জন্য কোথাও বেড়াতে যেতে চাইলে মৈনট ঘাটকে বেছে নিতে পারেন। সেখানে গেলে পদ্মার সৌন্দর্য যেমন আপনাকে মোহিত করবে, তেমনি খেতে পাবেন পদ্মার তাজা ইলিশ। আমরা সাধারণত পরিচিত জায়গা ছাড়া ঘুরতে যাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারি না। নিরাপত্তার কারণেও আমরা অনেক জায়গায় যেতে চাই না। 

যান্ত্রিক নগরী ঢাকার আশপাশে ঘোরার জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণেও অনেকে ছুটির দিনগুলো ঘুমিয়েই কাটান। অনেকের আবার ঘুরতে যাওয়ার আগে কত কিছু চিন্তা করতে হয়! সময়, পর্যাপ্ত অর্থ এবং ভালো ভ্রমণ সঙ্গী নিয়ে একটা চিন্তা থেকেই যায়।

হাতে পর্যাপ্ত অর্থ ও সময় নেই দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার, অথচ নিজেকে প্রাণবন্ত করার জন্য একটু নান্দনিক এবং মনোরম পরিবেশের প্রয়োজন। তাই হন্যে হয়ে খুঁজছেন ঢাকার আশপাশেই কোনো মনোরম পরিবেশ।

এমন সবকিছুর সমাধান দিতে মৈনট ঘাটকে বেছে নিতে পারেন। আমি খুব ঘুমপ্রিয় মানুষ, তাই শুক্রবার এলেই দেরি করে ঘুম থেকে উঠি। কয়েক দিন ধরে চিন্টু কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করছিল ওকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। 

গত শুক্রবারও ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ার জন্য কোথাও যেতে পারিনি আর সেই ধারাবাহিকতায় আজও দেরি করে উঠেছি ঘুম থেকে। এদিকে চিন্টুর মন খুব খারাপ, আজও যেতে পারল না কোথাও। 

আমি মনে মনে ভাবলাম ছোট মানুষ বেশ কিছুদিন ধরে বায়না ধরেছে ঘুরতে যাবে, তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া উচিত। এদিকে বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুকের কল্যাণে মৈনট ঘাটের নাম শুনছিলাম। তাই ভাবলাম দূরত্ব কম যেহেতু তাই বিকেল বেলাতেই চিন্টুকে নিয়ে বের হব। এখন আর কিছু না বলে চিন্টুকে সারপ্রাইজে দেব। 

কাল বেলা ব্যাংকের কিছু কাজ ছিল তা শেষ করলাম দুপুর হতেই চিন্টুকে বললাম বিকেল ৩টার মধ্যে রেডি থাকিস। ঠিক বিকেল ৩টায় আমরা গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের সামনে থেকে মৈনট ঘাটের উদ্দেশে বাসে রওনা হলাম।

শুক্রবার তাই যান্ত্রিক শহরের কোলাহল কিছুটা হলেও কম আমাদের ফিটনেসবিহীন বাস এগিয়ে চলছে গন্তব্যস্থলে। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছালাম মৈনট ঘাটে। চিন্টু তো মৈনট ঘাটে এসে খুব খুশি দোহারের কার্তিকপুরের যে জায়গাটি পদ্মাপাড়ে গিয়ে মিশেছে তার নাম মৈনট ঘাট। এখানে ডানে-বাঁয়ে বালু চিকচিক করা স্থলভূমি থাকলেও সামনে শুধু রুপার মতো চকচকে পানি।

মৈনট পদ্মাপাড়ের একটি খেয়াঘাট। এখান থেকে প্রতিদিন ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ট্রলার ও স্পিডবোট চলাচল করে। খেয়া পারাপারের জন্য জায়গাটির পরিচিতি আগে থেকেই ছিল। তবে এখন সেটা জনপ্রিয় বেড়ানোর জায়গা হিসেবেও।

এত দিন অনেকটা আড়ালে থাকলেও ঢাকার কাছে বেড়ানোর ‘হটস্পট’ এখন এই মৈনট ঘাট। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া মৈনট ঘাটের নতুন নাম হলো–মিনি কক্সবাজার! বিস্তীর্ণ জলরাশির ঢেউ আর সঙ্গে শরতের নির্মল আকাশ–এ এক অনবদ্য কাব্য। ছুটির দিন তাই অনেক মানুষের পদচারণে মুখর মৈনট ঘাট। জন মানবের পদচারণা দেখে মনে হলো নগরবাসীর কাছে নতুন এক নির্মল বিনোদনের স্থান। 

মিনি কক্সবাজারের তীরে আমরা হেঁটে বেড়াচ্ছি। খানিক পরপর মাছ ধরার ট্রলার ছুটে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ মাছ ধরার নৌকা দেখে মাছ কেনার জন্য এগোচ্ছেন। দরদাম ঠিক থাকলে অনেক ভ্রমণপিপাসু মাছ কিনে নিচ্ছেন। পুরো নদীর তীর ও তার আশপাশের এলাকা সমুদ্রসৈকতের মতো করে সাজানো। হঠাৎ চিপসের প্যাকেট পড়ে আছে দেখে খুব খারাপ লাগল, আমরাই আমাদের পরিবেশকে দূষিত করছি। 

পদ্মা এত বিশাল যে, ওপারের কিছুই দেখা যায় না, দেখা যায় না ডান-বাঁয়ের কোনো বসতি। নদীর পারে ট্রলার ও স্পিডবোটের মহাজনদের মেলা। আপনি চাইলে ট্রলারে চেপে ওপারের চরভদ্রাসন থেকেও ঘুরে আসতে পারেন। আবার ঘণ্টা চুক্তিতে ট্রলার বা স্পিডবোট ভাড়া করে পদ্মার বুকে ভেসে বেড়াতে পারেন। 

যা-ই করেন এখানে সময়টা কিন্তু বেশ কাটবে। আমরা ট্রলারে চেপে বসলাম ঘুরে বেড়ালাম প্রমত্ত পদ্মায়। আমাদের ট্রলারের মাঝি রহিম মিয়া বললেন এখানে সকালবেলাটা খুব ভালো কাটে, দুপুর কিছুটা মন্থর, তবে বিকেলবেলা অনেক বেশি জমজমাট। 

সোনা রোদের গোধূলিবেলার তো কোনো তুলনাই চলে না। নদীতে পাল তোলা নৌকার ঘুরে বেড়ানো আবার কখন উথাল-পাতাল ঢেউ–এ এক অন্য রকম অনুভূতি। দেখতে দেখতে সূর্য দেবের বিদায়বেলা চলে এল, সূর্য দেবের বিদায়বেলায় প্রকৃতি অসাধারণ রূপ ধারণ করেছে। নদীতে ভ্রমণ শেষে চিন্টু ইলিশ মাছ ভাজা খাওয়ার বায়না ধরল। তাই তাকে নিয়ে ঘাটে অবস্থিত একটি হোটেলে গেলাম। সেখানে ইলিশ মাছ ভাজা খেলাম—কী অসাধারণ স্বাদ। এখানে ইলিশ ১৩০ থেকে ১৯০ টাকা। বড় সাইজের ইলিশ খেতে চাইলে আগেই অর্ডার দিতে হবে আপনাকে। 

কীভাবে আসবেন
ঢাকা থেকে মৈনট ঘাটে আসার সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায়টি হচ্ছে গুলিস্তানের গোলাপ শাহের মাজারের সামনে থেকে সরাসরি মৈনট ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসা বাস। 
৯০ টাকা ভাড়া আর দেড় থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে আপনি পৌঁছে যাবেন মৈনট ঘাট। মৈনট থেকে ঢাকার উদ্দেশে শেষ বাসটি ছেড়ে যায় সন্ধ্যা ৬টায়। যারা প্রাইভেট কার অথবা বাইক নিয়ে আসতে চাচ্ছেন, তারা এই বাসের রুটটাকে ব্যবহার করতে পারেন। আসতে সুবিধা হবে।
 
সচেতনতা 
মৈনট ঘাটে সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যদি আশপাশে ময়লা দেখতে পান তাহলে নিশ্চয় আপনার ভালো লাগবে না। তাই পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে। যেখানে-সেখানে পানির বোতল, চিপস-বিস্কুটের প্যাকেটসহ কোনো ময়লা ফেলা যাবে না। আপনি নিজে যেমন ফেলবেন না, তেমনি কাউকে ফেলতে দেখলে তাকে নিরুৎসাহিত করাটাও আপনার দায়িত্ব। আরেকটি কথা সাঁতার না জানলে গোসল করার সময় পদ্মার বেশি গভীরে না যাওয়াই ভালো।

/এমটি