‘স্যার, একটা প্রশ্ন ছিল...’
শ্রেণিকক্ষের পেছনের সারি থেকে লাজুক কণ্ঠে কথাটি ভেসে আসে। শিক্ষক তখন বোর্ডে লিখছেন, সামনে পরীক্ষা, সিলেবাস শেষ করার তাড়া। তিনি না তাকিয়েই বললেন, ‘এখন প্রশ্ন কোরো না। আগে এটা শেষ করি।’
অনেক শ্রেণিকক্ষে বাক্যটি আরও কঠোর শোনা যায়–‘এত প্রশ্ন করলে ক্লাস চলবে কীভাবে?’ কিংবা ‘বইয়ে যা আছে, সেটাই লেখো।’
বাংলাদেশের অসংখ্য বিদ্যালয়ে প্রতিদিন এমন দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। হয়তো শিক্ষক ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুকে নিরুৎসাহিত করতে চান না, কিন্তু শিশু একটি কঠিন বার্তা পেয়ে যায়–প্রশ্ন করা গুরুত্বপূর্ণ নয়, উত্তর মুখস্থ করাই গুরুত্বপূর্ণ। সেই মুহূর্ত থেকেই শেখার স্বাভাবিক আনন্দের জায়গা দখল করে নেয় ভুল করার ভয়।
অথচ শিশুর শেখার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়ই হলো প্রশ্ন করা। সে দেখে শেখে, শুনে শেখে, অনুকরণ করে শেখে, হাতে-কলমে কাজ করে শেখে। তবে সবচেয়ে গভীরভাবে শেখে প্রশ্ন করার মাধ্যমে। প্রশ্নই তাকে ভাবতে শেখায়, যুক্তি খুঁজতে শেখায়, নিজের ভুল ধরতে শেখায় এবং নতুন জ্ঞান নির্মাণের সাহস দেয়। যে শিশুর প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হয়ে যায়, তার শেখাও ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে। শিক্ষক যখন বলেন, ‘প্রশ্ন কোরো না।’ তখন তিনি পরোক্ষভাবে বলেন, ‘তুমি কিছু শিখো না।’
এ কারণেই একই শ্রেণিকক্ষে, একই শিক্ষক, একই পাঠ্যবই এবং একই পাঠদানের পরও একজন শিক্ষার্থী গণিতে ৯৩ নম্বর পায়, আরেকজন পায় ২৩। আমরা প্রায়ই এটাকে মেধার পার্থক্য বলে ব্যাখ্যা করি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। যে শিক্ষার্থী বুঝতে না পেরেও প্রশ্ন করতে পারে না, সে নিজের মতো করে বিষয়টি বুঝে নেয়। ভুল ধারণা জমতে জমতে একসময় সেটাই তার শেখার সবচেয়ে বড় বাধায় পরিণত হয়। প্রশ্ন করার সুযোগ না থাকলে দুর্বল শিক্ষার্থী আরও দুর্বল হয়, আর শেখার বৈষম্য আরও গভীর হয়।
এই সংকট শুধু শ্রেণিকক্ষের নয়, এটা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থারও সংকট। আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে এখনো শিক্ষার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হয়ে আছে পরীক্ষা এবং নম্বর। শিক্ষার্থী জানতে চায়, কোন অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ, কোন প্রশ্ন কমন আসবে, কত নম্বরের জন্য কতটুকু লিখতে হবে। অভিভাবক সন্তানের কৌতূহলের চেয়ে ফলাফল নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। বিদ্যালয়ের সুনামও অনেক সময় নির্ধারিত হয় কতজন জিপিএ-৫ পেয়েছে, তার ওপর। ফলে শেখার কেন্দ্রবিন্দুতে জ্ঞান নয়, পরীক্ষাই স্থান করে নেয়।
এর ফল আমরা উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রেও দেখতে পাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, অনেক শিক্ষার্থী তথ্য মনে রাখতে পারে, কিন্তু বিশ্লেষণ করতে পারে না, উত্তর লিখতে পারে, কিন্তু নিজেরা প্রশ্ন তৈরি করতে পারে না। নিয়োগদাতারাও দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, নতুন স্নাতকদের মধ্যে সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তা, যোগাযোগ এবং সৃজনশীলতার ঘাটতি আছে। এগুলো কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা নয়, এর শিকড় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণিকক্ষেই।
বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তারে গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিদ্যালয়ে ভর্তি বেড়েছে, অবকাঠামো উন্নত হয়েছে, বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং ডিজিটাল শিক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুধু বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকাই শেখার নিশ্চয়তা দেয় না। বিশ্বব্যাংক, ইউনেসকো ও ইউনিসেফ বহু বছর ধরেই সতর্ক করে আসছে, অনেক দেশে–বাংলাদেশসহ শেখার সংকট (Learning Crisis) তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ শিশুরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রত্যাশিত মাত্রায় শিখছে না। এই সংকটের অন্যতম কারণ হলো এমন শ্রেণিকক্ষ, যেখানে শিক্ষার্থীর কৌতূহল ও অংশগ্রহণের চেয়ে মুখস্থবিদ্যা বেশি গুরুত্ব পায়।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (OECD) গবেষণাও একই কথা বলছে। তাদের মতে, কার্যকর শিক্ষাদানের অন্যতম শর্ত হলো এমন শ্রেণিকক্ষ, যেখানে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে, নিজেদের যুক্তি ব্যাখ্যা করতে পারে এবং ভুল উত্তর দেওয়ার কারণে অপমানিত হওয়ার ভয় পায় না। কারণ প্রকৃত শিক্ষা শুরু হয় তখনই, যখন একজন শিক্ষার্থী উত্তর শুনে সন্তুষ্ট না হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করতে শেখে–‘কেন?’ ‘কীভাবে?’ ‘অন্যভাবে কি সম্ভব?’
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো–আমরা কি পরীক্ষায় সফল শিক্ষার্থী তৈরি করতে চাই, নাকি চিন্তা করতে সক্ষম মানুষ? এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। পরীক্ষায় ভালো করা প্রয়োজন, কিন্তু সেটাই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। যে শিক্ষা প্রশ্নকে ভয় পায়, সে শিক্ষা কখনোই উদ্ভাবন, গবেষণা কিংবা সৃজনশীলতার ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে না।
শেখা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বিশেষ করে গণিত, বিজ্ঞান কিংবা ভাষার মতো বিষয়ে প্রতিটি ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী ধারণা গড়ে ওঠে। প্রথম ধাপটি না বুঝলে দ্বিতীয় ধাপও বোঝা কঠিন হয়ে যায়। তখন একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে প্রয়োজন একটি প্রশ্ন করার সুযোগ। কিন্তু সেই সুযোগ যদি না থাকে, তাহলে সে নিজের মতো করে বিষয়টি অনুমান করে নেয়। ভুল ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে সে পরের অধ্যায়ে যায়, পরের শ্রেণিতে ওঠে। কয়েক মাস পর দেখা যায়, সে শুধু একটি অধ্যায়েই নয়, পুরো বিষয়েই পিছিয়ে পড়েছে।
অর্থাৎ পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীর সমস্যা সব সময় মেধার নয়, অনেক সময় তা প্রশ্ন করতে না পারার ফল। আমরা তার দুর্বলতার কারণ খুঁজি কোচিংয়ের অভাবে, অনুশীলনের ঘাটতিতে কিংবা পারিবারিক পরিবেশে। অথচ শ্রেণিকক্ষেই যদি সে একবার বলতে পারত, ‘স্যার/মিস, আমি বুঝতে পারিনি’, তাহলে হয়তো তার শেখার গতিপথই বদলে যেত।
প্রশ্নহীন শ্রেণিকক্ষ এভাবেই শিক্ষাগত বৈষম্য তৈরি করে। যে শিক্ষার্থী কোনোভাবে বুঝে নেয়, সে এগিয়ে যায়। যে বুঝতে পারে না এবং প্রশ্নও করতে পারে না, সে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ে। একই শ্রেণিকক্ষে বসে দুই শিক্ষার্থীর শেখার দূরত্ব তাই দিন দিন বাড়তে থাকে। আমরা পরীক্ষার ফল দেখি, কিন্তু সেই ফলের পেছনে নীরবে জমে ওঠা না-বোঝার ইতিহাস দেখি না।
স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, কৌতূহল মানুষের মস্তিষ্ককে শেখার জন্য প্রস্তুত করে। নতুন কিছু জানার আগ্রহ তৈরি হলে শেখা গভীর হয়, স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিপরীতে ভয়, অপমান কিংবা অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ শেখার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। তখন শিক্ষার্থীর লক্ষ্য হয়ে যায় বিষয়টি বুঝা নয়, ভুল না করা।
তাই প্রশ্ন করার অধিকারকে কেবল শৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে না দেখে এটিকে শেখার মান, শিক্ষার সমতা এবং দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ গঠনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা দরকার।
শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি তৈরি করতে যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রাধিকার বদলানো। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষক-প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে স্বীকার করতে হবে–প্রশ্ন করার সংস্কৃতি ছাড়া শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।
প্রথম কাজ হওয়া উচিত শ্রেণিকক্ষের সংস্কৃতি বদলানো। শিক্ষককে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে ভুল উত্তর দেওয়ার কারণে কোনো শিক্ষার্থী বিব্রত হবে না। একজন শিক্ষার্থী যদি বলে, ‘স্যার/মিস, আমি বুঝতে পারিনি’, তাহলে সেটাকে দুর্বলতার পরিচয় নয়, শেখার সূচনা হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষক যদি ‘ভুল হয়েছে’ বলার বদলে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি এমনটা কেন ভাবলে?’, তাহলে একটি ভুল উত্তরও পুরো শ্রেণির শেখার সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক-প্রশিক্ষণের ধরন পাল্টাতে হবে। একজন ভালো শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই শেষ করেন না, তিনি জানেন কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন গ্রহণ করতে হয় এবং কীভাবে একটি প্রশ্নকে আলোচনায় রূপ দিতে হয়। শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে এই দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে হবে মূল্যায়নব্যবস্থায়। আমাদের পরীক্ষা যদি শুধু মুখস্থ জ্ঞান যাচাই করে, তাহলে বিদ্যালয়ও মুখস্থবিদ্যাই শেখাবে। প্রশ্নপত্রে বিশ্লেষণ, যুক্তি, বাস্তব সমস্যা সমাধান এবং ব্যাখ্যাভিত্তিক প্রশ্নের পরিমাণ বাড়াতে হবে। কারণ পরীক্ষা যা মূল্যায়ন করে, শ্রেণিকক্ষ শেষ পর্যন্ত সেটাই শেখায়।
চতুর্থত, বিদ্যালয়ের সাফল্য মূল্যায়নের পদ্ধতিও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি বিদ্যালয় কতজন জিপিএ-৫ পেল, সেটাই তার একমাত্র পরিচয় হতে পারে না। শিক্ষার্থীরা কতটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রশ্ন করতে পারে, কতটা যুক্তি দিয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, কতটা বইয়ের বাইরে জানতে আগ্রহী–এসবও শিক্ষার মানের সূচক হওয়া উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিবর্তনের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন নেই। নতুন ভবন, স্মার্ট বোর্ড কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু এগুলোর কোনোটিই এমন শ্রেণিকক্ষের বিকল্প হতে পারে না, যেখানে শিশু প্রশ্ন করতে ভয় পায়। শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ আদতে একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন–শিশুর কৌতূহলকে সম্মান করার সংস্কৃতি।
বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা শিক্ষার্থী নয়, প্রয়োজন চিন্তাশীল মানুষ, প্রয়োজন এমন তরুণ, যারা নতুন প্রশ্ন তুলবে, নতুন সমাধান খুঁজবে এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তথ্য মুখস্থ করার মূল্য ক্রমেই কমছে, কিন্তু সঠিক প্রশ্ন করার মূল্য বাড়ছে প্রতিদিন।
তাই শিক্ষা সংস্কারের আলোচনা শুরু হওয়া উচিত একটি খুব সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে–আমাদের শ্রেণিকক্ষে কি শিশুর প্রশ্নের জন্য জায়গা আছে?
যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে নতুন পাঠ্যক্রম, নতুন বই, নতুন প্রযুক্তি কিংবা নতুন ভবন–কোনোটিই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না। কারণ শিক্ষার প্রাণ পাঠ্যবইয়ে নয়, শ্রেণিকক্ষের কথোপকথনে, আর সেই কথোপকথনের শুরু হয় একটি প্রশ্ন থেকে।
বাংলাদেশের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে যেদিন একজন শিক্ষার্থী নির্ভয়ে বলতে পারবে, ‘স্যার/মিস, আমি বুঝতে পারিনি’, আর শিক্ষক বিরক্ত না হয়ে বলবেন, ‘আবার বুঝিয়ে বলি’, সেদিনই শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপটি নেওয়া হবে।
কারণ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিশুদের মুখস্থ করা উত্তরের সংখ্যা দিয়ে নয়, নির্ধারিত হয় তারা কত সাহস নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে, তার ওপর। যে জাতি তার শিশুদের প্রশ্ন করতে শেখায়, ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তার হাতেই গড়ে ওঠে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক