দেশের অভ্যন্তরে ও ভারতের উজানে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশের রংপুর, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বেশ কয়েকটি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা সতর্কীকরণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্র।
এদিকে সারা দেশে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বুধবার (৮ জুলাই) সকালে আগামী চার দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস জারি করে এই তথ্য জানিয়েছে ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বর্তমানে উত্তর বঙ্গোপসাগরে মৌসুমি বায়ু প্রবল অবস্থায় রয়েছে এবং এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে।
আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, ভারতের ছত্রিশগড় এবং তৎসংলগ্ন উত্তর ও মধ্য প্রদেশে অবস্থানরত মৌসুমি স্থল নিম্নচাপটি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর ও দুর্বল হয়ে সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। এটি বর্তমানে মধ্য প্রদেশ ও তৎসংলগ্ন উত্তর প্রদেশে অবস্থান করছে এবং এটি আরও পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে মৌসুমি বায়ুর বর্ধিতাংশের অক্ষ রাজস্থান, সুস্পষ্ট লঘুচাপের কেন্দ্রস্থল, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে সারা দেশের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। এই সময়ে সারা দেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বান্দরবানে ৩১৪ মিলিমিটার এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে রাঙামাটিতে ২৮৭ মিলিমিটার। তাপমাত্রার তথ্যে দেখা গেছে, গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে সিলেটে ২৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের দায়িত্বরত সহকারী প্রকৌশলী ইমন কল্যাণ দাস জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার থেকে ভারতের মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও অরুণাচল প্রদেশেও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হয়েছে। উজানের ঢলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন দিন চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, যার পরবর্তী দুই দিন মাঝারি-ভারী থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১২৭টি পানি সমতল স্টেশনের মধ্যে ৬৯টি স্টেশনে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ৫৩টি স্টেশনে পানি হ্রাস পেয়েছে। ৫টি স্টেশনে পানি অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমানে ২টি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সাঙ্গু নদী বান্দরবান স্টেশনে বিপৎসীমার ৯৬ সেন্টিমিটাও ওপর দিয়ে এবং মাতামুহুরী নদী লামা স্টেশনে বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সাঙ্গু নদীতে ৩৪৮ সেন্টিমিটার এবং মাতামুহুরী নদীতে ১৭৩ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়েছে, যা আগামী তিন দিন আরও দ্রুত বাড়তে পারে। এর ফলে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। এ ছাড়া ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার নদীগুলো কিছু কিছু স্থানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের মনু, ধলাই, খোয়াই, কংস, সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। কুশিয়ারা নদী ফেঞ্চুগঞ্জ ও মারকুলি স্টেশনে এবং সোমেশ্বরী নদী কলমাকান্দা স্টেশনে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় এই নদীগুলো সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার কিছু স্থানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সুরমা নদীর পানিও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করতে পারে।
উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগে তিস্তা নদীর পানি বেড়েছে এবং নদীটি ডালিয়া, কাউনিয়া ও তারাপুর স্টেশনে সতর্কসীমায় রয়েছে। তবে ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় তিস্তা নদী বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। যার ফলে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় ধরলা ও দুধকুমার নদও লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় সতর্কসীমায় প্রবাহিত হয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করতে পারে।
গঙ্গা নদীর পানি স্থিতিশীল ও পদ্মা নদীর পানি হ্রাস পেয়েছে, যা আগামী তিন দিন বাড়লেও বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। অন্যান্য অববাহিকার মধ্যে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় হ্রাস পেয়েছে এবং এটি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী চার দিন এই অববাহিকায় পানি বৃদ্ধি পেলেও তা বিপৎসীমার নিচেই থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। ঢাকা ও এর চারপাশের বুড়িগঙ্গা নদীর পানি হ্রাস পেয়েছে।