গত সোমবার সকাল থেকে যশোর জেলা শহরসহ আট উপজেলায় বৃষ্টিপাত শুরু হয়। কখনো ঝুমবৃষ্টি, আবার কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি; এভাবেই বর্ষণ অব্যাহত থাকে। সকালের দিকে কিছুক্ষণের জন্য সূর্যের মৃদু আলোর দেখা মিললেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। দিনভর মেঘের ঘনঘটা স্থায়ী হয়। টানা বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি ও আর্থিক লোকসানে পড়েন সাধারণ দিনমজুর, কুলি, হকার ও শ্রমজীবী মানুষ।
যশোর বিমানঘাঁটি আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত জেলাজুড়ে ৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। মঙ্গলবারও একই অবস্থা বিরাজ করে। তবে গতকাল বুধবার দুপুরের দিকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের এই প্রভাব আরও দুই দিন থাকতে পারে।
টানা বৃষ্টির কারণে যশোর শহরে লোকজনের উপস্থিতি ছিল সীমিত। দড়াটানা মোড়, চৌরাস্তা, ও বড়বাজার এলাকার অধিকাংশ ছোট ছোট দোকান, ফুটপাতের ব্যবসা ও কাঁচাবাজার বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। যারা জীবিকার তাগিদে কিংবা জরুরি প্রয়োজনে ছাতা মাথায় দিয়ে ঘরের বাইরে বের হয়েছেন, তাদের পড়তে হয় চরম বিড়ম্বনায়।
এদিকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সুযোগ নিয়েছে শহরের রিকশা ও ইজিবাইকচালকরা। তাদের বিরুদ্ধে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ যাত্রীরা। তবে যাত্রী খুব কম হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন চালক। শহরের সার্কিট হাউস মোড়ে রিকশাচালক আব্দুল মজিদ বলেন, ‘এই বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় রিকশা চালানো যে কী কষ্টের, তা বোঝানো যাবে না। কিন্তু ঘরে বসে থাকার উপায় নেই। আমার উপার্জনের ওপর চারজনের সংসার চলে। এক দিন বের না হলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে। তাই বাধ্য হয়েই ভিজতে ভিজতে রিকশা চালাচ্ছি।’
বৃষ্টির কারণে সবচেয়ে অমানবিক পরিস্থিতিতে পড়েছেন যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসা দূরপাল্লার রোগীরা। হাসপাতাল মোড়ে আটকে পড়া ঝিনাইদহ এলাকার এক বৃদ্ধ রহিমা বেগম দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘সারা দিন ধরে থমথমে বৃষ্টি। ডাক্তার দেখাতে এসে এখন হাসপাতালের বারান্দায় আটকা পড়ে আছি। বের হওয়ার কোনো পথ পাচ্ছি না। আমার বাড়ি অনেক দূরে। রাত যত বাড়ছে, মন তত আনচান করছে। এই বৃষ্টিতে রাতে কোনো দূরপাল্লার গাড়ি পাব কি না, তা আল্লাহই জানে।’
এদিকে যশোরকে দেশের অন্যতম প্রধান ‘সবজি ভান্ডার’ বলা হয়ে থাকে। এখান থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক সবজি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। কিন্তু টানা বর্ষণে জেলার চুড়ামনকাটি, বারীনগর, হৈবতপুর ও শার্শা এলাকার নিচু সবজিখেতগুলোতে পানি জমতে শুরু করেছে।
স্থানীয় চাষিরা জানান, জুনের খরা কাটিয়ে যারা মাত্র নতুন করে শীতকালীন আগাম সবজির চারা রোপণ করেছিলেন, কিংবা পটোল, বেগুন, ঝিঙে ও কাঁচা মরিচের আবাদ ধরে রেখেছিলেন, তারা এখন চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। বৃষ্টি যদি আরও দুই-তিন দিন স্থায়ী হয়, তবে খেতের সবজিগাছের গোড়া পচে সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।
বিশেষ করে শাকজাতীয় ফসল ও সদ্য গজানো চারাগাছ এই বৃষ্টিতে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে স্থানীয় বাজারে সবজির সরবরাহ কমে গিয়ে দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
যশোরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মহিবুল হাসান জানিয়েছেন, তারা মাঠপর্যায়ের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। কৃষকদের দ্রুত নিজ নিজ খেত থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে জমিতে পানি জমে ফসলের ক্ষতি না হতে পারে।