টানা বর্ষণে বারবার ডুবছে চট্টগ্রাম। তিন দিন ধরে নতুন নতুন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নগরজুড়ে নেমে আসছে স্থবিরতা। দুই দিনে পাহাড় ও দেয়ালধসে দুজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সংস্থা চলমান জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ প্রায় ৯৮ শতাংশ শেষ হওয়ার কথা বললেও কার্যত এর সুফল পাচ্ছেন না নগরবাসী। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলত চার কারণে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন হচ্ছে না। তা হলো কর্ণফলীর সঙ্গে বিভিন্ন খালের মুখে নির্মিত সব জলকপাট সচল না করা, জোয়ারে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, আবর্জনা ও পলিথিন ফেলে খাল-নালা ভরাট এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সিডিএর মেগা প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩৬টি খালের খনন ও সংস্কারকাজ চলছে, যার মধ্যে ৩০টি খালের সম্পূর্ণ এবং ৫টি খালের ৯৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। হিজড়া খালের অগ্রগতি ৬৮ শতাংশ। প্রকল্পে ডিজাইন অনুযায়ী ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
সরেজমিনের দেখা যায়, চট্টগ্রামের চকবাজার চক সুপার মার্কেট এলাকায় পাশের খাল থেকে পানি প্রবেশ করছে। এতে আশপাশে দোকান পাট ও মার্কেটে পানি জমেছে। ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। এ অবস্থা বিরাজ করছে গত সোমবার থেকে। কাঁচা বাজারসহ প্রায় এক হাজারে বেশি দোকান পানিতে তলিয়ে গেছে। সড়ক দিয়ে পায়ে হাঁটা ও গাড়ি চলাচলের অবস্থা নেই।
প্রবীণ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, কর্ণফুলী নদীতে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। জোয়ারের সময় বৃষ্টি হলে সে পানি আর নামতে পারে না। এতে সাময়িক জলাবদ্ধতা হয়। বৃষ্টির সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সড়কে পানি জমার প্রধান কারণ।
চকবাজার কাঁচাবাজারের শুঁটকি ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন বলেন, তিন দিন ধরে ক্রেতা নেই। দোকানে পানি প্রবেশ করায় অনেক মাল নষ্ট হয়ে গেছে। এখানে আশপাশে প্রায় এক হাজারের বেশি দোকানে পানি ঢুকেছে। রাতে পানি ঢোকায় পণ্য নষ্ট হয়েছে।
দুপুরে চক সুপার মার্কেটের সামনের সড়কে জলাবদ্ধতা নিরসনে পানিপ্রবাহের বাধা অপসারণ করছিলেন চসিকের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাব্বির ইসলাম ফারুক। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, পানি চলাচলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাসাবাড়ির ময়লাভর্তি পলিথিন। দোকান বা মার্কেটের সামনের এ ধরনের পতিবদ্ধতা যদি ব্যবসায়ীরা দূর করে দেন, তাহলে জলাবদ্ধতা থাকবে না। প্রত্যেকের নাগরিকের দায়িত্ব পালন করা উচিত।
জলাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন অফিসগামী ও সাধারণ মানুষ। সারা দিন সড়কে যানবাহন কম থাকায় বেশি ভাড়া আদায় করেছে গণপরিবহনগুলো।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অধীনে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেড। সংস্থাটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষের দিকে। এরপরও জলাবদ্ধতা হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে আমাদের ৩০ বছর আগের সময়ে ফিরে যেতে হবে। সে সময় চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা হতো না। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে পাহাড় কাটা, খাল দখল, অবৈধ ভবন নির্মাণ করে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলেছিল। প্রকল্পের কাজ করার সময় প্রায় সাড়ে ৫ হাজার ভবন ভাঙা হয়। হিজড়া খালের সংস্কারের সময়ও ১০৬টি ভবন ভাঙা হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে আমাদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।’
তিনি জানান, চট্টগ্রামে বিভিন্ন খালের মুখে ৩৯টি জলকপাট স্থাপন করা হয়েছে। যার অনেকটি এখনো সচল হয়নি। এসব জলকপাট পুরাপুরি সচল থাকলে জলাবদ্ধতা থাকবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নালা-নর্দমা পরিষ্কার করা সিডিএর কাজ নয়। সিডিএর প্রধান কাজ অবকাঠামো উন্নয়ন করা। সিটি করপোরেশনসহ সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে সিডিএ।
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘ চার দশকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর কিছু এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা হচ্ছে শুধু পানি চলাচলে বাধার কারণে। তদারক করতে আমাদের ৬ সদস্যবিশিষ্ট ১৬টি টিম কাজ করছে।’
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম জানান, গতকাল বেলা ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অতিভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে। সকালে বঙ্গোপসাগরে জোয়ার ছিল ৪ দশমিক ৫২ মিটার, যা বাতাস ও বৃষ্টিতে বৃদ্ধি পেয়ে আরও দুই মিটার পর্যন্ত বেড়েছে। এ ছাড়া ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতে মারাত্মক পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি জানান, মেঘ বিস্ফোরণে চট্টগ্রাম ও আশপাশ অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তিন দিনের প্রায় ৭৬৮ দশমিক ৩ (বেলা ৩টার হিসেবে) মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীতে গত সোমবার থেকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এবার কিছু নতুন এলাকাতেও পানি জমেছে। নগরীর নিউ মার্কেট, রেয়াজউদ্দিন বাজার এবং আগ্রাবাদ, পাঠানটুলিতে পানি জমেছে। মুরাদপুরের জলাবদ্ধতা ছিল দীর্ঘদিনের সমস্যা। সিডিএর মেগা প্রকল্পের আওতায় সেখানে খাল খনন ও সংস্কার করার ফলে গত বছর মুরাদপুরে জলাবদ্ধতা হয়নি। কিন্তু গতকাল সকালে সেখানে ফের জলাবদ্ধতা হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ জানায়, নালা ও খালগুলো পরিষ্কার রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালছে। গতকাল রাতে র্যাপিড অ্যাকশন টিম গঠন করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কন্ট্রোল রুম খুলেছে চসিক।
চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নগরীতে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষ, সাধারণ মানুষ খুবই কষ্ট পেয়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসলে বলেকয়ে আসে না। আমি নগরবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা যেন সবাই ধৈর্য ধারণ করি। চট্টগ্রামে একসময় পাহাড়ধস হতো। সবাই সাবধানে থাকার কারণে এখনো পাহাড়ধস হয়নি। সবাইকে সচেতন থাকতে হবে ভারী বর্ষণে কেউ বাইরে যাবেন না। গতকালসহ আগের তিন দিনে প্রায় সাড়ে ৭০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। সার্বক্ষণিক মাঠে রয়েছি।’