সুনামগঞ্জে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরের পর থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও ভারী বৃষ্টিপাত আর হয়নি। তারপরও বাড়ছে সুরমা নদীসহ সব নদী ও হাওরের পানি।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে বৃষ্টি কম হলেও দুপুরের পর থেকে বৃষ্টিপাত আবার শুরু হয়।
গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কের শক্তিয়ারখলা, দুর্গাপুর এলাকায় এখনো পানি আছে। এসব স্থানে বৃহস্পতিবার যান চলাচলে সমস্যা হলেও শুক্রবার ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলছে। সড়কে পানি থাকায় ওই পথে টাঙ্গুয়ার হাওরে যাতায়াতকারী পর্যটকদের কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
এদিকে বৃষ্টিপাত কম হলেও সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জে বন্যার সতর্কতা জারি করে জানায়, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সিলেট সুনামগঞ্জের বন্যার পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের কাছে ষোলঘর এলাকায় সুরমা নদীর পানি শুক্রবার বেলা ৩টায় বিপৎসীমার ৭ দশমিক ৩০ মিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতদিনের তুলনায় নদীর পানি ২৪ ঘণ্টায় ১০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে ভারতের চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরাম এলাকায় বৃষ্টি হওয়ার কারণে সুনামগঞ্জে পাহাড়ি ঢল নামছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মৌসিনরাম (মেঘলায়) ১৭৭ মিলিমিটার ও চেরাপুঞ্জিতে ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর প্রভাবে তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা ও পাটলাই, জগন্নাথপুর উপজেলার নলজুর ও কুশিয়ারা, দোয়ারাবাজারের খাসিয়ামারা, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার রক্তি, সদর উপজেলার চলতি নদে পানি বেড়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুন হাওলাদার জানান, সুনামগঞ্জে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। আরও ৪৮ ঘণ্টা ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে এতে পানি আরও বাড়বে। যেহেতু সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকা ভারতে চেরাপুঞ্জি ও মৌরসিনরামে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে তাই সুনামগঞ্জ জেলায় স্বল্প মেয়াদি একটি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সুনামগঞ্জের হাওর নেতা অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ জানান, সুনামগঞ্জের মানুষ বন্যাসহ প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে কীভাবে টিকে থাকতে হয় তা জানে। যেহেতু পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসন সুনামগঞ্জে বন্যার সতর্কতা জারি করেছে তাই সুনামগঞ্জে হাওর এলাকার মানুষ একই সঙ্গে শহরের মানুষ আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। যদি এলাকায় পানি বৃদ্ধি পাওয়া অব্যাহত থাকে এবং বাড়ির আঙ্গিনার ডুবে যায় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সবাইকে নিয়ে পাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দুইতলা বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হবে। এর আগেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে আসবাবপত্র ঘরের মধ্যে উঁচু মাচা করে তুলে রাখলে নষ্ট হবে না। বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ঔষধ, নাপা, স্যালাইন, সর্দি-জ্বরের ঔষধ, বিশুদ্ধ পানি, পানি বিশুদ্ধ করণ ট্যাবলেট সংগ্রহ করে রাখলে ভালো হবে। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত মোমবাতি, দিয়াশলাই, হারিকেন রাখলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাবে। হাওরের সাহসী মানুষ বন্যা শুরু আগে এই গুলো প্রস্তুত রাখলে তারপরও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারবে।
সুনামগঞ্জের হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন জানান, যেহেতু সুনামগঞ্জ হাওর এলাকা প্রায় প্রতি বছর সুনামগঞ্জের মানুষ বন্যার মুখোমুখি হতে হয়। তাই এই অঞ্চলের মানুষ জানে কীভাবে মোকাবিলা করতে হয় তারপরও মানুষ নিজে এবং তাদের গবাদিপশু হাঁস মোরগ নিয়ে কষ্ট করেন। তাই বন্যা শুরু আগেই নিজেদের গবাদি পশু, হাঁস মোরগ নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে রেখে আসতে পারেন। এবং খড় ধান নিয়ে রাখলে গবাদিপশুসহ হাঁস মোরগকে খাওয়াতে পারবেন এতে করে নিজেরাও বাঁচবেন সঙ্গে তাদের গবাদিপশু, হাঁস মোরগেকেও বাঁচাতে পারবেন।
এ দিকে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন থেকে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে জানিয়ে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানান, সুনামগঞ্জের সব বাহিনী এবং কমিটির সংশ্লিষ্ট সদস্যদের নিয়ে দুর্যোগপূর্ণ, দুর্যোগকালীন, দুর্যোগউত্তর প্রস্তুতি সভা জেলা এবং ১২টি উপজেলায় সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৩১১টি আশ্রয়কেন্দ্র, ৪৮৪ টি নৌকা, আটটি স্পিডবোট, স্বেচ্ছাসেবক ১২০১ জন ছাড়াও ইরা, ব্র্যাক এবং রেডক্রিসেন্ট এর প্রায় ১২০০ জন, মেডিক্যাল টিম ১০৫৬টি, দুর্যোগকালীন জিআর চাল, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ২,৯৯,৫০০ টি, শুকনা খাবার, ঢেউটিন, ইত্যাদি ১২ টি উপজেলায় প্রস্তুত আছে।
রিফাত/