এক রাতের টানা বৃষ্টি। ভোর হতেই ময়মনসিংহ নগরীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি, আবাসিক এলাকা, বাজার–সবখানেই জমে আছে পানি। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও ঘরে ঢুকেছে ড্রেনের দুর্গন্ধযুক্ত কালো পানি। অফিসগামী মানুষ পথে আটকে পড়েছেন। শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাওয়া ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে–প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না?
গতকাল বুধবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নগরীর চরপাড়া, ব্রাহ্মপল্লী, ভাটিকাশর, কাচিঝুলি, বাসবাড়ি কলোনি, নয়াপাড়া, কপিখেত, সানকিপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাতভর বৃষ্টির পানি সড়কে জমে আছে। অনেক বাড়িতে পানি ঢুকে আসবাবপত্র নষ্ট হয়েছে। কোথাও ড্রেন উপচে ময়লাযুক্ত পানি ঘরে ঢুকে পড়ায় দুর্গন্ধে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অনেক সড়কে পানি জমে থাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। রিকশা ও মোটরসাইকেল চলতে গিয়ে বন্ধ হয়ে পড়ে, পথচারীদের অনেকেই জুতা হাতে নিয়ে হাঁটুপানি মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে বাধ্য হন। টানা বৃষ্টির কারণে নগরীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া জমে থাকা পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও রয়েছে। বুধবার সকালে নগরীর ব্রাহ্মপল্লী এলাকায় ঘরের ভেতরে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে বিছানা থেকে পড়ে আয়াস নামে ৮ মাসের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন (মসিক) প্রতিবছর খাল খনন, ড্রেন নির্মাণ, সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে এসব খাতে ব্যয় হয় ২৫ লাখ ১৬ হাজার ৮৫০ টাকা। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪ লাখ ৮৫ হাজার ৮৪০ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যয় হয় ৬০ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও একই ধরনের প্রকল্পে মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও খাল খনন, পরিষ্কার এবং ড্রেন নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভারী বৃষ্টি হলেই নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। ফলে প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, জলাবদ্ধতার কারণ কেবল ড্রেন পরিষ্কার না করা নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সংকুচিত বা দখল হওয়া খাল-নালা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি। নগরীর অনেক এলাকায় ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় পলিমাটি ও ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ পায় না। অন্যদিকে বিভিন্ন স্থানে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থাই অকার্যকর হয়ে পড়ে।
সানকিপাড়া এলাকার বাসিন্দা আজিজুল হক বলেন, ‘বর্ষা এলে একই দুর্ভোগ দেখতে দেখতে আমরা ক্লান্ত। প্রতি বছর কাজের কথা শুনি, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখি না। এবার অন্তত স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ দেখতে চাই।’
কপিখেত এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা খাতুন বলেন, ‘শহরের আয়তন ও জনসংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে ড্রেনেজ অবকাঠামো সম্প্রসারণ হয়নি। সামান্য বৃষ্টিতে বাসাবাড়িতে ড্রেনের ময়লাযুক্ত পানি প্রবেশ করে। তখন দুর্ভোগের সীমা থাকে না। এই দুর্ভোগ থেকে রেহাই চাই।’
ময়মনসিংহ মঞ্চের সমন্বয়কারী ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি থেকে মানুষ মুক্তি চায়। খাল পুনরুদ্ধার, সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানভিত্তিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাধার সংরক্ষণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নগর পরিকল্পনায় জলপ্রবাহের বিষয়টি অগ্রাধিকার না দিলে প্রতিবছর বর্ষা এলেই ময়মনসিংহকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।’
মসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সুমনা আল মজীদ বলেন, বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পলি অপসারণ এবং পানি দ্রুত নিষ্কাশনের কাজ চলছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জলাবদ্ধতার খবর পেয়ে বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন মসিক প্রশাসক রুকুনোজ্জামান রোকন। তিনি বলেন, খালের পানিপ্রবাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে।