চট্টগ্রামে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার। গত জুন মাসে যেখানে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১২২ জন। সেখানে জুলাইয়ের প্রথম ৯ দিনেই আক্রান্ত হয়েছে ১০৮ জন।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। সেটির প্রমাণ মিলেছে জুলাই মাসের প্রথম ৯ দিনে। এখান থেকেই বোঝা যাচ্ছে চট্টগ্রামে চোখ রাঙাতে শুরু করেছে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অক্টোবর বা নভেম্বর মাস পর্যন্তও ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। একইসাথে বছরের কোন্ মাসগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রবণতা বা ঝুঁকি বেশি থাকে তা যাচাই করেছে খবরের কাগজ। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, এই চার বছরে জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আক্রান্তের হার বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করা তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়। অপরদিকে বছরটিতে জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৬৪৭ জন। এই পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) মারা গেছেন ৩৩ জন। ২০২৩ সালে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৪৬৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়। ওই বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৩ হাজার ২৪৭ জন। এসময়ে (জুলাই-নভেম্বর) মারা গেছেন ৯৩ জন।
তার পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১৯৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়। ওই বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৭৬৫ জন। এসময়ে (জুলাই-নভেম্বর) মারা গেছেন ৩৮ জন। ২০২৫ সালে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় ৪৪৫ জন। ওই বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৬৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এসময়ে (জুলাই-নভেম্বর) মারা গেছেন ২৪ জন। এখান থেকে প্রমাণ মিলছে জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রোগটি বেশি প্রভাব বিস্তার করে।
চলতি বছরের জুলাই মাস চলছে। বছরটির প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে পর্যন্ত) মোট ১৭৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। জুন মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১২২ জন। অপরদিকে শুধুমাত্র জুলাই মাসের প্রথম নয় দিনেই (১ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত) আক্রান্ত হয়েছেন ১০৮ জন। এতেই বোঝা যায়, ডেঙ্গু আক্রান্তের ঝুঁকির মাসও শুরু হয়েছে।
ঝঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত আট এলাকা
নগরের জালালাবাদ (২ নং ওয়ার্ড), পাঁচলাইশ (৩ নং ওয়ার্ড), উত্তর কাট্টলী (১০ নং ওয়ার্ড), পশ্চিম বাকলিয়া (১৭ নং ওয়ার্ড), দক্ষিণ বাকলিয়া (১৯ নং ওয়ার্ড), পাথরঘাটা (৩৪ নং ওয়ার্ড), দক্ষিণ হালিশহর (৩৯ নং ওয়ার্ড) ও দক্ষিণ পতেঙ্গা (৪১ নং ওয়ার্ড) কে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড হিসেবে চিহ্নিত করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) স্বাস্থ্য বিভাগ।
ডেঙ্গু রোধে নগরজুড়ে মশক নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভা ধ্বংস এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করছে চসিক। এদিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার কারণে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ১৬ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডে ৫০ বেডের ডেঙ্গু ব্লক প্রস্তুত করা হয়েছে। গত ৪ জুলাই দুপুরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ডেঙ্গু ব্লক উদ্বোধন করেন।
চসিক মেয়র ও চমেক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং উন্নত চিকিৎসাসেবা—দুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। চসিক নগরজুড়ে মশক নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভা ধ্বংস এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নাগরিকদেরও সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
মেয়র বলেন, চমেক হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু হওয়ায় রোগীরা দ্রুত ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাবেন। হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজন এবং সেবার পরিবেশ আরও উন্নত করতে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম খবরের কাগজকে বলেন, এবছর জুন থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বেড়েছে। তবে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু বাড়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ এ সময়ে পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, ফুলের টবে তিনদিনের বেশি পানি জমে থাকলে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। জনগণের উদ্দেশে বলতে চাই, বাড়ির আশপাশ পরিস্কার রাখতে হবে। স্বাস্থ্য সচেতন থাকতে হবে। দিনে বা রাতের বেলা যখনই বিছানায় যাবেন- মশারি ব্যবহার করতে হবে। মশা যাতে কামড়াতে না পারে সেজন্য কিছু ক্রিম আছে যা দিনের বেলা ব্যবহার করতে পারেন। জ্বর হলে ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন। বিশেষ করে এই মৌসুমে জ্বর হলে অবশ্যই ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষাগুলো সরকার বিনামূল্যে বিভিন্ন হাসপাতালে করার ব্যবস্থা করেছে।
উল্লেখ্য, বর্ষা মৌসুম শুরু হলে জীবাণুবাহী এডিস মশার উপদ্রব বাড়ে। এই মৌসুমটিতে ভ্যাপসা গরমের সাথে ঝিরি কিংবা থেমে বৃষ্টি হয়। এটি এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য সহায়ক। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। বৃষ্টির জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে এডিস মশা এবং এতে মশার বংশবিস্তারও ত্বরান্বিত হয়।
এসএন/