চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় সাঙ্গু নদী থেকে লোকালয়ে প্রবেশ করা পানির প্রবল স্রোতে একটি কবরস্থান থেকে তিনটি মরদেহ ভেসে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বাজালিয়া আলতাব আলী চৌধুরী জামে মসজিদের কবরস্থান থেকে মরদেহ তিনটি ভেসে উঠে ঝোপঝাড়ের সঙ্গে আটকে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। এরপর তারা মরদেহগুলো মসজিদের খাটিয়ায় রাখেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাক আহমেদ মুরাদ বলেন, পানির প্রবল স্রোতে মরদেহ তিনটি কবরস্থান থেকে ভেসে উঠেছে। এরপর সেগুলো অন্য কবরস্থানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিবছর বন্যার সময় সাঙ্গু নদীর পানির স্রোতে এ মসজিদের কবরস্থান থেকে অনেক মরদেহ ভেসে যায়। কিন্তু এ সমস্যা সমাধানের জন্য এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। আজিজ কেরানির বাড়ি থেকে মো. ইলিয়াছের বাড়ি পর্যন্ত নদীর পাড়ের অংশে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হলে এ সমস্যার সমাধান হবে।
আরিফুল ইসলাম/নাঈম
চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের মছনিয়াকাটা ডবলতলী এলাকায় পাহাড় ধসে মাটিচাপা পড়ে তাওসিফ (১০) ও রুমি আক্তার (১২) নামে একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ।
বুধবার (৮ জুলাই) রাতে মৃত্যুর এ দুর্ঘটনা ঘটে। পাহাড়ধসে নিহত শিশু রুমির মা গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
খবর পেয়ে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহিন দেলোয়ার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতদের পরিবারকে নগদ ২০ হাজার টাকা ও চাল সহায়তা দিয়েছেন। এ ঘটনা ছাড়াও পেকুয়ার শিলখালীসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় একাধিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সড়ক যোগাযোগ, ভেসে গেছে অসংখ্য মাছের ঘের ও ফসলি জমি।
পেকুয়ার মেহেরনামা এলাকায় প্রবল স্রোতে বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বাঁধের সঙ্গে স্থানীয় একটি কবরস্থানের অংশবিশেষ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, স্রোতের তোড়ে একটি মরদেহও ভেসে গেছে, যা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাওয়া যায়নি।
দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে পেকুয়ায় এক মানবিক ঘটনা ঘটেছে। শিলখালী ইউনিয়নের ১৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ এনামের মেয়ের প্রসবব্যথা উঠলে পরিবারের সদস্যরা কোমর সমান পানি মাড়িয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে তাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসেন।
বিষয়টি জানতে পেরে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম দ্রুত গাড়ির ব্যবস্থা করেন। অতিরিক্ত পানির কারণে গাড়িটি আটকে গেলেও পরবর্তীতে বিকল্প উপায়ে প্রসূতিকে নিরাপদে হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
বন্যার কারণে চকরিয়া ও পেকুয়ার নিচু এলাকাগুলো সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর ও শ্রমিকরা। কাজ বন্ধ থাকায় পরিবার নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটছে তাদের। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পানিবন্দি মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার ও জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন।
বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে বিদ্যুতের পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্কও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যে-সব এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে এবং পানি ঢুকেছে, সেসব স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় অচল। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় মোবাইল ফোনের টাওয়ারগুলোও কার্যক্রম চালাতে পারছে না। সংশ্লিষ্ট টাওয়ারগুলোতে পর্যাপ্ত জেনারেটর বা সৌরবিদ্যুৎ (সোলার ব্যাকআপ) ব্যবস্থা না থাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নেটওয়ার্ক সেবাও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দুর্গত এলাকার মানুষ চরম যোগাযোগ সংকটে পড়েছেন এবং জরুরি তথ্য আদান-প্রদানেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
টানা বৃষ্টিতে চকরিয়া ও পেকুয়ায় ব্যাপক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে বহু বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ও ধসে যাওয়া এলাকাগুলো পরিদর্শন করা হচ্ছে। দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসনের সব টিম মাঠে নিরলসভাবে কাজ করছে।
টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে চকরিয়া-পেকুয়া অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
রকিবুল/নাঈম
টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়কের দস্তিদার হাট ব্রিজ, বুড়ির দোকান ব্রিজ ও অলি আহমদ কলেজ এলাকার অংশ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে এ মহাসড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বান্দরবানের সঙ্গে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল থেকে সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লোকালয়ে প্রবেশ করা শুরু করলে, বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি পেয়ে মহাসড়কের ওপর দিয়ে প্রবল স্রোতে প্রবাহিত হতে থাকে। এতে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মহাসড়কের দুই পাশে বিভিন্ন যানবাহন আটকা পড়ে।
অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। কেউ কেউ ভ্যানের সাহায্যে পানিতে তলিয়ে যাওয়া অংশ অতিক্রম করে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
বুড়ির দোকান এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল মান্নান বলেন, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে সাঙ্গু নদী ও আশপাশের খালের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেসরকারি চাকুরিজীবী আল আমিন বলেন, আমি চট্টগ্রাম শহরে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করি। আর আমার বাড়ি বান্দরবান পৌরসভার আর্মি পাড়ায় অবস্থিত। সেখানেও পানিতে তলিয়ে গেছে। তাই পরিবারের কাছে ছুটে যাচ্ছি। কিন্তু মহাসড়কের বেশ কয়েকটি অংশ তলিয়ে যাওয়ায় গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সেজন্য একাধিক গাড়ি পরিবর্তন করে হলেও গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।
বান্দরবান সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়কের সাতকানিয়ার ৩টি অংশ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে মহাসড়কের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়াও বান্দরবানের কয়েকটা অংশে মহাসড়কের উপর পাহাড়ধস হয়েছে। আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছি।
আরিফুল ইসলাম/নাঈম