রাত গভীর। মক্কার একটি ঘর ঘিরে রেখেছে উন্মুক্ত তরবারি হাতে কুরাইশের বাছাই করা যুবকরা। প্রতিটি গোত্র থেকে একজন–যেন হত্যার রক্ত ভাগ হয়ে যায় সবার মধ্যে, আর বনু হাশিম কারও কাছে প্রতিশোধ নিতে না পারে। পরিকল্পনা চূড়ান্ত, ভোর হলেই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করা হবে।
ঘরের ভেতরে বিছানায় শুয়ে আছেন একজন, গায়ে নবিজির সবুজ চাদর। ঘাতকরা ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে নিশ্চিন্ত, শিকার বিছানাতেই আছে।
কিন্তু সেই বিছানায় নবিজি নেই। আছেন এক তরুণ, আলী ইবনে আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু। নবিজি তাকে দুটি দায়িত্ব দিয়ে হিজরতের পথে বেরিয়ে গেছেন। তার বিছানায় শুয়ে থাকা, আর মানুষের গচ্ছিত আমানতগুলো ফিরিয়ে দেওয়া।
সিরাতে ইবনে হিশামে ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ এসেছে; মুসনাদে আহমাদে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার দীর্ঘ বর্ণনায়ও হিজরতের রাতে আলীর নবিজির বিছানায় শয়নের উল্লেখ রয়েছে। (পাঠকের জন্য স্বচ্ছতা: এটি মূলত সিরাত ও ইতিহাসগ্রন্থের বর্ণনা; বিস্তারিত খুঁটিনাটির সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের আলোচনা আছে, তবে মূল ঘটনাটি সিরাত-গবেষকদের কাছে স্বীকৃত)
ভাবুন তো সেই রাতের কথা। তরবারিগুলো যেকোনো মুহূর্তে নেমে আসতে পারে, আর সেগুলোর নিচে শুয়ে আছেন মাত্র বিশের কোঠার এক তরুণ। কীসের জোরে? ভালোবাসার জোরে। আনুগত্যের জোরে। এই বিশ্বাসের জোরে যে, আল্লাহর রাসুল যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তাতে কল্যাণ ছাড়া কিছু নেই।
আর লক্ষ করুন দ্বিতীয় দায়িত্বটি, আমানত ফেরত দেওয়া। যারা নবিজিকে হত্যা করতে চাইছে, সেই মক্কাবাসীরাই নিজেদের মূল্যবান সম্পদ গচ্ছিত রাখত তারই কাছে! শত্রুও জানত, ‘আল-আমিন’-এর চেয়ে নিরাপদ হাত আর নেই। মৃত্যুর হুমকির মুখেও ইসলাম শেখায়, আমানতের খেয়ানত নয়।
আজ আমরা সামান্য ঝুঁকিতেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাই, আর সুযোগ পেলেই আমানতে শিথিল হই। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর সেই রাত শেখায়; ভালোবাসার দাবি মুখে নয়, ঝুঁকি নেওয়ায়, আর ঈমানের সৌন্দর্য আমানতদারিতায়। হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে আপনার রাসুলের জন্য সেই ভালোবাসা দিন, যা আমাদের দায়িত্বশীল ও আমানতদার বানায়। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক