পূর্বে দেখা হয়েছে আটবার। ফ্রান্সের জয় ৬টি এবং ড্র হয়েছে বাকি ২টি। অজেয় এই ফ্রান্সের সামনে এখন মরক্কো। আজ উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে দুই পরাশক্তি। বোস্টনে তাদের লড়াই শুরু হবে আজ রাত ২টায়। ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের পুনরাবৃত্তির এই মহারণে ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামবে দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। তবে ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যে প্রস্তুত আফ্রিকান সিংহ মরক্কো।
কাতার বিশ্বকাপের সেমির লড়াইয়ে রচিত হয়েছিল এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্য। সেদিন ফরাসিদের জয়ে থেমেছিল মরক্কোর রূপকথা, থামেনি কেবল তাদের জয়গান। বিশ্বমঞ্চের পরিসংখ্যানে ফ্রান্স এগিয়ে থাকলেও, বল মাঠে গড়ানোর আগে পরিসংখ্যান দিয়ে লেখা যায় না ফুটবলের শেষ রোমাঞ্চটুকু। এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্স ভাসছে সাফল্যের এক নিখুঁত স্রোতে। কিলিয়ান এমবাপ্পে-উসমান ডেম্বেলেদের পায়ের জাদুতে মুগ্ধ ফুটবল বিশ্ব। অন্যদিকে মরক্কো দেখিয়েছে তাদের ইস্পাতকঠিন রক্ষণ ও ক্ষিপ্রতার ঝলক। শেষ ষোলোয় কানাডার বিপক্ষে ৩-০ গোলের দাপুটে জয়ে তারা আত্মবিশ্বাসের চূড়ায়।
একদিকে দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, অন্যদিকে আফ্রিকার নতুন ফুটবল জাগরণের প্রতীক। চার বছর আগে কাতারের সেমিফাইনালে যে স্বপ্ন ভেঙেছিল মরক্কোর, এবার সেই ইতিহাস বদলে দেওয়ার সুযোগ তাদের সামনে। মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস অবশ্য স্পষ্টভাবেই ফ্রান্সের পক্ষে। দুদলের আট আন্তর্জাতিক সাক্ষাতে ফ্রান্স জিতেছে ছয়বার, বাকি দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। মরক্কো এখনও ফরাসিদের বিপক্ষে প্রথম জয়ের অপেক্ষায়। বিশ্বকাপে একমাত্র দেখাও হয়েছিল ২০২২ সালের সেমিফাইনালে, যেখানে ২-০ গোলের জয় নিয়ে ফাইনালে উঠেছিল ফরাসিরা। তাই এবারের কোয়ার্টার ফাইনাল মরক্কোর কাছে শুধু একটি ম্যাচ নয়, বহু বছরের অপেক্ষার প্রতিশোধ নেওয়ারও মঞ্চ।
কোচ দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স এবারের বিশ্বকাপেও নিজেদের অভিজ্ঞতার ছাপ রেখে চলেছে। গ্রুপ পর্বে ধারাবাহিক ফুটবল খেলে নকআউটে ওঠার পর শেষ ষোলোতে শক্ত প্রতিরোধ গড়া প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করেছে ফ্রান্স। অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টির গোলই ছিল সেই ম্যাচের পার্থক্য। পুরো ম্যাচে কঠিন শারীরিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ধৈর্য ধরে খেলার জন্য নিজের দলকে প্রশংসা করেছেন দেশম। তার মতে, এমন কঠিন পরীক্ষাই শিরোপা জয়ের পথে দলকে আরও পরিণত করে। অন্যদিকে মরক্কো যেন ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভয়ংকর আন্ডারডগে। গ্রুপ পর্বে আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্সের পর তারা শেষ ষোলোতে তিন গোলে উড়িয়ে দিয়েছে কানাডাকে। রক্ষণে শৃঙ্খলা, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণ–এই তিন অস্ত্রেই এগোচ্ছে আটলাস লায়ন্সরা।
মরক্কোর নতুন কোচ মোহাম্মদ উয়াহবি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বদলে দিয়েছেন দলের মানসিকতা। বয়সে তরুণ হলেও তার কৌশল, আত্মবিশ্বাস এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা ইতোমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘ফ্রান্সের নাম বড় হতে পারে, কিন্তু মাঠে নামার পর নাম নয়, পারফরম্যান্সই সবকিছু নির্ধারণ করবে। টানা অপরাজিত থেকে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা মরক্কো এখন আর কাউকে ভয় পায় না।’ ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পেও সতর্ক। তার মতে, মরক্কো এমন একটি দল যারা সুযোগ পেলে শাস্তি দিতে এক মুহূর্তও দেরি করে না। তাই ধৈর্য, বলের নিয়ন্ত্রণ এবং ছোট ভুল এড়িয়ে চলাই হবে ফরাসিদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
এই ম্যাচে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন দুই সুপারস্টার–কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আশরাফ হাকিমি। একদিকে বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলস্কোরার, অন্যদিকে আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ফুল-ব্যাকদের একজন। তাদের দ্বৈরথই হয়তো নির্ধারণ করে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য। ফ্রান্স নামবে অভিজ্ঞতার শক্তি নিয়ে, মরক্কো খেলবে স্বপ্নের সাহস নিয়ে। একদল জানে কীভাবে বিশ্বকাপ জিততে হয়, অন্যদল জানে কীভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করতে হয়। তাই এটি শুধু একটি কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ নয়। এটি অতীতের হিসাব চুকানোর, ইতিহাস নতুন করে লেখার এবং আরেকটি বিশ্বকাপ রূপকথা জন্ম দেওয়ার অপেক্ষা।
শেষ বত্রিশের বাধা অনায়াসে পেরোলেও, শেষ ষোলোতে এসে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছিল ফ্রান্স। শারীরিক শক্তিনির্ভর ফুটবল খেলা প্যারাগুয়েকে হারাতে তাদের ঘাম ঝরাতে হয়েছে, শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পের সফল স্পট কিকেই নিশ্চিত হয় জয়। এবার সামনে আরও কঠিন প্রতিপক্ষ। ফ্রান্সের সহকারী কোচ গি স্টিফোর বিশ্বাস, মরক্কোর বিপক্ষে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে তার দলকে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি যেসব দলের বিপক্ষে আমরা খেলেছি, মরক্কো তাদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের প্রতিপক্ষ। তারা দারুণ গোছানো, সুসংগঠিত ও মানসিকভাবে খুব দৃঢ়। সবচেয়ে বড় কথা, পাল্টা আক্রমণে তারা ভয়ংকর কার্যকর এবং সেই পথেই অনেক গোল করেছে। মাঠের দুই প্রান্তেই তাদের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে সমৃদ্ধ খেলোয়াড় রয়েছে। নিঃসন্দেহে তারা একটি মানসম্পন্ন দল; যারা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।’