চলতি বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলেও আর্জেন্টিনার পথ মোটেও বিতর্কহীন নয়। বরং শেষ ষোলোর পর থেকেই লিওনেল মেসিদের ঘিরে প্রশ্ন উঠছে; ফিফা কি বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে? মিসরের কোচ থেকে শুরু করে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন পর্যন্ত রেফারিংয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। কিন্তু এসব অভিযোগের পক্ষে আদৌ কতটা প্রমাণ আছে?
শেষ ষোলোয় মিসরের বিপক্ষে নাটকীয় ৩-২ গোলের জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল মিসর। এরপর অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন মেসিদের। ১৪ মিনিটে তিন গোল। কোয়ার্টারে লিওনেল স্কালোনির দল। তবে ম্যাচ শেষে মিসরের কোচ হোসাম হাসান অভিযোগ করেন, রেফারির সিদ্ধান্তে তারা ‘অন্যায়ের শিকার’ হয়েছেন। এমনকি তিনি ইঙ্গিত দেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও লিওনেল মেসিকে টুর্নামেন্টে ধরে রাখতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিতর্কের মূল কারণ কী?
মিসরের সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল দুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে। প্রথমটি, মোস্তাফা জিকোর করা একটি গোল ভিএআরের মাধ্যমে বাতিল হয়। রিপ্লেতে দেখা যায়, আক্রমণ শুরু হওয়ার সময় মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ে পা দেন। সেই ফাউলের কারণেই গোলটি বাতিল করা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের ঠিক আগে মোহাম্মদ সালাহকে ফাউল করা হলেও পেনাল্টি দেওয়া হয়নি।
দুই ঘটনাই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী, গোল হওয়ার আগে বিল্ডআপে ফাউল থাকলে ভিএআর গোল বাতিল করতে পারে। অন্যদিকে সালাহর ঘটনাটি রেফারি ও ভিএআর স্বাভাবিক শারীরিক সংঘর্ষ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ফলে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটিকে সরাসরি পক্ষপাতিত্বের প্রমাণ বলা কঠিন।
আর্জেন্টাইন রেফারিদের নিয়েও প্রশ্ন
কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স-মরক্কো ম্যাচে পুরো অন-ফিল্ড রেফারিং দলই আর্জেন্টিনার হওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পরে ভিএআরের প্রধান কর্মকর্তাও আর্জেন্টিনার হওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও এ ধরনের ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব সাধারণত সবচেয়ে অভিজ্ঞ রেফারিদেরই দেওয়া হয়। ফলে শুধুমাত্র জাতীয়তার কারণে তাঁদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই। তবে এমন নিয়োগ বিতর্কের সুযোগ তৈরি করেছে; এটিও সত্য।
মেসির সম্ভাব্য লাল কার্ড বিতর্ক
গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আইসা মান্দির পায়ের পেছনে স্টাড লাগিয়েও লিওনেল মেসি কোনো কার্ড দেখেননি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন বালোগান প্রায় একই ধরনের ট্যাকলে ভিএআর দেখে সরাসরি লাল কার্ড পান। এই দুই ঘটনার তুলনা করে অনেকেই দাবি করছেন, মেসি বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন। যদি তখন মেসি লাল কার্ড দেখতেন, তবে এক বা ততোধিক ম্যাচে নিষিদ্ধ হতেন। ফলে বিশ্বকাপে তাঁর করা সর্বোচ্চ আট গোলের সংখ্যাও কমে যেত।
তবে ফুটবলে একই ধরনের দুটি ঘটনা সব সময় একই সিদ্ধান্তে শেষ হয় না। ট্যাকলের গতি, বলের অবস্থান, আঘাতের মাত্রা ও রেফারির ব্যাখ্যার ওপরও সিদ্ধান্ত নির্ভর করে। তাই দুটি ঘটনা একেবারে অভিন্ন ছিল; এমন দাবি করাও কঠিন।
কম হলুদ কার্ডও আলোচনায়
আরেকটি পরিসংখ্যানও আলোচনায় এসেছে। এবারের বিশ্বকাপে প্রতি ১৯.৭টি ফাউলে একটি হলুদ কার্ড পেয়েছে আর্জেন্টিনা। শেষ আটে থাকা দলগুলোর মধ্যে কেবল তিনটি দলের অনুপাতই এর চেয়ে বেশি। অন্যদিকে ইংল্যান্ড প্রতি ৭.৭টি ফাউলেই একটি হলুদ কার্ড পেয়েছে। অর্থাৎ আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের চেয়ে বেশি ফাউল করলেও কার্ড পেয়েছে তুলনামূলক কম। এই পরিসংখ্যান অনেকের সন্দেহ বাড়ালেও এটিই পক্ষপাতিত্বের অকাট্য প্রমাণ নয়। কারণ সব ফাউলের গুরুত্ব এক নয় এবং প্রতিটি ঘটনার আলাদা মূল্যায়ন থাকে।
সহজ পথ কি পেয়েছে আর্জেন্টিনা?
বিশ্বকাপের ড্র নিয়েও আলোচনা কম হয়নি। ফিফা এবার এমনভাবে নকআউটের সূচি সাজিয়েছে, যাতে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দল; ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, স্পেন ও ইংল্যান্ড; সেমিফাইনালের আগে একে অপরের মুখোমুখি না হয়।
এর ফলে আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত খেলেছে তুলনামূলক নিচের সারির দল কেপ ভার্দে (র্যাঙ্কিং ৬৭), মিসর (২৯) এবং এবার কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড (১৯)। অন্যদিকে স্পেনকে ইতোমধ্যে পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হয়েছে, ফ্রান্স খেলছে মরক্কোর বিপক্ষে। তবে এটিও টুর্নামেন্টের নির্ধারিত কাঠামোর অংশ। শুধু আর্জেন্টিনার জন্য আলাদা করে কোনো পথ তৈরি করা হয়েছে; এমন প্রমাণ নেই।
পেনাল্টিও আলোচনায়
২০২২ বিশ্বকাপে রেকর্ড পাঁচটি পেনাল্টি পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। এবারও তারা তিনটি পেনাল্টি পেয়েছে, যা টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ। তবে মেসি এর মধ্যে দুটি পেনাল্টি মিসও করেছেন। তাই বেশি পেনাল্টি পাওয়া নিয়েও বিতর্ক থাকলেও সেটিকে এককভাবে পক্ষপাতিত্বের প্রমাণ বলা যাচ্ছে না।
বাস্তবতা কী বলছে?
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ঘিরে বিতর্কের যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছে। কিছু সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ, কিছু ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার অভাবও চোখে পড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ সামনে আসেনি, যা নিশ্চিতভাবে বলে দেয়; ফিফা পরিকল্পিতভাবে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দিচ্ছে। বরং বাস্তবতা হলো, বিতর্কের মাঝেও কেপ ভার্দে ও মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনাকে দুটি ম্যাচই জিততে হয়েছে শেষ মুহূর্তের লড়াই করে। তাই অভিযোগ, পরিসংখ্যান ও বিতর্ক থাকলেও ষড়যন্ত্রের দাবিকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করার মতো শক্ত প্রমাণ এখনো মেলেনি।
এসএন/